সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ বা সৌরকেন্দ্রিকতাবাদ বা সূর্যকেন্দ্রিকতা (ইংরেজি ভাষায়: Heliocentrism বা heliocentricism) এমন একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মডেল যাতে ধরে নেয়া হয় যে, স্থির সূর্য মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং তাকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ আবর্তিত হয়।
সূর্যকেন্দ্রিকতা ও ভূকেন্দ্রিকতা হচ্ছে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যকার সম্পর্ক এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে দুটি পরস্পরবিরোধী বৈজ্ঞানিক অভিমত। সূর্যকেন্দ্রিকতাই হচ্ছে বর্তমানে গৃহীত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী অন্যান্য গ্রহের ন্যায় পৃথিবী নিজ কক্ষে ঘুর্ণ্যমান অবস্থায় সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
সূর্যকেন্দ্রিকতার তত্ত্ব কেবল আধুনিককালে প্রমাণিত ও সত্য বলে গৃহীত হলেও প্রাচীনকালেও বিভিন্ন দার্শনিকের মধ্যে এই তত্ত্বের অনুসরণ দেখা যায়। বিশেষ করে ৩১০-২৩০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে গ্রিক দার্শনিক এরিস্টার্কাস এবং তাঁর পরবর্তী নিকোলাস স্পষ্টরূপেই মনে করতেন যে, পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
এরিস্টার্কাসের গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিডাস পন্টিকাসের মধ্যে সূর্যকেন্দ্রিকতার আভাস পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে সূর্যকেন্দ্রিকতার তত্ত্ব সুস্পষ্টভাবে এরিস্টার্কাস পোষণ করতেন। কিন্তু তার প্রাথমিক আভাস হেরাক্লিডাস-এর রচনাতেও দেখা যায়। হেরাক্লিডাস মনে করতেন পৃথিবী নয়, সূর্য হচ্ছে বিশ্বের কেন্দ্র। হেরাক্লিডাস অবশ্য সূর্যের আবর্তন অনুমান করতে পারেন নি। তিনি মনে করতেন সূর্য স্থির এবং পৃথিবী তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
সূর্যকেন্দ্রিকতাকে অমান্য করে প্লেটো, এরিস্টটল ভূকেন্দ্রিকতার তত্ত্বের পরিপোষক ছিলেন। প্লেটো এবং এরিস্টটল এবং পরবর্তীকালের টলেমীর ব্যাখ্যার সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসযুক্ত হয়ে ভূকেন্দ্রিকতার তত্ত্বকে বহুকাল যাবৎ অপতিদ্বন্দ্বী করে রেখেছিল। আধুনিককালে এর উপর প্রথম আঘাত হানেন কপারনিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩ খ্রি.)। কপারনিকাস আঙ্কিকভাবে সূর্যকেন্দ্রিকতার তত্ত্ব প্রমাণিত করেন। পরবর্তীকালে গ্যালিলিও, কেপলার ও নিউটন এই তত্ত্বকে বৈজ্ঞানিকভাবে অধিকতর শক্তিশালী করেন।
সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ অনুযায়ী সূর্য বিশ্বের একমাত্র কেন্দ্র নয়; সূর্য কেবলমাত্র সৌরমণ্ডলের কেন্দ্র; মহাবিশ্বব্যাপী এরূপ আরো সূর্য আছে এবং তাদের কেন্দ্র করে অগণিত মণ্ডলেরও অস্তিত্ব রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১৯৩।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।