প্রত্যাহারপন্থার অনুগামী আর রক্ষকদের ‘কর্মপন্থা’

একজন প্রাবন্ধিকের মন্তব্যলিপি [থেকে]
প্রত্যাহারপন্থার অনুগামী আর রক্ষকদের ‘কর্মপন্থা’

বর্তমান আন্তঃবিপ্লব কালপর্যায়টাকে নিছক আপতিক বলে ব্যাখ্যা দেওয়া চলে না। স্বৈরতন্ত্রের বিকাশের ক্ষেত্রে, বুর্জোয়া রাজতন্ত্র, বুর্জোয়া কৃষ্ণ-শতক [১] পার্লামেন্ট প্রথা আর গ্রামাঞ্চলে জারতন্ত্রের বুর্জোয়া কর্মনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে আমরা একটা বিশেষ পর্বের মুখোমুখি এসে পড়েছি, আর এই সবকিছুকে সমর্থন করছে প্রতিবিপ্লবী বুর্জোয়ারা, তাতে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমান কালপর্যায়টা নিঃসন্দেহেই ‘বিপ্লবের দুটো ঢেউয়ের মধ্যেকার’ উত্তরণ-কালপর্যায়, কিন্তু ঐ দ্বিতীয় বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুত হতে হলে এই উত্তরণের বিশেষত্বগুলোকে আমাদের আয়ত্ত করা চাই, ‘অভিযানের’ সমগ্র ধারাটা আমাদের উপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে যে-কষ্টকর, কঠিন, অশুভ উত্তরণটাকে তার সঙ্গে আমাদের কর্মকৌশল আর সংগঠনকে মানিয়ে নিতে পারা চাই। দুমার মঞ্চ এবং অন্যান্য বৈধ সুযোগসুবিধাও ব্যবহার করা হলো সংগ্রামের এমন একটা অনাড়ম্বর প্রণালী, যার ফলে ‘জমকাল’ কিছু ঘটে না। তবে, উত্তরণকালপর্যায়টা যে উত্তরণেরই ব্যাপার বটে, তার কারণ এই যে, বলগুলোকে অবিলম্ব আর নিষ্পত্তিকর ক্রিয়াকলাপে লাগান নয়, সেগুলিকে প্রস্তুত আর জড়ো করাই এই সময়কার বিশেষ-নির্দিষ্ট কাজ। বাহ্যিক জমকবর্জিত এই কাজ কীভাবে সংগঠিত করতে হয় সেটা জানা, কৃষ্ণ-শতক-অক্টোবরী দুমার [২] কালপর্যায়ের পক্ষে নিজস্ব যাবতীয় আধা-বৈধ প্রতিষ্ঠানকে কী করে ঐ উদ্দেশে সদ্ব্যবহার করা যায় সেটা জানা, এমনকি এই ভিত্তিতেই কী করে তুলে ধরতে হয় বৈপ্লবিক সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাসির সমস্ত ঐতিহ্য, তার সাম্প্রতিক বীরত্বপূর্ণ অতীতের যাবতীয় স্লোগান, তার কাজের সমগ্র মেজাজ, সুবিধাবাদ আর সংস্কারবাদের সঙ্গে তার আপোসহীনতা সেটা জানা – এমনই পার্টির করণীয় কাজ, এমনই এই মুহূর্তের করণীয় কাজ।

১৯০৮ সালের ডিসেম্বর সম্মেলনের [৩] প্রস্তাবে বিবৃত কর্মকৌশল থেকে নতুন কর্মপন্থার প্রথম বিচ্যুতিটাকে আমরা বিচার-বিশ্লেষণ করেছি। আমরা দেখেছি, সেটা প্রত্যাহারপন্থী ভাব-ধারণার অভিমুখী বিচ্যুতি, – বর্তমান পরিস্থিতির মার্কসীয় বিশ্লেষণের সঙ্গে কিংবা সাধারণভাবে বৈপ্লবিক সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক কর্মকৌশলের বুনিয়াদী উপস্থাপনাগুলির সঙ্গে ঐসব ভাব-ধারণার কোনো মিল নেই। নতুন কর্মপন্থার দ্বিতীয় মৌলিক উপাদানটাকে এখন আমাদের বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে।

