রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টির খসড়া কর্মসূচি

রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টির খসড়া কর্মসূচি[১] (প্রবন্ধ থেকে)

খ। (১৩) ভূমিদাস ব্যবস্থার এই সব জেরের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান, এই বর্বরতার সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ হলো জার স্বৈরতন্ত্র। এই হলো প্রলেতারীয় মুক্তি আন্দোলন ও জাতীয় সাংস্কৃতিক বিকাশের সবচেয়ে ক্রূর, সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু।

গ। সেইজন্য[২] রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টির আশু, কর্তব্য হলো জার স্বৈরতন্ত্রের উচ্ছেদ ও তার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক সংবিধানের ভিত্তিতে প্রজাতন্ত্র স্থাপন, যা নিশ্চিত করবে;

১) জনগণের আত্মক্ষমতা, অর্থাৎ জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত বিধানপ্রণয়নী সভার হাতে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রত্যর্পণ;

২) বিধানপ্রণয়নী সভা তথা আত্মশাসনের সমস্ত স্থানীয় সংস্থায় নির্বাচনের জন্য ২১ বছর বয়ঃপ্রাপ্ত সমস্ত নাগরিকদের সার্বজনীন, সমান ও প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার; সমস্ত নির্বাচনেই গোপন ভোটদানের ব্যবস্থা; সমস্ত প্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থায় প্রতিটি নির্বাচকের নির্বাচিত হবার অধিকার; জনপ্রতিনিধিদের বেতন দান;

৩) নাগরিকদের ব্যক্তিত্ব ও গৃহের অলঙ্ঘনীয়তা;

৪) বিবেক, বাক, মুদ্রণ, সভা, ধর্মঘট ও সমিতির অবাধ স্বাধীনতা;

৫) গমনাগমন ও শিল্পবৃত্তির স্বাধীনতা;

৬) সামাজিক সম্প্রদায়ভেদের অবসান এবং নরনারী, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত নাগরিকের পরিপূর্ণ সমাধিকার;

৭) রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার;

৮) উপরিওয়ালার কাছে নালিশ না করেও প্রতি নাগরিকের জন্য যে কোনো রাজকর্মচারীকে আদালতে সোপর্দ করার অধিকার অর্পণ;

৯) স্থায়ী সৈন্যবাহিনীর পরিবর্তে জনগণের সর্বজনীন সশস্ত্রকরণ;

১০) রাষ্ট্র থেকে গির্জা এবং গির্জা থেকে স্কুলের পৃথকীকরণ;

১১) ১৬ বছর পর্যন্ত সকলের বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষা; গরিব ছেলেমেয়েদের জন্য রাষ্ট্রের খরচায় খাদ্য পোষাক ও পাঠোপকরণ সরবরাহ।

ঘ। শ্রমিক শ্রেণীর রক্ষণ ও তার সংগ্রামী ক্ষমতা[৩] উন্নয়নের স্বার্থে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টি দাবি করে:

১) সমস্ত মজুরি শ্রমিকদের জন্য কর্মদিনের ৮ ঘন্টা সীমাবন্ধন;

২) জাতীয় অর্থনীতির সমস্ত শাখায় নারী পুরুষ উভয় মজুরি শ্রমিকের জন্য একাদিক্রমে অন্যুন ৩৬ ঘণ্টার সাপ্তাহিক ছুটি আইন দ্বারা নির্ধারণ;

আরো পড়ুন:  সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক বা তৃতীয় আন্তর্জাতিকের কার্যক্রম ও ভূমিকা

৩) উদ্বৃত্ত কাজের পুরোপুরি নিষেধ :

৪) টেকনিকাল কারণে যা একান্তই অপরিহার্য এমন ক্ষেত্র ছাড়া জাতীয় অর্থনীতির সব শাখায় রাত কাজের (রাত ৯টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত) নিষেধ ;

৫) ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের মজুরি শ্রমে লাগানো উদ্যোক্তাদের পক্ষে নিষেধ;

৬) যে সব শাখা বিশেষ করে নারী দেহের পক্ষে ক্ষতিকর সেখানে নারী শ্রম নিয়োগের নিষেধ;

৭) শ্রমিকদের শ্রমসামর্থের পরিপূর্ণ অথবা আংশিক ক্ষতির জন্য, দুর্ঘটনা অথবা অনিষ্টকর উৎপাদন পরিস্থিতি জনিত ক্ষতির জন্য আইন, দ্বারা নিয়োগকর্তার নাগরিক দায়িত্ব নির্ধারণ; এ ক্ষতি নিয়োগকর্তার দোষে ঘটেছে একথা প্রমাণ করার দায়িত্ব থেকে শ্রমিকের অব্যাহতি;

৮) সামগ্রী দিয়ে মজুরি শোধ নিষেধ;[৪]

৯) কর্মক্ষমতাহীন বৃদ্ধ শ্রমিকদের রাষ্ট্রীয় পেনসন দান;

১০) কারখানা পরিদর্শকদের সংখ্যাবৃদ্ধি; যেসব শাখায় নারী শ্রমের প্রাধান্য সেখানে পরিদর্শিকা নিয়োগ ; শ্রমিকদের নির্বাচিত ও রাষ্ট্র কর্তৃক বেতনপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের মারফত ফ্যাক্টরি আইন পালনের উপর তত্ত্বাবধান ব্যবস্থা তথা নির্বাচিত শ্রমিকদের দ্বারা হার নির্ধারণ ও লাট মালের তদারকির প্রতিষ্ঠা;

