কাঁঠাল চাঁপা বা কাঁঠালি চাঁপা তীব্র ঘ্রাণযুক্ত সমভূমির বৃহৎ চিরহরিৎ গুল্ম

ভূমিকা: কাঁঠাল চাঁপা (বৈজ্ঞানিক নাম: Artabotrys hexapetalus ইংরেজি নাম: Climbing Ylang-ylang) হচ্ছে এ্যানোনেসি পরিবারের আর্টাবোসি গণের  একটি সপুষ্পক গুল্ম। এই গুল্মটি অনেকে বাড়ির বাগানের শোভাবর্ধন করার জন্য লাগিয়ে থাকে।

বৈজ্ঞানিক নাম: Artabotrys hexapetalus (L. f.)। Bhandari, Baileya 12: 149 (1965).  সমনাম: Annona hexapetala L. f. (1781), Artabotrys odoratissima_R. Br. ex Ker-Gawl. (1820), Uvaria odoratissima Roxb. (1832). ইংরেজি নাম: Climbing Ylang-ylang. স্থানীয় নাম: কাঁঠাল চম্পা। জীববৈজ্ঞানিকশ্রেণীবিন্যাস জগৎ/রাজ্য: Plantae. বিভাগ: Angiosperms. অবিন্যাসিত: Magnoliids. বর্গ: Magnoliales. পরিবার: Annonaceae. গণ: Artabotrys.  প্রজাতি: Artabotrys hexapetalus

বর্ণনা:

কাঁঠালি চাঁপা বৃহৎ চিরহরিৎ গুল্ম। এই ফুলের পুষ্পদণ্ড আংটাকৃতি বা অর্ধআরোহীর সাহায্যে পেঁচিয়ে নিচের দিকে মুখ করে থাকে। গাছের শাখাগুলো মসৃণ ও প্রশাখাগুলো চ্যাপ্টা রোমদ্বারা আবৃত। পাতা সবৃন্তক, আকারে ৬ থেকে ৭ মিমি লম্বা ও মসৃণ। পত্রফলক ১০-১৮ x ২.৮-৪.৮ সেমি, আয়তাকার-উপবৃত্তাকার থেকে বিবল্লমাকার, আকারে বড়, উপরের দিক চকচকে; তবে উভয় দিক মসৃণ, কচি পাতা সোনালি থেকে বাদামি বর্ণের চ্যাপ্টা রোমদ্বারা নিবিড়ভাবে আবৃত। 

ফুলের বোঁটা আংটা আকৃতি ও চ্যাপ্টা। পত্র প্রতিমুখ, হালকা রোমশ থেকে মসৃণ, সাধারণত একটি বোঁটাতে একটি ফুল ফোঁটে। পুষ্পবৃন্তিকা দেখতে মসৃণ ও আকারে দেড় থেকে দুই সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়। বৃত্যংশ ৩টি এবং দৈর্ঘ্য ৭-১০ ও প্রস্থ ৪-৭ মিমি। ফুলের নিচের অংশ যমক, ডিম্বাকার, সূক্ষ্মাগু, মসৃণ, শীর্ষ পুনঃবক্র। 

ফুলের পাপড়ি থাকে ৬টি। পাপড়ির দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন থেকে পাঁচ সেমি ও প্রস্থ এক থেকে দেড় সেমি। পাপড়ি দেখতে ডিম্বাকার থেকে আয়তাকার। ফুলের রং হলুদাভ-সবুজ থেকে উজ্জ্বল হলুদ, উভয় পৃষ্ঠ রোমশ, নিম্নাংশে সরু ও অবতল, অবতল অংশের উপরে বিস্তৃত, অর্ধ-স্থূলাগ্র, সমতল, বহির্দেশীয় পাপড়িসমূহ ক্ষুদ্র অনুফলক বিশিষ্ট যাহা অবতল। 

আরো পড়ুন:  লালপাতা পৃথিবীর উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলে চাষাবাদকৃত শোভাবর্ধক উদ্ভিদ

