আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > লেনিন > সমবায় প্রসঙ্গে

সমবায় প্রসঙ্গে

সমাজতন্ত্রের ইতিহাস

আমার মনে হয়, আমাদের দেশে সমবায় সম্পর্কে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। অক্টোবর বিপ্লবের পর এখন এবং নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতির কথা ছেড়ে দিলেও (এই প্রসঙ্গে বরং বলা উচিত, নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতির জন্যই) আমাদের সমবায় আন্দোলন যে একেবারেই ঐকান্তিক গুরুত্ব অর্জন করছে, তা সকলেই বুঝতে পারছে কিনা সন্দেহ। সেকেলে সমবায়ীদের স্বপ্নে অনেক উৎকল্পনা ছিল। উৎকল্পনার দরুন তাদের প্রায়ই হাস্যকর মনে হত। কিন্তু তাদের উৎকল্পনাটা কোনখানে? এইখানে যে শোষকদের প্রভুত্ব উচ্ছেদ করার জন্য শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক সংগ্রামের বনিয়াদী মূলে তাৎপর্যটি তারা বোঝত না। আমাদের এখানে বর্তমানে এটার উচ্ছেদ ঘটেছে এবং এখন সেকেলে সমবায়ীদের স্বপ্নের মধ্যে যা ছিল উৎকল্পনামূলক, এমন কি রোমাণ্টিক, এমন কি মামুলী তার অনেক কিছুই অতি-অনাবৃত বাস্তব হয়ে উঠছে।

আমাদের দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা যেহেতু সত্যি করেই শ্রমিক শ্রেণির হাতে, যেহেতু উৎপাদনের সমস্ত উপায়ই এই রাষ্ট্রক্ষমতার দখলে, সেইহেতু এখন জনসাধারণকে সমবায়বদ্ধ করার কাজটাই শুধু আসলে বাকি আছে। জনসাধারণের অধিকাংশ সমবায়ের অন্তর্ভুক্ত হলে যারা সঙ্গত কারণেই ভাবত যে শ্রেণিসংগ্রাম, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম, ইত্যাদি অপরিহার্য বিধায় অতীতে সমাজতন্ত্রকে সঠিক কারণেই উপহাস, নিন্দা ও ঘৃণা করত, এবার তা আপনা থেকেই স্বীয় লক্ষ্যে পৌঁছবে। কিন্তু রাশিয়ার সমবায়ীকরণের তাৎপর্য এখন আমাদের পক্ষে কত বিপুল, কত অশেষ হয়ে উঠছে তা সকল কমরেডই বোঝে না। নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতিতে আমরা ব্যবসায়ীরুপী কৃষককে, ব্যক্তিগত ব্যবসার নীতিকে একটা সুবিধা দিয়েছিলাম। সমবায়ের বিপুল তাৎপর্য্য আসছে ঠিক এই থেকেই (লোকে যা ভাবছে এটা তার উল্টো)। আসল কথা হলো, নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতির আমলে আমাদের যা দরকার তা হলো যথেষ্ট মাত্রায় ব্যাপক আকারে ও গভীরভাবে রাশিয়ার জনগণকে সমবায়-সমিতিতে সংগঠিত করা। কেননা, ব্যক্তিগত স্বার্থ, ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থ এবং তার ওপর রাষ্ট্রীয় পরিদর্শন ও নিয়ন্ত্রণকে কোন মাত্রায় মেলাতে হবে, কোন মাত্রায় তাকে সাধারণ স্বার্থের অধীনস্থ করে রাখতে হবে, যা পূর্বে বহু সমাজতন্ত্রীর কাছে বিষম বাধা হয়ে উঠেছিল, তা এখন আমরা পেয়ে গেছি। বস্তুতপক্ষে, উৎপাদনের বৃহদায়তন উপায়গুলির ওপর রাষ্ট্রের ক্ষমতা, প্রলেতারিয়েতের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা, এই প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদে ও অতিক্ষুদে চাষী জোট, কৃষকদের ক্ষেত্রে এইসব প্রলেতারিয়েতের নেতৃত্বের নিশ্চিতি, ইত্যাদি — সমবায় এবং কেবলমাত্র সমবায় থেকেই একটা পরিপূর্ণ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন করার পক্ষে এই জিনিসগুলিই কি যথেষ্ট নয়? অথচ এই সমবায়কে আমরা আগে অবজ্ঞা করেছি দোকানদারি বলে এবং নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতির আমলে এখনো একদিক থেকে তা-ই দেখার অধিকার আমাদের আছে। এটা এখনো সমাজতান্ত্রিক সমাজের নির্মাণ নয়। কিন্তু সেই নির্মাণের জন্য যা-কিছু প্রয়োজন ও পর্যাপ্ত তা এই-ই।

