ভূমিকা: খয়ের (বৈজ্ঞানিক নাম: Acacia catechu) বাংলাদেশে পরিচিত নাম। বাণিজ্যিকভাবে এর চাহিদা অনেক। রং শিল্পের জন্য এর যেমন গুরুত্ব আছে তেমনি এতে নানা ভেষজ গুণাগুণ আছে। খয়ের মূলত আমাদের কাছে পানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত, যা ঠোঁটে টকটকে লাল আভা ছড়িয়ে দেয়। তবে লোকজ ঐতিহ্যের বাইরেও বাংলা সাহিত্যে এই গাছের এক বিশাল জগত রয়েছে; যেখানে এটি কালপত্র, যজ্ঞাঙ্গ, দন্তধাবন, গায়ত্রী ও মেধ্যের মতো বিচিত্র ও শ্রুতিমধুর নামে সমাদৃত। কেবল বাংলায় নয়, সংস্কৃতের ‘খদির’ থেকে শুরু করে হিন্দিতে ‘খৈর’, মিয়ানমারে ‘শ’ এবং ইংরেজিতে ‘Cutch tree’—নানা ভাষায় এর ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় এর গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলে। প্রাচীন আয়ুর্বেদ থেকে আধুনিক ভেষজ চিকিৎসা, সবখানেই এর বাকল ও কাঠের নির্যাস এক অনন্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যা আমাদের সাধারণ ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়।
খয়েরের বিবরণ:
খয়ের মূলত একটি মাঝারি আকৃতির পর্ণমোচী বা পাতাঝরা বৃক্ষ,যা তার অনন্য বৈশিষ্ট্য ও নান্দনিক পল্লবের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। যা উচ্চতায় প্রায় ১৫ থেকে ১৮ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর কাণ্ড ও বাকলের গঠন বেশ স্বতন্ত্র; বাকল সাধারণত লালচে-বাদামী রঙের এবং অমসৃণ প্রকৃতির। সময়ের সাথে সাথে এই বাকল ধূসর থেকে ছাই বর্ণ ধারণ করে এবং এতে গভীর ফাটল দেখা দেয়,যা লম্বা লম্বা ফালি আকারে গাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এর শাখা-প্রশাখাগুলো বেশ সরু ও মসৃণ হলেও অনেক সময় এগুলো কোমল ও খর্বাকার রোম দ্বারা আবৃত থাকে। শাখার রঙ সাধারণত বাদামী বা উজ্জ্বল বেগুনী হয়ে থাকে। গাছটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর তীক্ষ্ণ কাঁটা বা কন্টক। এর উপপত্রীয় কন্টকগুলো জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে এবং এগুলো কিছুটা নিম্নমুখী ও আংটার মতো বাঁকানো। এই কাঁটাগুলোর বিশেষ গঠন গাছটিকে অন্যান্য বৃক্ষ থেকে সহজেই আলাদা করতে সাহায্য করে। গাছটির পাতা দ্বিপক্ষল এবং প্রতিমুখভাবে সজ্জিত। পত্রবৃন্তের নিচের দিকে দুই পাশে দুটি কাঁটা বিদ্যমান থাকে। পাতার প্রধান অক্ষ বা পত্রাক্ষটি সাধারণত ২.৬ থেকে ১৪.০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং এটি রোমশ প্রকৃতির। অনেক সময় এই পত্রাক্ষের গায়েও বিক্ষিপ্তভাবে ছোট ছোট কাঁটা দেখা যায়। পত্রাক্ষের গোড়ার দিকে একটি স্পষ্ট উপবৃদ্ধি এবং নিচের দিকের পক্ষ জোড়ার মাঝখানে ২ থেকে ৫টি পর্যন্ত ক্ষুদ্র উপবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। এই বৃক্ষে পাতার সংখ্যা ও বিন্যাস বেশ চমৎকার। সাধারণত ৪ থেকে ২৪ জোড়া পক্ষ থাকে, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি কমে মাত্র ২ জোড়াতেও নামতে পারে। প্রতিটি পক্ষ ৩.০ থেকে ৪.৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয় এবং এতে ২০ থেকে ৫০ জোড়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পত্রক থাকে। পত্রকগুলো রৈখিক দীর্ঘায়ত এবং আকারে ১.৩-১০.০ x ০.