খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি, উপকারিতা ও নিরাপদে খাওয়ার সঠিক নিয়ম

খেসারি

বৈজ্ঞানিক নাম:  Lathyrus sativus, সমনাম: Cicercula alba Medik., Cicercula caerulea Medik. Cicercula sativa (L.) Medik. Lathyrus asiaticus (Zalkind) Kudrj. Lathyrus azureus Dean, Lathyrus sativus subsp. albus Smekalova, Lathyrus sativus f.  chlorospermus Smekalova, Lathyrus sativus var.  comitans Smekalova, ইংরেজি নাম:  grass peacicerchiablue sweet peachickling peachickling vetchIndian pea,  white pea, white vetch. স্থানীয় নাম:  খেসারি ।  
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae. বিভাগ: Magnoliophyta. বর্গ: Fabales. পরিবার: Fabaceae. গণ: Lathyrus.  প্রজাতি: Lathyrus sativus

খেসারি (বৈজ্ঞানিক নাম: Lathyrus sativus) হচ্ছে ফেবেসি (Fabaceae) পরিবারের ল্যাথাইরাস (Lathyrus) গণের একটি সপুষ্পক লতানো উদ্ভিদ। ইংরেজি পরিভাষায় এটি ‘Grass pea’, ‘White vetch’ বা ‘Indian pea’ নামে পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়াসহ বাংলাদেশে পুষ্টিকর ডাল হিসেবে খেসারির চাষ ব্যাপক জনপ্রিয়। কম খরচে এবং সহজ পদ্ধতিতে চাষ করা যায় বলে আমাদের দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় এই ডালটি একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

খেসারি উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য ও বিবরণ

খেসারি মূলত একটি ছোট আকৃতির বর্ষজীবী বিরুৎ (লতানো) জাতীয় উদ্ভিদ। এর শারীরিক গঠন ও বৈশিষ্ট্যের বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:

  • পাতা ও কাণ্ড: এর পাতাগুলো আকারে বেশ ছোট, গাঢ় সবুজ এবং কিছুটা চিকন ও লম্বাটে হয়।
  • ফুল: খেসারি গাছে ছোট আকারের আকর্ষণীয় ফুল ফোটে, যার রঙ সাধারণত হালকা নীল বা বেগুনি-নীল হয়ে থাকে। এই ফুলগুলো দেখতে অনেকটা শিম ফুলের মতোই চমৎকার।
  • ফল ও ডাল: ফুল থেকে প্রথমে ছোট শুঁটি আকারে ফল বের হয়। এই শুঁটির ভেতরেই তৈরি হয় খেসারির বীজ বা ডাল। সাধারণত খেসারি ডালের রঙ হালকা হলুদ বা ধূসর-হলুদ হয়ে থাকে।
  • শাক হিসেবে ব্যবহার: এই উদ্ভিদের আরেকটি দারুণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর পাতা যখন কচি থাকে তখন তা শাক হিসেবে রান্না করে খাওয়া যায়। গ্রামীণ বাংলায় ‘খেসারির শাক’ অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সুস্বাদু একটি খাবার।[১]

খেসারি ডালের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও উৎপাদন

খেসারি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রধান ডাল জাতীয় ফসল। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং কম পানিতে বেঁচে থাকার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে এর ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে:

  • প্রধান উৎপাদনকারী দেশ: বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেসারি ডাল উৎপাদিত হয় ভারতে
  • দক্ষিণ এশিয়ায় চাষাবাদ: ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশেই খেসারির সফল চাষ হয়।
  • অন্যান্য অঞ্চল: দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু শুষ্ক অঞ্চলেও সীমিত পরিসরে খেসারির চাষাবাদ লক্ষ্য করা যায়।

আমাদের দেশের চরাঞ্চল এবং ধান কাটার পর পতিত জমিতে (রিলে ক্রপ হিসেবে) খেসারির উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে।

খেসারি ডাল চাষ পদ্ধতি ও উৎপাদন অঞ্চল

খেসারি একটি অত্যন্ত সহনশীল ফসল। কম খরচে এবং নামমাত্র পরিশ্রমে এই ডাল চাষ করা যায়:

  • বপনের সময় ও জমি: আশ্বিন-কার্তিক মাসে নিম্নভূমি বা চরাঞ্চল থেকে বন্যার জল নেমে গেলে কাদাযুক্ত বা পলি পড়া মাটিতে এর বীজ ছিটিয়ে বোনা হয়।
  • বিনা সারে চাষ: খেসারি চাষের জন্য আলাদা কোনো সারের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় জমিতে আমন ধান থাকা অবস্থাতেই (ধান কাটার কিছুদিন আগে) জমিতে খেসারির বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘রিলে ক্রপ’ বলে。 ধান কাটার সময় খেসারি গাছ ছোট থাকে এবং পরবর্তীকালে চৈত্র মাসে এই ডাল পরিপক্ব হয়।
  • উৎপাদন অঞ্চল: বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে খেসারির ফলন বেশি হয়। বাংলাদেশের মধ্যে বিশেষ করে পাবনা ও ফরিদপুর অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি খেসারি ডাল জন্মে।
  • পশুখাদ্য হিসেবে: অনেক অঞ্চলে ডাল পাকার আগেই কচি সবুজ খেসারি গাছ কেটে গরুর পুষ্টিকর ঘাস বা খাদ্য হিসেবে খাওয়ানো হয়।

