শিল কড়ই বা মটর কড়ই গাছের পরিচিতি: বৈশিষ্ট্য, চাষাবাদ ও এর বহুমুখী গুরুত্ব

শিল কড়ই বা মটর কড়ই

বৈজ্ঞানিক নাম: Albizia lucidior (Steud.) Nielsen, Adansonia Ser. 2(19): 222 (1975). সমনাম: Mimosa lucida Roxb. (1832), Inga lucidior Steud. (1840), Albizia lucida (Roxb.) Benth. (1844). ইংরেজি নাম: জানা নেই । স্থানীয় নাম: শিল কড়ই, মটর কড়ই, চাকী, অসিন, মোচা।

ভূমিকা: প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসে যেসব বৃক্ষ নিজেদের অনন্য বৈশিষ্ট্য আর ছায়াঘেরা স্নিগ্ধতা দিয়ে আমাদের মুগ্ধ করে, তাদের মধ্যে ‘শিল কড়ই’ অন্যতম। এটি মূলত একটি অর্ধচিরহরিৎ বৃক্ষ, যা তার রাজকীয় উচ্চতা এবং ছাতার মতো ছড়ানো ডালপালার জন্য সুপরিচিত। শুধু ছায়া প্রদানকারী বৃক্ষ হিসেবেই নয়, বরং মজবুত কাঠ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের কারণেও এই গাছের কদর অনেক বেশি। বনাঞ্চল থেকে শুরু করে আমাদের গ্রাম-বাংলার মেঠো পথ—সবখানেই এই বৃক্ষটির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা শিল কড়ইয়ের বিস্তারিত পরিচয়, এর ফুলের অপার্থিব সৌন্দর্য এবং অর্থনৈতিকভাবে এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে গভীর আলোকপাত করব। 

শিল কড়ই গাছের বর্ণনা:

প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি হলো শিল কড়ই, যা তার বিশাল ছড়ানো চূড়া এবং ৮ থেকে ১৮ মিটার উচ্চতা নিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। এই অর্ধচিরহরিৎ বৃক্ষটির মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর ঘন সবুজ পত্রপল্লবে এবং বাকলের বিশেষ গঠনে। গাছটির শরীর জুড়ে থাকা ধূসরাভ থেকে গাঢ় বাদামী রঙের বাকল বেশ মসৃণ হলেও তাতে আনুভূমিক কুঞ্চন এবং কর্কের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুসকুড়ি এক অদ্ভুত টেক্সচার তৈরি করে। যখন নতুন কচি বিটপ আর পুষ্পমঞ্জরী উঁকি দেয়, তখন সেগুলো রেশমী বাদামী রোমে ঢাকা থাকে, যা গাছটিকে এক ধরণের কোমলতা প্রদান করে। এর পাতার গঠন বেশ জটিল ও আকর্ষণীয়; প্রতিটি পাতাই দ্বি-পক্ষল যৌগিক এবং পত্রবৃন্তের গোড়ায় ছোট ছোট উপবৃদ্ধি বর্তমান থাকে। বিশেষ করে ওপরের দিকের বড় বড় চকচকে গাঢ় সবুজ পাতাগুলো যখন নিচের ফ্যাকাশে সবুজ পাতার ওপর ছায়া ফেলে, তখন এক চমৎকার রঙের খেলা তৈরি হয়। দীর্ঘায়ত বা উপবৃত্তাকার এই পাতাগুলো অনেকটা পাতলা কাগজের মতো এবং এদের অগ্রভাগটি বেশ সুন্দরভাবে ভোঁতা হয়ে মিশে গেছে। সব মিলিয়ে শিল কড়ই কেবল একটি কাঠ বা ছায়া প্রদানকারী বৃক্ষই নয়, বরং এর প্রতিটি অংশের গঠন বৈচিত্র্য উদ্ভিদপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময়ের নাম।

