ঘৃতকুমারী লিলিয়াসি পরিবারের অ্যালো গণের একটি বিরুত জাতীয় উদ্ভিদ। এদের বৈজ্ঞানিক নাম Aloe vera. সারা দুনিয়ায় অ্যালো ভেরা নামে পরিচিত এই উদ্ভিদটির বাংলা নাম ঘৃতকুমারী বা ঘৃতকাঞ্চন বা তরুণী।
ঘৃতকুমারীর বোটানিকাল পরিচয়
উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায়, আমরা সাধারণত যে অ্যালোভেরা ব্যবহার করি তার বর্তমান বোটানিকাল নাম হলো Aloe indica Royle। তবে এর একটি পরিচিত পূর্ব নাম রয়েছে, যা হলো Aloe barbadensis Mill। এটি মূলত Liliaceae (লিলিয়েসি) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি উদ্ভিদ। এই পরিবারের গাছগুলো সাধারণত রসালো এবং ঔষধিগুণে ভরপুর হয়ে থাকে।
আঞ্চলিক ভিন্নতা: জাফিরাবাদি ঘৃতকুমারী: আগ্রহের বিষয় হলো, ভৌগোলিক অবস্থানভেদে এই উদ্ভিদের প্রজাতিতে ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন—ভারতের কাঠিয়াবাড় অঞ্চলের জাফিরাবাদে যে বিশেষ ধরনের ঘৃতকুমারী জন্মায়, সেটির বোটানিকাল নাম হলো Aloe abyssinica Lam। এটি সাধারণ প্রজাতির চেয়ে কিছুটা আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে পারে।
ঘৃতকুমারী বনাম ঘৃতকাঞ্চন: পার্থক্য করার উপায়: অনেকেই ঘৃতকুমারী এবং ঘৃতকাঞ্চনের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। এই দুটি উদ্ভিদ একই গোত্রের হলেও এদের গঠনগত কিছু সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে যা দেখে আপনি সহজেই চিনতে পারবেন:
- পাতার গঠন: ঘৃতকুমারীর পাতা দেখতে অনেকটা আনারসের পাতার মতো। এর গোঁড়ার দিকটা বেশ চওড়া থাকে এবং পুরো পাতাটি রসালো ও পুরু হয়। অন্যদিকে, ঘৃতকাঞ্চনের পাতা গোড়া থেকে বিপরীতমুখী হয়ে থাকে এবং এটি তুলনামূলকভাবে হালকা ও সরু হয়।
- রঙ ও কাঁটার প্রকৃতি: ঘৃতকুমারীর পাতার রঙ গাঢ় সবুজ এবং এর কিনারে থাকা কাঁটাগুলো বেশ ঘন হয়। কিন্তু ঘৃতকাঞ্চনের পাতার গোঁড়ার দিকটা কম চওড়া এবং এর গায়ের কাঁটাগুলো ঘৃতকুমারীর তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম থাকে।
বিবরণ
প্রকৃতির এক অনন্য ভেষজ উদ্ভিদ হলো ঘৃতকুমারী, যা উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় একটি বর্ষজীবী বীরুৎ হিসেবে পরিচিত। এই গাছটি সাধারণত আকারে খুব বেশি বড় হয় না, উচ্চতায় এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা একে টব বা ছোট বাগানে চাষের উপযোগী করে তোলে। এর পাতাগুলো অত্যন্ত পুরু এবং রসালো, যার গঠনশৈলী বেশ অদ্ভুত; পাতার নিচের দিকটা কিছুটা বৃত্তাকার বা ঢালু হলেও ওপরের দিকটা একদম সমান্তরাল থাকে। সুরক্ষার খাতিরেই যেন প্রকৃতির নিয়মে এর পাতার দুই প্রান্তে করাতের মতো তীক্ষ্ণ কাঁটা বিদ্যমান। পাতার অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকে স্বচ্ছ, পিচ্ছিল ও জেলির মতো মাংসল শাঁস, যা মূলত এই উদ্ভিদের প্রাণশক্তি। তবে এই শাঁসের একটি তীব্র উৎকট গন্ধ রয়েছে এবং এটি স্বাদে অত্যন্ত তিক্ত। ঘৃতকুমারী পাতা থেকে নিঃসৃত হালকা হলুদ রঙের আঠা বা নির্যাস যখন রৌদ্রে শুকিয়ে শক্ত করা হয়, তখন তা থেকে অমূল্য ঔষধি উপাদান ‘মুসম্বর’ তৈরি হয়, যা বিভিন্ন প্রাচীন চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ঋতুচক্রের আবর্তনে শীতের শেষ ভাগে এই গাছের কেন্দ্র থেকে একটি লম্বা, সরু এবং লাঠির মতো পুষ্পদণ্ড আকাশপানে জেগে ওঠে, যেখানে লেবু রঙের মনোমুগ্ধকর ফুল ও ফলের সমারোহ ঘটে। [১]
