খেসারির ডালের ১০টি ভেষজ গুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা

খেসারি (বৈজ্ঞানিক নাম: Lathyrus sativus) মূলত ফেবেসি (Fabaceae) পরিবারের একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ডাল জাতীয় শস্য। আমাদের দেশে সুলভ ও সাশ্রয়ী মূল্যের এই ডালটি কেবল প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের চাহিদাই মেটায় না, বরং এর রয়েছে অনন্য কিছু ওষধি ও ভেষজ গুণাগুণ। সঠিক নিয়মে খাওয়া হলে এটি শরীরের ক্লান্তি দূর করতে, হজমশক্তি বাড়াতে এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিরাময়ে চমৎকার কাজ করে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা খেসারি ডালের এমন ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ গুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা আপনাকে অবাক করবে।

⚠️ স্বাস্থ্যকর উপায়ে খেসারি ডাল রান্নার ও খাওয়ার সঠিক নিয়ম

স্বাভাবিক খাদ্যতালিকায় সপ্তাহে ১-২ দিন খেসারি ডাল খেলে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে বাজার থেকে আমরা যে খেসারি ডাল কিনি, সেগুলো সাধারণত কাঁচা বা ভাজা ছাড়া থাকে। তাই এই ডালের ওষধি গুণাগুণ শতভাগ পেতে এবং এর ভেতরের টক্সিন বা প্রাকৃতিক বিষাক্ত উপাদান প্রায় ৯০% পর্যন্ত দূর করতে রান্নার আগে নিচের ৪টি ধাপ অবশ্যই মেনে চলুন:

  • ভালো করে বেছে নেওয়া: বাজার থেকে আনা কাঁচা ডাল রান্নার বা ওষধি ব্যবহারের আগে খুব ভালো করে ঝেড়ে এবং বেছে ময়লা পরিষ্কার করে নিতে হবে।
  • দীর্ঘ সময় ভিজিয়ে রাখা: ডাল রান্নার বা ব্যবহারের আগে সারা রাত অথবা অন্তত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যাপ্ত জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এর ফলে ডালের ভেতরের জটিল উপাদানগুলো নরম হয়ে আসে।
  • ভেজানো জল ফেলে দেওয়া: ভেজানো ডালের জলটি কোনোভাবেই রান্নায় ব্যবহার করা যাবে না। সেই জল ফেলে দিয়ে পরিষ্কার ও ফ্রেশ জল দিয়ে ডালটি আরও কয়েকবার ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
  • উচ্চ তাপে ফুটিয়ে সেদ্ধ করা: ডালটি পর্যাপ্ত জল দিয়ে উচ্চ তাপে খুব ভালো করে সেদ্ধ বা ফুটিয়ে নিতে হবে। তীব্র উত্তাপের কারণে ডালে থাকা অবশিষ্ট ক্ষতিকারক উপাদানও সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় এবং এটি শতভাগ নিরাপদ হয়।

রোগ প্রতিকারে খেসারি ডালের ১০টি ভেষজ গুণ

১. শিশুদের রিকেট বা কার্শ্যরোগ নিরাময়ে

অপষ্টিজনিত কারণে শিশুদের হাড় দুর্বল হওয়া বা রিকেট রোগ (যা প্রাচীন আয়ুর্বেদে ‘কার্শ্যরোগ’ নামে পরিচিত) নিরাময়ে শোধিত খেসারির ডাল চমৎকার কাজ করে। এটি ব্যবহারে শিশুদের শারীরিক দুর্বলতা কেটে যায় এবং হাড় মজবুত হয়।

  • ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: প্রায় ৫ থেকে ১০ গ্রাম শোধিত খেসারির ডাল ৫০০ মিলি (আধ লিটার) জলে নিয়ে ভালো করে সেদ্ধ করুন। জল ফুটে যখন প্রায় ১২৫ মিলির মতো (এক কাপের অর্ধেক) হয়ে আসবে, তখন পাত্রটি নামিয়ে নিন। এরপর জলটি কিছুক্ষণ স্থির বা থিতিয়ে রেখে ওপরের পরিষ্কার ওষধি জলটুকু শিশুকে খাওয়াতে হবে। একদিন পর পর (একদিন অন্তর) কিছুদিন এই নিয়ম মেনে খাওয়ালে শিশুর স্বাস্থ্যের দ্রুত উন্নতি ঘটে।

