বড় কেসুতি (Adenosma indianum) উদ্ভিদের পরিচিতি ও শনাক্তকরণের উপায়

বড় কেসুতি

বৈজ্ঞানিক নাম: Adenosma indianum (Lour.) Merr., Trans. Amer. Philos. Soc. 24 (2): 351 (1935). সমনাম: Marouled indiang Lour. (1790), Adenosma capitatum (Benth.) Hance (1873). ইংরেজি নাম: জানা নেই। স্থানীয় নাম: বড় কেসুতি।

ভূমিকা: প্রকৃতির বিশাল ভাণ্ডারে এমন অনেক ছোট ছোট বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ রয়েছে, যা আমাদের চারপাশেই জন্মে কিন্তু সঠিক পরিচয়ের অভাবে আমরা এড়িয়ে যাই। আজ আমরা এমন একটি বিশেষ বর্ষজীবী বীরুৎ উদ্ভিদ সম্পর্কে জানবো, যার শারীরিক গঠন এবং বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত চমৎকার।

বড় কেসুতি-র বর্ণনা:

প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় ভাণ্ডারে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বনজ উদ্ভিদের মধ্যে বর্ষজীবী এই বীরুৎটি তার স্বতন্ত্র শারীরিক গঠনের জন্য অত্যন্ত অনন্য, যা উচ্চতায় প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে। এই উদ্ভিদটির কাণ্ড বেশ শাখান্বিত ও বেলনাকার আকৃতির এবং এর সমস্ত শরীর জুড়ে ঘন লোমশ আবরণের পাশাপাশি হলুদ রঙের আকর্ষণীয় অবৃন্তক গ্রন্থি বিদ্যমান থাকে, যা উদ্ভিদটিকে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রদান করে। এর পাতাগুলোর বিন্যাসও বেশ চমৎকার; প্রায় ১.৫-৪.৫ সেমি লম্বা এবং ০.৫-১.৫ সেমি চওড়া এই পাতাগুলো প্রায় বৃন্তহীন এবং সাধারণত ৩-৪টি ভার্টিসিল বা চক্রাকারে সাজানো থাকে। আয়তাকার-বল্লমাকার থেকে শুরু করে ডিম্বাকার-আয়তাকার গঠনের এই পাতাগুলো ঘন গ্রন্থিল রোমশ এবং উভয় পিঠ অমসৃণ হওয়ার পাশাপাশি পাতার নিম্নভাগে প্রচুর দাগ লক্ষ্য করা যায়। পাতার কিনারাগুলো গোলাকার দন্তর-করাত দপ্তরের মতো খাঁজকাটা এবং এর শীর্ষভাগ স্থূলাগ্র প্রকৃতির। এই উদ্ভিদের পুষ্পমঞ্জরী অত্যন্ত ঘন এবং এর হেড প্রায় ২.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, যা ৩-৯ সেন্টিমিটার দীর্ঘ মঞ্জরীদণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এছাড়া এর রেখাকার মঞ্জরীপত্রগুলোতে লম্বা সিলিয়া বা রোম থাকে এবং বৃতি নলে ফিকে হলুদ রঙের অবৃন্তক গ্রন্থির উপস্থিতি উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে একে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে। মূলত বনজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই ধরনের ক্ষুদ্র বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই বর্ষজীবী বীরুৎ উদ্ভিদটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর চমৎকার পুষ্পবিন্যাস, যার দলমন্ডল ফিকে রক্ত-বেগুনি থেকে শুরু করে গাঢ় নীল রঙের বৈচিত্র্যময় বর্ণ ধারণ করতে পারে। প্রতিটি ফুল সাধারণত ৮-১০ মিমি লম্বা হয় এবং এর গ্রীবা বা গলার অংশটি বেশ রোমশ থাকে, তবে ফুলের নলটি ৫ মিমি লম্বা এবং সম্পূর্ণ রোমহীন প্রকৃতির। ফুলের উপরের ওষ্ঠটি গোলাকার বা বর্তুলাকার, যা দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ৪.৫ মিমি এবং এতে খুবই হালকা বা দুর্বলভাবে খাঁজ লক্ষ্য করা যায়; বিপরীতে এর নিম্ন ওষ্ঠটি প্রায় ৫ মিমি চওড়া ও চ্যাপ্টা ধরনের হয়, যার পার্শ্বীয় খন্ডকগুলো মধ্য খন্ডক অপেক্ষা বেশি প্রশস্ত। প্রজনন বৈশিষ্ট্যের দিকে তাত্ত্বিকভাবে নজর দিলে দেখা যায়, এতে ৪টি দীর্ঘদ্বয়ী পুংকেশর থাকে এবং পুংদণ্ডগুলো দলমন্ডলের গোড়ার দিকে প্রবেশিত অবস্থায় থাকে যা সম্পূর্ণ রোমহীন। উদ্ভিদের গর্ভাশয়টি ডিম্বাকার আকৃতির এবং এর গর্ভদণ্ডটি মসৃণ বা রোমহীন হলেও গর্ভমুণ্ডটি কিছুটা বাঁকা হয়ে থাকে। ফুল পরবর্তী ধাপে এটি যখন ফলে রূপান্তরিত হয়, তখন ৩.২-৪.২ x ২.০-২.৫ মিমি আকারের ডিম্বাকার ক্যাপসিউল তৈরি করে, যা লম্বা ও স্থায়ী বৃতি দ্বারা সুন্দরভাবে আবৃত থাকে। ফলের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র বীজগুলো উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের এবং ডিম্বাকার-আয়তাকার হয়ে থাকে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ০.৫ মিমি এবং এগুলো স্বতন্ত্রভাবে জালিকাকার নকশাযুক্ত। এই নিখুঁত শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো উদ্ভিদটিকে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে এবং বংশবিস্তারে অনন্য সহায়তা প্রদান করে। ক্রোমোসোম সংখ্যা: 2n = ৭২.