আমাদের ব্যবহারিক কর্মীদের অনেকেই এই পরিস্থিতিটা ছোটো করে দেখে। আমাদের সমবায়-সমিতিগুলিকে তারা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে এবং প্রথমত, নীতির দিক থেকে (উৎপাদন-উপায়সমূহের উপর রাষ্ট্রের মালিকানা) এবং দ্বিতীয়ত, কৃষকদের পক্ষে সরলতম, সহজতম এবং আয়ত্তাধীন পদ্ধতিতে নয়া ব্যবস্থায় উৎক্রমণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই সমবায়ের কী অশেষ গুরুত্বে তা তারা বুঝতে পারে না।

এবং প্রধান কথাটা পুনরপি এইখানেই। সমাজতন্ত্র গঠনের জন্য নানাবিধ শ্রমিক সমিতি নিয়ে কল্পচারণ এক জিনিস কিন্তু, ব্যবহারিকভাবে এ সমাজতন্ত্র এমন ভাবে গঠন করতে পারে যাতে নির্মাণকার্যে প্রতিটি ক্ষুদে চাষী অংশ নেয় — তা একেবারেই অন্য ব্যাপার। এই স্তরেই এখন আমরা পৌঁছিয়েছি। এবং কোনো সন্দেহই নেই যে, এই স্তরে উপনীত হয়ে আমরা তা অপরিসীম কম কাজে লাগাচ্ছি।

নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতিতে গিয়ে আমরা যে বাড়াবাড়ি করেছি, সেটা এই দিক থেকে নয় যে, স্বাধীন শিল্প ও বাণিজ্যের নীতিতে আমরা মাত্রাতিরিক্ত রকমের গুরুত্ন দিয়েছি। নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতিতে গিয়ে আমরা বাড়াবাড়ি করেছি এই দিক থেকে যে, সমবায়ের কথা নিয়ে ভাবতে ভুলে গেছি, এই দিক থেকে যে, বর্তমানে সমবায়ের গুরুত্ব আমরা ছোটো করে দেখছি, এই দিক থেকে যে, পূর্বকথিত দুটি দিক থেকে সমবায়ের প্রভূত গুরুত্ব আমরা ভুলতে বসেছি।

এবার এই ‘সমবায়’-নীতির ভিত্তিতে ব্যবহারিকভাবে অবিলম্বেই কী করা যেতে পারে এবং করা উচিত, তা নিয়ে পাঠকদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। কী উপায়ে আমরা এক্ষনি ‘সমবায়’-নীতিকে বিকশিত করে তুলতে পারি ও কী উপায়ে তা করা উচিত, যাতে তার সমাজতান্ত্রিক অর্থ সকলের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়?

