বনরিটা বা ধানরিটা: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক অনন্য ভেষজ গুল্মের বিস্তারিত

ভূমিকা: প্রকৃতির বিশাল ভাণ্ডারে এমন কিছু উদ্ভিদ রয়েছে যা একই সাথে ঔষধি গুণসম্পন্ন এবং গঠনগত দিক থেকে বৈচিত্র্যময়। আজ আমরা আলোচনা করব আরোহী কাষ্ঠল গুল্ম বনরিটা নিয়ে,যা তার কাঁটাযুক্ত শাখা-প্রশাখা এবং চমৎকার পুষ্পমঞ্জরীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এশিয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের পাহাড়ি বনভূমিতে এই উদ্ভিদটির দেখা পাওয়া যায়। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, বরং ভেষজ চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন ব্যবহারেও এই উদ্ভিদটির রয়েছে অনন্য গুরুত্ব। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই উদ্ভিদের গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং এর বহুমুখী ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত।

বিষয়ের নামবিস্তারিত তথ্য
প্রধান স্থানীয় নামবনরিটা, লাট বাবুল, কুচুই, রিটা, ধানরিটা
বৈজ্ঞানিক নামAcacia concinna (Willd.) DC., Prod. 2: 464 (1825) [০.৫.৪]
সমনাম (Synonyms)Mimosa rugata (Lamk.) Voigt (1783), Mimosa concinna Willd. (1806) [০.৫.৫] (মূল বানানের টাইপো সংশোধন করা হয়েছে)
ইংরেজি নামShikakai (শিকাকাই) নামে এটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, তবে সাধারণ ইংরেজি নাম সুনির্দিষ্ট নয়।

বিবরণ

বনরিটা মূলত একটি লতানো বা আরোহী গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এটি বনের বুকে অন্য কোনো বড় গাছ বা অবলম্বনকে আশ্রয় করে ওপরে বেড়ে ওঠে।

কাণ্ড, কাঁটা ও ডালপালার রূপ পরিবর্তন

সময়ের সাথে সাথে এই উদ্ভিদটির ডালপালা ও প্রধান কাণ্ডের গঠনে বেশ চমৎকার কিছু পরিবর্তন দেখা যায়:

  • কাষ্ঠল রূপ: কচি অবস্থায় লতানো হলেও, সময়ের সাথে সাথে এটি শক্ত বা কাষ্ঠল লতায় (Woody Climber) পরিণত হয়।
  • আত্মরক্ষামূলক কাঁটা: এর শাখা-প্রশাখাগুলোতে ছোট ছোট কাঁটা থাকে। এই কাঁটাগুলো গাছটিকে অন্য কোনো গাছ বা অবলম্বনকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে ওপরে উঠতে সাহায্য করে।
  • বাকলের স্পর্শ: কচি অবস্থায় এর ডালগুলো মখমলের মতো বেশ নরম ও লোমশ মনে হয়। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই লোমশ ভাব কেটে যায় এবং ডালগুলো মসৃণ রূপ ধারণ করে।

উপপত্রের গঠন ও দ্রুত ঝরে পড়া

বনরিটা উদ্ভিদের পাতার গোড়ার দিকের ছোট উপপত্রগুলোর গঠন বেশ কৌতূহলোদ্দীপক:

  • আকৃতি ও পরিমাপ: পাতার গোড়ায় সুন্দর হৃৎপিণ্ড আকৃতির ছোট উপপত্র (Stipules) দেখা যায়। এগুলো আকারে সাধারণত ৩ থেকে ৮ মিলিমিটার লম্বা এবং ১.৫ থেকে ৬ মিলিমিটার পর্যন্ত চওড়া হয়।
  • প্রকৃতি: এই উপপত্রগুলো কিছুটা পশমী বা লোমশ প্রকৃতির হয়ে থাকে। তবে এগুলো খুব বেশিদিন স্থায়ী হয় না এবং বেশ দ্রুতই গাছ থেকে ঝরে পড়ে।

পত্রাক্ষ ও পত্রবৃন্তের সূক্ষ্ম বিবরণ

তাত্ত্বিক ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এর পাতার প্রধান অক্ষ ও বোঁটার পরিমাপ নিচে দেওয়া হলো:

  • পত্রাক্ষের দৈর্ঘ্য: এর প্রধান পত্রাক্ষটি (Leaf Rachis) সাধারণত ৬ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। তবে অনুকূল পরিবেশ পেলে ক্ষেত্রবিশেষে এটি ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।
  • বাহ্যিক গঠন: পত্রাক্ষের গায়ে সূক্ষ্ম রোম থাকতে পারে অথবা এটি সম্পূর্ণ মসৃণও হতে পারে। এছাড়া এর নিচের দিকে কম-বেশি ছোট ছোট কাঁটার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
  • পত্রবৃন্ত ও বিশেষ গ্রন্থি: গাছটির পত্রবৃন্ত বা পাতার বোঁটা ১.৫ থেকে ৫.২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এই বৃন্তের গোড়ার কিছুটা ওপরে একটি বিশেষ ধরনের উপবৃদ্ধি বা গ্রন্থি (Gland) থাকে, যা দেখতে অনেকটা উপবৃত্তাকার বা বৃত্তাকার। এই অংশটি প্রায়ই কিছুটা নিচু বা অবতল (Depressed) প্রকৃতির হয়ে থাকে।

পক্ষ ও পাতার বিশেষ গ্রন্থি

এই উদ্ভিদের পাতার ভেতরের শাখা বা পক্ষগুলোর সাজানোর পদ্ধতি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক:

  • পক্ষ বা পিনা (Pinnae): প্রতিটি পাতায় ৫ থেকে ১১ জোড়া পর্যন্ত ক্ষুদ্র শাখা বা ‘পক্ষ’ থাকে। এই পক্ষগুলো সাধারণত ১.৫ থেকে ২.৮ সেন্টিমিটার লম্বা হয়।
  • শনাক্তকারী গ্রন্থি: এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—১ থেকে ৩ জোড়া পক্ষের সংযোগস্থলে ছোট আকৃতির একটি উপবৃদ্ধি বা গ্রন্থি (Gland) দেখতে পাওয়া যায়। এই অংশটি দেখেই উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা গাছটিকে সহজে চিনতে পারেন।

ক্ষুদ্র পত্রকের পরিমাপ ও আকৃতি

বনরিটা পাতার ক্ষুদ্র পত্রকগুলোর পরিমাপ নিচে দেওয়া হলো:

  • পত্রকের সংখ্যা: প্রতিটি পক্ষে ১০ থেকে ৩৫ জোড়া অত্যন্ত ছোট ছোট পত্রক (Leaflets) খুব সুন্দরভাবে সাজানো থাকে।
  • পরিমাপ: পত্রকগুলো আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হয়; এগুলো লম্বায় ৩.check_all_images.৫ থেকে ১১.৫ মিলিমিটার এবং চওড়ায় মাত্র ০.৮ থেকে ৩.৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়।
  • আকৃতি ও কিনারা: এদের আকৃতি অনেকটা সরু এবং লম্বাটে ধরনের হয়ে থাকে। পত্রকগুলোর গোড়ার দিকটা কিছুটা অসমান। এর শীর্ষভাগ বা মাথা কখনো গোলাকার, আবার কখনো সূঁচালো ও তীক্ষ্ণ হতে পারে।
  • সূক্ষ্ম লোম বা সিলিয়া: পত্রকের চারপাশের কিনারাগুলো খুব সূক্ষ্ম লোম বা সিলিয়া দ্বারা আবৃত থাকে, যা খালি চোখে দেখলে বেশ মসৃণ মনে হয়।

গোলকাকার পুষ্পমঞ্জরীর বিবরণ

গাছটির ফুল ফোটার অংশ বা পুষ্পমঞ্জরী বনের সৌন্দর্য অনেক বাড়িয়ে দেয়:

  • উৎপত্তি: এর ফুলের বিন্যাস সাধারণত খর্বাকার হয় এবং এটি পাতার কাক্ষিক অংশ (Axil) থেকে উৎপন্ন হয়।
  • শিরমঞ্জরী: গোলকাকার এই শিরমঞ্জরীগুলো (Flower Heads) কখনো কখনো ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
  • মঞ্জরীদণ্ড: এর মঞ্জরীদণ্ডগুলো একা থাকে না, বরং ১ থেকে ৪টি দণ্ড একসাথে মিলে একটি চমৎকার গুচ্ছ তৈরি করে।
  • পুষ্পক শিরের ব্যাস: প্রতিটি গোলাকার পুষ্পক শিরের ব্যাস প্রায় ৭ থেকে ১২ মিলিমিটার হয়ে থাকে।

চমৎকার রঙের পরিবর্তন ও রূপ

গাছটির ফুল ফুটার প্রারম্ভিক ও চূড়ান্ত পর্যায়ের রঙের বৈচিত্র্য বেশ দৃষ্টিনন্দন:

  • মুকুল অবস্থা: ফুলগুলো যখন কুঁড়ি বা মুকুল অবস্থায় থাকে, তখন এগুলো দেখতে গাঢ় লাল রঙের হয়।
  • ফুটন্ত ফুল: ফুলগুলো যখন পুরোপুরি প্রস্ফুটিত বা ফুটে ওঠে, তখন এর রঙ বদলে অনেকটা চমৎকার ননীর মতো সাদা হয়ে যায়। এই রঙের পরিবর্তন উদ্ভিদটিতে এক ধরণের বিশেষ বৈচিত্র্য আনে।

ফুলের বাহ্যিক পরিমাপ ও আকৃতি

তাত্ত্বিক ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এর প্রতিটি ফুলের বাহ্যিক বিন্যাস বেশ সূক্ষ্ম ও কৌতূহলোদ্দীপক:

  • অবৃন্তক ফুল: ফুলগুলো আকারে বেশ ক্ষুদ্র এবং এগুলো সম্পূর্ণ বোঁটাহীন বা অবৃন্তক (Sessile) প্রকৃতির হয়ে থাকে।
  • ৫-গুণিতক বিন্যাস: ফুলগুলো প্রাকৃতিকভাবে উভলিঙ্গ এবং এগুলো বৈজ্ঞানিক ‘৫-গুণিতক’ (5-merous) বিন্যাসে পাঁচটি অংশে চমৎকারভাবে বিভক্ত থাকে।

বৃতি ও দলমণ্ডলের সূক্ষ্ম বিবরণ

ফুলের পাপড়ি ও বাইরের আবরণের পরিমাপ নিচে তুলে ধরা হলো:

  • বৃতি নল: এর ফুলের বৃতিটি নলাকার হয়ে থাকে এবং এটি লম্বায় ২.০ থেকে ৩.২ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়। এর পাঁচটি ত্রিকোণাকার বা ডিম্বাকার দাঁতের মতো অংশ রয়েছে, যা বেশ তীক্ষ্ণ বা সুচালো হয়। এই বৃতিগুলো সম্পূর্ণ মসৃণ হতে পারে অথবা সূক্ষ্ম নরম রোমযুক্ত হতে পারে।
  • দলমণ্ডল (পাপড়ি): অন্যদিকে, ফুলের পাপড়ি বা দলমণ্ডল ৩ থেকে ৪ মিলিমিটার লম্বা হয়, যা বাইরের বৃতির তুলনায় কিছুটা বড় বা দীর্ঘ দেখায়।

প্রজনন অঙ্গের অভ্যন্তরীণ গঠন

ফুলের ভেতরের পুরুষ ও স্ত্রী প্রজনন অংশের গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • বহির্মুখী পুংকেশর: ফুলের ভেতর থেকে পুংকেশরগুলো পাপড়ি ছাড়িয়ে চমৎকারভাবে বাইরের দিকে বেরিয়ে থাকে। এগুলোর দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩.৫ থেকে ৫.৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
  • কোমল গর্ভাশয়: উদ্ভিদটির গর্ভাশয় বেশ মসৃণ এবং এটি আকারে ০.৮ থেকে ১.৫ মিলিমিটার লম্বা হয়। এই গর্ভাশয়টি একটি ছোট বোঁটা বা বৃন্তের ওপর আসন পেতে অবস্থান করে এবং এর উপরিভাগ রেশমের মতো অত্যন্ত কোমল বা নরম প্রকৃতির হয়ে থাকে।

পড জাতীয় ফল ও বাহ্যিক রূপ

ফুল ফোটার পরবর্তী ধাপে এটি যখন ফলে রূপান্তরিত হয়, তখন এর বাহ্যিক গঠনে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়:

  • শুঁটি জাতীয় ফল: এই উদ্ভিদের ফলগুলো মূলত লম্বাটে ‘পড’ (Pod) বা শুঁটি জাতীয় হয়ে থাকে।
  • পরিমাপ ও আকার: ফলগুলো সাধারণত লম্বায় ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় প্রায় ১.৭ থেকে ২.৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
  • ঢেউখেলানো কিনারা: ফলের চারপাশের কিনারাগুলো প্রায়ই চমৎকার ঢেউখেলানো এবং কিছুটা কুঁচকানো প্রকৃতির হয়।