খেসারি ডাল ও পক্ষাঘাত (ল্যাথিরিজম) বিতর্ক

খেসারি ডাল খেলে পক্ষাঘাত (প্যারালাইসিস) বা রাতকানা রোগ হয়—এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে:

  • আসল সত্য: খেসারি ডালের কারণে রাতকানা রোগ হয় না। তবে এই ডালে ‘ওডিএপি’ (β-ODAP) নামের একটি হালকা বিষাক্ত অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে।
  • ঝুঁকির কারণ: কেউ যদি টানা ২-৩ মাস প্রধান খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে খেসারি ডাল খায় (যেমনটি অতীতে দুর্ভিক্ষের সময় হতো), তবে নিম্নবর্গের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দুই পা অবশ বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগকে নিউরোল্যাথিরিজম (Neurolathyrism) বলা হয়।

খেসারি ডাল নিরাপদে খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি

স্বাভাবিক খাদ্যতালিকায় সপ্তাহে ১-২ দিন খেসারি ডাল খেলে কোনো ক্ষতি হয় না। তবে নিচের পদ্ধতিগুলো মেনে চললে এই ডালের টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদান প্রায় ৯০% পর্যন্ত দূর করা সম্ভব। বাজার থেকে আমরা যে খেসারি ডাল কিনি, সেগুলো সাধারণত ভাজা থাকে না। তাই বাজারে কেনা কাঁচা ডাল রান্নার আগে বা ওষধি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন:

১. পরিষ্কার করা: প্রথমে ডাল খুব ভালো করে ঝেড়ে এবং বেছে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
২. ভিজিয়ে রাখা: ডাল রান্নার আগে সারা রাত বা অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা প্রচুর জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে।
৩. জল ফেলে দেওয়া: ভেজানো ডালের জলটি ফেলে দিয়ে পরিষ্কার জল দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
৪. উচ্চ তাপে ফোটানো: ডালটি পর্যাপ্ত জল দিয়ে ভালো করে সেদ্ধ বা ফুটিয়ে নিতে হবে, এতে অবশিষ্ট টক্সিনও নষ্ট হয়ে যায়।

খেসারি ডাল নিরাপদে খাওয়ার ঐতিহ্যবাহী নিয়ম

খেসারি ডালের ভেতরে যে সামান্য ক্ষতিকারক বা বিষাক্ত উপাদান থাকে, তা দূর করার চমৎকার কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি রয়েছে। আমাদের দেশের গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ যুগ যুগ ধরে কোনো কুফল ছাড়াই যেভাবে এই ডাল খেয়ে আসছেন, তার পেছনের সঠিক নিয়মগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি (ভাজা ডাল): বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওড়িশার গ্রামাঞ্চলে খেসারি ডালের ব্যাপক চাষ ও ব্যবহার রয়েছে। সেখানকার মানুষ ডাল কাঁচা অবস্থায় সরাসরি রান্না করেন না। তারা প্রথমে ডালটিকে গরম বালির সাথে ভালো করে ভেজে নেন। এরপর যাঁতায় ভেঙে খোসা ঝেড়ে পরিষ্কার করেন। বিজ্ঞান বলে, বালির এই তীব্র উত্তাপের কারণে খেসারির ভেতরে থাকা ক্ষতিকারক টক্সিন বা বিষাক্ত অংশটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এই ডাল খাওয়া একদম নিরাপদ হয়ে ওঠে।[২]

💡 আরও পড়ুন: আপনি কি জানেন খেসারি ডাল কেবল পুষ্টিকরই নয়, এর রয়েছে অসাধারণ কিছু ওষধি গুণও? জেনে নিন 👉 খেসারির ডালের ১০টি ভেষজ গুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা 🌿

🌾 মটরশুঁটি ও খেসারি ডালের মধ্যকার মিল ও অমিল

উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে খেসারি ডাল এবং আমাদের অতি পরিচিত মটরশুঁটির মধ্যে গভীর একটি সম্পর্ক রয়েছে। নিচে এদের প্রধান মিল ও অমিলগুলো তুলে ধরা হলো:

  • একই উদ্ভিদ পরিবার: খেসারি এবং মটরশুঁটি দুটিই মূলত ফেবেসি (Fabaceae) বা শিম গোত্রীয় উদ্ভিদ পরিবারের সদস্য। এই কারণে এদের ফুল ও শুঁটির গঠনে অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়।
  • একই মৌসুমের ফসল: দুটি ফসলই মূলত শীতকালীন। আশ্বিন-কার্তিক মাসের দিকে যখন খেসারির বীজ বোনা হয়, ঠিক একই সময়ে মাঠে মটরশুঁটি চাষের প্রস্তুতিও শুরু হয়। চৈত্র বা বসন্তের শেষ ভাগে দুটি ফসলই পরিপক্বতা লাভ করে।
  • নাইট্রোজেন সংবন্ধন (Nutrient Fixation): খেসারি ও মটরশুঁটি—উভয় গাছের শিকড়ই মাটির উর্বরতা বাড়াতে জাদুকরী ভূমিকা রাখে। এরা বাতাস থেকে নাইট্রোজেন টেনে নিয়ে মাটিতে জমা করে, যা পরবর্তী ফসলের জন্য প্রাকৃতিক সারের কাজ করে।
  • ব্যবহারগত পার্থক্য: তবে এদের ব্যবহারে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। মটরশুঁটি সাধারণত কচি অবস্থায় সবুজ সবজি হিসেবে বা সালাদে কাঁচা খাওয়া হলেও, খেসারি মূলত বীজ বা শুকনা ডাল হিসেবেই আমাদের খাদ্যতালিকায় বেশি ব্যবহৃত হয়।

👉 আরও জানুন: আপনি কি শীতকালীন জনপ্রিয় সবজি মটরশুঁটি চাষের আধুনিক নিয়ম ও এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতে চান? তবে আমাদের এই বিস্তারিত গাইডটি পড়ুন: মটরশুঁটি চাষ পদ্ধতি ও এর স্বাস্থ্য উপকারিতা

🧪 খেসারি ডালের রাসায়নিক উপাদান ও গঠন (Chemical Composition)

খেসারি ডাল কেবল পুষ্টিগুণেই সমৃদ্ধ নয়, এর ভেতরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। ল্যাবরেটরি গবেষণায় খেসারি ডালের ভেতরে মূলত নিচের ৫টি প্রধান রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে:

  • (a) স্টার্চি ম্যাটেরিয়ালস (Starchy materials): এটি হলো ডালের মূল শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট অংশ। খেসারি ডালে প্রচুর পরিমাণে উন্নত মানের শ্বেতসার বা স্টার্চ থাকে, যা শরীরে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।
  • (b) সল্ট অব ফাইটিক অ্যাসিড (Salt of phytic acid): এটি উদ্ভিদের একটি প্রাকৃতিক উপাদান, যা খেসারি বীজের ভেতরে ফসফরাস সঞ্চয় করে রাখে। এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে।
  • (c) বিটা-অক্সালিলঅ্যামিনো অ্যালানিন (Beta-oxalylamino alanine / BOAA): এটি খেসারি ডালের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ-প্রোটিন অ্যামিনো অ্যাসিড। এটিই মূলত খেসারির সেই বিশেষ উপাদান, যা ওষধি গুণ তৈরিতে এবং অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে স্নায়ুর ক্ষতি করতে ভূমিকা রাখে।
  • (d) বিটা-এন-অক্সালিল-আলফা, বিটা-ডায়ামিনোপ্রোপিওনিক অ্যাসিড (Beta-N-oxalyl-alpha-beta-diaminopropionic acid / ODAP): চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি খেসারি ডালের প্রধান নিউরোটক্সিন উপাদান। এই ডালটি অতিরিক্ত খেলে যে প্যারালাইসিস বা ল্যাথিরিজম রোগ হয়, তার পেছনে মূলত এই ওডিএপি (ODAP) দায়ী। তবে সঠিক রান্নার পদ্ধতিতে এটি নষ্ট হয়ে যায়।
  • (e) গ্লুকোজ (Glucose): এটি ডালের অতি সাধারণ প্রাকৃতিক শর্করা বা চিনি। ডালটি হজম হওয়ার পর এই গ্লুকোজ আমাদের শরীরে সরাসরি শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে।

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, খেসারি ডাল আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি এবং খাদ্যতালিকায় কম খরচে প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর অন্যতম একটি উৎস। এই ডাল নিয়ে বাজারে কিছু নেতিবাচক ধারণা বা পক্ষাঘাতের ভয় প্রচলিত থাকলেও, আধুনিক বিজ্ঞান এবং আমাদের ঐতিহ্যবাহী রান্নার পদ্ধতি প্রমাণ করেছে যে সঠিক নিয়মে প্রস্তুত করলে খেসারি ডাল খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ। রান্নার আগে ডাল ভালো করে ফুটিয়ে নেওয়া কিংবা ভেজে নেওয়ার নিয়মগুলো মেনে চললে সব ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। তাই পুষ্টিগুণে ভরপুর এই সাশ্রয়ী ডালটি ভীতিহীনভাবে আমাদের খাদ্যতালিকায় যুক্ত করা যেতেই পারে।

তথ্যসূত্র

১. ডা: শ্রীযামিণী রঞ্জন মজুমদার: খাদ্যশস্য, মি: বি ছত্তার, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৩৫১, পৃষ্ঠা, ৭৮।
২. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা,২৪৪-২৪৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!