পরিবেশের পরম বন্ধু এবং প্রকৃতির ঝাড়ুদার হিসেবে পরিচিত পাখি হলো শকুন। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ পাখির তালিকায় প্রায় ৮০০ প্রজাতির পাখি থাকলেও শকুনের প্রজাতি রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি। আমাদের দেশে শকুনের বর্তমান অবস্থা এবং এর বিভিন্ন প্রজাতি নিচে আলোচনা করা হলো:
- বাংলাদেশে শকুনের প্রজাতি: বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ও পাখির তালিকায় ৪টি গণের মোট ৬ প্রজাতির শকুন রয়েছে。 এর মধ্যে ৪টি প্রজাতি এদেশের স্থায়ী বাসিন্দা এবং বাকি ২টিকে পরিযায়ী বা যাযাবর পাখি হিসেবে গণ্য করা হয়。
- বর্তমান দৃশ্যমানতা: একসময় দেশের আকাশে নিয়মিত শকুনের দেখা মিললেও বর্তমানে এগুলো মহাবিপন্ন。 এখন কেবল বাংলা শকুন (White-rumped Vulture) এবং গ্রিফন শকুন বা ইউরেশীয় গৃধিনী (Eurasian Griffon) মাঝে মাঝে দেশের আকাশে নজরে পড়ে।
- বিপন্ন ও মহাবিপন্ন শকুনের তালিকা: বাংলাদেশের স্থায়ী শকুনের মধ্যে রাজশকুন (Red-headed Vulture) এখন প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত এবং এটি ‘মহাবিপন্ন’ হিসেবে বিবেচিত。 এছাড়া অন্য প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- সরুঠুঁটি শকুন (Slender-billed Vulture)
- হিমালয়ী গৃধিনী (Himalayan Griffon)
- কালা শকুন (Cinereous Vulture)
- ধলা শকুন (Egyptian Vulture)
বিশ্বব্যাপী শকুনের বিস্তৃতি
বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রায় ১৮ প্রজাতির শকুন দেখতে পাওয়া যায়। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
- পশ্চিম গোলার্ধ: এই অঞ্চলে প্রায় ৭ প্রজাতির শকুন বাস করে।
- পূর্ব গোলার্ধ: ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশ জুড়ে ঈগল গোত্রের সাথে সম্পর্কিত প্রায় ১১ প্রজাতির শকুনের দেখা মেলে।
বাংলাদেশে শকুন বিলুপ্তির মূল কারণ: ডাইক্লোফেনাকের মরণথাবা
এক সময়ের চিরচেনা পাখি শকুন আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। গত তিন দশকে এশিয়ার দেশগুলোতে যে হারে শকুনের সংখ্যা কমেছে, তা পরিবেশবিদদের গভীরভাবে চিন্তিত করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শকুনের এই আকস্মিক বিলুপ্তির পেছনে প্রাকৃতিকের কোনো দুর্যোগ নয়, বরং মানুষের তৈরি একটি ওষুধ দায়ী।
- ডাইক্লোফেনাকের মারাত্মক প্রভাব: গবাদি পশুর চিকিৎসার জন্য ‘ডাইক্লোফেনাক’ (Diclofenac) নামের একটি ব্যথানাশক ওষুধ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। এটিই মূলত শকুনের জন্য বিষে পরিণত হয়েছে।
- ড. লিন্ডসে ওক-এর যুগান্তকারী গবেষণা: ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ অব ভেটেরিনারি মেডিসিনের গবেষক ড. লিন্ডসে ওক তাঁর গবেষণায় প্রথম এটি প্রমাণ করেন। তিনি দেখান যে, পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাকের অতিরিক্ত ব্যবহারই শকুন বিলুপ্তির প্রধান কারণ।
- যেভাবে শকুনের মৃত্যু ঘটে: ডাইক্লোফেনাক ওষুধ দেওয়া হয়েছে এমন কোনো গবাদি পশু মারা যাওয়ার পর, শকুন যখন সেই পশুর মাংস (ক্যারিয়ন) খায়, তখন মাত্র ৩ দিনের মধ্যে শকুনের কিডনি বা বৃক্ক সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘গাউট’ (Gout) বা ইউরিক অ্যাসিডের আধিক্য বলা হয়, যা শকুনের দ্রুত মৃত্যু ঘটায়।
- দক্ষিণ এশিয়ায় শকুনের বিপর্যয়: এই মরণঘাতী ওষুধের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে, বিশেষ করে ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৩০ শতাংশ শকুন মারা যেতে শুরু করে। সোজা কথায়, ডাইক্লোফেনাক মিশ্রিত মৃত পশুর মাংসই শকুনের জন্য যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
