নয়ান বা ময়ূর পানসি (বৈজ্ঞানিক নাম: Junonia almana) হলো নিমফালিডি (Nymphalidae) পরিবারের জুনোনিয়া গণের একটি অত্যন্ত চমৎকার ও রঙিন প্রজাপতি। বাংলাদেশের প্রজাপতির তালিকায় অনন্য স্থান অধিকার করে থাকা এই রূপসী পতঙ্গটি তার ডানার নজরকাড়া নকশার জন্য প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত।
নয়ান বা ময়ূর পানসি প্রজাপতির বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ও শ্রেণিবিন্যাস
| বিষয়ের বিবরণ | তথ্য / বৈজ্ঞানিক নাম |
|---|---|
| বাংলা নাম | নয়ান বা ময়ূর পানসি |
| বৈজ্ঞানিক নাম | Junonia almana (Linnaeus) |
| ইংরেজি নাম | The Peacock Pansy |
| স্থানীয় নাম | নয়ান, ময়ূর পানসি প্রজাপতি |
| জগৎ/রাজ্য (Kingdom) | Animalia (প্রাণী জগৎ) |
| পর্ব (Phylum) | Euarthropoda (সন্ধিপদী / আর্থ্রোপোডা) |
| শ্রেণি (Class) | Insecta (কীটপতঙ্গ) |
| বর্গ (Order) | Lepidoptera (লেপিডোপ্টেরা) |
| পরিবার (Family) | Nymphalidae (নিমফালিডি) |
| গণ (Genus) | Junonia |
| প্রজাতি (Species) | Junonia almana |
| সমনাম / প্রতিনাম (Synonyms) | • Papilio almana Linnaeus, 1758 • Vanessa almana Goart, 1819 • Junonia almana Bingham, 1905 • Precis almana almana Evans, 1932 |
নয়ান বা ময়ূর পানসি প্রজাপতির ডানার গঠন ও বৈশিষ্ট্য
ময়ূর পানসি প্রজাপতির ডানা অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এদের ডানার গঠন বৈজ্ঞানিক দিক থেকে খুবই অনন্য। নিচে এদের ডানা ও ঋতুভিত্তিক রূপান্তরের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
- ডানার পরিমাপ: ময়ূর পানসি প্রজাপতিদের দুই ডানা প্রসারিত অবস্থায় এর মোট মাপ বা উইংস্প্যান (Wingspan) সাধারণত ৬০ থেকে ৬৫ মিলিমিটার হয়ে থাকে।
- রং ও উপরিভাগ: এদের ডানার উপরিভাগ মূলত আকর্ষণীয় মেটে রঙের বা হালকা তামাটে হলদে-কমলা ছোপযুক্ত হয়ে থাকে। [1, 2]
- চোখ-সদৃশ দাগ বা ওসেলাস (Ocellus): এদের সামনের ডানার উপরের দিকে ২টি সুন্দর ওসেলাস (চোখের মতো বৃত্তাকার দাগ) থাকে। অন্যদিকে, পেছনের ডানার উপরের দিকে শিরা ৪ থেকে ৭-এর অংশ জুড়ে একটি বেশ বড় ও স্পষ্ট ওসেলাস দেখা যায়, যা ময়ূরের পেখমের চোখের মতো দেখায়।
- ডানার প্রান্তীয় আকৃতি: সামনের ডানার টারমেন বা বাইরের অংশটি পিরামিড আকৃতির হয়ে থাকে। এর বাইরের প্রান্ত ৩ নম্বর শিরার সাথে একটি কোণ তৈরি করে। ডানা জুড়ে ৩টি গাঢ় রেখা এবং ৫টি আড়াআড়ি বার বা দাগ সেলের ভেতরে ও পেছনে অবস্থান করে। পেছনের ডানার টরনাস (নিচের কোণ) অংশে একটি শীর্ষ-ভোঁতা লেজের মতো গঠন থাকে।
ঋতুভেদে ময়ূর পানসি প্রজাপতির রূপান্তর (Seasonal Variation)
এই প্রজাপতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে এদের ডানার আকার ও রঙের পরিবর্তন ঘটে (Seasonal Polyphenism):
- শুকনো বা শীত মৌসুম (Dry Season Form): শুষ্ক আবহাওয়ায় এদের ডানার প্রান্তীয় রেখাগুলো বেশ অস্পষ্ট হয়ে যায়। এই সময়ে এরা ডানার নিচের অংশ ভাঁজ করে শুকনো পাতার মতো ছদ্মবেশ (Camouflage) ধারণ করে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকে।
- ভেজা বা বর্ষা মৌসুম (Wet Season Form): বর্ষাকালে বা ভেজা মৌসুমে এদের ডানা ৩ নম্বর শিরার মতো কোণ তৈরি করে না এবং পেছনের ডানার লেজের মতো অংশটি থাকে না। তবে এই সময়ে এদের ডানার কালো দাগ ও ওসেলাসগুলো অনেক বেশি গাঢ়, স্পষ্ট ও উজ্জ্বল দেখায়।
ময়ূর পানসি প্রজাপতির স্বভাব ও বাসস্থান
ময়ূর পানসি বা নয়ান প্রজাপতি (Junonia almana) মূলত একটি বেশ চঞ্চল এবং বেশ সাধারণ প্রজাতি (Common Species)। এদেরকে সাধারণত লোকালয়ের কাছাকাছি ঝোপঝাড়, খোলা মাঠ, বাগান, ফসলের ক্ষেত এবং বনাঞ্চলের রৌদ্রোজ্জ্বল স্থানে ডানা মেলে বসে থাকতে বা ওড়াউড়ি করতে দেখা যায়।
শুঁয়োপোকা বা লার্ভার খাদ্য উদ্ভিদ (Larval Host Plants)
ময়ূর পানসি প্রজাপতির লার্ভা বা শুঁয়োপোকাগুলো নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকে। এদের প্রধান খাদ্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে গ্লক্সিনিয়া (Gloxinia) এবং ওসবেকিয়া (Osbeckia)।
বিখ্যাত কীটতত্ত্ববিদ ভার্শনি (Varshney, 1994)-এর গবেষণামতে, Junonia গণের অন্তর্ভুক্ত সকল প্রজাপতির লার্ভা নিচের উদ্ভিদগুলোকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে:
- Hygrophila spinosa: কুলেখাড়া বা তালমাখনা গাছ।