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদরাজির মধ্যে এই বিশেষ বীরুৎ উদ্ভিদটি তার অভিযোজন ক্ষমতার কারণে বেশ অনন্য। এটি মূলত উন্মুক্ত বালুকাময় এলাকা, ধান ক্ষেতের প্রান্ত এবং আর্দ্র নিম্নভূমি বা নিচু জমিতে জন্মাতে দেখা যায়। যেখানে মাটির আর্দ্রতা বেশি থাকে এবং পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পৌঁছায়, এমন পরিবেশেই এই উদ্ভিদটি সবচেয়ে দ্রুত ও সতেজভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে কৃষি জমির আশেপাশের ভিজে মাটিতে এদের উপস্থিতি প্রকৃতিপ্রেমীদের নজর কাড়ে।

এই উদ্ভিদের জীবনচক্রে ফুল ও ফল ধারণের সময়টি বেশ দীর্ঘ। সাধারণত জুলাই মাস থেকে শুরু করে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত এই উদ্ভিদে রক্ত-বেগুনি বা নীল রঙের ফুল এবং বীজযুক্ত ক্যাপসিউল ফল দেখা যায়। এই দীর্ঘ সময়কাল উদ্ভিদটির বংশ রক্ষার জন্য অত্যন্ত সহায়ক। এর বংশ বিস্তার প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং এটি মূলত বীজের সাহায্যেই নতুন চারা উৎপন্ন করে। ফলের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্রাকার জালিকাকার হলুদ বীজগুলো যখন মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন অনুকূল পরিবেশে সেখান থেকে নতুন বীরুৎ জন্ম নেয়।

বিস্তৃতি:

বড় কেসুতি সাধারণত স্যাঁতসেঁতে বা আর্দ্র মাটি পছন্দ করে। ধান ক্ষেতের আইল বা প্রান্তরে, নিচু জলাভূমির আশেপাশে এবং নদীর ধারের বালুকাময় উন্মুক্ত স্থানে এদের প্রচুর পরিমাণে জন্মাতে দেখা যায়। বাংলাদেশে এই উদ্ভিদটি সর্বত্র পাওয়া গেলেও এটি কোনো চাষকৃত উদ্ভিদ নয়, বরং প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে ওঠে। বছরের জুলাই মাস থেকে শুরু করে পরবর্তী জানুয়ারি মাস পর্যন্ত এই উদ্ভিদে ফুল ও ফল দেখা যায়। এটি মূলত বীজের মাধ্যমে তার বংশধারা বজায় রাখে। ভৌগোলিকভাবে এটি এশিয়ার অনেকগুলো দেশে বিস্তৃত। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার বন-জঙ্গলে এই উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবেই টিকে আছে।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ১০ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) বড় কেসুতি প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে বড় কেসুতি সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।   

তথ্যসূত্র:

১. এম অলিউর রহমান (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১০ম, পৃষ্ঠা ২৩২। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

Leave a Comment

error: Content is protected !!