নতুন গ্রুপটির ঘোষণা অনুসারে এই উপাদানটা হলো ‘সৃষ্টি করা’ এবং ‘জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া নতুন, প্রলেতারীয়’ সংস্কৃতি : ‘প্রলেতারীয় বিজ্ঞান গড়ে তোলা, প্রলেতারিয়ানদের মধ্যে সাচ্চা কমরেডীয় সম্পর্ক মজবুত করা, প্রলেতারীয় দর্শন গড়ে তোলা, প্রলেতারীয় আশাআকাঙক্ষা আর অভিজ্ঞতার দিকে শিল্পকলাকে পরিচালিত করা’।

নতুন কর্মপন্থায় যে-অতি-সরল কূটনীতি বিষয়টার সারমর্মটাকে ঢাকা দেবার কাজ করছে, এই হলো তার একটা নমুনা! ‘বিজ্ঞান’ আর ‘দর্শনের মধ্যে সাচ্চা কমরেডীয় সম্পর্ক মজবুত করা’ ঢোকানটা সত্যিই অতি-সরলতা নয় কি? নতুন গ্রুপটি কর্মপন্থার ভিতরে হাজির করেছে তথাকথিত নালিশগুলো, অন্যান্য গ্রুপের (যেমন, প্রথমত, নিষ্ঠাবান বলশেভিকদের) বিরুদ্ধে এই অভিযোগ যে, তারা ভেঙেছে ‘সাচ্চা কমরেডীয় সম্পর্ক’। এই মজার উপবাক্যটার আসল মর্মবস্তু ঠিক এমনই।

এখানে ‘প্রলেতারীয় বিজ্ঞানকে’ও দেখায় ‘বিষণ্ণ এবং অবান্তর’। সর্বপ্রথমত, এখন আমরা জানি কেবল একটি প্রলেতারীয় বিজ্ঞানের কথা – মার্কসবাদ। কর্মপন্থার রচয়িতারা কোন কারণে এটাকে, এই একমাত্র যথাযথ পরিভাষাটাকে প্রণালীবদ্ধভাবে এড়িয়ে সর্বত্র ব্যবহার করেছেন ‘বিজ্ঞানসম্মত সমাজতন্ত্র’ এই শব্দ-দুটো। এটা তো সবার জানা কথা যে, মার্কসবাদের ডাহা বিরোধীরাও রাশিয়ায় ঐ পরবর্তী কথাটার দাবিদার। দ্বিতীয়ত, ‘প্রলেতারীয় বিজ্ঞান’ গড়ে তোলার কাজটাকে যদি কর্মপন্থায় হাজির করা হয়, তাহলে স্পষ্টাস্পষ্টি বলা আবশ্যক আমাদের কালের ঠিক কোন মতাদর্শগত আর তত্ত্বগত সংগ্রাম এখানে বোঝানো হচ্ছে, আর এই কর্মপন্থার রচয়িতারা ধরছেন কাদের পক্ষ। এ বিষয়ে নিরবতা একটা অতি-সরল এড়ানোর কৌশল, কেননা ১৯০৮–১৯০৯ সালের সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক সাহিত্যের সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে তাদের প্রত্যেকেরই কাছে বিষয়টার সারমর্মটা সুস্পষ্ট। আমাদের কালে সামনে এসে গেছে মার্কসবাদী আর মাকপন্থীদের[৪] মধ্যে একটা সংগ্রাম, সে-সংগ্রাম চালানো হচ্ছে বিজ্ঞান, দর্শন আর শিল্পকলার ক্ষেত্রে। সাধারণ্যে জ্ঞাত এই তথ্যটা না-দেখে চোখ বুজে থাকাটা হাস্যকর তো বটেই। মতপার্থক্য ঢাকবার জন্যে নয়, সেটার ব্যাখ্যা দেবার জন্যেই লেখা উচিত ‘কর্মপন্থা’।

আরো পড়ুন:  পাটি সংগঠন ও পার্টি সাহিত্য

আমাদের ঐ লেখকেরা কর্মপন্থার উপরে-উদ্ধৃত অংশটা দিয়ে অজান্তে নিজেদের ধরিয়ে দিয়েছেন আনাড়ীর মতো। সবাই জানে, ‘প্রলেতারীয় দর্শন’ কথাটা দিয়ে বাস্তবিক বোঝানো হয়ে থাকে মাকপন্থা — যে কোনো বুদ্ধিমান সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাট সঙ্গে সঙ্গেই ‘নতুন’ ছদ্মনামটার অর্থোদ্ধার করে ফেলবেন। এই ছদ্মনাম উদ্ভাবন করাটা নিরর্থক, এর পেছনে লুকবার চেষ্টা অর্থহীন। আসলে, নতুন গ্রুপটার সবচেয়ে প্রতিপত্তিশালী সাহিত্যিক কেন্দ্রটা মাকপন্থী; অ-মাকীয় দর্শনকে তারা অ-‘প্রলেতারীয়’ গণ্য করে।