সমবায়কে রাজনৈতিকভাবে এমনভাবে রাখা চাই, যাতে সমবায় শুধুই যে সাধারণভাবে ও সর্বদাই নির্দিষ্ট কিছু সুবিধা পাবে তাই নয়, সেই সুবিধা হওয়া চাই বৈষয়িক সুবিধা (ব্যাঙ্ক হারের মাত্রা, ইত্যাদি)। সমবায়গুলিকে ঋণ দিতে হবে এমন পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ, যা অত্যধিক না হলেও ব্যক্তিগত উদ্যোগের জন্য আমরা যে-পরিমাণ ঋণ দিই তার চেয়ে বেশি, ভারী শিল্প, ইত্যাদিকে যা মঞ্জুর করি এমন কি তার সমান।

সমস্ত সামাজিক ব্যবস্থাই বিশেষ একটি শ্রেণি কর্তৃক আর্থিক সাহায্যদানেই কেবল গড়ে উঠতে পারে। ‘স্বাধীন’ পুঁজিবাদের জন্মগ্রহণে যে কোটি কোটি রুবল মূল্য দিতে হয়েছিল, তার উল্লেখ করার দরকার নেই। এখন আমাদের এই কথাটা বুঝতে হবে এবং ব্যবহারিক কাজে প্রয়োগ করতে হবে যে, বর্তমানে যে-সমাজব্যবস্থাকে সচরাচর অপেক্ষা বেশি সমর্থন করা উচিত সেটি হলো সমবায়-ব্যবস্থা। কিন্তু সমর্থন করতে হবে কথাটার সত্যকার অর্থে, অর্থাৎএই সমর্থন বলতে যে-কোনো রকমের সমবায় বাণিজ্যের সমর্থন বুঝলে যথেষ্ট হবে না। সমর্থন বলতে আমরা বুঝাব এমন সমবায়-বাণিজ্যের সমর্থন, যেখানে জনসাধারণের সত্যকার বৃহৎ ভাগটা সত্যই অংশ নিচ্ছে। সমবায়-বাণিজ্যের শরিক কৃষককে একটা বোনাস দেওয়া—এটা অবশ্যই একটা সঠিক পন্থা। কিন্তু সেক্ষেত্রে এই অংশ গ্রহণটা যাচাই করা, কৃষকের সচেতনতা ও সদগুণ যাচাই করা, এই হলো আসল কথা। যখন কোনো সমবায়ী গাঁয়ে গিয়ে একটা সমবায়-দোকান খোলে, তখন লোকে, সত্যি করে বললে, তাতে কোনোই অংশ নেয় না। কিন্তু সেইসঙ্গে নিজেদের স্বার্থে প্রণোদিত হলে লোকেরাই তাড়াতাড়ি করে তাতে যোগ দিতে চাইবে।