চাষ পদ্ধতি:
ঘৃতকুমারীর বংশ বিস্তার ও প্রসারের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ এবং এটি মূলত অঙ্গজ প্রজনন পদ্ধতির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক গাছের গোড়া বা পার্শ্বদেশ থেকে ছোট ছোট চারা বা অঙ্গজ জন্মাতে দেখা যায়, যা বিচ্ছিন্ন করে রোপণ করলেই দ্রুত নতুন গাছের সৃষ্টি হয় এবং এভাবেই এই উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধি ঘটে। বর্তমান সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বাগানে যেমন এর নিয়মিত চাষাবাদ হচ্ছে, তেমনি দক্ষিণ ভারতের বনাঞ্চলেও অযত্নে বেড়ে ওঠা বিচিত্র প্রজাতির ঘৃতকুমারী প্রাকৃতিকভাবেই জন্মাতে দেখা যায়। কেবল ঔষধি গুণের জন্য নয়, সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ তাদের বাগান সাজাতে কিংবা ঘরের বারান্দায় টবের ভেতরেও এই গাছ পরম মমতায় লালন করে থাকেন। যদিও পাশ্চাত্য উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের দাবি অনুযায়ী ঘৃতকুমারীর আদি নিবাস হলো আরব দেশ ও সক্রোটা দ্বীপপুঞ্জ, তবে এই মতামতকে পুরোপুরি মেনে নেওয়া কঠিন। কারণ প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য ঘাঁটলে দেখা যায় যে, অথর্ববেদের সুক্তে এই ভেষজ উদ্ভিদটির বিস্তারিত সমীক্ষা ও বর্ণনা রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে ভারতীয় উপমহাদেশে এর অস্তিত্ব ও ব্যবহার বহু প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান ছিল।
বিস্তৃতি:
ঘৃতকুমারীর ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও উৎপত্তির ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং বৈচিত্র্যময়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা যায় যে, এই ঔষধি উদ্ভিদের আদিম বাসস্থান ছিল সুদূর আফ্রিকার আবিসিনিয়া (বর্তমান ইথিওপিয়া) অঞ্চলে। তবে এর অতুলনীয় ভেষজ গুণাবলি এবং অতি সহজে সব ধরনের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার কারণে এটি সময়ের সাথে সাথে সীমানা ছাড়িয়ে বর্তমানে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। একসময় নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, আজ এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকার প্রায় প্রতিটি দেশেই ঘৃতকুমারীর দেখা মেলে। জলবায়ুর বৈচিত্র্য উপেক্ষা করেই এটি মরুভূমি থেকে শুরু করে আর্দ্র উপকূলীয় এলাকা—সর্বত্রই নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে। এখন উন্নত বিশ্বের আধুনিক প্রসাধন শিল্প থেকে শুরু করে অনুন্নত অঞ্চলের ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতি, সবখানেই এই আবিসিনিয়ান উদ্ভিদটি এক অপরিহার্য উপাদান হিসেবে স্বীকৃত ও সমাদৃত।
ব্যবহৃত অংশ:
ঘৃতকুমারীর বহুমুখী ঔষধি গুণের কারণে এর প্রায় প্রতিটি অংশই বিভিন্ন রোগের প্রতিকারে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তবে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় এর পাতার ভেতরে থাকা স্বচ্ছ, মাংসল ও পিচ্ছিল জেল বা শাঁসটি, যা সরাসরি ত্বকের যত্ন ও হজমের সমস্যায় টনিক হিসেবে কাজ করে। কেবল পাতার শাঁস নয়, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এই গাছের ডাঁটা ও মূলও ভেষজ ওষুধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া, ঘৃতকুমারীর পাতা থেকে নিঃসৃত হওয়া ঘন নির্যাসটি যখন রোদে শুকিয়ে জমাট বাঁধানো হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘মুসব্বর’ বা ‘মুসম্বর’। এই শুষ্ক রসটি আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসায় একটি শক্তিশালী এবং দুর্লভ ঔষধ হিসেবে পরিচিত। মূলত এই প্রতিটি অংশের সঠিক মিশ্রণ ও ব্যবহারই ঘৃতকুমারীকে ভেষজ জগতের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নিম্নে এই উদ্ভিদটির
ভেষজ গুণাগুণ
১. শুক্রমেহে: শুক্রমেহ, যা প্রজননতন্ত্রের একটি সমস্যা, সাধারণত শ্লেষ্মাপ্রধান শারীরিক প্রকৃতির ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মলত্যাগের সময় কোঁত দিলে অথবা প্রস্রাবের সময় অনিচ্ছাকৃত শুক্রস্খলন হতে পারে, যা শরীরকে দুর্বল করে দিতে পারে। এই ধরণের রোগীদের মধ্যে ঠান্ডা খাবার বা পানীয়ের প্রতি আসক্তি দেখা যেতে পারে। প্রতিকার হিসেবে ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরার শাঁস ব্যবহার করা যেতে পারে, যা শ্লেষ্মাজনিত সমস্যায় উপশম আনতে পারে। প্রতিদিন সকালে অথবা বিকেলে সামান্য চিনির সাথে ঘৃতকুমারীর টাটকা মাংসল শাঁস সেবন করা যেতে পারে, যা শরবত আকারে বা সরাসরি খাওয়া যায়। নিয়মিত ব্যবহারে এই ধরণের শুক্রক্ষরণ বন্ধ হয়ে শরীর সতেজ হতে সাহায্য করতে পারে।
২. গুল্ম রোগে: ‘আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের অন্যতম নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’র প্রথম খণ্ডের ৩৩৪ পৃষ্ঠায় গুল্ম রোগের নিরাময়ে ঘৃতকুমারীর কার্যকর ব্যবহারের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। অনেক সময় নারীদের গর্ভকালীন পেটে ব্যথার সাথে গুল্ম রোগের ব্যথার বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে; তবে মনে রাখতে হবে যে, গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সাধারণত পেটে সার্বক্ষণিক ব্যথা থাকে না, যেখানে গুল্ম রোগে আক্রান্ত হলে পেটে প্রায়ই এক ধরনের মৃদু বা ‘কুনকুনে’ ব্যথা অনুভূত হতে পারে। এই অবস্থায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে সমস্যাটি গুল্ম রোগের, তবে ঘরোয়া প্রতিকার হিসেবে ঘৃতকুমারীর শাঁস অত্যন্ত ফলদায়ক। আনুমানিক ৫ থেকে ৬ গ্রাম পরিমাণ টাটকা ঘৃতকুমারীর মাংসল শাঁস সামান্য চিনি মিশিয়ে দিনে দুইবার শরবত করে খেলে মাত্র ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যেই পেটের সেই অস্বস্তিকর ব্যথা ও সমস্যা অনেকাংশে প্রশমিত হয়। তবে একটি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি—এই পদ্ধতিটি সাধারণ গুল্ম রোগের ক্ষেত্রে কাজ করলেও ‘রক্তগুল্ম’ বা টিউমার জাতীয় জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে কার্যকর নয়, তাই সঠিক রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত আবশ্যক।