শিল কড়ই গাছ যখন ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, তখন এর ডালের প্রান্তভাগে এক চমৎকার দৃশ্য তৈরি হয়। এর পুষ্পমঞ্জরীগুলো অনেকটা ছোট ছাতার মতো বা গুচ্ছাকারে সাজানো থাকে, যা দেখতে বেশ নান্দনিক। সরু ও মসৃণ ডাঁটার ওপর ২ বা তার বেশি মঞ্জরী একত্রে মিলে এক একটি গুচ্ছ তৈরি করে এবং প্রতিটি গুচ্ছে ৬ থেকে ১০টি ছোট ছোট ফুল ফুটে থাকে। এই ফুলগুলোর রঙ মাখনের মতো সাদা বা কিছুটা হলুদাভ সাদা হয়ে থাকে, যা গাছের গাঢ় সবুজ পাতার মাঝে খুব সুন্দর ফুটে ওঠে। ফুলের গঠনটিও বেশ বিশেষ; এর নিচের অংশটি দেখতে অনেকটা ছোট ঘণ্টা বা সরু পাইপের মতো। ফুলের পাপড়িগুলো যখন মেলে ধরে, তখন তার বাইরের দিকে বাদামী রঙের এক ধরণের রেশমী আভা দেখা যায়, যা হাত দিয়ে ধরলে খুব নরম বা মখমলের মতো মনে হয়। প্রস্ফুটিত এই ফুলগুলো থেকে এক ধরণের উজ্জ্বল ঝিলিক তৈরি হয়, যা শিল কড়ই গাছকে প্রকৃতির মাঝে এক অনন্য ও স্নিগ্ধ রূপ দান করে।

শিল কড়ই ফুলের ভেতরের গঠনটিও বেশ চমৎকার এবং বৈচিত্র্যময়। এই ফুলে একগুচ্ছ পুংকেশর থাকে, যার সংখ্যা প্রায় ১৫টি পর্যন্ত হতে পারে। এই পুংকেশরগুলো লম্বায় ২.০ থেকে ২.৫ সেন্টিমিটার এবং দেখতে হালকা হলুদ রঙের। এদের গঠন অনেকটা তুরপুন বা ঘোরানো যন্ত্রের মতো, যার ঠিক শেষ মাথায় গাঢ় লাল রঙের একটি চক্র বা রিং দেখা যায়—যা সাদাটে ফুলের মাঝে এক দারুণ রঙের বৈচিত্র্য তৈরি করে। এর পরাগধানীগুলো আকারে বেশ ছোট এবং দুই ভাগে বিভক্ত থাকে। ফুলের ঠিক মাঝখানে থাকা গর্ভদণ্ডটি ২.৫ থেকে ৩.০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং বেশ মসৃণ হয়। পুংকেশরের গোড়ার দিকের অংশটি একটি নলের মতো গঠন তৈরি করে, যা প্রায় ৪ মিলিমিটার লম্বা হয়। প্রকৃতির এই সুক্ষ্ম কারুকাজ আর রঙের বিন্যাস শিল কড়ই ফুলকে অন্যান্য সাধারণ ফুল থেকে আলাদা এবং অনন্য করে তুলেছে।

শিল কড়ই গাছের ফলগুলো দেখতে লম্বাটে ও চ্যাপ্টা ধরনের হয়ে থাকে, যাকে উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় ‘পড’ বলা হয়। এক একটি ফল প্রায় ১৫ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৩.৫ সেন্টিমিটার চওড়া হতে পারে। ফলগুলো সাধারণত লালচে বাদামী রঙের এবং দুই প্রান্তের দিকে কিছুটা সরু হয়ে যায়। এই ফলের খোসা বেশ নমনীয় এবং বীজের ঠিক উপরে ফলের গায়ে গোলাকার দাগ লক্ষ্য করা যায়। ফলটি পেকে গেলে নিজে থেকেই ফেটে যায় এবং ভেতর থেকে বীজগুলো বেরিয়ে আসে। প্রতিটি ফলে সাধারণত ৬ থেকে ৮টি বীজ থাকে। বীজগুলো দেখতে গোল ও চ্যাপ্টা, যার ব্যাস প্রায় ১০ মিলিমিটার এবং পুরুত্ব ১.৫ মিলিমিটারের মতো। বীজের দুই পাশই কিছুটা স্ফীত বা উত্তল থাকে এবং এর কিনারার দিকে সূক্ষ্ম কিছু রেখা বা চিহ্ন দেখা যায়, যা একে একটি নিখুঁত গঠন দান করে। প্রকৃতির এই সুশৃঙ্খল বিন্যাস শিল কড়ইয়ের বংশবিস্তার প্রক্রিয়াকে করে তুলেছে যেমন কার্যকর, তেমনি দৃষ্টিনন্দন।ক্রোমোসোম সংখ্যা: 2n = ২৬।