কর্মপন্থায় এ বিষয়ে তারা যদি বলতে চাইত, তাহলে তাদের বলা উচিত ছিলো: দর্শন আর শিল্পকলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অ-‘প্রলেতারীয়’ অর্থাৎ অ-মাকীয় তত্ত্বের বিরুদ্ধে যারা লড়বে তাদের এক করছে এই নতুন গ্রুপ। সেটা হতো একটা সুবিদিত মতাদর্শগত ধারার অকপট, সত্য এবং প্রকাশ্য ঘোষণা – অন্যান্য মতধারার উদ্দেশে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। কোনো মতাদর্শগত সংগ্রাম যখন পার্টির পক্ষে বিরাট গুরত্বসম্পন্ন বিবেচিত হয় তখন লোকে কয় না – প্রকাশ্য যুদ্ধঘোষণা করে দেয়।

মার্কসবাদের বিরুদ্ধে এই কর্মপন্থার প্রচ্ছন্ন দার্শনিক সংগ্রাম ঘোষণার নির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট জবাব দিতে আমরা প্রত্যেকের উদ্দেশে আহবান জানাব। বাস্তবে, ‘প্রলেতারীয় সংস্কৃতি’-সংক্রান্ত যাবতীয় বাছা-বাছা বুলি মার্কসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটা আবরণমাত্র। নতুন গ্রুপটির ‘মৌলিক’ উপাদান হলো এই যে, দর্শনে এরা ঠিক কোন ধারার সমর্থক সেটা খোলাখুলি বিবৃত না-করেই এরা পার্টি কর্মপন্থায় দর্শন ঢুকিয়েছে।

প্রসঙ্গত বলি, ঐ কর্মপন্থার উপরে-উদ্ধৃত কথাগুলির আসল মর্মবস্তুকে পুরোপুরিই নেতিবাচক বলা ঠিক হবে না। সেগুলির একটা ইতিবাচক মর্ম বস্তু আছে। এই ইতিবাচক  মর্মবস্তুটাকে প্রকাশ করা যায় একটা নামে: মাক্সিম গোর্কি।[৫]

যথার্থই, বুর্জোয়া পত্র-পত্রিকায় ইতিমধ্যে ঘোষিত (তারা এটাকে বিকৃত করেছে, বেঁকিয়ে-পেঁচিয়ে ধরেছে) একটা কথা ঢাকা দেবার কোনো দরকার নেই – কথাটা হলো এই যে, গোর্কি এই নতুন গ্রুপটির একজন অনুগামী। গোর্কি তো নিঃসন্দেহে প্রলেতারীয় শিল্পকলার সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি, যিনি এই শিল্পকলার জন্যে করেছেন বিস্তর এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি করতে পারঙ্গম। সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টির যে কোনো উপদল গোর্কিকে সদস্য হিসেবে পেলে সঙ্গত কারণেই গর্ববোধ করতে পারে, কিন্তু এই যুক্তিতে কর্মপন্থার ভিতরে ‘প্রলেতারীয় শিল্পকলা’ ঢুকাবার অর্থ হলো এই কর্মপন্থাকে দৈন্যের সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া, অর্থ হলো গ্রুপটিকে সাহিত্যচক্রে পরিণত করা, যার ফলে এটা নিজেকে ঠিক ‘প্রাধিকারী’ হিসেবেই খুলে ধরেছে… কোনো প্রাধিকার মানার বিরুদ্ধে কর্মপন্থর রচয়িতারা বিস্তর বলেছেন, কিন্তু সেটা যে কী নিয়ে, তার সরাসরি ব্যাখ্যা দেন নি। ব্যাপারটা হলো এই যে, দর্শনে বলশেভিকদের বস্তুবাদের সপক্ষে অবস্থান এবং প্রত্যাহারপন্থার বিরুদ্ধে বলশেভিকদের সংগ্রামকে তাঁরা মনে করেন পথক-পৃথক ‘প্রাধিকারীর’ কর্মপ্রচেষ্টা (একটা গুরতর বিষয়ের দিকে একটা মদ, আভাস!), যাদের প্রতি — তাঁরা বলেন — মাকপন্থার শত্রুদের রয়েছে ‘অন্ধবিশ্বাস’। এমনসব বাকহামলা অবশ্য নিতান্তই ছেবলামি। কিন্তু, প্রাধিকারীদের সঙ্গে কুব্যবহার করে তো ‘ভপেরিয়দপন্থীরা’ই [৬]। প্রলেতারীয় শিল্পকলার ক্ষেত্রে গোর্কি একজন প্রাধিকারশালী ব্যক্তি — সেটা তো তর্কাতীত। মাকপন্থা আর প্রত্যাহারপন্থাকে পেলা দিয়ে দাঁড় করাবার জন্যে এই প্রাধিকার ‘কাজে লাগানটা’ (অবশ্য মতাদর্শগত অর্থে) হলো প্রাধিকারীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে নেই তারই একটা দৃষ্টান্ত।

