আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > প্রাণী > পাখি > বাংলাদেশের পাখি বাংলাদেশের প্রাণ, পাখি বাঁচান, বাংলাদেশ বাঁচান

বাংলাদেশের পাখি বাংলাদেশের প্রাণ, পাখি বাঁচান, বাংলাদেশ বাঁচান

বাংলাদেশের পাখি হচ্ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রাপ্ত সেসব পাখি যেগুলোর দালিলিক প্রমাণ হাজির করা গেছে। বাংলাদেশের পাখিগুলোকে বাংলাদেশের প্রকৃতির প্রাণরূপে বিবেচনা করা হয়। তাই আমাদের উচিত বাংলাদেশের পাখিকে রক্ষা করে বাংলাদেশকে বাঁচাতে অবিরাম চেষ্টা করা। সারা বিশ্বে পাখির প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ১০,০৬৪টি। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে আছে প্রায় ১,২০০ প্রজাতির পাখি। বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ছয়শ প্রজাতির পাখির ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে এবং অনুমান করা হয় যে একদা বাংলাদেশে ৮০০ প্রজাতির পাখি ছিলো।

বাংলাদেশে আগে যত পাখি ছিলো তার একটি প্রজাতির নাম হচ্ছে গোলাপি হাঁস, যেটি পৃথিবী থেকেই বিলুপ্ত হয়েছে। আরো ২৯ প্রজাতির পাখি অতীতে বাংলাদেশে ছিলো, এখন নেই_ যদিও তারা বিলুপ্ত হয়নি, অন্য দেশে টিকে আছে। এই ২৯ প্রজাতির পাখি অতীতে যে বাংলাদেশে ছিলো সেকথা নিশ্চিতভাবে জানা আছে, যদিও তাদের যথার্থ আবাস অনেক ক্ষেত্রেই এদেশে এখন নেই। বাংলাদেশের বিলুপ্ত পাখির মোট ৩০টি প্রজাতির কথা বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে উল্লেখ করা হয়েছে।[১] অবশিষ্ট ৬২৬ প্রজাতির পাখি সাম্প্রতিককালে এদেশে দেখা গেছে। এছাড়াও এদেশের পাখি পর্যবেক্ষকগণ মাঝেমধ্যেই নতুন প্রজাতির পাখি দেখার তথ্য দেন।[২]

আরো পড়ুন বাংলাদেশের পাখির একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা

পৃথিবীর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে পাখি এবং পাখিরা বাংলাদেশের প্রকৃতির অপরূপ উপাদান। বর্তমানে সারা পৃথিবীতেই পাখি রক্ষার জন্য সর্বাত্বক চেষ্টা চলছে। বিজ্ঞানীরা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে পাখিই পরিবেশের সুস্থতার সূচক। কোনো অঞ্চলে ক্রমাগত পাখির পরিমাণ কমতে থাকা মানে সে অঞ্চলে ক্রমাগত দূষণ বাড়তে থাকা। বাংলাদেশের পাখি বিশেষজ্ঞগণ দেশে পাখির পরিমাণ কমে যাবার কথা বহু বছর ধরেই বলছেন। দেশে দূষণ বাড়ছে এবং পাখি কমছে এটা এখন কৃষক, পরিবেশবিদ, পরিবেশকর্মি, পাখি পর্যবেক্ষক, বন্যপ্রাণ আলোকচিত্রীগণ জানেন এবং মানেন।

নানাবিধ কারণে পৃথিবীতে পাখি কমছে। বাংলাদেশেও পাখি কমছে অতি দ্রুতগতিতে। মানুষের কারণে উজাড় হচ্ছে বন, ভরাট হচ্ছে জলাভূমি। পাখিদের আবাসস্থল ধ্বংস করছে মানুষ। নগরায়ন, শিল্পায়ন, কৃষিজমির আগ্রাসন, মানুষের মাধ্যমে ভূমি দখল, নদীতে বাঁধ দিয়ে চর জাগানো, খনিজ সম্পদ উত্তোলন, প্রাকৃতিক পরিবেশে পর্যটনের প্রসার ইত্যাদির কারণে পাখির আবাসভূমি ধ্বংস হচ্ছে। খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য সাগর, মহাসাগর, নদী, পাহাড়, বনভূমি, সমতলভূমি সর্বত্রই চলছে বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রাসন। ভালো ফলনের জন্য জমিতে দেওয়া হচ্ছে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, বালাইনাশক, আগাছানাশক যেসব উপাদান পাখির এবং অন্যান্য প্রাণীর খাবারের সংগে মিশছে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে ভারসাম্য বিনষ্ট করছে। প্রতিবছর পৃথিবীতে ৫০০ কোটি পাউণ্ড কীটনাশক ছিটানো হয়। শুধুমাত্র উত্তর আমেরিকাতেই সাত-আট কোটি পাখি প্রতিবছরে কীটনাশক খেয়ে মারা যায়।[৩] বীজ সংরক্ষণের জন্য বীজে কীটনাশক মিশিয়ে রাখা হয় এবং সেই বীজ খেয়েও মারা যায় পাখি।