এই সমস্যার আর একটা দিক আছে। ‘সুসভ্য’ (সবাগ্রে সাক্ষর) ইউরোপীয়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমবায়-কর্মে নিঃশেষে সকলকেই শুধু নিস্ক্রিয় নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণ করানোয় আমাদের খুব বেশি কিছু করার দরকার নেই। সঠিকভাবে বলতে হলে, ‘কেবল’ একটি জিনিসই আমাদের করার আছে: আমাদের জনসাধারণকে এতটা ‘সুসভ্য’ করে তুলতে হবে, যাতে সমবায়ের কাজে সকলের অংশগ্রহণের পুরো সুবিধা তারা বুঝতে পারে এবং সে অংশগ্রহণ সংগঠিত করতে পারে। ‘কেবল’ এটাই। সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য অন্য কোনো পন্ডিতির আর আমাদের এখন দরকার নেই। কিন্তু এই ‘কেবলটুকু’ সম্পন্ন করতে হলে প্রয়োজন একটা গোটা বিপ্লবের, সমগ্র জনসাধারণের সাংস্কৃতিক বিকাশের একটা গোটা যুগ। তাই আমাদের নিয়ম হওয়া উচিত; যথাসম্ভব কম পন্ডিতিপনা এবং যথাসম্ভব কম চালিয়াতি। এদিক থেকে নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতি এই অর্থে একটা অগ্রগতি, যে, তা অতি সাধারণ স্তরের কৃষকের উপযোগী এবং তার কাছ থেকে উচ্চ কিছু দাবি করে না। কিন্তু নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতির মাধ্যমে সমবায়ে সমগ্র জনসাধারণের সার্বজনীন অংশগ্রহণ সম্ভব করে তুলতে হলে একটা গোটা ঐতিহাসিক যুগের দরকার। উত্তম ক্ষেত্রে এই যুগ আমরা পেরতে পারি একটি কি দুটি দশকে। তাহলেও, এটি হবে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক যুগ – এই ঐতিহাসিক যুগ ছাড়া, সার্বজনীন সাক্ষরতা ছাড়া, উপযুক্ত মাত্রার জ্ঞান ছাড়া, বই পড়ার অভ্যাসে জনসাধারণকে যথেষ্ট মাত্রায় শিক্ষিত করে তোলা ছাড়া এবং তার পেছনে একটা বৈষয়িক ভিত্তি ছাড়া, শস্যহানি, দুর্ভিক্ষ, ইত্যাদির বিরুদ্ধে কিছুটা রক্ষাকবচ ছাড়া আমরা আমাদের লক্ষ্যার্জনে অক্ষম হব। এখন প্রধান কথাই হলো, যে-বৈপ্লবিক উদ্যম, যে-বিপ্লবী উদ্দীপনা আমরা ইতিমধ্যেই দেখিয়েছি এবং দেখিয়েছি যথেষ্ট পরিমাণে, ও পরিপূর্ণ সফলতা অর্জন করেছি — তার সঙ্গে মেলাতে পারা (প্রায় বলবার ইচ্ছে হচ্ছে) এক বুদ্ধিমান ও সাক্ষর ব্যবসায়ী হবার ক্ষমতা, ভাল সমবায়ী হবার পক্ষে তা সম্পুর্ণ যথেষ্ট। ব্যবসায়ী হবার ক্ষমতা বলতে আমি বোঝাতে চাইছি সংস্কৃতিবান ব্যবসায়ী হবার ক্ষমতা। সেইসব রুশী অথবা সাধারণভাবে চাষীর মাথায় যেন কথাটা ভাল করে ঢোকে, যারা ভাবে: ব্যবসা যখন করছে তখন ব্যবসায়ী হবার ক্ষমতা রাখে। কথাটা মোটেই ঠিক নয়। ব্যবসা করছে বটে, কিন্তু সংস্কৃতিবান ব্যবসায়ী হওয়া এখনো অনেক বাকি। এখন সে ব্যবসা করছে এশীয় ধরনে। কিন্তু, সঙ্গে এর তফাত একটা গোটা যুগের।

উপসংহারে: একসারি অর্থনৈতিক, আর্থিক ও ব্যাঙ্কিং সুবিধা চাই সমবায়গুলির জন্য। এটাই হওয়া উচিত জনসাধারণকে সংগঠনের নতুন নীতিতে আমাদের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমর্থন। কিন্তু এতে শুধু কর্তব্যের সাধারণ রূপরেখাই হাজির হচ্ছে মাত্র — কেননা তাতে ব্যবহারিক দিক থেকে কর্তব্যের সমগ্র বিষয় সুনির্দিষ্ট ও সবিস্তারে বর্ণিত হচ্ছে না, অর্থাৎ সমবাযয়ীকরণের জন্য যে ‘বোনাস’ আমরা দেব তার রূপ (এবং তা দেবার শর্ত), যে-রূপের বোনাস দিয়ে আমরা সমবায়গুলিকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারব, যে-রূপের বোনাসের মাধ্যমে আমরা উঠব সুসভ্য সমবায়ীদের স্তরে — সেই রূপটা আমাদের খুঁজে বার করতে পারা চাই। এবং উৎপাদন উপায়সমূহের উপর সামাজিক মালিকানার আমলে, বুর্জোয়ার উপর প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিগত জয়লাভের আমলে সুসভ্য সমবায়ীদের যে ব্যবস্থা, তা-ই হলো সমাজতন্ত্রের ব্যবস্থা।

৪ জানুয়ারি, ১৯২৩

***

আরো পড়ুন:  শ্রমিকদের সংগঠন ও বিপ্লবীদের সংগঠন

নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতি সম্পর্কে আমি যখনই লিখেছি, তখনই সর্বদা ১৯১৮ সালে লেখা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ সম্পর্কে আমার প্রবন্ধটি* উদ্ধৃত করেছি। তাতে কিছু কিছু, তরুণ কমরেডের মনে একাধিকবার সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কিন্তু তাদের সন্দেহ জেগেছে প্রধানত বিমূর্ত রাজনৈতিক দিকটাতেই।

