চালমুগরা গাছের দশটি ভেষজ গুণাগুণ ও প্রয়োগ

চিরসবুজ মধ্যমাকৃতির এই বৃক্ষটি সমভূমির চাইতে পাহাড়িয়া অঞ্চলে বেশী জন্মে। সাধারণতঃ এটিকে সিকিম, খাসিয়া, চট্টগ্রাম, রেঙ্গুন প্রভৃতি স্থানে পাওয়া যায়। কাঠ খুব শক্ত, কাঠের ভেতরের রং সাদা হলেও বাহিরের রং হলদে, ছাল ধূসর। পাতার সামনের দিকটা ছুচালো লম্বায় ৮। ১০ ইঞ্চি পর্যন্তও হয়ে থাকে, দেখতে আকারে অনেকটা বাসক পাতার মত হলেও তদপেক্ষা পুরু হলদে রঙের ফুলগুলি কখনো এক একটি, কখনো বা থোকা থোকা হয়ে ফোটে, ফলে মনমাতানো গন্ধ। ধূসর রঙের ফল, বেশ শক্ত ও পুরু, দেখতে অনেকটা ছোট আকারের বেদানার মত, তার ভেতরে ২। ৩টি বীজ থাকে, বীজ প্রায় ১ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে দেখা যায়। একে বাংলা ও হিন্দীতে চাউলমুগরা, চালমুগরা এবং সংস্কৃতে তুবরক বলে। এর বোটানিক্যাল নাম Gynocardia odorata R. Br. Fsfact Flacourtiaceae.

ঔষধার্থে ব্যবহার্য অংশ—-বীজ ও তজ্জাত তেল। এছাড়া এই ফ্যামিলির আরও দুটি গাছ আমরা দেখতে পাই।

১. Hydnocarpus kurzii এটি ত্রিপুরা, আসাম, বাংলাদেশের শ্রীহট্ট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে, বর্মা ও আন্দামান দীপপুঞ্জে জন্মে। এটির বীজের তেলও বাজারে চাউলমুগরা তৈল হিসেবে পাওয়া যায়।

২. Hydnocarpus laurifolia (পূর্বে নাম ছিল Hydnocarpus wightia1um)-এটি দক্ষিণ ভারতের সমুদ্রতীরবতী পার্বত্য অঞ্চলে ও সিংহলে জন্মে। বীজ অপেক্ষাকৃত ছোট। এটির তেলও চাউলমুগরার তৈল হিসেবে চলে। এ সবগুলিরই Flacourtiaceae পরিবারের.

চালমুগরা গাছের ভেষজ প্রয়োগ:

মেহ, প্রমেহ, কুষ্ঠ, রক্তবহ স্রোতে বাত (এ বাত কষ্টকর) প্রভৃতি হয়ে থাকে। তাছাড়া মেদবহু স্রোতেও চালমুগরা ভাল কাজ করে। এছাড়া রসবহ স্রোতে যে কাজ করে না তা নয়, আমাশয়জাত-বিষ্ঠাজাত ক্রিমি প্রভৃতিতেও কাজ করে। চালমুগরার বীজচূর্ণ প্রথমে মিষ্টস্বাদের হলেও পরিণামে তিক্ত স্বাদের হয়।

১. মধুমেহ: আয়ুর্বেদের চিন্তাধারায় প্রমেহ রোগটি ২০ প্রকারের এবং এগুলির পরিণাম এতই ভয়ঙ্কর যে, জীবনটাকে মৃতপ্রায় করে রাখে। এরই একটি বলা হয় মধুমেহ, আধুনিক পরিভাষায় যার নাম Diabetes Mellitus. রসবহ স্রোতে যখন ক্ষয় দেখা দেয়, তখনই এর চিকিৎসা প্রয়োজন, তা না হলে এটা যদি রক্তবহ ও মেদোবহ স্রোতে গিয়ে আশ্রয় নেয়, তখন কিন্তু তা বংশগত ব্যাধিতে পরিণত হয়ে যায়, আর অসাধ্যের পর্যায়ে পড়ে। বংশানুক্রমিতা বললে বুঝতে হবে যে, পিতার শক্র ও মাতার আর্তব শোণিত সংযোগে গঠিত দেহে সংক্রমিত রোগাকুরগ্রস্ত হয়ে যে সন্তান জন্মাবে, তাকে অর্শাবে। এইজন্য মধুমেহ রোগ বড়ই কষ্টসাধ্য। এক্ষেত্রে চালমুগরার বীজচূর্ণ ২ বা ১ গ্রাম মাত্রায় সকালে ও বৈকালে গরম জলসহ মধুমেহের প্রথমাবস্থায় খেলে ওটা সামলে যায়। কিন্তু রক্তবহ স্রোতে আশ্রিত হয়ে যে ক্ষয় দেখা দেয়, তাতে এই চালমুগরা ব্যবহার করলে ক্ষয়টা অবরুদ্ধ হয়ে রোগটা যাপ্য হয়ে যায়। আর এর পরিণতিতে বাতরক্ত, কুষ্ঠ প্রভৃতি আসতে পারে না।

