চশমাপরা হনুমান (Phayre’s Langur): বাংলাদেশের এক বিপন্ন নন্দন

প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি চশমাপরা হনুমান। চোখের চারপাশে সাদা বৃত্তাকার দাগের কারণে এদের দেখতে অনেকটা চশমা পরার মতো লাগে, যা এদের বন্যপ্রাণী প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, বাসস্থান ধ্বংস ও বনায়ন কমে যাওয়ার কারণে এই সুন্দর প্রাণীটি আজ আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে যাওয়ার মুখে। নিচে এই প্রজাতিটির শ্রেণীবিন্যাস, বাসস্থান, বিস্তৃতি ও উপপ্রজাতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস ও সাধারণ পরিচিতি

বৈশিষ্ট্য / ট্যাক্সনমিতথ্য (Information)
বাংলা নামচশমাপরা হনুমান, কালো হনুমান
আঞ্চলিক/ত্রিপুরী নামকালা বান্দর (Kala Bandar)
ইংরেজি নামPhayre’s Langur / Spectacled Leaf Monkey
বৈজ্ঞানিক নামTrachypithecus phayrei (Blyth, 1847)
জগৎ (Kingdom)Animalia
পর্ব (Phylum)Chordata
শ্রেণী (Class)Mammalia (স্তন্যপায়ী)
বর্গ (Order)Primates (প্রাইমেট)
পরিবার (Family)Cercopithecidae

অনন্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য

চশমাপরা হনুমানকে ইংরেজিতে প্রায়ই ‘Spectacled Monkey’ বা চশমা পরা বানর বলা হয়। এর মূল কারণ হলো এদের কুচকুচে কালো মুখের ওপর চোখের চারপাশের চামড়া সাদা রঙের হয়ে থাকে, যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাখিটি বা প্রাণীটি চশমা পরে আছে। এদের গায়ের রঙ সাধারণত কালচে বা ধূসর হয়ে থাকে।

বাসস্থান ও জীবনধারা (Habitat and Behavior)

এই হনুমান মূলত গভীর অরণ্য এবং বাঁশঝাড় পছন্দ করে। এরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের আর্দ্র চিরহরিৎ এবং মিশ্র চিরহরিৎ বনে বাস করে। বনের ভেতরের বাঁশঝাড় ও কৃত্রিম বনায়ন বা প্ল্যান্টেশন এলাকাগুলোতেও এদের বিচরণ দেখা যায়।

  • গাছের কোন স্তরে থাকে: চশমাপরা হনুমান সাধারণত বনের মধ্যবর্তী ক্যানোপি (Middle Canopy) বা মাঝের ডালপালাগুলোতে থাকতে পছন্দ করে। তবে প্রয়োজনে এরা গাছের একদম মগডাল (Top) এবং নিচের অংশও ব্যবহার করে।
  • ভূমির ব্যবহার: এরা স্থলভাগে বা বনের মাটিতে নামতে একদমই পছন্দ করে না। এদের পুরো জীবনযাত্রার ১% এরও কম সময় এরা বনের মেঝে বা মাটিতে কাটায়।

ভৌগোলিক বিস্তৃতি (Distribution)

  • বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশে চশমাপরা হনুমান মূলত সিলেট বিভাগ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের চিরহরিৎ বনাঞ্চলে টিকে রয়েছে।
  • বৈশ্বিক বিস্তৃতি: বাংলাদেশ ছাড়াও এই প্রজাতিটি ভারত, মিয়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড, লাওস এবং ভিয়েতনামে পাওয়া যায়।

বিশ্বব্যাপী চশমাপরা হনুমানের উপপ্রজাতি (Subspecies)

সারা বিশ্বে চশমাপরা হনুমানের মোট ৪টি উপপ্রজাতি বা সাব-স্পিসিজ সনাক্ত করা হয়েছে:

উপপ্রজাতির বৈজ্ঞানিক নামভৌগোলিক বিস্তৃতি ও অঞ্চল
Trachypithecus phayrei phayrei Blyth, 1847বাংলাদেশ এবং ভারত
Trachypithecus phayrei crepusculus Eliot, 1909মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম থাইল্যান্ড
Trachypithecus phayrei shanicus Wroughton, 1917উত্তর শান রাজ্য এবং উচ্চ মিয়ানমারের ইরাবতী নদীর পূর্ব অঞ্চল
Trachypithecus phayrei ruhei Knottnerus-Meyer, 1933সাঙ্গোরা, দক্ষিণ সিয়াম (থাইল্যান্ড)

বর্তমান সংরক্ষণ স্থিতি ও হুমকি (Conservation Status)

বিশ্বব্যাপী এই প্রজাতিটি এখনো পুরোপুরি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে না থাকলেও, বাংলাদেশে চশমাপরা হনুমান চরমভাবে বিপন্ন (Critically Endangered – CR) হিসেবে তালিকাভুক্ত। আমাদের দেশ থেকে এই প্রজাতিটিকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে হলে বনাঞ্চল রক্ষা করা এবং এদের সর্বোচ্চ স্তরের আইনি সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।[১]

আরো পড়ুন:

টিকা

১. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৭ মার্চ ২০১২ তারিখে প্রাণকাকলি ব্লগে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ৩১ মে ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!