১১) ব্যক্তিমানুষ ও নাগরিক হিসাবে মজুরি-শ্রমিকদের জীবন ও কার্যকলাপে মালিকদের হস্তক্ষেপ থেকে তাদের রক্ষার উদ্দেশ্যে মালিকগণ কর্তৃক ব্যবস্থাপিত তাদের বাসস্থানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, এই সব বাসস্থানের আভ্যন্তরীণ অবস্থা তথা বাসস্থান ভাড়াদানের শর্ত সবই তদারকের জন্য শ্রমিকদের মধ্যে থেকে নির্বাচিতদের সহযোগে স্থানীয় আত্মশাসন সংস্থার তত্ত্বাবধান প্রবর্তন;

১২) মজুরি-শ্রম নিয়োগকারী সমস্ত উদ্যোগে শ্রম পরিস্থিতির সুসংগঠিত সর্বাঙ্গীন স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধানের প্রবর্তন;

১৩) হস্তশিল্প, কুটির শিল্প ও স্বাধীন কারুশিল্প এবং সরকারি শিল্পোদ্যোগের উপর কারখানা পরিদর্শকের তত্ত্বাবধান প্রসার;

১৪) শ্রমরক্ষা আইন লঙ্ঘনের জন্য ফৌজদারি দায়িত্ব প্রবর্তন;

১৫) যে কোনো অজুহাত এবং যে কোনো নামেই হোক না কেন (জরিমানা, খারাপ কাজ ইত্যাদি) মজুরি থেকে টাকা কাঁটা মালিকদের পক্ষে নিষেধ;

১৬) শ্রমিক ও মালিকদের সমান সমান প্রতিনিধি নিয়ে জাতীয় অর্থনীতির সর্বশাখায় শ্রম-আদালতের প্রতিষ্ঠা।[৫]

আরো পড়ুন:  কমিউনিস্ট নৈতিকতা সাম্যবাদী আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট জনগণের নৈতিকতার অনুশীলন

টিকা:

১. এই খসড়ার নীতিগত অংশটা হলো সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য ফ্রেই কতৃক প্রস্তাবিত খসড়া (এবং তা গ, ভ, প্লেখানভের আদি খসড়ার ভিত্তিতে রচিত); ব্যবহারিক অংশটা (নিম্নে উল্লিখিত জায়গাটা থেকে শেষ পর্যন্ত) প্রস্তাব করেন সমগ্র কমিশন অর্থাৎ সম্পাদকমণ্ডলীর পাঁচ জন সদস্যই। ১৯০৩ সালে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে গৃহীত পার্টি কর্মসূচি রচনা করেছিলেন লেনিনীয় ‘ইস্ক্রা’ সম্পাদকেরা, ১৯০১-১৯০২ সালে কর্মসূচির আদি খসড়াটা গ, ভ, প্লেখানভের। প্লেখানভের প্রথম বা পরবর্তি কোনো খসড়াই গ্রহণয্যোগ্য নয় দেখে লেনিন ১৯০২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে নিজের একটি খসড়া রচনা করেন। লেনিন ও প্লেখানভের ভাষ্যের উপর ভিত্তি করে একটি একক খসড়া কর্মসূচি রচনার জন্য ‘ইস্ক্রা’ সম্পাদকমণ্ডলী একটি মতৈক্য কমিশন নিয়োগ করে। লেনিন এইটে আদায় করেন যাতে চুড়ান্ত খসড়ায় প্রলেতারীয় একনায়কত্বের অতি গুরত্বপূর্ণ ধারাটি অন্তর্ভুক্ত হয়, বিপ্লবে প্রলেতারিয়েতের নেতৃভূমিকাটি সুনির্দিষ্ট হয়, এবং পার্টির প্রলেতারীয় চরিত্রের উপর জোর পড়ে। কর্মসূচির সমগ্র কৃষি অংশটাও লেনিন রচনা করেন। ১৯০২ সালের ১লা জুন, ২১ নং ‘ইস্ক্রায়’ খসড়া কর্মসূচি প্রকাশিত হয়। – সম্পাঃ

২. এইখান থেকে বাকিটা সমগ্র কমিশন কর্তৃক গৃহীত।

৩. ফ্রেই’এর প্রস্তাব ছিল অনুচ্ছেদটির প্রথমাংশ এই ভাবে পরিবর্তন করা হোক: “দৈহিক ও নৈতিক অধঃপতন থেকে শ্রমিক শ্রেণীকে রক্ষা এবং স্বীয় মুক্তির সংগ্রামে তার সামর্থ্য বর্ধনের স্বার্থে …

৪. ফ্রেই-এর প্রস্তাব: এখানে (এই ধারায়) ঢোকানো শ্রমিক নিয়োগের সমন্ত চুক্তিতেই। বেতন দানের মেয়াদ আইন দ্বারা এক সপ্তাহ ধার্য করা।

৫. ১৯০২ সালের জানুয়ারির শেষ ও ফেব্রুয়ারির প্রথমে লিখিত।

Leave a Comment

error: Content is protected !!