শকুনের আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগ
গত কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় শকুনের সংখ্যা যেভাবে কমেছে, তাকে বন্যপ্রাণী ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয় বলে গণ্য করা হয়। নিচে এর পরিসংখ্যান এবং সংরক্ষণের বৈশ্বিক প্রয়াস তুলে ধরা হলো:
- ভয়াবহ পরিসংখ্যান: মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে শকুনের সংখ্যা এক ধাক্কায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকে সার্কভুক্ত (SAARC) দেশগুলোতে শকুনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, বর্তমান সময়ে এই সংখ্যা কমে মাত্র ৪০ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৯৯% শকুনই প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে।
- আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস: বিশ্বজুড়ে শকুনকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার (International Vulture Awareness Day) আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
- মেলোক্সিক্যাম—শকুনের জন্য নিরাপদ বিকল্প: ডাইক্লোফেনাকের মারাত্মক বিষক্রিয়া থেকে শকুনকে বাঁচাতে বিজ্ঞানীরা পশু চিকিৎসায় একটি বড় পরিবর্তন এনেছেন। তারা ডাইক্লোফেনাকের পরিবর্তে সমান কার্যকরী অথচ শকুনের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ‘মেলোক্সিক্যাম’ (Meloxicam) নামের ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
- বর্তমান সংকট: মেলোক্সিক্যামের মতো নিরাপদ বিকল্প থাকা এবং সরকারিভাবে ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও শকুনের সংখ্যা আশানুরূপ বাড়ছে না। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো—কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এখনো গোপনে গবাদি পশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক বা শকুনের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য ব্যথানাশক (যেমন: কিটোপ্রোফেন, অ্যাসেক্লোফেনাক) ব্যবহার করে চলেছেন।
বাংলাদেশে শকুন দর্শনের বাস্তব চিত্র: দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি
বাংলাদেশে শকুনের অস্তিত্ব যে কতটা সংকটাপন্ন এবং মাঠপর্যায়ে এদের সংরক্ষণে কী ধরণের ঘটনা ঘটেছে। এই বিষয়ে গত ২ এপ্রিল ২০১২ তারিখে অনুপ সাদির সংগে টেলিফোনে বিস্তারিত কথা হয় গবেষক সীমান্ত দীপুর সংগে। নিচের দুটি বাস্তব ঘটনা থেকে শকুনের বিলুপ্তি স্পষ্ট বোঝা যায়:
১. সিলেটের কালাছড়া বনাঞ্চলে শকুনের সংখ্যা বিপর্যয়
বাংলাদেশের খ্যাতনামা পাখি গবেষক সীমান্ত দীপু-এর মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শকুনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
- ২০০৯ সালের জানুয়ারি: সিলেট বিভাগের কালাছড়ার গভীর জঙ্গলে একসঙ্গে ৪৭টি বাংলা শকুন দেখা গিয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
- ২০১০ সালের বিপর্যয়: মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ডাইক্লোফেনাকের বিষক্রিয়া ও বাসস্থান সংকটের কারণে সেখানে শকুনের সংখ্যা কমে মাত্র ৭টিতে এসে দাঁড়ায়।
- পরবর্তী পরিস্থিতি: পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর কালাছড়ার ঐ অঞ্চলে শকুনের সংখ্যা কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়ে প্রায় ২০টি বাংলা শকুনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