৫-১৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই পত্রকগুলো মসৃণ বা সামান্য রোমশ হয় এবং এদের শীর্ষভাগ কিছুটা স্থূলাগ্র বা তীক্ষ্ণ প্রকৃতির। সজীব অবস্থায় এগুলো সবুজ থাকলেও শুষ্ক অবস্থায় কালচে-বাদামী বর্ণ ধারণ করে, তখন পাতার শিরাগুলো আর স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। এই বৃক্ষটির পুষ্পমঞ্জরী কাক্ষিক এবং বেলনাকার আকৃতির হয়ে থাকে, যা লম্বায় প্রায় ৫ থেকে ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। এর ফুলগুলো অবৃন্তক এবং বর্ণে আকর্ষণীয় ননীবৎ সাদা। ফুলের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর বৃতি পেয়ালা বা ঘণ্টার মতো এবং আকারে ১.০-১.৫ x ১.২-১.৫ মিলিমিটার। বৃতির দন্তকগুলো ত্রিকোণাকার বা ব-দ্বীপাকার হয়ে থাকে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ০.৫ মিলিমিটার। দলমণ্ডল ২.৫-৩.২ মিলিমিটার লম্বা এবং এর খণ্ডকগুলো দীর্ঘায়ত থেকে অনেকটা রৈখিক-ভল্লাকার আকৃতির হয়। ফুলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর অসংখ্য পুংকেশর; যার ৪.৫-৫.০ মিলিমিটার লম্বা পুংদণ্ডগুলো দলমণ্ডলের বাইরে বেরিয়ে থাকে। গর্ভাশয়টি দীর্ঘায়ত-উপবৃত্তাকার এবং গর্ভদণ্ড প্রায় ৪-৫ মিলিমিটার লম্বা হয়ে থাকে। এই গাছের ফলগুলো চ্যাপ্টা ‘পড’ বা শুটির মতো, যা লম্বায় ৫-১২ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ১.৫-১.৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। ফলের রঙ চকোলেট-বাদামী থেকে লালচে বাদামী হয়ে থাকে, তবে শুষ্ক অবস্থায় এটি কালচে বর্ণ ধারণ করে। ফলের উপরিভাগ মসৃণ ও চকচকে এবং এর কিনারাগুলো ঢেউখেলানো বা তরঙ্গিত। ফলের শীর্ষভাগ সুচালো বা ‘বী’ বিশিষ্ট এবং নিচের দিকটি বৃন্তের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে আসে। প্রতিটি পডে বা শুটিতে ৩ থেকে ১০টি পর্যন্ত বীজ থাকে; যেগুলো চ্যাপ্টা, ডিম্বাকার বা বর্তুলাকার এবং আড়াআড়িভাবে ৪-৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়। প্রকৃতির বৈচিত্র্যে এই বৃক্ষটি শুষ্ক মৌসুমে সম্পূর্ণ পত্রশূন্য হয়ে পড়ে, যা একে একটি আদর্শ পত্রঝরা বৃক্ষের রূপ দেয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই উদ্ভিদের ক্রোমোসোম সংখ্যা হচ্ছে 2n = ২৬।
উপযুক্ত মাটি ও প্রাপ্তিস্থান:
এই বৃক্ষটি অত্যন্ত সহনশীল প্রকৃতির, যা প্রায় সব ধরনের মাটিতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। তবে পলিমাটিতে এর বৃদ্ধি সবচেয়ে ভালো হয়। প্রাকৃতিকভাবে একে পরিত্যক্ত জায়গা, রাস্তার ধার, ফসলি জমির আইল, এমনকি রেলপথের পাশেও জন্মাতে দেখা যায়। এছাড়া শুষ্ক পাহাড়ি ঢালেও এটি বেশ ভালোভাবে টিকে থাকে। অনেক সময় বালুময় নদীর তীরে ডালবার্জিয়া সিসু (Dalbergia sissoo) বা শিশু গাছের সাথে এই বৃক্ষটিকে সহাবস্থান করতে দেখা যায়।
ফুল-ফল ও বংশবিস্তার:
গাছটির বংশবিস্তার প্রক্রিয়াও বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। কার্তিক থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত এর রোমশ ও কিঞ্চিৎ বাঁকানো ফলগুলো পরিপক্ক হতে থাকে। এর বংশবিস্তার প্রক্রিয়া বেশ সহজ;সরাসরি জমিতে বীজ বপনের মাধ্যমেই নতুন চারা তৈরি করা যায়। ফলগুলো পুরোপুরি পেকে গেলে একসময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেটে যায় এবং বীজগুলো খোসাসহ মুক্ত হয়ে পড়ে। এরপর বাতাস কিংবা বর্ষার পানির স্রোতে ভেসে এই বীজগুলো দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনুকূল পরিবেশে নতুন চারার জন্ম নেয়। তবে গাছটিতে সাধারণত মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ফুল ও ফল দেখা যায়। এছাড়া বৃক্ষটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর চমৎকার ‘কপিস’ বা গোড়া থেকে নতুন কুঁড়ি জন্মদানের ক্ষমতা। যদি এর মাথা ছেঁটে দেওয়া হয়, তবে গাছটি তাতে দ্রুত সাড়া দেয় এবং ঝোপালো ও সতেজ হয়ে ওঠে।
খয়ের গাছের বিস্তৃতি:
খয়ের গাছটি মূলত দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি আদি বৃক্ষ, যার বিস্তৃতি উপ-হিমালয়ান ট্র্যাক বরাবর পাঞ্জাব থেকে সিকিম পর্যন্ত এবং শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও চীনের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশে এই বৃক্ষটি মূলত উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে, বিশেষ করে রাজশাহী এবং পাবনায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সচরাচর গ্রামীণ জনপদে মানুষের বাড়ির আঙিনায়, পরিত্যক্ত ভিটায় এবং রেললাইনের দুই ধারের অনাবাদী জমিতে এই গাছটি প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে থাকে। এছাড়া বালুময় নদীর পাড়ে অন্যান্য বৃক্ষের সাথে সহাবস্থান এবং শুষ্ক পাহাড়ি ঢালে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে এই অঞ্চলের প্রকৃতিতে খয়ের গাছের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:
খয়ের গাছের সার কাঠ তার অসাধারণ স্থায়িত্ব এবং গাঢ় লালচে-বাদামী বর্ণের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই বৃক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পদ হলো ‘খয়ের’, যা এর সার কাঠ থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় আহরণ করা হয়। কাঠ অত্যন্ত ভারী এবং মজবুত হওয়ায় এটি গৃহনির্মাণের খুঁটি, ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি, ইক্ষু মাড়াই যন্ত্রের বীম, লাঙল, নৌকা এবং গরুর গাড়ির চাকার মতো ভারী ও ঘর্ষণরোধী যন্ত্রাংশ তৈরিতে অপরিহার্য। এছাড়া সূক্ষ্ম কাজের জন্য চিরুনি, আসবাবপত্র, বল্লম কিংবা তরবারির হাতল তৈরিতেও এই কাঠের জুড়ি নেই। শুধু শিল্পপণ্যই নয়, খয়েরের কাঠ থেকে উৎপাদিত উচ্চমানের কয়লা এবং এর জ্বালানি ক্ষমতা একে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক করে তুলেছে। এমনকি এর বাকলে থাকা ট্যানিন চামড়া শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা এই গাছটিকে প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। খয়ের গাছের ব্যবহারিক বহুমুখিতা কেবল চিকিৎসা বা কাঠ শিল্পের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; এর টাটকা সবুজ পাতা গবাদি পশুর অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এই বৃক্ষের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক দিক হলো এর বাণিজ্যিক খয়ের উৎপাদন প্রক্রিয়া। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার চারঘাট অঞ্চলে গড়ে ওঠা অসংখ্য কুটির শিল্পে খয়ের গাছের সার কাঠের ছোট ছোট ফালি বা চিপস বড় পাত্রে দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধ করা হয়। এই বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাণিজ্যিকভাবে বিশুদ্ধ খয়ের প্রস্তুত করা হয়, যা এই অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জীবিকা নির্বাহের এক প্রধান উৎস এবং দেশীয় ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্যিক দিক থেকে বিচার করলে, খয়ের মূলত পাওয়া যায় এই গাছের সারকাষ্ঠ (Heartwood) এবং তার নির্যাস থেকে। বাজারজাত খয়ের সাধারণত দুই ধরণের হয়—একটি হালকা রঙের, যাকে ‘ক্থ’ বলা হয় এবং অন্যটি গাঢ় রঙের যা ‘কুথ’ নামে পরিচিত। মানসম্মত খয়ের তৈরির জন্য মূলত ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী পরিপক্ক গাছের সারকাষ্ঠ ব্যবহার করা হয়। এই কাঠের প্রধান কার্যকারিতার মূল রহস্য হলো এতে থাকা উচ্চমাত্রার ‘ক্যাটেচিন’ (Catechin) এবং ‘ক্যাটেচুট্যানিক অ্যাসিড’ (Catechutannic acid)। এই শক্তিশালী প্রাকৃতিক রাসায়নিক উপাদানগুলোই মূলত খয়েরকে তার অনন্য ভেষজ ও বাণিজ্যিক গুণাগুণ দান করে।
শাস্ত্রীয় মতে
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খয়ের মূলত পানের স্বাদবর্ধক এক অনুপান হিসেবে পরিচিত হলেও, প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর স্থান অনেক উঁচুতে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম গ্রন্থ অথর্ববেদের ‘বৈদ্যক কল্পে’ (সূক্ত ১৩.৩১.৫১) খয়েরকে ‘যূপম’ ও ‘মেধ্য’ নামে অভিহিত করে এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে কালজয়ী আয়ুর্বেদ শাস্ত্রীয় গ্রন্থ যেমন— চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা, অত্রিসংহিতা, হারীত, চক্রদত্ত, ভাবপ্রকাশ ও বাগভট—এর প্রতিটি পৃষ্ঠায় খয়েরের সার কাঠের বীর্যশক্তি বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সংহত রাখার গুণগান করা হয়েছে। বিশেষ করে রক্তদুষ্টিজনিত সমস্যা বা রক্ত সংবহনতন্ত্রের জটিল ব্যাধি নিরাময়ে এর কার্যকারিতা অপরিসীম। মহর্ষি চরক তো চর্মরোগ বা কুষ্ঠ রোগীদের জন্য খদিরের (খয়ের) ক্কাথ সেবনকে এক অনন্য দাওয়াই হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আধুনিক ভেষজ চিকিৎসাতেও খয়েরের বিজ্ঞানসম্মত ব্যবহারের স্বীকৃতি মিলেছে। বাংলাদেশ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারি (১৯৯২) অনুযায়ী প্রায় ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের প্রধান উপাদান হিসেবে খয়ের ব্যবহৃত হয়। একইভাবে, বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানী ফর্মুলারি (১৯৯৩) অনুযায়ী খয়েরকে এর রং ও গুণাগুণ ভেদে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ক্বাথ সফেদ’ বা সাদা খয়ের ১২টি ওষুধের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং ‘কাত সুখ’ বা লাল খয়ের ব্যবহৃত হয় আরও ২টি বিশেষ ওষুধের ফর্মুলায়। প্রাচীন ঋষিদের জ্ঞান আর আধুনিক ফর্মুলারির এই সমন্বয় প্রমাণ করে যে, খয়ের কেবল রসনাবিলাসের বস্তু নয়, বরং এটি মানবদেহের রক্তশোধন ও চর্মরোগ নিরাময়ের এক কালজয়ী মহৌষধ।
ভেষজ গুণাগুণ