ফলের আবরণ ও শুকানোর পর পরিবর্তন

কাঁচা ও পাকা অবস্থায় এই ফলের আবরণে দারুণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়:

  • পুরু ও রসালো ভালভ: কাঁচা অবস্থায় ফলের বাইরের আবরণ বা ভালভগুলো বেশ পুরু এবং রসালো হয়ে থাকে।
  • ভঙ্গুর অবস্থা: তবে ফল যখন পুরোপুরি পেকে শুকিয়ে যায়, তখন এটি অনেক বেশি কুঁচকে যায় এবং অত্যন্ত ভঙ্গুর বা সহজে ভেঙে যাওয়ার মতো অবস্থায় পরিণত হয়।

শুঁটির ভেতরের অভ্যন্তরীণ গঠন

ফলের ভেতরের বীজের সুরক্ষার জন্য প্রকৃতিতে একটি চমৎকার বিন্যাস রয়েছে:

বীজের আকারের বৈচিত্র্য: শুঁটির ভেতরে থাকা বীজগুলোর আকার সব সময় এক রকম হয় না, বরং এগুলো বিভিন্ন রকমের বা নানা আকারের হতে পারে।

পরিমাপ: বীজগুলো সাধারণত ৬.৫ থেকে ১১ মিলিমিটার লম্বা এবং ৪.৫ থেকে ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত চওড়া হয়ে থাকে।

আকৃতি: এদের আকৃতি অনেকটা উপবৃত্তাকার (ডিম্বাকার) থেকে শুরু করে গোলকাকার পর্যন্ত হতে পারে।

চিত্রবিচিত্রিত রূপ: বীজগুলোর বাহ্যিক চেহারা বেশ বৈচিত্র্যময় এবং এগুলো দেখতে অনেক সময় নানারকম ডোরাকাটা বা চিত্রবিচিত্রিত রঙের হতে পারে।

বীজের গায়ে বিশেষ রেখা ও গঠন

তাত্ত্বিক ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এর বীজের গায়ে কিছু চমৎকার শনাক্তকারী চিহ্ন থাকে:

  • প্লিউরোগ্রাম রেখা: বীজের গায়ে একটি বিশেষ রেখা বা ‘প্লিউরোগ্রাম’ (Pleurogram) স্পষ্ট দেখা যায়, যা লম্বায় প্রায় ৫ থেকে ১০ মিলিমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
  • উন্মুক্ত মাইক্রোপাইল: বীজের একটি নির্দিষ্ট প্রান্ত বা মাইক্রোপাইল (Micropyle) নামক অংশটি সম্পূর্ণ খোলা বা উন্মুক্ত থাকে, যা বীজের অঙ্কুরোদগমে সাহায্য করে।

ফল পাকার পর বীজ ছড়িয়ে পড়া

উদ্ভিদটি কোনো কৃত্রিম পদ্ধতি ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে নিজের বংশধারা টিকিয়ে রাখতে চমৎকার একটি কৌশল ব্যবহার করে:

  • সংযোগ রেখা বরাবর ফাটা: ফলটি যখন পুরোপুরি পেকে একদম শুকিয়ে যায়, তখন এর নিচের দিকের প্রধান সংযোগ রেখা (Suture) বরাবর প্রাকৃতিকভাবেই ফেটে বা ফেটে যায়।
  • বীজ বাইরে আসা: এই স্বয়ংক্রিয় বিস্ফোরণ বা ফাটার কারণে ভেতরের অসংখ্য ক্ষুদ্র বীজ খুব সহজে বাইরে বেরিয়ে চারপাশের মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন চারা গজানোর জন্য প্রস্তুত হয়।

পাতলা পর্দা: ফলের ভেতরে থাকা বীজগুলোর মাঝখানে একটি পাতলা পর্দার মতো আলাদা অংশ থাকে।