পাখি বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিবিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই বলছেন পাখি এবং মাছের জীবন একে অপরের উপর নিভর্রশীল। তারা সুনির্দিষ্ট করেই বলছেন পরিযায়ী পাখি, যেগুলোকে বাংলাদেশে অতিথি পাখিও বলা হয়, তার বেশিরভাগই জলাভূমির পাখি; এবং এই জলাভূমির পাখি না থাকলে মাছ থাকবে না। ব্যপারটি কীভাবে ঘটবে তা খেয়াল করি। পাখির বিষ্ঠা বা পায়খানা কিছু কিছু মাছ সরাসরি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এজন্যই আমরা সচরাচর দেখি মাছের খামারিরা হাঁস মুরগির বিষ্ঠা টাকা দিয়ে কিনে বস্তার বস্তা মাছের পুকুরে প্রয়োগ করেন। আর হাঁস-মুরগিও যে পাখি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পাখির বিষ্ঠা পরোক্ষভাবেও মাছের খাবারের যোগান দেয়। পাখির বিষ্ঠা জলজ উদ্ভিদের ডাল পালায় বা কাদায় কয়েকদিন থাকলে পাখির বিষ্ঠার চারপাশে প্লাংকটন জন্মে। এই প্লাংকটন মাছের ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাবার যা ছাড়া কোনো মাছ ও অন্যান্য অনেক জলজ প্রাণীই বৃদ্ধি পায় না। প্লাংকটন মাছের পুষ্টি যোগায়। তাই বলা হয় পাখি ছাড়া মাছ থাকবে না। বাংলাদেশ থেকে যে কয়েক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং আরো প্রায় ৬০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে তা পাখির দ্বারা মাছ খেয়ে ফেলার কারণে নয়। আসলে মাছ কমে যাচ্ছে মানুষের অদূরদর্শিতা, অজ্ঞানতা ও নির্বুদ্ধিতার কারণে। বরং এখনো যে সামান্য কিছু মাছ টিকে আছে তা পাখিদেরই কল্যাণে। বাংলাদেশের পাখির তালিকার প্রায় ৬৫৮-এর অধিক প্রজাতির পাখির মধ্যে এক-চতুর্থাংশ সংকটাপন্ন এবং তার বেশ কয়েকটি বিলুপ্তির পথে। এই পাখি হারিয়ে গেলে দেশ থেকে মাছও হারিয়ে যাবে।

সব ধরনের পাখি শিকার নিষেধ

বাংলাদেশের জমির উর্বরাশক্তি গত ২০ বছরে কয়েক গুণ কমেছে। সব কৃষকই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন জমি আর আগের মতো ফলন দেয় না। অথচ এই দেশ ছিল পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা উর্বর। যেই দেশে একদা বীজ মাটিতে ফেলে দিলেই শস্য জন্মাত সেই দেশে এখন সার কীটনাশক ও যত্ন দিয়েও প্রত্যাশিত ফসল আসে না। জমির এই উর্বরাশক্তি কমে যাওয়ার কারণ পাখি কমে যাওয়া। কেননা হাজার হাজার বছর ধরে পাখির বিষ্ঠাই জমির সার হিসেবে কাজে লেগেছে। মানুষ এখন বুঝতে শিখেছে যে, ফসলে ভাগ বসিয়ে পাখিরা মানুষের যেটুকু ক্ষতি করে উপকার করে তার চেয়ে ঢের বেশি। এছাড়াও পাখি ক্ষতিকর জলজ উদ্ভিদ ও বীজ এবং ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষি ফসলের উৎপাদন বাড়ায়।

এছাড়াও পাখি পরাগায়নে সহায়তা করে, বীজ স্থানান্তর করে, খাদ্য-শৃঙ্খল ঠিক রাখে। এরকম উপকারি প্রাণীগুলোকে হত্যা করা কিংবা জবাই করে খেয়ে ফেলা মানে বাংলাদেশকেই হত্যা করা। তাই আর কোনো পাখি হত্যা নয়। কেননা একটি পাখি প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেলে সেটি আর কোনোদিনই ফিরে আসবে না। এ সম্পর্কে আমদের ভারতীয় সভ্যতা ও আফ্রিকান সভ্যতার নীতি হলো প্রাণের প্রতি ভালোবাসা। অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন,

“তিন হাজার বছর ধরে ভারতের নীতি হচ্ছে প্রাণের প্রতি শ্রদ্ধা। শুধু মানুষের নয়, প্রাণীমাত্রেরই বেঁচে থাকার অধিকার আছে। সে অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। এই মূল নীতির উপরে ভারতীয় সভ্যতার প্রতিষ্ঠা। সেইজন্য ভারতীয় সভ্যতা এতকাল অটুট।”[৪]

পাখি বাঁচলে মাছ বাঁচবে, ফুল ফুটবে, ফল ধরবে, গাছ বাঁচবে, ঋতুবৈচিত্র্য থাকবে, প্রকৃতি রক্ষা পাবে, সর্বোপরি বাংলাদেশ টিকে যাবে। তাই আসুন সকলে মিলে পাখি বাঁচাই, প্রকৃতি বাঁচাই, জীববৈচিত্র্য বাঁচাই।

তথ্যসূত্র:
১. প্রধান সম্পাদক জিয়া উদ্দিন আহমেদ,বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা; জুন ২০১১, খণ্ড ২৬, পৃষ্ঠা xxxv.
২. সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদন,
৩. সৌরভ মাহমুদ, “পাখিরা থাকবে কোথায়!” দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ মে, ২০১১, পৃষ্ঠা-১২, http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2011-05-14/news/153998.
৪. অন্নদাশঙ্কর রায়; মুক্তবঙ্গের স্মৃতি; দেজ পাবলিশিং, কলকাতা; পৌষ, ১৪০৫; পৃষ্ঠা-১০৮।

রচনাকালঃ ২৭ মার্চ, ২০১২ এবং প্রাণকাকলি সাইটে প্রকাশিত।

আরো পড়ুন:  টবে ফুলের চাষ করবার বিস্তারিত পদ্ধতি
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page