৩. ঋতুবন্ধে: নারীদের পিরিয়ড বা মাসিক জনিত জটিলতা, যা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ‘ঋতুবন্ধ’ নামে পরিচিত, তার চিকিৎসায় ঘৃতকুমারী এক অনন্য মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় দেখা যায় কোনো নারী অন্তঃসত্ত্বা নন কিংবা তার পেটে গুল্ম জাতীয় কোনো সমস্যাও নেই, তবুও নিয়মিত মাসিক হচ্ছে না। এই ঋতুবন্ধের প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে দুই-তিন দিন স্তনে অস্বস্তিকর ব্যথা অনুভূত হতে পারে এবং সেই সাথে কোমরেও তীব্র ব্যথা হতে পারে। এমন শারীরিক সমস্যার সমাধানে ঘৃতকুমারীর একটি বিশেষ প্রয়োগ পদ্ধতি রয়েছে। এক্ষেত্রে ঘৃতকুমারীর টাটকা মাংসল শাঁস ভালো করে চটকে তরল করে নিতে হয়। এরপর আমসত্ত্ব যেভাবে ধাপে ধাপে রোদে শুকিয়ে প্রস্তুত করা হয়, ঠিক সেভাবেই এই তরল শাঁসটি ৫ থেকে ৬টি স্তরে একের পর এক রোদে শুকিয়ে ঘন ও শক্ত করে নিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় তৈরি ঘৃতকুমারীর নির্যাস থেকে আন্দাজ ২ থেকে ৩ গ্রাম পরিমাণ নিয়ে সামান্য গরম পানিতে ভিজিয়ে দিনে দুই বার সেবন করলে মাসিকের অনিয়মিত হওয়া বা বন্ধ থাকার সমস্যাটি দূর হয় এবং ঋতুচক্র স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
৪. অগ্নিমান্দ্যে: শরীরের হজম শক্তি কমে যাওয়া বা অগ্নিমান্দ্য, যা মূলত পিত্তবিকৃতির কারণে হয়ে থাকে, তার নিরাময়ে ঘৃতকুমারী এক অসামান্য ভেষজ হিসেবে কাজ করে। পিত্তের ভারসাম্যহীনতার ফলে যখন ক্ষুধা মন্দা বা হজমের গোলযোগ দেখা দেয়, তখন এই প্রাকৃতিক উপাদানটি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’র ৩৪৮ পৃষ্ঠায় এই অগ্নিমান্দ্য রোগে ঘৃতকুমারীর ব্যবহারের বিস্তৃত ও চমৎকার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে নিয়ম করে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘৃতকুমারীর শাঁস সেবন করা প্রয়োজন। সাধারণত ৩ গ্রাম বা প্রায় সিকি তোলা পরিমাণ ঘৃতকুমারীর টাটকা মাংসল শাঁস নিয়ে তাতে সামান্য চিনি মিশিয়ে খেলে পাকস্থলীর পিত্তের দোষ দূর হয়। নিয়মিত কয়েকদিন এই ঘরোয়া টোটকাটি অনুসরণ করলে পেটের হজম ক্ষমতা ফিরে আসে এবং অগ্নিমান্দ্যের অস্বস্তি দূর হয়ে শরীরের স্বাভাবিক ক্ষুধা ও সজীবতা পুনরায় ফিরে পাওয়া যায়।
৫. ক্রিমি: শরীরের অভ্যন্তরীণ পরজীবী বা কৃমির সমস্যায় ঘৃতকুমারী একটি চমৎকার প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। কৃমি কেবল পেটের অস্বস্তিই সৃষ্টি করে না, বরং এটি শরীরের পুষ্টি শোষণ ব্যাহত করে শারীরিক দুর্বলতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিখ্যাত আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’র প্রথম খণ্ডের ৩১৯ পৃষ্ঠায় কৃমি বিনাশে ঘৃতকুমারীর কার্যকর ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও মহিমা বর্ণিত হয়েছে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রতিদিন নিয়ম করে দুই বেলা ঘৃতকুমারীর টাটকা মাংসল শাঁস সেবন করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিবার আনুমানিক ৫ গ্রাম পরিমাণ পরিষ্কার ঘৃতকুমারীর জেল বা শাঁস নিয়ে সাধারণ পানির সাথে মিশিয়ে খেলে অন্ত্রের ক্ষতিকর পরজীবীগুলো দূর হতে শুরু করে। নিয়মিত কয়েকদিন এই ঘরোয়া ও ভেষজ পদ্ধতিটি অনুসরণ করলে পেটের কৃমি জনিত উপসর্গগুলো কমে যায় এবং পরিপাকতন্ত্র পুনরায় সুস্থ ও সবল হয়ে ওঠে।