আরো পড়ুন:  লেভ তলস্তয় এবং তাঁর যুগ

মাকপন্থা আর প্রত্যাহারপন্থার প্রতি গোর্কির সহানুভূতি সত্ত্বেও, প্রলেতারীয় শিল্পকলার ক্ষেত্রে তিনি একটি মস্ত সংযোজন। কিন্তু, পার্টির ভিতরে প্রত্যাহারপন্থী আর মাকপন্থীদের পৃথক গ্রুপ স্থাপন করে এবং সেই গ্রুপের একটা বিশেষ কাজ হিসেবে তথাকথিত ‘প্রলেতারীয়’ শিল্পকলার বিকাশকে তুলে ধরে যে-কর্মপন্থা সেটা সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক প্রলেতারিয়ান আন্দোলনের বিকাশের ক্ষেত্রে একটা বিয়োজন, কেননা একজন বিশিষ্ট প্রাধিকারীর ক্রিয়াকলাপে যেগুলো তাঁর দুর্বলতার দিক এবং প্রলেতারিয়েতকে তিনি যে-বিপুল আনুকূল্য করছেন তাতে একটা নেতিবাচক উপাদান, ঠিক সেটাকেই সংহত করতে এবং কাজে লাগাতে চায় এই কর্মপন্থা।

১৯১০ সালে ৬ (১৯) মার্চ এবং ২৫ মে (৭ জুন) ‘দিসকুসিয়ন্নি লিস্তোক’ পত্রিকার ১ আর ২ নং সংখ্যায় প্রকাশিত

স্বাক্ষর: ন. লেনিন[৭]

টিকা:

১. কৃষ্ণ-শতক – বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্যে জার পুলিস কর্তৃক সংগঠিত গুণ্ডাদল। কৃষ্ণ-শতকীরা বিপ্লবীদের খুন করত, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ওপর হামলা করত, ইহুদি-নিধন দাঙ্গা বাধাত।

২. অক্টোবরী’রা ছিলো ‘১৭ অক্টোবরের সঙ্ঘ’ পার্টির সদস্যরা, ১৯০৫ সালের ১৭ অক্টোবরের জার ঘোষণাপত্র প্রকাশের পর রাশিয়ায় এ পার্টির আবির্ভাব হয়। এটা ছিল প্রতিবিপ্লবী পার্টি, বৃহৎ বুর্জোয়া ও পুঁজিবাদী ধরনে কাজ চালানো জমিদারদের স্বার্থের প্রবক্তা।

এখানে তৃতীয় রাষ্ট্রীয় দুমার কথা বলা হচ্ছে (১৯০৭-১৯১২)।

৩. রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিক পার্টির সারা-রাশিয়া (ডিসেম্বর), (পঞ্চম সারা-রাশিয়া) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় প্যারিসে ১৯০৮ সালে ২১-২৭ ডিসেম্বরে (১৯০৯ সালের ৩–৯ জানুয়ারিতে)। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিনিধি ছিলেন লেনিন। সম্মেলনে লেনিন ‘বর্তমান মুহূর্ত ও পার্টির কর্তব্য সম্বন্ধ’ এক রিপোর্ট পেশ করেন। দুমার সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক গ্রুপ সম্বন্ধে, সাংগঠনিক এবং অন্যান্য প্রশ্নেও তিনি ভাষণ দেন। সম্মেলনে বলশেভিকরা সংগ্রাম চালায় দুটি সুবিধাবাদী ধারার সঙ্গে: লুপ্তিপন্থা ও প্রত্যাহারপন্থার সঙ্গে। লেনিনের প্রস্তাব অনুসারে সম্মেলনে লুপ্তিপন্থার নিন্দা করা হয় এবং সমস্ত পার্টি সংগঠনকে এর বিরুদ্ধে সংগ্রামে আহবান জানানো হয়।

