রবীন্দ্রনাথের সোনাঝুরি বা আকাশমণি গাছ কেন ক্ষতিকর? জানুন এর আসল রহস্য ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা!

আমাদের চেনা প্রকৃতির বুকে বনায়নের নামে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এক ক্ষতিকর ও আগ্রাসী উদ্ভিদের নাম আকাশমণি। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফ্যাবাসি’ (Fabaceae) পরিবারের অন্তর্গত এই গাছটিকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় Acacia auriculiformis বলা হলেও, আমাদের উপমহাদেশে এটি মূলত ‘আকাশমণি’ বা ‘একাশিয়া’ নামেই পরিচিত। দ্রুত বর্ধনশীল এই কাঠ উৎপাদনকারী গাছটি মূলত অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং পাপুয়া নিউ গিনির স্থানীয় প্রজাতি। তবে পরিবেশগত নানা নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে এটিকে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর আগ্রাসী প্রজাতির (Invasive Species) উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আকাশমণি গাছের নামকরণ ও পরিচিতি

উদ্ভিদ জগতে আকাশমণি গাছটি তার দ্রুত বৃদ্ধি এবং কাঠের চাহিদার কারণে বহুল পরিচিত। বাংলাদেশে এটিকে সাধারণত ‘আকাশমণি’ বা ‘সোনাঝুরি’ বা ‘একাশিয়া’ বলা হলেও, আন্তর্জাতিকভাবে এর বিভিন্ন চমৎকার নাম রয়েছে। ইংরেজি ভাষায় এর পাতার গঠন এবং ফলের আকৃতির ওপর ভিত্তি করে একে ‘Earleaf acacia’, ‘Earpod wattle’, ‘Auri’, ‘Northern black wattle’ কিংবা ‘Papuan wattle’ নামে ডাকা হয়। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এর দ্বিপদ নাম হলো Acacia auriculiformis, যা মূলত ‘Fabaceae’ বা শিম গোত্রীয় পরিবারের একটি অত্যন্ত সুপরিচিত প্রজাতি।

আকাশমণির জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস (Scientific Classification)

বৈজ্ঞানিক বিষয়ের নামবিবরণ / তথ্য
বাংলা নামআকাশমণি, একাশিয়া
ইংরেজি নামEarleaf acacia, Earpod wattle, Auri, Northern black wattle, Papuan wattle, Tan wattle
দ্বিপদ নাম (Binomial Name)Acacia auriculiformis
সমনাম (Synonym)নেই
জগৎ/রাজ্য (Kingdom)Plantae (উদ্ভিদ জগৎ)
শ্রেণীবিভাগ (Clade)Angiosperms, Eudicots, Rosids
বর্গ (Order)Fabales
পরিবার (Family)Fabaceae (শিম গোত্রীয় পরিবার)
গণ (Genus)Acacia
প্রজাতি (Species)Acacia auriculiformis

আকাশমণি গাছ রোপণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও বর্তমান আইনি অবস্থান

পরিবেশ, মাটি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী মারণঘাতী প্রভাব বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার এই গাছটির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিগত ১৫ মে, ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশব্যাপী যেকোনো নতুন বনায়ন বা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে আগ্রাসী প্রজাতির এই আকাশমণি (একাশিয়া) এবং ইউক্যালিপ্টাস গাছের চারা রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে পরিবেশের চরম বিপর্যয় রুখতে এই ক্ষতিকর বিদেশি গাছের পরিবর্তে দেশিয় প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণের জন্য জোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আকাশমণি গাছের শারীরিক গঠন, কাণ্ড ও পাতার বৈশিষ্ট্য