আরো পড়ুন:  কাঁঠাল গাছ-এর চাষবাস, পরিচর্যা ও ফল সংরক্ষণের প্রক্রিয়া

২. প্রমেহে: প্রমেহ রোগটি ২০ প্রকারের এবং প্রথম থেকে সুচিকিৎসা না হলে পরিণামও ভাল নয়। চালমুগরার বীজচূর্ণ ২-১ গ্রাম মাত্রায় সকালে ও বৈকালে দু’বার গরম জলসহ খেতে হবে। প্রাচীন বৈদ্যেরা বীজচূর্ণের পরিবর্তে চালমুগরার তৈল ৫ ফোঁটা করে জলের সঙ্গে মিশিয়ে প্রত্যহ ২। ৩ বার ব্যবহার করতেন, সর্বপ্রকার প্রমেহে—এটা তাঁদের ব্যবহত মুষ্টিযোগ থেকে পাওয়া যায়। তবে তাঁরা নিজেদের তত্ত্বাবধানে এই তৈল প্রস্তুত করে নিতেন। বর্তমানে বাজারে যে চালমুগরার তৈল পাওয়া যায়, তা কতটা খাঁটি সে বিষয়ে সন্দেহ আছে, তাই ঘানিতে নিজ-তত্ত্বাবধানে সম্ভব হলে তেল প্রস্তুত করে নেওয়াই ভাল, আর তা না হলে বীজচূর্ণ সেবনই প্রশস্ত।

৩. শ্বিত্ররোগে: দেহ উৎপত্তির ক্ষেত্রে যে ক্রম, তার সংগঠন ক্রিয়া সাধন করে ক্রিমি। বাহ্য ও আভ্যন্তর ভেদে যেমন ক্রিমি দ্বিবিধ, তেমনি জন্মস্থান ভেদেও ৪ প্রকারের-বহির্মলজ, রক্তজ কফজ, ও পক্কাশয়জত। ক্ষেত্রবিশেষে ক্রিমির সংজ্ঞানাম পৃথক, কোন ক্ষেত্রে Fungus, কোন ক্ষেত্রে Virus, আবার দশ্যমান হ’লে তখন সেগলিকে Bacteria বলা হয়। জীবনধারণের জন্য আমরা যেসব আহার্য গ্রহণ করি—তা থেকে সৃষ্ট রসের দ্বারা আমাদের শরীরের পোষণ যেমন হয়, তেমনি সংগঠন ক্রিয়াও সাধিত হয়, এরই নাম উপচয়। আহার্য রসের উপচয়-ক্রিয়ার সাংগঠনিক রূপ যে ক্রিমিতে, তার নাম সৌরস। এই ক্রিমি আহার্য রসকে যেমন দ্রুত রক্তে পরিণত করে, তেমনি অতিরিক্ত রসক্ষয় ঘটিয়ে দেহকে ক্ষীণও করে দেয়। রক্তজ ক্রিমি দেহের উপচয় সৃষ্টিতে মাংস ও মেদ সৃষ্টি করে, আবার অপচয়ের ক্ষেত্রে লোম, কেশ প্রভৃতির ক্ষয়ও করে। এই অপচয় ঘটে থাকে কেশাদ, রোম-বিধ্বংস প্রভৃতি ক্রিমির দ্বারা। এক কথায় বলা যেতে পারে দেহ গঠনে ও রক্ষায় ক্রিমির যেমন কর্তৃত্ব, তেমনি কর্তৃত্ব দেহক্ষয়ের বেলাতেও, এটি তার স্বাভাবিক ধর্ম। রসবহ স্রোতটা সৌরস ক্রিমির দ্বারা অত্যধিক ক্ষয়প্রাপ্ত হলে গায়ে সাদা সাদা দাগ দেখা যায়, একেই আয়ুর্বেদীয় পরিভাষায় বলা হয় শ্বিত্র রোগ। এই রোগের প্রথমাবস্থায় চালমুগরার তৈল ৫ ফোঁটা মাত্রায় দু’বেলা ঠাণ্ডা জলসহ খাওয়ার ও তৈল প্রত্যহ ২। ৩ বার রোগাক্রান্ত স্থানে লাগাবার নির্দেশ দিতেন প্রাচীনেরা, কোন কোন ক্ষেত্রে উপকার যে পাওয়া যেতো না, তা নয়।

আরো পড়ুন:  বন জাম এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ ও শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ

৪. উদরাধ্মানে: যাঁদের প্রায়ই পেটে বায়ু জমে অর্থাৎ রসবহ স্রোতে বায়ুর বিকার হলে সেই বায়ু যদি কোষ্ঠগত হয়, তাহলে তাঁদের মূত্র-স্তব্ধতা (Retention of urine) আসে এবং পাঁজরাতে ব্যথা হতে থাকে। এক্ষেত্রে চালমুগরার তৈল ৫।৭ ফোঁটা ঠাণ্ডা জলে মিশিয়ে খেলে ওটার উপশম হয়, দীর্ঘদিন নিয়মানুসারে খেতে পারলে বায়ুর বিকারটাও কমে যায়।