চাষাবাদ ও বংশ বিস্তার: শিল কড়ই গাছ প্রকৃতির বিভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। এটি সাধারণত চিরহরিৎ গহীন অরণ্য থেকে শুরু করে শুষ্ক পত্রঝরা বন—সবখানেই সগৌরবে বেড়ে ওঠে। তবে বনের ভেতরে যেখানে কিছুটা খোলা বা পরিষ্কার জায়গা থাকে, সেখানে এই গাছটি বেশি দেখা যায়। সমতলের পাশাপাশি পার্বত্য বনাঞ্চলেও এটি প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায়। শিল কড়ইয়ের জীবনচক্রের অন্যতম প্রধান সময় হলো এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস; এই সময়ের মধ্যেই গাছটি ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে ওঠে। এর বংশ বিস্তারের মূল মাধ্যম হলো বীজ। উপযুক্ত পরিবেশে বীজ থেকেই নতুন চারা জন্ম নেয় এবং ধীরে ধীরে তা এক বিশাল ছায়াঘেরা বৃক্ষে পরিণত হয়। প্রকৃতির এই চক্র শিল কড়ইকে বনাঞ্চলের এক অপরিহার্য অংশ করে তুলেছে।

বিস্তৃতি:

শিল কড়ই মূলত এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের একটি নিজস্ব সম্পদ। এই বৃক্ষের আদি নিবাস ধরা হয় হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশের ছোট ছোট পাহাড়গুলোকে। তবে সময়ের সাথে সাথে এটি ভারত, আসাম, মিয়ানমার, চীন, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান এবং মালয়েশিয়ার বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই গাছটি মূলত পাহাড়ি অঞ্চলে বেশি দেখা যায়; বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে এর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষণীয়। তবে পাহাড়ের বাইরেও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোর গ্রাম-গঞ্জে মাঝে মাঝে এই ছায়াঘেরা গাছটি চোখে পড়ে। জলবায়ুর বৈচিত্র্য মেনে নিয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা এই বৃক্ষটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

শিল কড়ই কেবল একটি বিশাল বৃক্ষই নয়, বরং এটি আর্থিক সমৃদ্ধির এক বড় উৎস। এই গাছের কাঠ অত্যন্ত মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা আসবাবপত্র তৈরির জন্য কারিগরদের প্রথম পছন্দ। এর কাঠের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি খুব সুন্দরভাবে মসৃণ করা যায়, ফলে এই কাঠ দিয়ে তৈরি আসবাবপত্রে দারুণ ফিনিশিং পাওয়া যায়। ঘর সাজানোর শৌখিন ফার্নিচার ছাড়াও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে এই কাঠ নির্ভরযোগ্যতার সাথে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি কাঠের চাহিদা মেটাতেও শিল কড়ই বড় ভূমিকা রাখে।

ঐতিহ্যবাহী ও রেশম শিল্পে ব্যবহার:

সাধারণ ব্যবহারের বাইরেও শিল কড়ইয়ের একটি বিশেষ জাতিগত গুরুত্ব রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডে এই বৃক্ষটি রেশম শিল্পের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে বাণিজ্যিকভাবে রেশম পোকা পালনের জন্য শিল কড়ই গাছকে প্রধান ‘পোষক উদ্ভিদ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রেশম পোকার খাদ্য এবং আশ্রয়ের যোগান দিয়ে এই গাছটি উন্নত মানের সিল্ক বা রেশম উৎপাদনে সরাসরি সহায়তা করে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহ এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে শিল কড়ইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) শিল কড়ই প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, মাত্রাতিরিক্ত আহরণের জন্য বর্তমানে ঝুঁকির মুখে এবং বাংলাদেশে এটি সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে শীল কড়ই সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির জন্য স্ব-স্থানে এবং স্ব-স্থানের বাইরে উভয় ধরনের সংরক্ষণ ব্যবস্থাই গ্রহণ করতে হবে।

তথ্যসূত্র:

১. বি এম রিজিয়া খাতুন (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৯ম, পৃষ্ঠা ১৬২-১৬৩। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

ছবিটি নেওয়া হয়েছে ফেসবুকের ”বাঙলার গাছ-গাছড়া (Banglar gach-gachra)” গ্রুপ থেকে। আলোকচিত্রীর নাম: Ahsan Habib

Leave a Comment

error: Content is protected !!