২. হাড় ও গাঁটের ব্যথা দূর করতে

শরীরের কোনো জয়েন্ট বা গাঁটে ফোলা ভাব নেই, অথচ তীব্র ব্যথা বা কামড়ানি অনুভূতি হচ্ছে—এমন সমস্যায় খেসারির ডালের ভেষজ ব্যবহার দারুণ উপকারে আসে। এটি হাড়ের ভেতরের পুষ্টি জোগাতে এবং বাতের ব্যথা উপশমে সাহায্য করে।

  • ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: প্রথমে শোধিত খেসারির ডাল নিয়ে হালকা করে আদকুটা (অর্ধ-কুটিত বা আধা-ভাঙা) করে নিতে হবে। এরপর ডালের ওজনের প্রায় আট গুণ ওষধি তরল বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়ুর্বেদিক আসব/অরিষ্টে (মেডিকেটেড অ্যালকোহল) ডালটি ভিজিয়ে রাখুন। এভাবে টানা এক সপ্তাহ (৭ দিন) ভিজিয়ে রাখার পর তরলটি ভালো করে ছেঁকে নিতে হবে। এই ওষধি মিশ্রণটি প্রতিদিন ২ চামচ করে আধা কাপ হালকা গরম দুধের সাথে মিশিয়ে কিছুদিন নিয়মিত সেবন করলে হাড় ও গাঁটের দীর্ঘদিনের ব্যথা দূর হয়ে যায়।

৩. দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে

যাঁরা অনিয়মিত মলত্যাগ বা কোষ্ঠকাঠিন্যের (Constipation) সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য খেসারি ডাল একটি চমৎকার প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে কাজ করতে পারে। এই ডালে থাকা ফাইবার বা আঁশ অন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।

  • ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: খেসারি ডাল ভালো করে ধুয়ে সেদ্ধ করার পর যে জল বা সুপ তৈরি হয়, তাতে সামান্য লবণ মিশিয়ে নিন। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিরা টানা কয়েকদিন রাতে খাবারের সাথে এই ডালের জল খাওয়ার অভ্যাস করুন। এর ফলে পরের দিন সকালে পেট ও কোষ্ঠ (দাস্ত) পরিষ্কার হবে।
  • গ্রামীণ প্রচলিত প্রবাদ: খেসারি ডাল যে পেট পরিষ্কার করতে কতটা কার্যকরী, তা নিয়ে আমাদের দেশের গ্রামবাংলায় একটি মজার ও চমৎকার প্রবাদ প্রচলিত আছে:

“স্বর্গে ছিলি খেসারি, তোকে মর্তে আনলে কে।
তোর পায়ে পড়ি খেসারি, তুই কাছা খুলতে দে।”

৪. ভুলে যাওয়ার রোগ বা স্মৃতিশক্তি বাড়াতে

বয়স বাড়ার কারণে কিংবা মানসিক চাপের জন্য অনেকেই ইদানীং মাঝে মাঝে বিভিন্ন জিনিস বা বিষয় ভুলে যাওয়ার সমস্যায় পড়েন। এই ধরণের মানসিক বিভ্রান্তি বা অল্পতেই ভুলে যাওয়ার সমস্যা দূর করতে খেসারি ডালের ওষধি জল দারুণ উপকারী। এটি মস্তিষ্কের কার্যকারিতা সচল রাখতে সাহায্য করে।

  • ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: প্রথমে ১ কাপ ফুটিয়ে নেওয়া হালকা গরম জল নিন। এবার এই জলে ৩ থেকে ৪ গ্রাম ভালো করে শোধিত (পরিষ্কার করা) খেসারির ডাল ভিজিয়ে রাখুন। ডাল ভেজানো এই ওষধি জলটি নিয়মিত সকাল বা রাতে পান করুন। এভাবে কিছুদিন একটানা খেলে অল্পতেই ভুলে যাওয়ার এই মানসিক সমস্যাটি ধীরে ধীরে দূর হয়ে যাবে এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত হবে।

৫. বমি বমি ভাব ও বমন রোগ দূর করতে

বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনের সময়—যেমন শরৎকাল কিংবা বসন্তকালের আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে অনেকেরই হঠাৎ হঠাৎ বমি বমি ভাব হয় বা অনেকের সরাসরি বমি হয়ে থাকে। খেসারি ডালের ওষধি জল এই ধরণের পিত্তজনিত বা ঋতুভিত্তিক বমনভাব দ্রুত দূর করতে সাহায্য করে।

  • ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: একটি পাত্রে ১ কাপ ফুটন্ত গরম জল নিয়ে তাতে ৩ থেকে ৪ গ্রাম শোধিত খেসারির ডাল ভিজিয়ে রাখুন। জলটি পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে গেলে ডাল ছেঁকে নিয়ে সেই ওষধি জলটুকু সকালে অথবা বিকালের দিকে খালি পেটে খেয়ে নিন। এভাবে কয়েকদিন খেলে বমি বমি ভাব এবং পেটের অস্বস্তি পুরোপুরি চলে যাবে।

৬. মুখের অরুচি এবং কৃমির উপদ্রব দূর করতে

শরীরে পিত্তের আধিক্য বা প্রাবল্যের কারণে অনেকেরই মুখের রুচি নষ্ট হয়ে যায় এবং কোনো খাবার খেতেই ভালো লাগে না। খেসারি ডালের ওষধি জল পিত্তের ভারসাম্য ফিরিয়ে এনে মুখের স্বাভাবিক রুচি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। এছাড়া অনেকের অরুচির পাশাপাশি পেটে কৃমির উপদ্রব দেখা দেয়, এই প্রতিকারটি কৃমিনাশক হিসেবেও সমান কার্যকরী।

  • ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: ৩ থেকে ৪ গ্রাম শোধিত খেসারির ডাল ১ কাপ ফুটন্ত গরম জলে ভিজিয়ে রাখুন। জলটি ঠান্ডা হয়ে এলে ভালো করে ছেঁকে নিয়ে নিয়মিত সকালে খালি পেটে পান করুন। এটি পিত্তজনিত অরুচি দূর করার পাশাপাশি পেটের ক্ষতিকারক কৃমি দূর করতেও চমৎকার কাজ করে।

৭. দাঁতের মাড়ি হাজা এবং মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করতে

বিশেষ করে বর্ষাকালে আবহাওয়ার আর্দ্রতা এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে অনেকেরই দাঁতের মাড়ি হেজে যায় বা মাড়িতে ক্ষত সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এই মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়। খেসারি ডালের প্রাকৃতিক উপাদান মাড়ির এই ইনফেকশন দূর করতে দারুণ সাহায্য করে।

  • ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: প্রায় ৭ থেকে ৮ গ্রাম পরিষ্কার খেসারির ডাল এক কাপ গরম জলে ভিজিয়ে রাখুন। কয়েক ঘণ্টা পর যখন জলের রঙ কিছুটা বদলে যাবে, তখন ডাল ছেঁকে নিয়ে সেই জলটি মুখে পুরে কিছুক্ষণ রেখে দিন (যাকে আয়ুর্বেদের ভাষায় ‘কবল ধারণ’ বলা হয়)। এভাবে মুখে জলটি কিছুক্ষণ ধরে রেখে তারপর ফেলে দিন এবং হালকা কুলকুচি করুন। দিনে দুই থেকে তিনবার এই ওষধি জল দিয়ে মুখ পরিষ্কার করলে মাড়ি হাজা এবং মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার সমস্যা দ্রুত দূর হয়ে যায়।

৮. হাতের বা পায়ের আঙুলের হাজা রোগ নিরাময়ে

যাঁরা দীর্ঘ সময় জলে কাজ করেন বা গৃহস্থালির প্রয়োজনে জল বেশি ঘাঁটেন, তাঁদের হাতের ও পায়ের আঙুলের চিপায় এক ধরণের ফাঙ্গাল সংক্রমণ বা ‘হাজা রোগ’ দেখা দেয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে গ্রামাঞ্চলে এই সমস্যাটি ঘরে ঘরে হয়। খেসারি ডালের প্রলেপ এই ক্ষত শুকাতে জাদুকরী ভূমিকা রাখে।

  • ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: পরিমাণমতো খেসারির ডাল ভালো করে ধুয়ে নিয়ে সামান্য জল দিয়ে মিহি করে বেটে নিন। এবার এই ডাল বাটা হালকা একটু গরম বা কুসুম কুসুম উষ্ণ করে নিন। এরপর হাতের বা পায়ের আক্রান্ত হাজা জায়গায় এই প্রলেপটি লাগিয়ে কিছুক্ষণ রাখুন। নিয়মিত কয়েকদিন এই প্যাকটি ব্যবহার করলে মাড়ি বা আঙুলের হাজা দ্রুত শুকিয়ে যাবে।
  • বিশেষ সতর্কতা: খেসারির ডাল ব্যবহারে হাজা রোগ সাময়িকভাবে সেরে গেলেও, এর মূল কারণটি দূর করতে হবে। অর্থাৎ ক্ষত থাকা অবস্থায় দীর্ঘ সময় জল ঘাঁটা বা আক্রান্ত স্থান ভেজা রাখা বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় এই সমস্যাটি বারবার ফিরে আসতে পারে।