৫. শিরাগত বাতে: এতে সারা শরীরে শির শির করতে থাকে, মাঝে মাঝে টান টান ভাব, যাকে খিলধরা বলা হয়, কখনো কখনো সাময়িকভাবে সর্বাঙ্গে আড়ষ্টতা আসে, তখন মনে হবে—নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন নিজেরই নয়, এখানে বুঝতে হবে রসবহ স্রোতটা দূষিত, পায়ের পাতার নিচটাও মাঝে মধ্যে অসাড় হতে থাকে; এইসব হওয়া আরম্ভ হ’লে ধরে নিতে হবে—শিরাগত বাতরোগ যে শুরু হয়েছে, তাতে আর কোন সন্দেহ নেই। এই অবস্থায় ১০ ফোঁটা করে দুবেলা চালমুগরার তৈল বাতাসার মধ্যে ফেলে খাওয়ার অভ্যেস করতে হবে। বিশ তৈল পাওয়া সম্ভব না হলে চালমুগরা বীজচূর্ণ ১ গ্রাম মাত্রায় দু’বেলা গরম জলসহ খেলেও চলবে। তবে এটা কিছুদিন খাওয়ার পরেই এর উপকারিতাটা অনুভূত হয়।

৬. বাতরক্তে: এ এক জটিল ব্যাধি। রাক্তাশ্রিত বায়ু, বিকৃতিপ্রাপ্ত হ’লে শরীরের বিভিন্ন স্থানে চামড়াটা লাল হয়ে ওঠে, পরে কিছুদিন বাদে ঐ জায়গাটা আস্তে আস্তে কালো হয়ে যায়; এরপরে আসে শরীরে জড়তা, এর সঙ্গে শরীরে ব্যথাও অনভূত। হয় এবং অরুচিও এসে যায়। বিশেষ লক্ষণ হচ্ছে—সর্বাঙ্গ থেকে খুসকিবৎ মরা চামড়া ঝরে পড়ে, মাথায় চাপড়া ঘা হয়, যেটি অরুংষিকা নামে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পরিচিত। কিছুদিন পরে শরীরের চামড়া ফাটা ফাটা হয়ে যায় ও কর্কশ হয়, এর পরে শেষের দিকে হাঁপও ধরতে থাকে। একে উপেক্ষা করলে পরিণতিতে কুণ্ঠও আসতে পারে। এই রোগের প্রাথমিক কালে যদি চালমুগরার বীজ -১ গ্রাম মাত্রায় সকালে ও বৈকালে ১ কাপ চিনির জলসহ খাওয়া এবং সেইসঙ্গে চালমুগরার তৈল সর্বাঙ্গে মেখে স্নান করা যায়, তাহ’লে বাতরক্তটার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন চিকিৎসিত না হলে সম্পূর্ণ আরোগ্যের আশা করা উচিত হবে না।

আরো পড়ুন:  কুরচি গাছের ছাল, বীজের দশটি ঔষধি গুণাগুণ

৭. অর্শ রোগে: চালমুগরা কোন ধরনের অর্শে কাজ করে। যেসব অর্শে রক্ত পড়ে, কেবলমাত্র সেই অর্শেই চালমুগরা কাজ করে। এক্ষেত্রে চালমুগরার তেল ১০ ফোঁটা মাত্রায় বাতাসায় পরে সকালে ও বৈকালে খেলে রক্তপড়াটা বন্ধ হয়ে যায়।

বাহ্য-প্রয়োগ

৮. খোস-পাঁচড়া: সাধারণ ঘায়ে চালমুগরার তেল গরম করে তাতে সামান্য মোম (তাই বলে প্রচলিত মোমবাতির মোম নয়, যেটা মধুচ্ছিষ্ট সেটাই আসল মোম) মিশিয়ে রেখে দিতে হয়, সেই মলম লাগালে এগুলি সেরে যায়।

৯. কুষ্ঠের প্রথমাবস্থায়: উপরিউক্ত পদ্ধতিতে প্রস্তুত মলম লাগালে ও চালমুগরার তেল ১০ ফোঁটা মাত্রায় দু’বেলা খেলে ওটার যে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা, তা থেকে অব্যহতি পাওয়া যাবে।

১০. অরংষিকা (Eczema of the Scalp): মাথায় চাপড়া খুসকি, মাঝে মাঝে চুলকোয়, চামড়া ওঠে, মামড়ি পড়ে, এ অবস্থায় চালমুগরার তেলের সঙ্গে সমপরিমাণ নারকেল তেল মিশিয়ে প্রতিদিন একবার করে মাথায় লাগাতে হবে। তবে সাবান না মাখাটাই ভাল।

CHEMICAL COMPOSITION

Gynocardia odorata

1. Gynocardia (crystalline glucoside 5.0%). 2. Oil consists of (a) Linolic acid; (b) Plamitic acid; (c) Linolenic acid; (d) Isolinolenic acid; (f) Oleic acid. 3. Hydrolytic enzyme, Gynocardase.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৫, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৩, পৃষ্ঠা, ৫৮-৬২।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি flowersofindia.net থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Tabish

Leave a Comment

error: Content is protected !!