তাদের মনে হয়েছে, যে-ব্যবস্থায় উৎপাদন-উপায়ের মালিক শ্রমিক শ্রেণি এবং সেই শ্রমিক শ্রেণির হাতেই যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতা, সেখানে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ কথাটি প্রযোজ্য নয়। তারা কিন্তু এটা লক্ষ্য করে নি যে, আমি ‘রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ’ কথাটি ব্যবহার করেছিলাম: প্রথমত, তথাকথিত বামপন্থী কমিউনিস্টদের সঙ্গে বিতর্কে আমার যা বক্তব্য ছিলো, তার সঙ্গে আমাদের বর্তমান বক্তব্যের ঐতিহাসিক যোগসুত্র রাখার জন্য; এবং সেইসঙ্গে আমি তখনই দেখিয়েছিলাম যে, আমাদের বর্তমান অর্থনীতির চেয়ে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ উন্নততর হবে; সাধারণ রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ এবং পাঠকদের কাছে নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতির পরিচয় দিতে গিয়ে আমি যে অসাধারণ, বলতে কি, অতি অসাধারণ রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের কথা বলেছিলাম, তাদের মধ্যে একটা পূর্বোপর যোগসূত্র দেখান আমার কাছে জরুরী মনে হয়েছিলো।

দ্বিতীয়ত, আমার কাছে সর্বদাই ব্যবহারিক লক্ষ্যটা গুরুত্বপূর্ণে। আর আমাদের নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতির ব্যবহারিক লক্ষ্য ছিলো সুবিধা দেওয়া। আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে নিঃসন্দেহে সুবিধার মানে দাঁড়াত বিশুদ্ধ রূপের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ। রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ সম্পর্কে আলোচনাটা আমি এইভাবে দেখেছিলাম।

কিন্তু ব্যাপারটার আরেকটা দিক আছে, যে-ক্ষেত্রে আমাদের দরকার হতে পারে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ, অথবা অন্ততপক্ষে তার সঙ্গে একটা তুলনা। এটা হলো সমবায়ের প্রশ্ন।

কোন সন্দেহ নেই যে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের পরিস্থিতিতে সমবায় হলো পুঁজিবাদী যৌথ প্রতিষ্ঠান। এতেও সন্দেহ নেই যে, আমাদের বতর্মান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে আমরা অন্য কোনো রূপ নয় কেবল সামাজিক ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং অন্য কোনভাবে নয়। কেবল শ্রমিক শ্রেণির হস্তস্থিত রাষ্ট্রক্ষমতা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত যে ব্যক্তিগত পুঁজিবাদী উদ্যোগ, তাকে যুক্ত করি সুসঙ্গত রূপের সমাজতান্ত্রিক ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে (উৎপাদন উপায়, যে-ভূমির ওপর উদ্যোগটা প্রতিষ্ঠিত সেই ভূমি এবং খাস উদ্যোগটাই রাষ্ট্রের), সেক্ষেত্রে তৃতীয় ধরনের উদ্যোগেরও একটা প্রশ্ন আসে, নীতিগত তাৎপর্য্যের দিক থেকে আগে যার কোনো স্বাতন্ত্র্য ছিলো না, অর্থাৎ সমবায়মূলক উদ্যোগের প্রশ্ন। ব্যক্তিগত পুঁজিবাদের আমলে ব্যক্তিগত উদ্যোগের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের যা তফাত, পুঁজিবাদী উদ্যোগের সঙ্গে সমবায়মূলক উদ্যোগেরও সেই তফাত। রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের আমলে রাষ্ট্রীয়-পুঁজিবাদী উদ্যোগ থেকে সমবায়মূলক উদ্যোগের তফাত প্রথমত এই যে, এগুলি ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং দ্বিতীয়ত, এগুলি যৌথ উদ্যোগ। আমাদের বতর্মান ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত পুঁজিবাদী উদ্যোগ থেকে সমবায়মূলক উদ্যোগের তফাত হলো এগুলি যৌথ উদ্যোগ, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক উদ্যোগের সঙ্গে তাদের তফাত থাকে না, যদি যে-ভূমির ওপর তারা প্রতিষ্ঠিত সেই ভূমি এবং উৎপাদন উপায়ের মালিক হয় রাষ্ট্র, অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণি।