চাষবাস

  • আবাসস্থল ও পরিবেশ: এই উদ্ভিদটি মূলত বৈচিত্র্যময় পরিবেশে বেড়ে উঠতে সক্ষম। এটি সাধারণত চিরহরিৎ বর্ষা অরণ্য বা রেইনফরেস্ট এবং কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত বা উপদ্রত বনাঞ্চলে বেশি দেখা যায়। এছাড়া খালের পাড়, মাঠের কিনারা কিংবা উন্মুক্ত তৃণভূমিতেও এর দেখা পাওয়া যায়। এমনকি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০ মিটার থেকে শুরু করে ১৫০০ মিটার পর্যন্ত উঁচুতে এবং চুনাপাথর সমৃদ্ধ পাহাড়ি এলাকাতেও এই গাছটি জন্মাতে পারে।
  • ফুল ও ফল ধারণের সময়: প্রকৃতির ঋতুচক্র অনুযায়ী এই উদ্ভিদে ফুল ও ফল আসার একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে এই গাছটি ফুলে-ফলে ভরে ওঠে। যারা এই উদ্ভিদের সংগ্রহ বা চাষ করতে চান, তাদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • বংশ বিস্তার পদ্ধতি: উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবে বীজের মাধ্যমেই বংশ বৃদ্ধি করে। ফলের ভেতরে থাকা পরিপক্ক বীজগুলো অনুকূল পরিবেশে নতুন চারা জন্ম দিতে সাহায্য করে।

বিস্তৃতি

  • ভৌগোলিক বিস্তৃতি: এই উদ্ভিদটি মূলত এশিয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের একটি সহজাত প্রজাতি। ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন এবং ফিলিপাইন পর্যন্ত এর বিস্তৃতি রয়েছে। এই বিশাল অঞ্চলের জলবায়ু ও মাটির সাথে গাছটি চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে।
  • বাংলাদেশে প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশেও এই উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি জেলাগুলোতে এটি বেশি দেখা যায়। সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলার গভীর ও মিশ্র চিরহরিৎ বনভূমিগুলো এই গাছের জন্য উপযুক্ত আবাসস্থল।

গুণাগুণ

  • অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ঔষধি ব্যবহার: এই উদ্ভিদটি বিভিন্ন দেশে ভেষজ চিকিৎসা ও দৈনন্দিন কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে চীন এবং জাপানে এর ফলকে বমনকারক, মূত্রবর্ধক এবং প্রাকৃতিক রেচক (Laxative) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিডনির সমস্যা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এই ফলের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত।
  • আঞ্চলিক ও ভেষজ চিকিৎসা: ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে এই গাছের পাতা ও ফল পিত্ত সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এটি বেশ কার্যকর। বাহ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে চর্মরোগ যেমন—দাদ, অ্যাকজিমা, কুষ্ঠ সদৃশ দাগ এবং ফোঁড়া নিরাময়ে এই উদ্ভিদের প্রলেপ বা পট্টি দেওয়া হয়।
  • চুল ও ত্বকের যত্ন: চুলের যত্নে এই উদ্ভিদটির বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। ভারতে এটি চুলের দ্রুত বৃদ্ধি এবং খুশকি দূর করার জন্য একটি জনপ্রিয় ঘরোয়া প্রতিষেধক। এর ফল থেকে তৈরি ক্বাথ চুলের পরিচ্ছন্নতায় ‘হেয়ার ওয়াশ’ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। এছাড়া স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, সন্তান প্রসবের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে এর বীজ ব্যবহৃত হয়।
  • রান্না ও অন্যান্য বিবিধ ব্যবহার: ফিলিপাইনে এই উদ্ভিদের টক বা অম্লীয় ফল রান্নার স্বাদ বাড়াতে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, এর কাণ্ড চূর্ণের একটি বিশেষ গুণ রয়েছে যা মাছের বিষ হিসেবে কাজ করে। ভারতের অরুণাচল প্রদেশের আদিবাসীরা মাছ শিকারের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন; পানিতে কাণ্ড চূর্ণ ছিটিয়ে দিলে মাছ অচেতন হয়ে ভেসে ওঠে, যা সহজে মাছ শিকারে সাহায্য করে।

আরো পড়ুন:

📚 তথ্যসূত্র ও টিকা (References & Notes)

১. বি এম রিজিয়া খাতুন (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৬ষ্ঠ, পৃষ্ঠা ১৪৭-১৪৮। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. প্রকাশ ও পরিমার্জন সংক্রান্ত নোট: এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টাল ‘রোদ্দুরে.কম’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্টের গুণগত মান, বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং আধুনিকতা বজায় রাখতে আজ ১০ জুলাই ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ নিবন্ধটি নতুন তথ্যসহ পরিমার্জন, আধুনিকীকরণ এবং আপডেট করা হলো।
৩. চিত্রস্বত্ব (Image Credit): এই নিবন্ধে ব্যবহৃত ছবিগুলো মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিমিডিয়া কমন্স (Wikimedia Commons) থেকে সংগৃহীত। আলোকচিত্রীর নাম: Dinesh Valke

Leave a Comment

error: Content is protected !!