২. পঞ্চগড়ে গ্রিফন শকুনের আগমন ও উদ্ধার অভিযান
২০১১ সালের মার্চ মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে উত্তরবঙ্গে পরিযায়ী বা যাযাবর শকুনের আগমন এবং তা উদ্ধারের একটি মানবিক চিত্র পাওয়া যায়:
- ডিসেম্বর, ২০১০: বাংলাদেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দণ্ডাপাল ইউনিয়নের রাজারহাট, সুন্দরদীঘি, ফুলবাড়ী ও খকেরহাটে একঝাঁক পরিযায়ী গ্রিফন শকুন বা ইউরেশীয় গৃধিনী আশ্রয় নেয়।
- স্থানীয়দের তৎপরতা ও উদ্ধার: দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়া ৮টি শকুনকে স্থানীয় লোকজন ধরে ফেলে। খবর পেয়ে পঞ্চগড়ের তৎকালীন জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিক শকুনগুলোকে না মেরে সুরক্ষার নির্দেশ দেন। তবে সঠিক চিকিৎসার অভাবে দুটি অসুস্থ শকুন মারা যায়।
- সাফারি পার্কে স্থানান্তর: ২০১১ সালের ১১ মার্চ তৎকালীন বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি অবশিষ্ট বিরল গ্রিফন শকুনগুলোকে উন্নত চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার জন্য কক্সবাজারের চকরিয়ায় অবস্থিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক’-এর শকুন কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে সুস্থ হওয়ার পর পাখিগুলোকে আবার প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
পরিবেশের সুরক্ষায় শকুনের ভূমিকা এবং ক্ষুরা-তড়কা রোগের প্রকোপ
প্রকৃতির পরম বন্ধু শকুন আজ আমাদের নিজেদের ভুলের কারণেই বিলুপ্তির মুখে। আন্তর্জাতিক শকুন শুমারির এক ভয়াবহ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে দশকে পৃথিবীর প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ বাংলা শকুন মারা গেছে। পরিবেশের সুরক্ষায় এবং গবাদি পশুর মারাত্মক মহামারী নিয়ন্ত্রণে শকুনের কোনো বিকল্প নেই।
- প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী: লোকালয়, নদীনালা কিংবা গভীর বনের পচা-গলা মৃত পশুর মাংস খেয়ে পরিবেশকে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত রাখার একক কৃতিত্ব শকুনের। শকুন না থাকলে এই মৃতদেহগুলো পচে চারদিকে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া ও রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে।
- মহামারী প্রতিরোধে শকুনের অলৌকিক ক্ষমতা: গবাদি পশুর অত্যন্ত মারাত্মক দুটি রোগ হলো ‘ক্ষুরা রোগ’ (Foot-and-Mouth Disease) এবং ‘তড়কা রোগ’ (Anthrax)। এই রোগের জীবাণু সাধারণ কোনো উপায়ে ধ্বংস করা কঠিন। কিন্তু শকুনের পাকস্থলীতে এমন শক্তিশালী এসিড ও পাচক রস থাকে, যা এই ক্ষুরা ও তড়কা রোগের জীবাণুকে অনায়াসে হজম করে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে।
- বাংলাদেশে রোগবালাই বাড়ার মূল কারণ: বর্তমানে বাংলাদেশে গবাদি পশুর মধ্যে ক্ষুরা ও তড়কা রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রকৃতিতে শকুনের অনুপস্থিতি।
- ওষুধ নিষেধাজ্ঞা ও বর্তমান বাস্তবতা: শকুনের এই বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১০-২০১১ সালে বাংলাদেশে ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করা হয় এবং ২০২১ সালে আরেকটি ক্ষতিকর ওষুধ কিটোপ্রোফেনও নিষিদ্ধ করা হয়। অনেক দেশে এর বিকল্প হিসেবে নিরাপদ ওষুধ ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি, মাঠপর্যায়ে অসচেতনতার কারণে এখনো কিছু এলাকায় গোপনে নিষিদ্ধ ওষুধের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায়নি।
