কলচিকাম-এর নানা প্রজাতির বিবরণ

কলচিকাম-এর সম্পর্কে জানে রাখা ভালো। এর সর্ব প্রকার কন্দ ও বীজ থেকে কলচিসিন নামক বীর্য বিশেষ বা উপক্ষার পাওয়া যায়। এই বীর্য শক্তিটিকে নিয়ে কিভাবে সমীক্ষা হয়েছে, তা এখানে দেওয়া হচ্ছে।

কলচিকাম-এর প্রকারভেদ

Liliaceae পরিবারের অন্তর্গত Colchicum গণভুক্ত প্রায় ৮৫টি প্রজাতি এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অংশে জন্মে। তন্মধ্যে মাত্র কয়েকটি ঔষধার্থে ব্যবহৃত হয়ে। এগুলির মধ্যে মাত্র ২টি প্রজাতি ভারতের পশ্চিম হিমালয়ের বিভিন্ন স্থানে ২-৯ হাজার ফুট উচ্চতায় জন্মে। সে দুটি প্রজাতি হলো Colchicum luteum এবং colchicum aitchisonii. বহির্ভারতে এর যে প্রজাতিটি ঔষধার্থে অধিক ব্যবহৃত হয় সেটির নাম Colchicum autumnale. ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এই প্রজাতিটির মাতৃভূমি। এছাড়া Colchicum variegatum এবং Colchicum speciosum প্রজাতি দুটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জন্মে ও ঔষধার্থে ব্যবহৃত হয়।

কলচিকাম-এর পরিচিতি

ভারতের ভেষজ চিকিৎসক সম্প্রদায়ের কাছে Colchicum সুরিঞ্জান নামে পরিচিত। এখানে এটিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে— (১) সুরিঞ্জান কড়ুয়া, (২) সুরিঞ্জান মিঠা।

সাধারণত দেখা যায় যে, প্রায় স্বাদহীন শ্বেত বর্ণ বিশিষ্ট কন্দগুলি মিঠা এবং তিক্তা স্বাদ শিষ্ট বাদামী, লালচে, কালচে লাল, উজ্জ্বল লাল বাদামী প্রভৃতি রঙের কন্দগুলি কড়ুয়া সুরিঞ্জান নামে চলে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষা অনুসারে Cólchicum autumnale, C. luteum এবং C. aitchisonii এই তিনটির কন্দকে আমরা কড়ুয়া সুরিঞ্জান বা সুরিঞ্জান উদ্ভিদের কড়ুয়া বলতে পারি। এ ছাড়া Narcissus tazetta (Amaryllidaceae) নামক একটি উদ্ভিদের শুষ্ক কন্দ (চাকা চাকা করে কাটা) সুরিঞ্জান কড়ুয়ার পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। অবশ্য এটি পারস্য থেকে এ দেশে আসে, তবে বর্তমানে ভারতের কোথাও কোথাও বাগানে যত্ন সহকারে চাষ করা হয়।

উপরিউক্ত কলচিকামের সমস্ত প্রজাতিগুলি থেকে Colchicine নামক উপক্ষার পাওয়া গোলেও N. tazetta-এর কন্দ থেকে কলচিসিন পাওয়া যায় না। তবে বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা জানা গেছে যে Iphigenia stellata (Liliaceae) নামক ভেষজটি থেকেও কলচিসিন নামক উপক্ষার পাওয়া যায়।

আরো পড়ুন:  কুকুরশোঁকা দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বিরুৎ

ইউনানি সম্প্রদায়ের মতে, এটিই প্রচলিত ছিল যে সুরিঞ্জান মিঠার প্রয়োগ আভ্যন্তরিক এবং সুরিঞ্জান কড়ুয়ার (তিক্ত) ব্যবহার বাহ্যিক। কিন্তু বর্তমানের ভৈষজ্য সমীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে—মিঠার চেয়ে তিক্ত সুরিঞ্জানই উৎকৃষ্ট এবং সেটির আভ্যন্তরিক ও বাহ্যিক দু’ভাবেই ব্যবহার করা যেতে পারে। এখানে তিনটি প্রজাতির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো ।

