ভূমিকা: প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে চিরসবুজ উদ্ভিদ সবসময়ই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলের তেমনই একটি অনন্য উদ্ভিদ হলো হরিণা শাক (বৈজ্ঞানিক নাম: Aglaonema hookerianum)। এটি মূলত একটি বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ, যা তার দৃষ্টিনন্দন পাতার জন্য সুপরিচিত। আজ আমরা জানব গহীন অরণ্যের এই উদ্ভিদটি সম্পর্কে বিস্তারিত।
হরিণা শাক-এর বর্ণনা:
প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি হরিণা শাক (বৈজ্ঞানিক নাম: Aglaonema hookerianum) মূলত একটি চিরসবুজ বিরুৎ প্রজাতির উদ্ভিদ, যা তার সুসংগঠিত শারীরিক কাঠামোর জন্য পরিচিত। এই উদ্ভিদের কাণ্ড সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ১.৫ থেকে ২.০ সেন্টিমিটার পুরু হয়ে থাকে, যার প্রতি দুটি পর্বের মধ্যবর্তী দূরত্ব বা পর্বমধ্য ১.৫ থেকে ৩.০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এর দীর্ঘ সবৃন্তক পাতাগুলোর বৃন্ত প্রায় ২৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং গোড়ায় ১৫ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের একটি ঝিল্লিযুক্ত পত্র বেষ্টনী বিদ্যমান থাকে। পত্রফলকের আকার সাধারণত ২৭ x ৭-১২ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে, যা দেখতে ডিম্বাকার থেকে শুরু করে উপবৃত্তাকার বা ভল্লাকার পর্যন্ত হতে পারে; এর ভূমি কখনও অসম বা বর্তুলাকার হলেও শীর্ষভাগ সবসময়ই দীর্ঘ সরু বা দীর্ঘাগ্র প্রকৃতির হয়। সম্পূর্ণ নিরেট সবুজ রঙের এই পাতায় কোনো চিত্র-বিচিত্র দাগ থাকে না এবং এর মধ্যশিরা থেকে ৭-১৩টি প্রাথমিক পার্শ্বীয় শিরা সুস্পষ্টভাবে অপসারিত হয়। প্রজনন পর্যায়ে এতে ১ থেকে ৩টি একত্রিত মঞ্জরীদন্ড দেখা যায় যা ২১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং এর ৩-৭ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের চমসা (Spathe) পুংকেশর ও শক্ত গর্ভদন্ডযুক্ত ডিম্বাকার গর্ভাশয়কে ধারণ করে। পরিপক্ক অবস্থায় এই উদ্ভিদে ৩ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ১.৪ সেন্টিমিটার স্থূল ফল জন্মে, যা এর বংশবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
প্রাকৃতিক পরিবেশে হরিণা শাক সাধারণত গভীর অরণ্যের ছায়াঘেরা এবং আর্দ্র স্থানে জন্মাতে পছন্দ করে। তীব্র সূর্যের আলো অপেক্ষা স্নিগ্ধ ও শীতল পরিবেশ এই বিরুৎ প্রজাতির বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়ক। এই উদ্ভিদের জীবনচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হলো এর ফুল ও ফল ধারণকাল, যা মূলত জুন থেকে জুলাই মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়। বর্তমান সময়ে এর অনন্য শারীরিক গঠন এবং চিরসবুজ বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি বাহারি উদ্ভিদ (Ornamental Plant) হিসেবে বাগানবিলাসীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে। হরিণা শাকের বংশবিস্তার প্রক্রিয়াও বেশ চমৎকার; এটি মূলত এর মূল বা গ্রন্থিকের (Rhizome) মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করে থাকে। গ্রন্থিক পদ্ধতিতে বংশবিস্তারের সক্ষমতা থাকায় এটি খুব সহজেই নির্দিষ্ট স্থানে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং প্রতিকূল পরিবেশে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে।
বিস্তৃতি:
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ। এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত উত্তর-পূর্ব ভারত (বিশেষ করে খাসিয়া পাহাড় এবং কাছার অঞ্চল) এবং মায়ানমারের আরাকান অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিলেট, চট্টগ্রাম (সীতাকুণ্ড অঞ্চল), বান্দরবান এবং রাঙ্গামাটির কাসালং নদী সংলগ্ন জেলাগুলোতে এই উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে। মূলত আর্দ্র জলবায়ু এবং পাহাড়ের ঢালু অঞ্চলগুলো এই প্রজাতির টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে অনুকূল।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১১ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) হরিণা শাক প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, অরণ্য উৎখাত ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বাংলাদেশে এটি সঙ্কটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে হরিণা শাক সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে আবাসস্থল ও তার বাইরে সংরক্ষণের চেষ্টা করা দরকার।
তথ্যসূত্র:
১. হোসনে আরা (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৪-২৫। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
বি. দ্র: ছবিটি নেওয়া হয়েছে flowersofindia.net ওয়েব সাইট থেকে।
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।