কুন্দ বা তারা জুঁই ফুল এশিয়ার গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় অঞ্চলের সুগন্ধি আলংকারিক ফুল

ভূমিকা:  তারা জুঁই বা কুন্দ ফুল (বৈজ্ঞানিক নাম: Jasminum multiflorum ইংরেজি : Downy Jasmine, Hairy Jasmine, Musk Jasmine) হচ্ছে ওলেসা পরিবারের জেসমিনাম গণের লতানো চিরসবুজ গুল্ম। বাড়িতে বা বাগানের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য লাগানো হয়। এটি মূলত শীতকালে ফোটে, তাই এর অন্য নাম শীত জুঁই। সংস্কৃত ভাষায় এটিকে মাঘ মল্লিকা বলা হয় যেহেতু এটি মাঘ মাসে ফোটে। এটির ফুল মাঝে মাঝে এতো বেশি ফোটে যে পাতাহীন গাছটিকে সাদা মনে হয়।

বৈজ্ঞানিক নাম: Jasminum multiflorum (Burm. f.) Andr., Bot. Rep. 8: t. 496 (1807). সমনাম: Nyctanthes multiflora Burm. f. (1768), Nyctanthes pubescens Retz. (1788), Jasminum pubescens (Retz.) Willd. (1797), Jasminum hirsutum Willd. (1797). ইংরেজি নাম : Downy Jasmine, Hairy Jasmine, Musk Jasmine. স্থানীয় নাম: চামেলিয়া, তারা যুঁই, দেশি জুঁই, মাঘ মল্লিকা, শীত জুঁই, কুন্দ ফুল।

জীববৈজ্ঞানিকশ্রেণীবিন্যাস

জগৎ/রাজ্য: Plantae. বিভাগ: Tracheophyta. অবিন্যাসিত: Edicots. শ্রেণী: Magnoliopsida. বর্গ: Lamiales. পরিবার: Oleaceae. গণ: Jasminum. প্রজাতি: Jasminum multiflorum.     

কুন্দ ফুলের বিবরণ

কুন্দ ‘ভারতীয় উপমহাদেশীয় প্রজাতি। গুল্মটি দেখতে লতানো ধরনের চিরসবুজ ঝোপ’।[১] এই গাছের সাথে চামেলির মিল আছে, তবে কুন্দর শাখাসমূহ ধনুকের মতো বাঁকানো থাকে। উপশাখা বৃত্তাকার, ঘন হলুদ, রোমাবৃত। পাতা সরল, প্রতিমুখ, দৈর্ঘ্য ৩.০-৭.৫ ও প্রস্থ ১.৫-৪.০ সেমি, ভল্লাকার-দীর্ঘায়ত থেকে স্থুল ডিম্বাকার, শীর্ষ তীক্ষা বা খর্ব দীর্ঘাগ্র। পাদদেশের পাতা গোলাকৃতি, অর্ধহৃৎপিণ্ডাকার থেকে খাতাগ্র, কিনারা অখন্ড, কাগজের মতো, নিম্নপৃষ্ঠ মখমলের মতো বা ঘন রোমাবৃত এবং উপরের পৃষ্ঠ অতি রোমশ। পাতার মধ্যশিরার উভয়পাশে প্রাথমিক শিরা ৪টি, নিম্নপৃষ্ঠে উন্নীত এবং অতি রোমশ, উপরের পৃষ্ঠে কিছুটা উন্নীত অথবা নিমজ্জিত, অতি রোমশ, অন্যান্য শিরাবিন্যাস অস্পষ্ট, পত্রবৃন্ত ৪-১৫ মিমি লম্বা, শক্ত, ঘন রোমাবৃত।