ভেষজ চিকিৎসার এক বিশাল ভাণ্ডার লুকিয়ে আছে এই বৃক্ষের প্রতিটি অংশে। এটি একদিকে যেমন কোষ্ঠবদ্ধতাকারী এবং শক্তিশালী কৃমিনাশক, অন্যদিকে আমাশয় ও দীর্ঘস্থায়ী পেটের পীড়া নিরাময়ে ধন্বন্তরী হিসেবে কাজ করে। শরীরের উচ্চ তাপমাত্রা বা জ্বর কমিয়ে আনতে, গলার ঘা, ব্রঙ্কাইটিস, আলসার এবং বদহজমের মতো সমস্যায় খয়েরের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। এছাড়া চর্মরোগের চিকিৎসায় যেমন—চুলকানি, কুষ্ঠ, ধবল রোগ এমনকি অগ্নিদগ্ধ ক্ষত বা শরীরের ফোলা ভাব কমাতে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত। নারীদের শ্বেতপ্রদর রোগ নিরাময়েও এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে।
আমাশয়: প্রাকৃতিক চিকিৎসায় খয়ের একটি নির্ভরযোগ্য নাম, যা বিশেষ করে পেটের পীড়া ও শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় অত্যন্ত কার্যকরী। দীর্ঘদিনের পুরনো আমাশয় নিরাময়ে খয়েরের চূর্ণ এক অব্যর্থ মহৌষধ। চিকিৎসকদের মতে, মাত্র এক গ্রাম পরিমাণ খয়েরের চূর্ণ নিয়ম মেনে সেবন করলে প্রাপ্তবয়স্কদের আমাশয় দ্রুত সেরে যায়। এটি পাকস্থলীর অস্বস্তি কমিয়ে হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে।
জ্বর ও কাশি: ঋতু পরিবর্তনের সাধারণ সমস্যা যেমন জ্বর ও কাশি নিয়ন্ত্রণেও খয়েরের ভূমিকা প্রশংসনীয়। এটি প্রাকৃতিক জ্বরনাশক হিসেবে কাজ করে শরীরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে। অনেকের ক্ষেত্রেই আলজিভ বেড়ে যাওয়ার কারণে অস্বস্তিকর কাশি দেখা দেয়; এমন পরিস্থিতিতে ছোট এক টুকরো খয়ের মুখে রেখে ধীরে ধীরে চুষলে গলায় আরাম পাওয়া যায় এবং কাশির তীব্রতা দ্রুত হ্রাস পায়। ঘরোয়া পদ্ধতিতে নিরাপদ স্বাস্থ্য সুরক্ষা পেতে খয়েরের এই ভেষজ ব্যবহার সত্যিই অতুলনীয়।
ক্ষত সারাতে: পুরাতন ক্ষত বা দীর্ঘদিনের না সারা ঘা সারাতে খয়েরের চূর্ণ ব্যবহার করলে জাদুকরী সুফল পাওয়া যায়। এমনকি সিফিলিসের মতো কঠিন রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের ক্ষত নিরাময়েও এর চূর্ণ বিশেষভাবে কার্যকর। এছাড়া যারা গনোরিয়ার কারণে সৃষ্ট গভীর নালীক্ষতে ভুগছেন, তাদের জন্য খয়েরের সঠিক প্রয়োগ এক আশাব্যাঞ্জক সমাধান হতে পারে। কেবল চর্মরোগ বা ক্ষত নয়, নারীদের কিছু বিশেষ শারীরিক জটিলতা নিরসনেও খয়েরের ব্যবহার যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। অত্যাধিক রজঃস্রাব (Menorrhagia)এবং শ্বেতস্রাবের (Leucorrhoea) মতো সমস্যায় খয়েরের নির্যাস অত্যন্ত ফলদায়ক বলে প্রমাণিত। এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ টিস্যুগুলোকে সংকুচিত করতে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। প্রাকৃতিক উপাদানে সমৃদ্ধ খয়েরের এই বহুমুখী ব্যবহার একে আধুনিক ভেষজ বিজ্ঞানে এক অনন্য মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।[২]
সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।
তথ্যসূত্র:
১. বি এম রিজিয়া খাতুন (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৯ম, পৃষ্ঠা ১৪৬-১৪৭। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. ড. সামসুদ্দিন আহমদ: ওষুধি উদ্ভিদ (পরিচিতি, উপযোগিতা ও ব্যবহার), দিব্যপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা, জানুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা, ৩৬-৩৭।
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: J.M.Garg
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।