পুংকেশর আড়াই মিমি লম্বা, মোচাকার শীর্ষ সমন্বিত, কীলকাকৃতি, পুংদন্ড পরাগধানীর তুলনায় খবর, অসম কোষ্ঠ, যোজক শীর্ষ প্রসারিত, তীক্ষাগ্র। গর্ভাশয় ৫ মিমি লম্বা, মসৃণ, গর্ভদণ্ড খর্ব, গর্ভমুণ্ড আয়তাকার, পিড়কাবিশিষ্ট। পরিপক্ক গর্ভপত্র ১-১০টি, প্রায় ৩.৭ X ২.২ সেমি, অবৃন্তক, বিডিম্বাকার, তীক্ষ্মাগ্র, পরিপক্ক অবস্থায় হলুদ, সুগন্ধযুক্ত, মসৃণ।[১] 

কাঁঠাল চাঁপার বংশ বিস্তার ও চাষাবাদ:

প্রায় সারা বছর কাঁঠাল চাঁপা গাছে ফুল ফুটে। ফুটন্ত ফুলের ঘ্রান খুব তীব্র। কাঁঠাল চাঁপা সমতল ভূমির গাছ। এর বীজ থেকে নতুন চারা জন্মে।  বীজ ছাড়াও বংশবিস্তারের জন্য গুটিকলম বা দাবাকলম করা যায়।[২][৩]

ক্রোমোসোম সংখ্যা:

২n = ১৬, ১৮ (Fedorov, 1969)।

কাঁঠাল চাঁপার বিস্তৃতি:

কাঁঠাল চাঁপা বা কাঁঠালি চাঁপা চীনে দেশজ উদ্ভিদ। বর্তমানে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। বাংলাদেশে এই গাছ বাস্তুভিটায় ব্যাপকভাবে জন্মানো হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কাঁঠালি চাঁপা জন্মে এবং অনেক দেশে এই এটি ইলাং ইলাং নামে পরিচিত ও খুবই জনপ্রিয়।[১][২]

কাঁঠাল চাঁপার অর্থনৈতিক গুরুত্ব:

পত্র ও মূল-এ আর্টাবট্রিন নামক অ্যালকালয়েড রয়েছে। পুষ্প এসেন্সিয়াল অয়েল বহন করে। পত্র ক্যামফেরল, কোয়ারসিটিন, সাইরিসিটিন ইত্যাদি গ্লাইকোসাইডিক উপাদানও বহন করে। ফলের ইথানল নির্যাস কার্ডিয়াক উদ্দীপনা সৃষ্টির মাধ্যমে কার্ডিয়াক অবদমন ক্রিয়া প্রদর্শন করে। ফল হাইপোটেনসিভ এবং স্পসমোজেনিক কার্যকারিতা সম্পন্ন। (Ghani, 2003)। সুগন্ধি ফুলের জন্যই প্রধানত এই গাছ চাষ করা হয়। কাপড় সুগন্ধি কারক হিসেবে ফুলের ব্যবহার হয়।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১০ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) কাঁঠালি চাঁপা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের আবাসস্থান ধ্বংসের কারণে সংকটাপন্ন এবং তবে বাংলাদেশে এটি আশঙ্কাগ্রস্থ নয় হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে কাঁঠাল চাঁপা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। তবে প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে উদ্ভিদ রক্ষার জন্য প্রজাতিটির চাষ উৎসাহিত করা উচিত। [১]

আরো পড়ুন:  শ্বেত কাঞ্চন দক্ষিণ এশিয়ার সুগন্ধি ও ভেষজ প্রজাতি

তথ্যসূত্র:

১. এম এ হাসান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ১০ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৩৮ । আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. ড. মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ ফুলের চাষ প্রথম সংস্করণ ২০০৩ ঢাকা, দিব্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা ১২০। আইএসবিএন 984-483-108-3

৩. দ্বিজেন শর্মা লেখক; বাংলা একাডেমী ; ফুলগুলি যেন কথা; মে ১৯৮৮; পৃষ্ঠা- ৭৩, আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৪৪১২-৭

Leave a Comment

error: Content is protected !!