শকুনের বাসস্থান সংকট, পরিবেশ দূষণ ও বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণ
একসময় সুন্দরবন এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল শকুনের প্রধান বিচরণক্ষেত্র থাকলেও, আধুনিক যুগে এই অঞ্চলগুলো এখন প্রায় শকুনশূন্য হয়ে পড়েছে। এর পেছনে প্রধান প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- আবাসস্থল ও বড় গাছের অভাব: শকুনেরা সাধারণত শিমুল, ছাতিম, বট বা রেইনট্রির মতো পুরনো এবং অনেক উঁচু বড় বড় গাছে বাসা বাঁধে ও ডিম পাড়ে। কিন্তু নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংস এবং গ্রামীণ এলাকার এসব পুরনো বড় গাছ কেটে ফেলায় শকুনের প্রজনন ও নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে।
- পরিবেশ দূষণ ও ডিম নষ্ট হওয়া: আধুনিক যুগে রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব পাখিদের ওপর পড়ছে। পরিবেশ দূষণের কারণে শকুনসহ বিভিন্ন বন্য পাখির ডিমের বাইরের শক্ত খোলসটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক পাতলা হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ডিমে তা দেওয়ার সময় খোলস ভেঙে ডিম নষ্ট হয়ে যায় এবং ছানা উৎপন্ন হতে পারে না।
- খাদ্যের তীব্র সংকট: উন্নত উপায়ে মৃত গবাদি পশু মাটি চাপা দেওয়া এবং চামড়া শিল্পের পরিবর্তনের কারণে খোলা জায়গায় মৃত পশুর অবশিষ্টাংশ এখন আর আগের মতো পাওয়া যায় যায় না। ফলে তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে এই পাখিটি।
- সংরক্ষণ উদ্যোগ ও ‘শকুনের রেস্তোরাঁ’ (Vulture Restaurant): বিষাক্ত ডাইক্লোফেনাক যুক্ত মাংস থেকে শকুনকে দূরে রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও এখন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘শকুন নিরাপদ অঞ্চল’ (Vulture Safe Zone) ঘোষণা এবং ‘শকুনের রেস্তোরাঁ’ বা ফিডিং স্টেশন স্থাপন করা। এই নিরাপদ জোনে শকুনের জন্য ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেনমুক্ত সম্পূর্ণ নিরাপদ গবাদি পশুর মাংস সরবরাহ করা হয়, যা তাদের বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে দারুণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলা সাহিত্যে শকুনের উপস্থিতি
কেবল পরিবেশ বা বিজ্ঞানই নয়, বাংলা সাহিত্যের কবি-সাহিত্যিকদের ভাবনায় ও লেখনীতেও চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে এই অনন্য পাখির রূপ। বিশেষ করে প্রকৃতির রূপমুগ্ধ কবিদের কবিতায় শকুনের অলস ও গম্ভীর ওড়ার দৃশ্য বারবার ফিরে এসেছে।
রূপসী বাংলার কালজয়ী কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর বিখ্যাত ‘শকুন’ কবিতায় এই পাখির এক নিস্তব্ধ রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে:
“মাঠ থেকে মাঠে মাঠে—সমস্ত দুপুর ভরে এশিয়ার আকাশে আকাশে
শকুনেরা চরিতেছে; মানুষ দেখেছে হাট ঘাঁট বস্তি, নিস্তব্ধ প্রান্তর
শকুনের; যেখানে মাঠের দৃঢ় নীরবতা দাঁড়ায়েছে আকাশের পাশে”
জীবনানন্দ দাশ ছাড়াও বাংলা সাহিত্যের আরও অনেক নামী-দামী লেখক ও ঔপন্যাসিক তাঁদের গল্প, উপন্যাস এবং কবিতায় গ্রামীণ ও বন্য প্রকৃতির আবহ তৈরি করতে শকুনকে প্রতীকী বা বাস্তব রূপক হিসেবে স্থান দিয়েছেন। সাহিত্যের এই বর্ণনাগুলোই প্রমাণ করে যে, একসময় এদেশের আকাশে শকুনের অবাধ ও চিরচেনা বিচরণ ছিল।
আরো পড়ুন
- বাংলাদেশে শকুন উদ্ধারের ইতিহাস ও জাতীয় ডেটাবেস (২০১০-২০১৫)
- প্রকৃতির বন্ধু শকুন কেন বিলুপ্তির পথে? কারণ ও প্রতিকার
- বাংলাদেশের একমাত্র মদনটাক পাখির কলোনি: হারিয়ে যাওয়ার পর আবার প্রত্যাবর্তন!