আরো পড়ুন:  আমলাতন্ত্র-এর ঐতিহাসিক গণতন্ত্রবিরোধিতা ও তার প্রকৃতি

৪. মাকপন্থী হচ্ছে মাকপন্থা অথবা প্রায়োগিক সমালোচনার সমর্থক। এই প্রতিক্রিয়াশীল আত্মমুখী-ভাববাদী দার্শনিক ধারা ১৯শ শতকের শেষে ও ২০শ শতকের শুরুতে বহুল প্রসার লাভ করে পশ্চিম ইউরোপে। এর স্রষ্টা হলেন অস্ট্রিয়ার পদার্থবিদ ও দার্শনিক এ. মাক (১৮৩৮–১৯১৬) এবং জার্মান দার্শনিক র. আভেনারিউস (১৮৪৩-১৮৯৬)। মাকপন্থা ছিলো শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে বিশেষ বিপজ্জনক বুর্জোয়া ভাববাদী দর্শনের ধারা, কেননা এটা একমাত্র বাইরে-বাইরেই ভাববাদের বিরুদ্ধাচরণ করত, আধুনিক প্রকৃতিবিজ্ঞানের প্রতি সমর্থন জানাত, ফলে মনে হতো তা একটি ‘বৈজ্ঞানিক’ মতবাদ। প্রতিক্রিয়াশীলতার বছরগুলিতে রাশিয়ায় কিছুসংখ্যক সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক বুদ্ধিজীবী মাক পন্থার প্রভাবে পড়ে। মাকপন্থার খুব প্রসার ঘটে মেনশেভিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। বলশেভিকদের ভেতর থেকেও কয়েকজন সাহিত্যিক মাকপন্থার আশ্রয় নেন (ভ. বাজারভ, আ. বগদানভ, আ. লুনাচারস্কি এবং অন্যান্যরা)। মার্কসবাদের বিকাশ সম্বন্ধে ভণ্ড বুলির আড়ালে রুশ মাকপন্থীরা আসলে মার্কসীয় দর্শনের মূল তত্ত্ব সংশোধন করতে শুরু করে। ভ. ই. লেনিন তাঁর বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ বইয়ে মাকপন্থার প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারার মুখোশ খুলে ধরেন, সংশোধনবাদীদের হাত থেকে রক্ষা করেন মার্কসীয় দর্শনকে, নতুন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে সর্বতোভাবে বিকশিত করে তোলেন দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে। মাক পন্থার ধ্বংসে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেনশেভিকবাদ, প্রত্যাহারপন্থা আর ঈশ্বর-গড়ার দার্শনিক ভাবধারা।

৫. গোর্কি, ম্যাক্সিম (আলেক্সেই মাক্সিমোভিচ পেশকভ) (১৮৬৮-১৯৩৬) রুশ লেখক, সোভিয়েত সাহিত্যের জনক। — সম্পাদকের টিকা

৬. ভপেরিয়দপন্থী, ‘ভপেরিয়দ’ গ্রুপ হচ্ছে প্রত্যাহারপন্থী, চরমপত্রবাদী এবং ঈশ্বর-গড়িয়েদের একটি পার্টি-বিরোধী গ্রুপ; ১৯০৯ সালের ডিসেম্বরে আ. বগদানভ ও গ, আ, আলেক্সিনস্কির উদ্যোগে গঠিত; গ্রুপের একই নামের একটি মুখপত্রও ছিল। শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে কোনো ভিত্তি না থাকায় ‘ভপেরিয়দ’ গ্রুপ ১৯১৩-১৯১৪ সালে কার্যত ভেঙ্গে যায়; ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর এর অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে যায়।

৭. লেখক অনুপ সাদি সম্পাদিত ভি. আই. লেনিনের প্রবন্ধগ্রন্থ সাহিত্য প্রসঙ্গে, টাঙ্গন ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০২০, পৃষ্ঠা ২৮-৩২ থেকে এই লেখাটি রোদ্দুরে ডট কমে সংকলন করা হয়েছে।।

Leave a Comment

error: Content is protected !!