1. Colchicum autumnale Linn.

কলচিকাম বলতে যে প্রজাতিটির কন্দ (শুষ্ক) সারা পৃথিবীব্যাপী অধিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে, সেটি হলো এইটি। ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এর আদিবাসস্থান হলেও আমেরিকা ও কানাডার প্রায় সর্বত্র বাগানে লাগান হয়। কন্দযুক্ত গাছ, পাতা লম্বাটে, অনেকটা পেঁয়াজ বা রসুনের পাতার মত। বসন্তে পাতা বেরোয়। গাছের পাতাগুলি বিবর্ণ হয়ে পড়ে যাওয়ার পর পুষ্পদণ্ড বেরোয়। ফুল সাদা বা হালকা লাল রঙের। কন্দ অনেকটা দেখতে এককোষী রসুনের মত হলেও আকারে তার চেয়ে কিছুটা বড় এবং সেগুলি ফিকে লাল রঙের আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত থাকে। উপরের আচ্ছাদন সরিয়ে দিলে গেঁটে কড়ির আকৃতি বিশিষ্ট—প্রায় সাদা রঙের কন্দ পাওয়া যায়। কন্দ অতিশয় কটু বিস্বাদ, কাটলে তা থেকে দুধ বেরোয়। জুন-জুলাই মাসে এগুলি সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে অথবা হালকা ভাপে সিদ্ধ করে শুকিয়ে ও উপরের খোসা বাদ দিয়ে বাজারে বিক্রয়ার্থে আসে। এগুলি সর্বদাই বাইরে থেকে আসে এবং সুরিঞ্জান কড়ুয়া নামে বাজারে বিক্রয় হয় ৷

2. Colchicum lutcum Baker

কলচিকামের যে দুটি প্রজাতি ভারতে জন্মে, তন্মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ এবং সর্বাপেক্ষা অধিক ব্যবহার্য। তাহলেও উভয় প্রকার সুরিঞ্জান সীমারেখা টপকে কলকাতার তথা ভারতের বাজারে আসে, অবশ্য তা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শোনা। গ্রীক দেশে ও ইউরোপের কোন কোন স্থানে এটি Yellow autumn crocus নামে পরিচিত। autumnale-এর পরিবর্তে এই প্রজাতিটির ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে ।

পশ্চিম হিমালয়ের বিভিন্ন স্থানে বিশেষত কাশ্মীরের ২-৯ হাজার ফুট উচ্চতায় উষ্ণ-প্রধান অঞ্চলের খোলামেলা জায়গায় ভালভাবে জন্মে। মে মাস নাগাত ঢাকা দেওয়া বীজতলায় বীজ বপন করা হয়। চারার বয়স বছর খানিকের হলে তবে গিয়ে অন্যত্র চাষের জন্য লাগানো হয়ে থাকে। পাতা সরু, অগ্রভাগ ভোঁতা। ফুল সোনালী হলদে রঙের হয়। গাছ বছর দুয়েকের হলে কন্দ তোলা হয়। কন্দ সংগ্রহের সময় জুন থেকে জুলাই মাস। সাধারণত টাটকা কন্দ ১৫-৩৫ মিলিমিটার লম্বা ও ১০-২০ মিলিমিটার চওড়া হতে দেখা যায়। কন্দ শঙ্কুবৎ অথবা ডিম্বাকৃতি, খয়েরী বা ধূসর খয়েরী রঙের হয়। কন্দের একদিকের অংশ লম্বালম্বি ভাবে কাটা থাকে। শুকনো বীজ খয়েরী সাদা। শুকনো কন্দ ও বীজ গন্ধহীন এবং স্বাদে তেতো। কন্দগুলিকে অল্প ভাপিয়ে নিয়ে শুকিয়ে বাজারে বিক্রয়ের উপযোগী করা হয়, তখন সেগুলি দেখতে গেঁটে কড়ি অথবা যোনি সদৃশ ।

আরো পড়ুন:  পাকুড় বাংলাদেশে জন্মানো উপকারী বৃক্ষ

3. Colchicum aitchisonii (Hook. f.) Nasir

এটি অন্য একটি প্রজাতি। যার পূর্বের নাম ছিল Merenderá aitchisonii এবং M. persica সুরিঞ্জান কড়ুয়া নামে luteum-এর সঙ্গে বাজারে আসে। পাঞ্জাবে, বিশেষত লবণাক্ত স্থান সমূহে, ঝিলামের নিকটের বিভিন্ন জায়গায়, কাশ্মীরের কোথাও কোথাও অতি অল্প পরিমাণে এটি জন্মে। অধিক জন্মে আফগানিস্থান, পারস্য প্রভৃতি দেশে। শুকনো কন্দমূল বাইরে থেকেই আসে, যোনির মতো আকৃতি বিশিষ্ট, কতকগুলোর রঙ হালকা লাল বাদামী, কতকগুলো আবার গাঢ় লাল বাদামী।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্র:

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, সপ্তম মুদ্রণ ১৪২৬, পৃষ্ঠা, ৩৫-৩৬।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি flowersofindia.net থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম:  Shakir Ahmad

Leave a Comment

error: Content is protected !!