- ছোট মদনটাক পাখি: সুন্দরবনের বিরল বাসিন্দা ও এর জীবনবৃত্তান্ত
- বড় মদনটাক বা হাড়গিলা পাখি: বিলুপ্তির ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
- এশীয় শামখোল বা শামুকখোল পাখি: বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও প্রজনন কলোনি
- বাংলাদেশের তিতির পাখি: তিন প্রজাতির তিতিরের বিস্তারিত পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
- চামচঠুঁটো বাটান বিশ্বে মহাবিপন্ন ও বাংলাদেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি
- মেটে তিতির: এক হারিয়ে যাওয়া পাখির বৈশিষ্ট্য ও জীবনকথা | Grey Francolin
- বাদা তিতির: বাংলাদেশের জলার তিতির ও এর জীবন বৈশিষ্ট্য | Swamp Francolin
- কালা তিতির বা শেখ ফরিদ: বাংলাদেশের এক মহাবিপন্ন পাখি | Black Francolin
- বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ছোট মদনটাক বাঁচানোর চেষ্টার তিন বছরের অভিজ্ঞতা
তথ্যসূত্র / References:
১. আইইউসিএন বাংলাদেশ (IUCN Bangladesh): বাংলাদেশে শকুনের বর্তমান অবস্থা, প্রজাতি এবং ‘শকুন নিরাপদ অঞ্চল’ (Vulture Safe Zone) ও ‘শকুনের রেস্তোরাঁ’ সম্পর্কিত অফিসিয়াল তথ্য ও রেড লিস্ট (Red List) ডাটা।
২. The Peregrine Fund & Oaks et al. (2004): গবাদি পশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাকের (Diclofenac) ব্যবহার এবং শকুনের কিডনি অচল হয়ে বিলুপ্তির পেছনে ড. লিন্ডসে ওক-এর যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রবন্ধ।
৩. বাংলাদেশ বন বিভাগ (Bangladesh Forest Department): বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সিলেট ও চাটমোহর) এবং সুন্দরবন এলাকায় শকুন শুমারি ও সংরক্ষণ কর্মসূচির প্রতিবেদন।
৪. প্রকাশ ও পরিমার্জন সংক্রান্ত নোট: এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ২ এপ্রিল ২০১২ তারিখে জনপ্রিয় ব্লগ প্রাণকাকলিতে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ওয়েব পোর্টাল ‘রোদ্দুরে.কম’-এ ০০ তারিখে প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্টের গুণগত মান, বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং আধুনিকতা বজায় রাখতে আজ ১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ নিবন্ধটি নতুন তথ্যসহ পরিমার্জন, আধুনিকীকরণ এবং আপডেট করা হলো।
৫টি সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
উত্তর: একসময় বাংলাদেশে ৬ প্রজাতির শকুন দেখা গেলেও বর্তমানে ডাইক্লোফেনাকের বিষক্রিয়া ও বাসস্থান সংকটের কারণে মূলত বাংলা শকুন এবং পরিযায়ী গ্রিফন শকুন মাঝে মাঝে দেখা যায়।
উত্তর: গবাদি পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ব্যথানাশক ওষুধ ‘ডাইক্লোফেনাক’ (Diclofenac)-ই শকুন বিলুপ্তির প্রধান কারণ। এই ওষুধ দেওয়া পশুর মাংস খেলে মাত্র ৩ দিনে শকুনের কিডনি অচল হয়ে যায়।
উত্তর: বিশ্বজুড়ে শকুনের গুরুত্ব তুলে ধরতে এবং সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবারে আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালন করা হয়।
উত্তর: শকুনের রেস্তোরাঁ হলো বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষিত এলাকা, যেখানে শকুনের খাদ্যের অভাব দূর করতে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ও নিরাপদ গবাদি পশুর মাংস সরবরাহ করা হয়।
উত্তর: রূপসী বাংলার রূপমুগ্ধ কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর বিখ্যাত ‘শকুন’ কবিতায় এশিয়ার আকাশে শকুনের অবাধ বিচরণ ও প্রকৃতির নিস্তব্ধ রূপকে অমর করে রেখেছেন।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।