  • গাছের গঠন ও ছাল: আকাশমণি কোনো কাঁটা ছাড়া, খুব দ্রুত বেড়ে ওঠা একটি চিরসবুজ গাছ, যা সাধারণত ১৫ থেকে ২৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর কাণ্ডের ছাল বা বাকল ধূসর-বাদামী রঙের হয়ে থাকে। অল্প বয়সী গাছের ছাল বেশ মসৃণ হলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে তা কালচে বাদামী বা কুচকুচে কালো রঙের হয়ে যায়। তখন কাণ্ডটি অমসৃণ দেখায় এবং তাতে লম্বালম্বি গভীর ফাটল ধরে। এর ডালপালাগুলো নিচের দিকে কিছুটা ঝুলে থাকে।
  • পাতার আকার ও গঠন: এর রূপান্তরিত পাতাগুলো ডালের দুপাশে একটির পর একটি (একান্তরভাবে) সাজানো থাকে। পাতাগুলো দেখতে সোজা বা কাস্তের মতো বাঁকানো হয়, যা লম্বায় ৯ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার (কখনও ২০ সেমি পর্যন্ত) এবং চওড়ায় ১ থেকে ৩ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। পাতার গোড়ার দিকটা সরু এবং ডগাটি কিছুটা সূচালো বা গোল হয়। চামড়ার মতো শক্ত ও গাঢ় সবুজ এই পাতার গোড়ায় ৩টি প্রধান শিরা থাকে এবং পাতার বোঁটাটি ২ থেকে ১০ (ক্ষেত্রবিশেষে ২০) মিলিমিটার লম্বা ও ফোলা হয়, যার পাশে একটি ছোট গ্রন্থি থাকে।

ফুল, ফলের অভ্যন্তরীণ গঠন ও সময়চক্র

  • ফুল ও মঞ্জরী: আকাশমণি গাছের পাতার গোড়া থেকে ৪ থেকে ৮ সেন্টিমিটার লম্বা বেলনাকার ফুলের ছড়া বা মঞ্জরী বের হয়। ডালটিতে সাধারণত ১ থেকে ২টি করে মসৃণ ফুলের ছড়া একসঙ্গে থাকে। এর ফুলগুলো খুবই ছোট, বোঁটাছাড়া, সুগন্ধযুক্ত এবং উজ্জ্বল সোনালী-হলুদ রঙের হয়।
  • ফুলের ভেতরের সুক্ষ্ম পরিমাপ: এর ফুলের বাইরের বাটি বা বৃত্তিটি দেখতে ঘণ্টার মতো, যা মাত্র ০.৫ থেকে ১.০ মিলিমিটার লম্বা এবং ০.৮ থেকে ১.০ মিলিমিটার চওড়া ও মসৃণ হয়। ফুলের মূল পাপড়ির অংশটি (দলমন্ডল) প্রায় ২ মিলিমিটার লম্বা এবং এর ৫টি ভাগ থাকে, যা দেখতে তীরের ফলার মতো। ফুলটিতে অসংখ্য পুংকেশর থাকে, যেগুলোর পুংদণ্ড ৩ থেকে ৪ মিলিমিটার লম্বা হয়। এর গর্ভাশয়টি বোঁটাছাড়া, মাত্র ১ মিলিমিটার লম্বা ও মসৃণ এবং এর গর্ভদণ্ডটি ৩ থেকে ৪ মিলিমিটার লম্বা হয়ে থাকে।
  • ফল ও বীজের রূপ: এর ফলগুলো চ্যাপ্টা ও মসৃণ শিমের (পড) মতো, যা লম্বায় ৮ থেকে ১২ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ০.৫ থেকে ১.০ সেন্টিমিটার হয়। কাঁচা অবস্থায় ফলটি সোজা থাকলেও পাকার পর এটি সাপের মতো কুন্ডলী পাকিয়ে যায়। শুকিয়ে গেলে ফলটি কালো হয়ে ফেটে যায়। এর ভেতরের বীজগুলো ডিম্বাকার ও আকারে মাত্র ৩-৫ × ২-৩ মিলিমিটার হয়। প্রতিটি বীজ একটি লম্বা, কুন্ডলী পাকানো কমলা রঙের ডিম্বক নাড়ি দিয়ে প্রায় গোল গোল হয়ে ঘেরা থাকে।
  • ফুল ও ফল ধরার সময়: আকাশমণি গাছে সাধারণত জুন মাস থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ফুল ও ফল ধরে।

ক্রোমোসোম সংখ্যা (Chromosome Number): সাইটোজেনেটিক্স বা কোষবিদ্যার তথ্যানুযায়ী, আকাশমণি (Acacia auriculiformis) উদ্ভিদের ডিপ্লয়েড কোষে ক্রোমোসোম সংখ্যা হলো ২n = ২৬। এই নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্য প্রজাতিটির দ্রুত অভিযোজন ও বংশবৃদ্ধির ক্ষমতাকে নির্দেশ করে।