৯. গেঁটে বাতের (Gout) তীব্র ব্যথা উপশমে

ইউরিক অ্যাসিডের আধিক্যের কারণে হওয়া গেঁটে বাত বা জয়েন্টের তীব্র ব্যথা দূর করতে খেসারি গাছের পাতা জাদুকরী ভূমিকা রাখে। গ্রামবাংলায় এই পাতাকে সাধারণত ‘খেসারি শাক’ বা ‘তেউড়ি শাক’ বলা হয়ে থাকে। এর অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বা প্রদাহনাশক উপাদান বাতের তীব্র কামড়ানি ও ফুলা ভাব দ্রুত কমিয়ে আনে।

  • ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: তাজা ও কচি খেসারির পাতা (তেউড়ি শাক) ভালো করে ধুয়ে নিয়ে সামান্য জল দিয়ে মিহি করে বেটে নিন। এই ডালপাতা বাটা হালকা একটু গরম বা কুসুম কুসুম উষ্ণ করে নিন। এরপর শরীরের যে যে জয়েন্টে বা গাঁটে বাতের তীব্র ব্যথা রয়েছে, সেখানে এই হালকা গরম প্রলেপটি লাগিয়ে দিন। নিয়মিত কয়েকদিন এই প্রলেপ ব্যবহার করলে বাতের ভেতরের ব্যথা ও ফোলা ভাব দ্রুত দূর হয়ে যায়।

১০. নখকুনির যন্ত্রণাদায়ক ইনফেকশন দূর করতে

হাতে বা পায়ের নখের কোণায় ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের সংক্রমণের কারণে নখকুনি হয়ে থাকে, যা তীব্র ব্যথা, ফোলা ভাব ও পুঁজ তৈরির কারণ হতে পারে। খেসারির কচি দানার প্রাকৃতিক উপাদান নখকুনির এই তীব্র যন্ত্রণা ও ইনফেকশন দ্রুত কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।

  • ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: খেসারি গাছের কচি শুঁটি থেকে কাঁচা সবুজ দানা বের করে নিয়ে ভালো করে বেটে নিন। এই ডাল বাটা হালকা একটু গরম বা কুসুম কুসুম উষ্ণ করে নিন। এরপর আক্রান্ত নখকুনির ওপরে এই হালকা গরম প্রলেপটি লাগিয়ে দিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই নখের ভেতরের তীব্র টনটনানি বা যন্ত্রণা কমে যাবে।
  • কার্যকারিতা বাড়ানোর বিশেষ টিপস: এই খেসারির কাঁচা দানা বাটার সাথে যদি সামান্য পরিমাণে ওষধি গুণসম্পন্ন ‘जनकपुरी खयर’ বা ‘জনকপুরী খয়ের’ মিশিয়ে প্রলেপ দেওয়া যায়, তবে নখকুনির ইনফেকশন বা ক্ষত অনেক দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং ভালো কাজ করে।

📜 খেসারি ডাল ও পক্ষাঘাতের ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা (১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দ)

খেসারি ডাল অতিরিক্ত খেলে মানুষের পা অবশ বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইসিস) হতে পারে—এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আবিষ্কার করার বহু আগেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন মনীষীদের জানা ছিল। তবে সাধারণ মানুষের স্মৃতি থেকে এটি হারিয়ে যাওয়ার পর, একটি ঐতিহাসিক ও দুঃখজনক ঘটনার মাধ্যমে এটি পুনরায় সামনে আসে:

  • ১৮২৯ সালের দুর্ভিক্ষ: গত ১৮২৯-১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভারতের উত্তরপ্রদেশে টানা ৩ বছর ধরে তীব্র খরা, ঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রধান খাদ্যশস্য যেমন—যব, গম এবং ধানের চাষ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সেখানে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
  • একমাত্র ভরসা খেসারি: চরম খাদ্যাভাবের মুখে সেখানকার সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে মাঠের টিকে থাকা একমাত্র ফসল ‘খেসারি কলাই’ বা ডাল সেদ্ধ করে দিনের পর দিন খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকার লড়াই করতে থাকেন।
  • নিম্নাঙ্গ বিকল হওয়ার মহামারী: টানা কয়েক মাস প্রধান খাদ্য হিসেবে শুধু খেসারি ডাল খাওয়ার পর দেখা গেল, ওই অঞ্চলের শত শত মানুষের শরীরের নিম্নাঙ্গ (কোমর থেকে দুই পা) অবশ ও বিকল হয়ে যাচ্ছে এবং তারা আর হাঁটতে পারছেন না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন পুরুষ।
  • ব্রিটিশ সরকারের অনুসন্ধান: এই রহস্যময় রোগ দেখে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের টনক নড়ে এবং তারা একটি বিশেষ অনুসন্ধান (Investigation) চালায়। গবেষণায় শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় যে, দীর্ঘদিন টানা খেসারি ডাল খাওয়ার কারণেই এই বিকলাঙ্গতা বা পক্ষাঘাত রোগ তৈরি হয়েছিল।

শিক্ষণীয় বিষয়: আমাদের প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে খেসারির এই পঙ্গুত্ব সৃষ্টির ক্ষমতা নিয়ে আগেই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকরা এই দুর্যোগের ঘটনাটিকে তাঁদের নিজেদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বলে প্রচার করে তৎকালীন সাধারণ সমাজকে চমকে দিয়েছিল। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, খেসারি ডাল ভেষজ গুণে সমৃদ্ধ হলেও এটি টানা দীর্ঘদিন প্রধান খাদ্য হিসেবে কেবল সেদ্ধ করে খাওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ

🌾 আরও পড়ুন: খেসারি ডাল কীভাবে কোনো সার ছাড়াই সহজে চাষ করা যায় এবং এর পেছনের ঐতিহাসিক সত্য জানতে পড়ুন 👉 খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি, উপকারিতা ও নিরাপদে খাওয়ার সঠিক নিয়ম 🚜✨

⚠️ অতিরিক্ত খেসারি ডাল খাওয়ার অপকারিতা ও আয়ুর্বেদিক সতর্কতা

প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে খেসারি ডালের যেমন ওষধি গুণের কথা বলা হয়েছে, তেমনি এর অতিরিক্ত ব্যবহারের কুফল সম্পর্কেও কড়া সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। আয়ুর্বেদ মতে, পরিমিত না খেলে এই ডাল শরীরের জন্য বেশ কিছু সমস্যা তৈরি করতে পারে:

  • শারীরিক সমস্যা: আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী খেসারির ডাল প্রকৃতির দিক থেকে অত্যন্ত ‘রুক্ষ’। এটি শরীরে বায়ু ও অম্ল (অ্যাসিডিটি) বৃদ্ধি করে এবং পেটে শূল বা তীব্র ব্যথার উদ্রেক করতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত খেলে এটি মলরোধ বা কোষ্ঠকাঠিন্য তৈরি করে।
  • দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি: খেসারির ডাল খেতে যতই সুস্বাদু লাগুক না কেন, এটি চোখের জন্য মোটেও ভালো নয়। অতিরিক্ত বা অনিয়মিতভাবে এই ডাল খেলে মানুষের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার বা দৃষ্টিশক্তি হারানোর তীব্র ঝুঁকি থাকে। তাই চোখের সুরক্ষায় এই ডাল বেশি না খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
  • যেসব ক্ষেত্রে উপকারী: তবে সীমিত ও সঠিক মাত্রায় খেলে এটি কফ, পিত্ত, মুখের অরুচি এবং বমন বা বমি বমি ভাব নাশ করতে সাহায্য করে।

❄️ শীতকালে মুলো দিয়ে খেসারি ডাল রান্নার গ্রামীণ কৌশল

আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে শীতকালে মুলো দিয়ে খেসারির ডাল রান্না করার একটি চমৎকার ঐতিহ্যবাহী প্রচলন আছে। আয়ুর্বেদ মতে, মুলো দিয়ে এভাবে রান্না করা খেসারির ডাল:

  • মুখের অরুচি দূর করে রুচি বাড়ায়।
  • ফুসফুসের পুরনো কাশি ও কফের সমস্যা কমায়।
  • থাইরয়েডের সমস্যা বা গলগণ্ড রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • শরীরের অতিরিক্ত চর্বি বা মেদবৃদ্ধি (স্থূলতা) রোধ করতে দারুণ কাজ করে।

তথ্যসূত্র

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ২৪৪-২৪৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!