সমবায় প্রসঙ্গে আলোচনায় এই অবস্থাচক্রটা যথেষ্ট বিবেচনা করা হয় না। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যের জন্য সমবায় যে আমাদের দেশে একেবারেই অতি বিশেষ একটা তাৎপর্য্য অর্জন করেছে, তা মনে রাখা হয় না। সুবিধাদানের কথা যদি ছেড়ে দিই, যা প্রসঙ্গত আমাদের এখানে মোটা রকমের কোনো বিকাশ লাভ করে নি, তাহলে আমাদের পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সমবায় একেবারে পুরোপুরি মিলে যায়। কথাটা বুঝিয়ে বলি। রবার্ট ওয়েন থেকে শুরু করে সেকালের সমবায়ীদের পরিকল্পনাগুলোর উৎকল্পনাটা কোথায়? এইখানে যে, তাঁরা শ্রেণিসংগ্রাম, শ্রমিক শ্রেণি কর্তৃক রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল, শোষক শ্রেণির প্রভুত্বনাশ – এই বনিয়াদী প্রশ্নটিকে হিসাবে না এনে সমাজতন্ত্র দিয়ে বর্তমান সমাজকে শান্তিপূর্ণভাবে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেইজন্যই এই ‘সমবায়মূলক’ সমাজতন্ত্রের মধ্যে শুধু কল্পচারণ দেখে, লোককে কেবল সমবায়বদ্ধ করেই শ্রেণি-শত্রুকে শ্রেণি-সহযোগী এবং শ্রেণিসংগ্রামকে শ্রেণিশান্তিতে (তথাকথিত গৃহ-শান্তি) রূপান্তরিত করার স্বপ্নে রোমাণ্টিক, এমন কি ছেঁদো কিছু একটা দেখে আমরা ঠিকই করেছিলাম।

বর্তমান কালের মূল কর্তব্যের দিক থেকে আমরা নিঃসন্দেহেই ঠিক করেছিলাম। কেননা, রাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য শ্রেণিসংগ্রাম ছাড়া সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা যখন শ্রমিক শ্রেণির হাতে এসে গেছে, শোষকদের রাজনৈতিক ক্ষমতা যখন খতম হয়েছে এবং শ্রমিক শ্রেণির হাতেই যখন রয়েছে উৎপাদনের সমস্ত উপায় (শ্রমিক রাষ্ট্র যেগুলি সাময়িকভাবে কনসেশন হিসেবে শর্তসাপেক্ষে শোষকদের স্বেচ্ছায় দিয়ে রেখেছে শুধু সেইগুলি বাদে), তখন অবস্থা কীভাবে বদলে গেছে দেখুন।

এখন একথা বললে ঠিকই বলব যে, আমাদের পক্ষে সমবায়ের সাধারণ বৃদ্ধিই হলো সমাজতন্ত্রের বৃদ্ধির সমতুল্য (পূর্বোল্লিখিত ‘সামান্য’ ব্যতিরেকটুকু বাদে) এবং সঙ্গে সঙ্গে আমরা স্বীকার করতে বাধ্য যে, সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গিতেও আমূল বদল ঘটেছে। এই আমূলে বদলটা হলো এই যে, আগে রাজনৈতিক সংগ্রাম, বিপ্লব, ক্ষমতা দখল, ইত্যাদির ওপরেই আমরা ভারকেন্দ্র রেখেছিলাম এবং রাখা উচিত ছিলো। এখন সেই ভারকেন্দ্র বদলে গিয়ে শান্তিপূর্ণে সাংগঠনিক ‘সাংস্কৃতিক’ কাজের ওপর সরে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রশ্ন না থাকলে, আমাদের অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক আয়তনে লড়াই চালাবার বাধ্যতা না থাকলে আমি এই কথাই বলতাম যে, আমাদের ভারকেন্দ্রটা সরে যাচ্ছে সাংস্কৃতিক ব্যাপারে। কিন্তু ওকথা ছেড়ে দিয়ে কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে, আমাদের কাজের ভারকেন্দ্র সত্যসত্যই এসে দাঁড়াচ্ছে সাংস্কৃতিক ব্যাপারে।