আবাসস্থল ও মাটির অভিযোজন ক্ষমতা:

আকাশমণি গাছের বেঁচে থাকা এবং প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা অবিশ্বাস্য রকমের তীব্র। এই প্রজাতিটি গভীর বা অগভীর—যেকোনো গভীরতার মাটিতে অনায়াসে বৃদ্ধি লাভ করতে পারে। মাটির বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে এটি বালিয়াড়ির অভ্রশিলাস্তর (Micaceous sand dunes), শক্ত ও আঁটসাঁট কাদামাটি, চুনাপাথরযুক্ত মাটি এবং অত্যন্ত পুষ্টিহীন অনুর্বর মাটিতেও চমৎকারভাবে জন্মাতে সক্ষম। শুধু তাই নয়, তীব্র লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চল এবং বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মৌসুমী জলাবদ্ধতা বা পানি জমে থাকে—এমন প্রতিকূল স্থানেও এই গাছটি খুব দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে। এই চরম অভিযোজন ক্ষমতার কারণেই এটি অন্য দেশীয় গাছপালাকে হটিয়ে দ্রুত নিজের রাজত্ব গড়ে তোলে।

আকাশমণি গাছের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও বাংলাদেশে প্রবর্তন

  • আদি নিবাস: এই গাছের মূল আদি নিবাস হলো ওশেনিয়া অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া
  • প্রাকৃতিক আবাসস্থল: অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড, পাপুয়া নিউগিনি এবং ইন্দোনেশিয়াতে এই গাছটি প্রাকৃতিকভাবেই বনের বুকে বিপুল পরিমাণে জন্মায়।
  • গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে চাষ: এর উচ্চ অভিযোজন ক্ষমতার কারণে বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত গ্রীষ্মমন্ডলীয় (Tropical) অঞ্চলে এই গাছটি প্রবর্তন করা হয়েছে এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক চাষাবাদ হচ্ছে।
  • বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশে এই প্রজাতিটি মূলত একটি বিদেশি আগন্তুক উদ্ভিদ বা প্রবর্তিত প্রজাতি হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছিল।
  • রাজপথের শোভা: শুরুর দিকে আমাদের দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়ক ও রাজপথের দুই ধারে সৌন্দর্য বর্ধন, ছায়া দান এবং ‘বীথিবৃক্ষ’ (Avenue Tree) হিসেবে এটি প্রচুর পরিমাণে লাগানো হয়েছিল।

আকাশমণি গাছের বহুমুখী অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও উপকারিতা

  • ছায়াপ্রদানকারী ও শোভাবর্ধক: আকর্ষণীয় গাঠনিক রূপের কারণে এই গাছটি চমৎকার ছায়াদানকারী বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। সাধারণত সৌন্দর্য বর্ধন এবং পথচারীদের ছায়ার জন্য এটিকে বিভিন্ন বাগানে লাগানো হয়।
  • সামাজিক বনায়ন ও হাইওয়ের শোভা: বাংলাদেশে রাজপথের শোভা বা ‘বীথিবৃক্ষ’ হিসেবে মহাসড়ক (Highways) ও রেলপথের দুই পাশে এই গাছটি ব্যাপকভাবে রোপণ করা হয়েছে।
  • আসবাবপত্র তৈরিতে কাঠের ব্যবহার: আকাশমণির কাঠ বেশ শক্ত এবং এর উপরিভাগ খুব দ্রুত মসৃণতা লাভ করে। এই আকর্ষণীয় টেক্সচারের কারণে ঘরবাড়ির আসবাবপত্র বা ফার্নিচার তৈরিতে এই কাঠ দারুণ উপযোগী।
  • জালানি কাঠের চাহিদা পূরণ: দ্রুত বৃদ্ধির হারের কারণে গ্রামীণ ও শহরতলির অঞ্চলগুলোতে এটি বর্তমানে জ্বালানি কাঠের (Fuelwood) একটি অন্যতম জনপ্রিয় উৎস হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
  • মাটি ও পরিবেশ রক্ষা: উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমিক্ষয় রোধে (Soil Erosion Prevention) এই গাছটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে সমুদ্র সৈকতে শক্তিশালী ঝড়-ঝাপটা থেকে উপকূলকে বাঁচাতে এটি এক প্রাকৃতিক আশ্রয় বা শেল্টারবেল্ট হিসেবে কাজ করে।
  • মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি: শিম গোত্রীয় (Fabaceae) উদ্ভিদ হওয়ায় এই গাছের শিকড় মাটিতে নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী নডিউল (Nitrogen-fixing nodules) তৈরি করে। এর ফলে পুষ্টিহীন বা চরম প্রতিকূল মাটিতেও গাছটি নিজের নাইট্রোজেনের চাহিদা পূরণ করে অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে ।

