লাল বাকলী সজনে: পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও চাষাবাদ পদ্ধতি

জংলি সজনে

বৈজ্ঞানিক নাম: Moringa concanensis Nimmo ex Daiz & Gibbs, Bombay Fl.: 311 (1861).
সমনাম: জানা নেই। সাধারণ নাম: drumstick tree
বাংলা নাম: লাল বাকলী সজনে বা সজনা বা সাজিনা
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae বিভাগ: Angiosperms অবিন্যাসিত: Eudicots অবিন্যাসিত: Rosids বর্গ: Brassicales গোত্র: Moringaceae গণ: Moringa প্রজাতি: Moringa concanensis

জংলি সজনে (Moringa concanensis) —যা অনেকের কাছে জংলি সজনা বা লাল বাকালি সজনে নামেও পরিচিত—মোরিঙ্গেসি (Moringaceae) পরিবারের মোরিঙ্গা গণের একটি অসাধারণ বৃক্ষ। এটি সাধারণত ছোট আকৃতির হয়ে থাকে। এই গাছটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর ফুল ও ফল ধরার জন্য কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমের প্রয়োজন হয় না; বরং সারা বছরই এটি ফুল ও ফলে সুশোভিত থাকে।

শারীরিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য: লাল বাকলী সজনের বাকল বেশ পুরু এবং কর্কের মতো লালচে আভার। এর পাতাগুলো একান্তরভাবে সাজানো এবং দ্বিপক্ষল প্রকৃতির। পাতার বৃন্তটি গোড়ার দিকে স্ফীত এবং এর অক্ষটি বেশ সরু হয়। প্রতিটি পাতায় ৩ থেকে ৫ জোড়া পক্ষ থাকে এবং ক্ষুদ্র পত্রকগুলো লম্বায় প্রায় ১.৩ থেকে ১.৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। ফ্যাকাশে সবুজ রঙের এই পত্রকগুলো দেখতে উপবৃত্তাকার বা কিছুটা গোলাকার, যার অগ্রভাগ ডিম্বাকার এবং কিনারাগুলো মসৃণ বা অখন্ড থাকে।

ফুল ও মঞ্জরী: গাছটিতে কাক্ষিক যৌগিক মঞ্জরীতে সুগন্ধি ফুল ফোটে। প্রতিটি ফুল প্রায় ১.৩ x ১.০ সেন্টিমিটার আকৃতির হয়। এর বৃতি তিন খণ্ডে বিভক্ত এবং খণ্ডগুলো অসম ও পাঁপড়ির মতো দেখায়। মজার ব্যাপার হলো, ফুলের পাদদেশ থেকে এই খণ্ডগুলো ঝরে পড়ে। ফুলটিতে পাঁচটি অসম আকৃতির পাঁপড়ি থাকে, যা মূলত গোলাপী রঙের হলেও তাতে হালকা হলুদ আভা বা ফুসকুড়ি দেখা যায়। এতে পাঁচটি বাঁকানো পুংকেশর এবং পরাগধানীহীন পাঁচটি পুংদণ্ড থাকে।

ফল ও বীজ: এর গর্ভপত্র তিনটি এবং এগুলো পরস্পর যুক্ত অবস্থায় থাকে। ফলটি দেখতে লম্বা ক্যাপসুলের মতো এবং এর আগার দিকটি বেশ সরু বা বীকবিশিষ্ট হয়। এটি মূলত ত্রিধারী বা তিন কোণাকার এবং এর বহিরাবরণ বেশ শক্ত। ফলের ভেতরে থাকা বীজগুলো প্রলম্বিত পাখনাযুক্ত হয়, যা এদের বংশবিস্তারে সহায়তা করে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানের গবেষণায় লাল বাকলী সজনের (Moringa concanensis) জেনেটিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এই প্রজাতির ডিপ্লয়েড ক্রোমোসোম সংখ্যা হচ্ছে 2n = 26। উল্লেখ্য যে, আমাদের অতি পরিচিত সাধারণ সজনের (Moringa oleifera) ক্রোমোসোম সংখ্যা সাধারণত 2n = 28 হয়ে থাকে। এই সূক্ষ্ম জেনেটিক পার্থক্যই লাল বাকলী সজনাকে অন্য প্রজাতি থেকে আলাদা করেছে।

ভৌগোলিক বিস্তৃতি: লাল বাকলী সজনের আদি নিবাস মূলত ভারত ও পাকিস্তান। এই প্রজাতিটি সর্বপ্রথম ভারতের মুম্বাই থেকে শনাক্ত করা হয়; পরবর্তীতে ভারতের রাজস্থান, সিন্ধু প্রদেশ এবং কোঙ্কন উপকূলীয় অঞ্চলেও এর উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। বাংলাদেশেও এই বৃক্ষটির দেখা পাওয়া যায়, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রাজশাহী, দিনাজপুর এবং রংপুরে এই প্রজাতিটি বিস্তৃত।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ব্যবহার: লাল বাকলী সজনে কেবল একটি সাধারণ বৃক্ষ নয়, এর বিভিন্ন অংশ বহুমুখী কাজে ব্যবহৃত হয়। এর কচি ও পুষ্ট কাঁচা ফলগুলো সুস্বাদু সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। এছাড়া এর কচি পাতা পুষ্টিগুণে ভরপুর হওয়ায় সবুজ শাক হিসেবেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। কৃষি ও গৃহস্থালি কাজেও এই গাছটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে; বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে টেকসই ও জীবন্ত বেড়া (Live fence) হিসেবে এর কান্ড ব্যবহার করা হয়।

সংরক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৯ম খণ্ড (আগস্ট ২০১০) অনুযায়ী, লাল বাকলী সজনে একটি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত প্রজাতি। তবে বর্তমানে এটি একটি বিশেষ ঝুঁকির সম্মুখীন; আর তা হলো সাধারণ সজনে (Moringa oleifera) দ্বারা এর ব্যাপক প্রতিস্থাপন। প্রাকৃতিক পরিবেশে সাধারণ সজনের আধিক্য এই প্রজাতিটির অস্তিত্বের জন্য একমাত্র হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত লাল বাকলী সজনে সংরক্ষণে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে দেশব্যাপী এর চারা উৎপাদন এবং রোপণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার জোরালো প্রস্তাব করা হয়েছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. এম এ হাসান, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৯ম খণ্ড, ১ম সংস্করণ। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ২৫০-২৫১। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

Leave a Comment

error: Content is protected !!