৬. শিশুর মলরোধে: সদ্যোজাত শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, বিশেষ করে শিশুর মলরোধ বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা। সদ্য প্রসূত শিশুর বয়স যখন এক মাসের কম, তখন অনেক সময় দেখা যায় তার পেট ফেঁপে আছে, শিশু স্তন্যপানে অনীহা প্রকাশ করছে এবং অস্বস্তির কারণে অনবরত কান্না করছে। যেহেতু এতটুকু শিশুকে কোনো প্রকার রাসায়নিক জোলাপ বা কড়া ঔষধ দেওয়া মোটেও সম্ভব নয় এবং তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তাই এই ক্ষেত্রে ঘৃতকুমারীর (Aloe Vera) মত প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পেটের সমস্যা সমাধানে ঘৃতকুমারীর শাঁসের উল্লেখ থাকলেও, শিশুদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহারের পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
৭.অর্শরোগ: অর্শ বা পাইলস জনিত সমস্যায় কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া একটি সাধারণ বিষয়, তবে এই সমস্যা থাকুক বা না থাকুক—অর্শের যন্ত্রণা লাঘবে ঘৃতকুমারী অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। অর্শ রোগের প্রধান উপদ্রব হলো মলত্যাগের সময় অস্বস্তি এবং মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত বা জ্বালাপোড়া হওয়া। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে ঘৃতকুমারীর ব্যবহারের একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে নিয়ম করে ৫ থেকে ৭ গ্রাম পরিমাণ টাটকা ঘৃতকুমারীর মাংসল শাঁস নিতে হবে এবং তার সাথে সামান্য খাঁটি ঘি মিশিয়ে সেবন করতে হবে। নিয়মিত দিনে দুইবার এই মিশ্রণটি খেলে পেটের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে দাস্ত বা মলত্যাগ অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্বাভাবিক হয়। এর ফলে মলদ্বারের ওপর চাপ কমে আসে এবং অর্শজনিত ফোলা ও যন্ত্রণার দ্রুত উপশম ঘটে। নিয়মিত কয়েকদিন এই ভেষজ টোটকাটি অনুসরণ করলে অর্শ রোগের শারীরিক জটিলতাগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে।
৮. একজিমায় বা চর্ম রোগ: চর্মরোগ বা একজিমা একটি যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা, যা গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় ‘আঁধারযোনি’ রোগ হিসেবেও পরিচিত। এই রোগের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো ঋতু এবং চন্দ্রের গতির সাথে এর হ্রাস-বৃদ্ধি। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কৃষ্ণপক্ষের সময় এই চর্মরোগের প্রকোপ বেড়ে যায় এবং শুক্লপক্ষ এলে তা কিছুটা কমে আসে। আবার ঋতুভেদে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে অথবা বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় এই চুলকানি বা একজিমার সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এই ধরণের চর্মরোগের অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক প্রতিষেধক।