আকাশমণি গাছের ক্ষতিকর ও নেতিবাচক দিকসমূহ

  • মারাত্মক বায়ুবাহিত অ্যালার্জি: এই গাছের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো এর ফুল ও পরাগরেণু (Pollen)। বাতাসে ভেসে বেড়ানো আকাশমণির রেণু অনেকের শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে তীব্র অ্যালার্জি, হাঁপানি এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যা তৈরি করে।
  • ঝড়ে ভেঙে পড়ার ঝুঁকি: গাছটি দ্রুত লম্বা হলেও এর কাঠ ও ডালপালা প্রাকৃতিকভাবে বেশ ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়। এর ফলে কালবৈশাখী বা তীব্র ঝড়ের সময় এর বড় বড় শাখা-প্রশাখা সহজেই ভেঙে পড়ে পথচারী, যানবাহন ও বৈদ্যুতিক লাইনের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

আকাশমণি গাছের আন্তর্জাতিক ও জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহার

  • মালয়েশিয়ায় শোভাবর্ধন: মালয়েশিয়ার বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলে এই গাছটিকে চমৎকার একটি শোভাবর্ধক বা আলংকারিক বৃক্ষ হিসেবে প্রধান প্রধান রাস্তার পাশে রোপণ করা হয়।
  • গৃহ নির্মাণে কাঠের ব্যবহার: মজবুত কাঠামোর কারণে মালয়েশিয়ার গ্রামীণ অঞ্চলে ঘরবাড়ি বা গৃহ নির্মাণের সময় এই গাছের কাঠকে টেকসই খুঁটি হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।
  • বাকল থেকে ট্যানিন সংগ্রহ: এই গাছের চামড়া বা বাকল (Bark) চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপজাত বা ‘ট্যানিন’ (Tannin)-এর একটি প্রধান প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে সংগ্রহ করা হয়।
  • ইন্দোনেশিয়ায় জ্বালানি ও কয়লা: ইন্দোনেশিয়াতে আকাশমণি গাছটি মূলত এর উচ্চ দহন ক্ষমতার জন্য পরিচিত। সেখানে এটি জ্বালানি কাঠ এবং উচ্চ মানের বাণিজ্যিক কয়লা (Charcoal) উৎপাদনের জন্য বড় পরিসরে চাষ করা হয়।
  • কাগজ শিল্পের কাঁচামাল: ইন্দোনেশিয়ার কাগজ উৎপাদন শিল্পে (Paper Industry) এই গাছের নরম কাঠকে মন্ড বা পাল্প (Pulp) তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগানো হয়।

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের মূল্যায়ন ও সংরক্ষণ অবস্থা

আন্তর্জাতিকভাবে আকাশমণিকে ক্ষতিকর আগ্রাসী উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, দেশের রাষ্ট্রীয় নথিতে এর অবস্থান বেশ সুনির্দিষ্ট। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’-এর ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) এই প্রজাতিটি সম্পর্কে বিশদ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জ্ঞানকোষের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আমাদের দেশে এই উদ্ভিদটির কারণে বর্তমানে প্রাকৃতিকভাবে কোনো বড় ধরণের বা জরুরি সংকট তৈরি হওয়ার কারণ দেখা যায়নি। এই বিশেষ কারণে বাংলাদেশে প্রজাতিটিকে সম্পূর্ণ ‘আশঙ্কামুক্ত’ (Least Concern) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