আমাদের সামনে এখন দুটি প্রধান কর্তব্য, যা রয়েছে পুরো একটা যুগ জুড়ে। এটা হলো আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রটাকে পুনর্গঠিত করার কর্তব্য, যা একেবারেই অকেজো, আগের যুগ থেকে যা আমরা সমগ্রভাবেই গ্রহণ করেছি; গত পাঁচ বছরের সংগ্রামের সময় তার গুরুতের কোনো পুনর্গঠন আমরা করে উঠতে পারি নি, তা সম্ভবও ছিলো না। আমাদের দ্বিতীয় কর্তব্য হলো কৃষকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক কাজ। আর সমবাযয়ীকরণই হলো কৃষকদের মধ্যে এই সাংস্কৃতিক কাজের অর্থনৈতিক লক্ষ্য। পরিপূর্ণ সমবায়ীকরণ থাকলে আমরা ইতিমধ্যেই সমাজতন্ত্রের জমির ওপর দু’পায়েই দাঁড়াতাম। কিন্তু পরিপূর্ণ সমবায়ীকরণ হলে ধরতে হয় কৃষকদের (বিপুলায়তন জনগণ হিসেবে বিশেষ করে কৃষকদেরই) এমন একটা সাংস্কৃতিক মান যে, গোটা একটা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া এই পরিপূর্ণ সমবায়ীকরণ সম্ভব নয়।

আমাদের বিরোধীরা একাধিকবার আমাদের বলেছে যে, যথেষ্ট সংস্কৃতিসম্পন্ন নয় এমন একটা দেশে সমাজতন্ত্র রোপণের অবিবেচক কাজ আমরা নিয়েছি। কিন্তু তারা ভুল করেছে যে, তত্ত্বে বর্ণিত প্রান্ত থেকে আমরা শুরু করি নি (যত রকমের পুঁথিবাগীশদের তত্ত্ব) এবং আমাদের দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, সেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পূর্বসূরী, যা সবকিছু সত্ত্বেও এখন আমাদের সামনে ।

পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক দেশ হয়ে উঠতে হলে আমাদের দেশটার জন্য এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবই এখন যথেষ্ট। কিন্তু আমাদের পক্ষে এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবে আছে এমন ধরনের অবিশ্বাস্য দুরূহতা, যা বিশুদ্ধ সাংস্কৃতিক (কেননা আমরা নিরক্ষর), এবং বিশুদ্ধ বৈষয়িক (কেননা সংস্কৃতিসম্পন্ন হতে হলে উৎপাদনের বৈষয়িক উপায়গুলির একটা নির্দিষ্ট বিকাশ দরকার, একটা নির্দিষ্ট বৈষয়িক ভিত্তি দরকার)।

৬ জানুয়ারি, ১৯২৩

৪৫ খন্ড ৩৬৯-৩৭৭ পৃঃ

* এখানে ভ. ই. লেনিন তাঁর ‘বামপন্থী’ ছেলেমানুষি ও পেটিবুর্জোয়াপনা প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করছেন। — সম্পাদক।

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন (এপ্রিল ২২, ১৮৭০ – জানুয়ারি ২১, ১৯২৪) ছিলেন লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতা, একজন মার্কসবাদী রুশ বিপ্লবী এবং সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ। লেনিন ১৯১৭ সালে সংঘটিত মহান অক্টোবর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page