রোগাক্রান্ত স্থানে ঘৃতকুমারীর টাটকা মাংসল শাঁস সরাসরি নিয়ে আলতোভাবে কিছুক্ষণ রগড়ে দিতে হবে। ঘৃতকুমারীর শীতল ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান চামড়ার জ্বালাপোড়া ও চুলকানি কমাতে সাহায্য করে। কিছুক্ষণ রাখার পর জায়গাটি পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। ত্বক শুকিয়ে যাওয়ার পর সেখানে সামান্য খাঁটি তিলের তেল মালিশ করলে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং রুক্ষতা দূর হয়। তবে সবচেয়ে ভালো ফল পেতে তিলের তেলের পরিবর্তে আয়ুর্বেদিক ‘মরিচাদ্য তেল’ ব্যবহার করা যেতে পারে, যা চর্মরোগের গভীর থেকে সংক্রমণ দূর করতে বিশেষভাবে কার্যকর। নিয়মিত এই প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করলে একজিমার দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা থেকে দ্রুত পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
৯. ফিক ব্যথায়: শরীরের হঠাত কোনো পেশির টান বা মাংসপেশিতে তীব্র টান লাগা, যাকে গ্রাম-বাংলার ভাষায় অনেকেই ‘ফিক ব্যথা’ বলে থাকেন, তার নিরাময়ে ঘৃতকুমারী বা ঘৃতকাঞ্চন এক জাদুকরী ভেষজ হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় হঠাত ভারী কিছু তুলতে গেলে বা ভুলভাবে শোয়ার কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে পিঠে বা কোমরে এই তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয় যা নড়াচড়াকে কঠিন করে তোলে। এই ধরণের যন্ত্রণাদায়ক ব্যথায় ঘৃতকুমারী বা ঘৃতকাঞ্চনের টাটকা মাংসল শাঁস একটি প্রাকৃতিক ব্যথানাশক মলম হিসেবে কাজ করে। ব্যথার জায়গায় ঘৃতকুমারীর শীতল ও পিচ্ছিল জেলটি লাগিয়ে কিছুক্ষণ আলতোভাবে মালিশ করলে আক্রান্ত স্থানের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং পেশির আড়ষ্টতা দ্রুত শিথিল হয়ে আসে। নিয়মিত অল্প সময় ধরে এই ভেষজ শাঁসটি মর্দন করলে ফিক ব্যথার তীব্রতা ধীরে ধীরে কমে যায় এবং শরীরের পেশিগুলো পুনরায় স্বাভাবিক ও নমনীয় হয়ে ওঠে।
১০. গ্রহণী রোগ: গ্রহণী রোগের একটি প্রধান লক্ষণ হলো রোগীর দিনের বেলায় বারবার (প্রায় ৩ থেকে ৪ বার) পাতলা দাস্ত বা মলত্যাগ হয়, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো রাতে এই সমস্যাটি থাকে না। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায়ই মানসিক অস্থিরতা বা সিদ্ধান্তহীনতা লক্ষ্য করা যায়; তারা দ্রুত মত পরিবর্তন করেন এবং কোন চিকিৎসায় সুস্থ হবেন তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। এই রোগটি অবহেলা করলে পরবর্তীতে তা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে, যা থেকে ‘সংগ্রহগ্রহণী’ এবং এর চূড়ান্ত পরিণতিতে ‘উদরী’ বা পেটে পানি জমার মতো মারাত্মক ব্যাধি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই ধরণের শারীরিক ও মানসিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে ঘৃতকুমারীর প্রাকৃতিক ক্ষমতা অত্যন্ত কার্যকর। প্রতিদিন নিয়ম করে ৪ থেকে ৫ গ্রাম পরিমাণ টাটকা ঘৃতকুমারীর মাংসল শাঁস খাওয়ার অভ্যাস করলে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফিরে আসে এবং ধীরে ধীরে গ্রহণী রোগের এই অস্বস্তিকর উপসর্গগুলো স্থায়ীভাবে দূর হয়।
সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।
তথ্যসূত্রঃ
১. আয়ূর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৪, পৃষ্ঠা,৩২-৩৩।
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।