যেহেতু এটি বিপন্ন কোনো উদ্ভিদ নয়, তাই বাংলাদেশে আকাশমণি সংরক্ষণের জন্য আলাদাভাবে কোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন হয়নি। তবে এর অতি-দ্রুত বংশবিস্তার এবং পরিবেশগত নেতিবাচক দিকগুলোর কথা বিবেচনা করে জ্ঞানকোষে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদী পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে যে—আমাদের দেশের স্থানীয় প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষায় এই বিদেশি প্রজাতিটির বংশবিস্তার নতুন করে আর উৎসাহিত করার কোনো প্রয়োজন নেই।

রবীন্দ্রনাথের ‘সোনাঝুরি’ ও আকাশমণির ফুলের সৌন্দর্য

দ্রুত বর্ধনশীল এই আকাশমণি গাছটি আমাদের দেশের রাস্তার দুই পাশে চমৎকার শোভাবর্ধনকারী ‘অ্যাভিনিউ ট্রি’ (Avenue tree বা tree alley) হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এর কাস্তের মতো বাঁকানো ডালপালা আর সোনালী রঙের ঝুলন্ত ফুলের থোকা বা মঞ্জরি দূর থেকে দেখতে সত্যিই অপূর্ব লাগে। এই গাছের কান্তাবর্ণা বা উজ্জ্বল সোনালী রঙের ঝুলন্ত ফুলের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর একটি চমৎকার সাহিত্যিক নাম দিয়েছিলেন—‘সোনাঝুরি’। শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরির হাট কিংবা আমাদের দেশের মেঠোপথের ধারে এর সোনালী ফুলের ঝরে পড়ার দৃশ্য সত্যিই যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর মন কেড়ে নেয়।

আকাশমণির পাতার আসল রহস্য: যা দেখছেন তা কি আসলেই পাতা?

আপনি কি কখনো আকাশমণি গাছের আসল পাতা দেখেছেন? উত্তর শুনে হয়তো অবাক হবেন, কিন্তু সত্যি বলতে এই গাছের পাতা আমাদের মধ্যে অনেকেই দেখেননি! আমরা সচরাচর আকাশমণি গাছে যে সবুজ রঙের চ্যাপ্টা অংশটিকে ‘পাতা’ বলে ভুল করি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেটি আসলে কোনো পাতা নয়; এটি মূলত একটি ‘পর্ণবৃন্ত’ (Phyllode)

উদ্ভিদের পাতার বোঁটা যখন বিবর্তিত বা রূপান্তরিত হয়ে দেখতে হুবহু পাতার মতো চ্যাপ্টা ও সবুজ রূপ ধারণ করে, তখন তাকে উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় পর্ণবৃন্ত বলা হয়। এই গাছটি যখন একদম ছোট চারা অবস্থায় থাকে, তখন এর গায়ে আসল ‘যৌগিক পাতা’ দেখা যায়। কিন্তু গাছটি একটু বড় হতেই সেই আসল পাতাগুলো চিরতরে ঝরে যায়। এরপর বয়স্ক গাছে শুধু চামড়ার মতো শক্ত (চর্মবৎ) এই রূপান্তরিত পর্ণবৃন্তগুলোই টিকে থাকে এবং পাতার মতো সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গাছের খাদ্য তৈরির কাজ সম্পন্ন করে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও সর্বশেষ আপডেট তথ্য

  • মূল প্রকাশ: এই তথ্যবহুল ও সচেতনতামূলক নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ‘রোদ্দুরে.কম’-এ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল।
  • সর্বশেষ সংস্করণ: পাঠকদের কাছে সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সমসাময়িক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও পরিবেশগত ক্ষতিকর দিকগুলো বিবেচনা করে আজ ০৬ জুন ২০২৬ তারিখে পুরো নিবন্ধটি সম্পূর্ণ পরিমার্জন ও আপডেট করা হয়েছে।
  • প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যসূত্র: বিএম রিজিয়া খাতুন। (আগস্ট ২০১০)। অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস। ইন: আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান (সম্পাদনা), বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (৯ম খণ্ড, ১ম সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা: ১৪২-১৪৩। আইএসবিএন: 984-30000-0286-0।

Leave a Comment

error: Content is protected !!