- Acanthus spp.: হরকচ বা হিজলি জাতীয় উদ্ভিদের প্রজাতি।
- Asteracantha longifolia: কাঁটাযুক্ত ভেষজ উদ্ভিদ।
- Barleria spp.: ঝিন্টি বা পিয়াবাসা জাতীয় ফুল গাছ।
- Justicia procumbens & J. micrantha: রক্তদ্রোণ বা জাস্টিসিয়া প্রজাতির ভেষজ।
- Lepidagathis prostrata: লেপিডাগাথিস প্রজাতির ছোট বীরুৎ গাছ।
- Sida rhombifolia: লাল বেড়ো বা বাটিয়াল গাছ।
- Jute: আমাদের চিরচেনা পাট গাছ।
- Sweet potato: মিষ্টি আলু গাছের পাতা।
- Lippia nodifolia: ভুঁইওকরা বা ভূঁইতুলসী।
- Antirrhinum orontium: ড্রাগন স্কাল ফুল গাছ বা স্ন্যাপড্রাগন প্রজাতি।
ময়ূর পানসি প্রজাপতির ভৌগোলিক বিস্তৃতি
এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ময়ূর পানসি প্রজাপতিটি প্রাকৃতিকভাবেই ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’-এর ২১ তম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) এই প্রজাপতির বিস্তৃতি সম্পর্কে বিশদ তথ্য দেওয়া হয়েছে। জ্ঞানকোষের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ ছাড়াও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, সমগ্র ভারতবর্ষ (ভারত ও এর আশেপাশের অঞ্চল), মায়ানমার এবং চীনে এই আকর্ষণীয় প্রজাপতি প্রজাতিটি নিয়মিত দেখতে পাওয়া যায় [১]।
ময়ূর পানসি প্রজাপতির ঋতুভিত্তিক রূপ নিয়ে ঐতিহাসিক মতামত
দুই প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও গবেষক মার্শাল এবং ডি নাইসভিলে (Marshall & de Niceville, 1886) এই প্রজাপতির ঋতুভিত্তিক বৈচিত্র্য নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মতামত প্রকাশ করেন।
তাঁদের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণালব্ধ অভিমত অনুযায়ী, দীর্ঘকাল ধরে আলাদা প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হওয়া অত্যন্ত নিকট সম্পর্কযুক্ত প্রজাতি Junonia asterie মূলত ময়ূর পানসি প্রজাপতির ভেজা বা বর্ষা মৌসুমের রূপ (Wet Season Form)। অন্যদিকে, Junonia almana হলো একই প্রজাপতির শুষ্ক বা শীতকালীন রূপ (Dry Season Form)। অর্থাৎ, এরা দুটি ভিন্ন প্রজাতি নয়, বরং জলবায়ু ও ঋতুভেদে একই প্রজাপতির দুটি ভিন্ন রূপান্তর মাত্র।
আরো পড়ুন:
- নয়ান বা ময়ূর পানসি প্রজাপতির বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণিবিন্যাস – Junonia almana
- বাংলাদেশের প্রজাপতির একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা
- রয়াল বাংলাদেশ ভারত মায়ানমার এবং চীনের প্রজাপতি
- চাঁদনরি দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রজাপতি
- বড় জামুই দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রজাপতি
- পাতি ভুশন্ডা বাংলাদেশ ভারত মায়ানমারের প্রজাপতি
- লালফুটকি ভুশন্ডা বাংলাদেশ ভারত মায়ানমারের প্রজাপতি
- পাতি কাগজী বাংলাদেশ ভারত মায়ানমারের প্রজাপতি
- সিধাড়ু এশিয়ার প্রজাপতি
- পাতি ঢেউখিলানি দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রজাপতি
- দেশি রাজা বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারের প্রজাপতি
- কালো রাজা বাংলাদেশ, ভারত, শ্রী লঙ্কা ও মায়ানমারের প্রজাপতি
- তামাটে রাজা বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারের প্রজাপতি
- চিতা পাড়পাখনা বাংলাদেশ, ভারত মায়ানমারের প্রজাপতি
- কালো শিরা ফুলকি দাঁড়া বাংলাদেশ, ভারত মায়ানমারের প্রজাপতি
- বনদাঁড়া বাংলাদেশ, ভারত মায়ানমারের প্রজাপতি
- নীল খাঁজী ফুলকি দাঁড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রজাপতি
- কমলা দাগী ফুলকি দাঁড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রজাপতি
- পাতি মরচেপাতা দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রজাপতি
- A Full Checklist of the Butterflies of Bangladesh
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. চৌধুরী, শফিক এইচ. (আগস্ট ২০০৯)। “আর্থ্রোপোডা: ইনসেক্টা-৩”। ইন: আহমদ, মোনাওয়ার; কবির, সৈয়দ মোহাম্মদ হুমায়ুন; আহমদ, আবু তৈয়ব (সম্পাদকদ্বয়)। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, খণ্ড ২১ (১ম সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা: ৭৮–৭৯। আইএসবিএন: 984-30000-0286-0।
২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২ জুলাই ২০১৮ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ৩০ মে ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
