জিনসেং এশিয়ার উপকারী গুল্ম

চীন দেশে ২৫০০ বৎসর পূর্বেও এর ব্যাপক ব্যবহারের ইতিহাস পাওয়া যায়। বিখ্যাত চৈনিক দার্শনিক কনফিউসিয়াস (৫৫১-৪৭৯ খ্রী. পূঃ) এই প্রজাতি সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। চীনে এটিকে নিয়ে নানা উপকথাও প্রচলিত। তাঁরা এটিকে সর্বরোগের জন্য ভেষজ ব’লে মনে করেন এবং অনেকে ভাবেন যে, বাড়িতে যদি যত্ন ক’রে রাখা যায় তাহলে গৃহস্থের মঙ্গল হয় ও বাড়িতে কোনো রোগ ঢুকতে পারে না। আমাদের দেশে তুলসী গাছ নিয়ে যে ভাবা হয়, অনেকটা সেই রকম। কোরিয়াতে বেশ কয়েক হাজার বৎসর পূর্ব থেকে এর ব্যবহার চলে আসছে। তবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বৎসর ধরে কোরিয়াতে জিনসেং-এর চাষ হচ্ছে।

প্রজাতি

এই প্রজাতিটি Araliaceae পরিবারের Panax গনের দু’টি প্রজাতি। চীন-জাপান-কোরিয়া এবং তৎসন্নিহিত অন্য দেশ সমূহে কম-বেশি যে Ginseng পাওয়া যায়, সেটির পরিচিতি Panax schinseng Nees (পূর্বে এটির নাম ছিল Panax ginseng Mey.) নামে, চলতি নাম Asiatic or Chinese ginseng, এক কাথায় জিনসেং। অন্য আর একটি প্রজাতি জন্মে আমেরিকা, কানাডা প্রভৃতি অঞ্চলে, তার নাম- Panax quinquefolium Linn., এটি American ginseng নামে পরিচিত।

বিগত শতখানিক বৎসরের মধ্যে নব্য উদ্ভিদবিজ্ঞানীগণ এই প্রজাতির হদিস পাননি ভারতের মাটিতে। পরিবর্তে সিকিম-সংলগ্ন হিমালয়ে এই গণের (Panax) কয়েকটি বিরল প্রজাতির সন্ধান তাঁরা পেয়েছেন এবং সেগুলিকে Pseudo-ginseng নামে অভিহিত করেছেন।এগুলির নাম হলো—

(1) Panax sikkimensis Banerjee, পূর্বে এটির নাম ছিল Aralia pseudoginseng . (2) Panax bipinnatifidus Seem, পূর্বে এটির নাম ছিল Panax pseudoginseng var. bipinnatifidus (Seem) Li. R Aralia bipinnatifida (Seem) Clarke.

জিনসেং-এর পরিচিতি:

গাছ ১-২ ফুট উঁচুতে হয়। পাঁচটি উপপত্র একসঙ্গে গুচ্ছবদ্ধভাবে থেকে একটি পাতার সৃষ্টি করে। উপপত্রগুলির কিনারা কাটাকাটা, অগ্রভাগ বল্লমের ফলার ন্যায়। পাতার বর্ণ প্রায় সাদা, সামান্য সবুজের আভাযুক্ত। ফুল গুচ্ছবদ্ধভাবে থাকে। প্রস্ফুটিত অবস্থায় এক-একটি দেখতে রক্তের ফোঁটার ন্যায়। তার মাঝে মাঝে সাদা সাদা বিন্দু। এক সঙ্গে অনেকগুলি মিলিয়ে গুচ্ছবদ্ধ ফুল। অনেকটা লাল জাপানী রঙ্গনের ফুলের থোকার মত দেখতে। ফল লাল হয়।

আরো পড়ুন:  বাসক গাছের ১১টি ঔষধি গুণ

শরৎকালের ফুল ও ফল হয়। বীজ থেকে গাছ জন্মে। মূলটাই আসল। সেটিই সংগ্রহ করা হয় ঔষধার্থে ব্যবহারের জন্য। উপযুক্ত তত্ত্বাবধান না পেলে মূলটি ব্যবহারের উপযোগী হতে প্রায় ১০/১২ বছর সময় লেগে যায়। মূল সাধারণত ৪/৫ ইঞ্চি লম্বা ও আধ থেকে এক ইঞ্চি মোটা, দেখতে অনেকটা তাঁতের মাকুর মত, দু’ভাগে বিভক্ত, চারদিকে হাত-পা ছড়ান, প্রায় মানুষের আকৃতি। কোরিয়ার জিনসেং-এর মূল অনেকটা মেহগনি রঙের হয়। মূলগুলি আবার নারী-পুরুষ ভেদে দু’রকমের হতে দেখা যায়।

আবাসস্থল ও চাষাবাদ:

এটি অযত্নে জন্মায়। পাহাড়ের যত্রতত্র স্বাভাবিকভাবে জন্মায়। কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ বছরের পুরাতন না হলে এ গাছের মূল ব্যবহারের উপযোগী হয় না। চীন ও কোরিয়াতে এই গাছের সন্ধান পাওয়া গেছে কয়েক হাজার বছর পূর্বে। দীর্ঘকাল ধরে মানুষের ধারণা ছিল— এ গাছ অগাছা, যত্ন করে লাগালে বাঁচে না। এদিকে গাছটির মূল অত্যধিক মূল্যবান হওয়ায় মূলের চাহিদা বাড়লো, ওদিকে গাছের বংশও ধ্বংস হতে চললো। তখন কিভাবে এর ব্যাপক চাষ করা যায়, সেই চেষ্টা শুরু হলো। বর্তমানে চীন, জাপান ও কোরিয়াতে এটির ব্যাপক চাষ হচ্ছে।

আমেরিকা ও কানাডায় প্রচুর পরিমাণে এটির চাষ হয় এবং চীনের অনেকটা চাহিদা মেটায়। রোমবিহীন শক্ত ডাঁটাহীন কন্দজাতীয় উদ্ভিদ। ১ থেকে ১২ ফুট উঁচু হয়। পাতার বিন্যাস এবং মূলের আকৃতি Panax schinseng– এর মত। তবে এটির মূল হরিদ্রাভ-শ্বেত বর্ণের। সবগুলিরই মূল হালকা সুগন্ধযুক্ত, স্বাদে মিষ্ট ও সামান্য তেতোর সংমিশ্রণ, পিচ্ছিল এবং প্রায় সমগুণসম্পন্ন।

তথ্যসূত্র:

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, সপ্তম মুদ্রণ ১৪২৬, পৃষ্ঠা, ২৭-২৯

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Pittillo, Dan J.

Leave a Comment

error: Content is protected !!