পুষ্পমঞ্জরী ঘন এবং মুণ্ডাকার স্তবক, খর্বাকার ও পার্শ্বীয় শাখার অগ্রভাগে প্রান্তীয়, ৩ থেকে অনেক পুষ্পবিশিষ্ট, ঘন রোমাবৃত। ফুল সাদা, সুগন্ধিময়, মঞ্জরীপত্র পুত্র সদৃশ, ভল্লাকার, বৃতি থেকে খর্বাকার, পুষ্পবৃন্ত ০.৫-২.০ মিমি লম্বা, রোমশ। বৃতির নল ১.০ থেকে ১.৫ মিমি লম্বা ও ঘন রোমাবৃত। সরু দলনল লম্বায় ১.২-১.৭ সেমি; খন্ডক ৬-৯টি, ১২-১৭ x ৪-৫ মিমি, দীর্ঘায়তভল্লাকার, দীর্ঘাগ্র থেকে তীক্ষাগ্র। পুংকেশর ২টি, অন্তর্গত, গর্ভাশয় দ্বি-প্রকোষ্ঠী, প্রতি প্রকোষ্ঠে ডিম্বকের সংখ্যা ২ ও গর্ভদন্ড সরু। ফল বেরী, উপবৃত্তীয়, ১.২ সেমি (প্রায়) লম্বা, পরিপক্ক অবস্থায় কালো, লম্বা ও রোমশ বৃতির দন্তক কর্তৃক বেষ্টিত। [২] ক্রোমোসোম সংখ্যা: 2n = ৩৯।

বংশ বিস্তার ও চাষাবাদ

বংশ বিস্তার হয় বীজ ও কলম দ্বারা। এদের শিকড় থেকেও নতুন চারা জন্মে। পত্রঝরা অরণ্য, ঝোপ এবং খালের পাড়, কখনও কখনও বাড়ির বাগানে চাষ করা হয়। ফুল ও ফল ধারণ ডিসেম্বর-জুলাই। তবে ‘ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে হঠাৎ সমস্ত গাছ ফুলে ভরে যায়। গাছে ফুলের স্থায়িত্ব কম। জেসমিনাম গনের অন্য প্রজাতির তুলনায় কুন্দের সুবাস কম’।[৩] এটি আকর্ষণীয় এবং গভীরভাবে সুগন্ধযুক্ত ফুলের জন্য ব্যাপকভাবে গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে চাষ করা হয়। ফ্লোরিডা, চিয়াপাস, মধ্য আমেরিকা, কুইন্সল্যান্ড এবং পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ অঞ্চলে প্রাকৃতিক করা হয়েছে।

বিস্তৃতি: চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং মায়ানমার। বাংলাদেশে এই প্রজাতিটি চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী এবং সিলেট জেলায় পাওয়া যায়।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্বের দিক:

পুষ্প কষযুক্ত এবং তেতো এবং পিত্তাধিক্যে ও প্রদাহবিশিষ্ট ক্ষত চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। পাতা আলসার চিকিৎসায় ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। শিকড়ের রস সর্প দংশনে উপকারী বলে ধরে নেয়া হয়।

কুন্দ ফুলের সাহিত্যে ব্যবহার

ভারতীয় পুরাণে, কুন্দ তার শুভ্রতার জন্য পরিচিত। সুতরাং, সাধারণ পশ্চিমা শব্দ ‘তুষারের মতো সাদা’ এর পরিবর্তে, হিন্দু পুরাণাত্ত্বিক কাহিনীতে প্রায়ই দেখা যায় ‘কুন্দের মতো সাদা’। এছাড়াও, সুন্দর সাদা দাঁতকে সাধারণত কুন্দ কুঁড়ির সাথে তুলনা করা হয়। এটি বিশেষভাবে বিষ্ণুর কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। মণিপুরের কুন্দ ফুল পূজার উপচার হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং বিয়ের অনুষ্ঠানের একটি অপরিহার্য অংশ। 

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০)  কন্দু ফুল প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে কুন্দ ফুল সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। [২]

তথ্যসূত্র

১. দ্বিজেন শর্মা লেখক; বাংলা একাডেমী ; ফুলগুলি যেন কথা; মে ১৯৮৮; পৃষ্ঠা- ৫১, আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৪৪১২-৭

২. এম অলিউর রহমান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৯ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩৪৯। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

৩. ড. মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ ফুলের চাষ প্রথম সংস্করণ ২০০৩ ঢাকা, দিব্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা ১০৮। আইএসবিএন 984-483-108-3

Leave a Comment

error: Content is protected !!