ওষধি উদ্ভিদ ভোলাটুকি বা ভেলা (Semecarpus anacardium) এর পরিচিতি ও গুণাগুণ

ভোলাটুকি বা ভেলা (বৈজ্ঞানিক নাম: Semecarpus anacardium) হলো এনাকারডিয়াসি (Anacardiaceae) পরিবারের সেমেকারপাস গণের একটি চিরহরিৎ সপুষ্পক উদ্ভিদ। বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন বনাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় এই গাছটি প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে থাকে। ওষধি গুণে অনন্য এই উদ্ভিদটি প্রাচীনকাল থেকেই লোকজ চিকিৎসা ও আয়ুর্বেদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

ভোলাটুকির নাম বৈচিত্র্য

ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভাষার ভিন্নতার কারণে এই উদ্ভিদটির নামের মধ্যে দারুণ বৈচিত্র্য দেখা যায়:

  • বাংলা নাম: এটি সাধারণত ভোলাটুকি, ভেলা, বেলা, ভল্লাত, ভল্লাতক, বেডা, ভেলাটুকু বা ভোলা নামে পরিচিত।
  • আঞ্চলিক নাম: বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এই ফলটিকে স্থানীয়ভাবে ‘বাওলা’ নামে ডাকা হয়।
  • সংস্কৃত নাম: প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় একে ‘ভল্লাতক’ বা ‘অরুষ্কর’ বলা হয়। এছাড়া আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে এর আরও ১৪টি ভিন্ন নাম রয়েছে।
  • হিন্দি নাম: হিন্দিতে এই উদ্ভিদটিকে ‘ভিলাবা’ বা ‘ভেলা’ নামে অভিহিত করা হয়।
  • ইংরেজি নাম: আন্তর্জাতিকভাবে এটি ‘The Marking Nut Tree বা Oriental Cashew Nut’ নামে পরিচিত।[১]

বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস ও সমনাম (Taxonomy Table)

নিচে ভোলাটুকি উদ্ভিদের ট্যাক্সোনমি, বর্গ, পরিবার এবং এর পূর্ববর্তী সমনামগুলোর (Synonyms) একটি তালিকা দেওয়া হলো:

ক্যাটাগরি / শ্রেণীবিন্যাসবিস্তারিত তথ্য
জগৎ (Kingdom)Plantae (উদ্ভিদ)
ক্ল্যাড (Clade)Angiosperms (সপুষ্পক উদ্ভিদ) / Rosids
বর্গ (Order)Sapindales
পরিবার (Family)Anacardiaceae
গণ (Genus)Semecarpus
প্রজাতি (Species)S. anacardium
স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নামSemecarpus anacardium Linn. f.
উদ্ভিদের সমনাম (Synonyms)Semecarpus latifolius Pers.
Anacardium latifolium Lamk.
Anacardium officinarum Gaertn.

ভোলাটুকি বা ভেলা গাছের শারীরিক বৈশিষ্ট্য

  • গাছের আকৃতি: ভেলা একটি ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি আকৃতির পাতাঝরা (পর্ণমোচী) বৃক্ষ। এটি সাধারণত ৮ থেকে ১০ মিটারের বেশি লম্বা হয় না। গাছের মাথায় প্রচুর ডালপালা ও পাতা থাকায় দূর থেকে এটিকে ছাতার মতো দেখায়।
  • বাকল ও ছাল: এর কান্ড বা ছালের রঙ ধূসর এবং গোলাকার শল্কের মতো বাকল গাছ থেকে খসে পড়ে।
  • পাতা: এর পাতাগুলো বেশ বড় (প্রায় ২২.৫-৭৫ সেমি লম্বা এবং ১২.৫-৩০ সেমি চওড়া) এবং বেশ মোটা বা চামড়ার মতো। পাতার উপরিভাগ মসৃণ হলেও নিচের দিকটা মখমলের মতো নরম ও সূক্ষ্ম লোমে আবৃত থাকে। বসন্তকালে এই গাছের সব পাতা ঝরে যায়।

ফুল ও ফলের বিবরণ

  • ফুল: মে ও জুন মাসে গাছে সবুজাভ-সাদা রঙের ছোট ছোট ফুল ফোটে। সাধারণত স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা আলাদা গাছে হয়, তবে কদাচিৎ একই গাছে উভয় ফুল দেখা যেতে পারে।
  • ফল: এর ফল আকারে ছোট (সর্বোচ্চ ২.৫ সেমি) এবং ড্রুপ (Droop) জাতীয়। কচি অবস্থায় ফল টক স্বাদের হয়। ফল পাকলে লালচে-কালো, বেগুনি বা হলদে-কালো রঙ ধারণ করে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে এই ফল পরিপক্ক হয়।

ক্রোমোসোম সংখ্যা

গবেষণা অনুযায়ী, ভোলাটুকি বা ভেলা উদ্ভিদের ডিপ্লয়েড ক্রোমোসোম সংখ্যা হলো ২n = ৬০ (Fedorov, 1969)।

ওষধি গুণাগুণ ও উপকারিতা

লোকজ ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এই গাছের বীজের নানা ব্যবহার রয়েছে:

  • স্মরণশক্তি বৃদ্ধি: প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এর বীজের শাঁস নিয়মিত খেলে মেধা ও স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পায়।
  • রোগ নিরাময়: অ্যাজমা (হাঁপানি), ত্বকের বিভিন্ন সংক্রমণ এবং শরীরের জ্বালাপোড়া কমাতে এর বীজ প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বর্তমান অবস্থা: নির্বিচারে বন উজাড়ের কারণে ওষধি গুণে ভরা এই ভোলাটুকি বা ভেলা গাছ এখন প্রকৃতিতে আগের চেয়ে অনেক কম দেখা যায়।

ভোলাটুকি বা ভেলা ফলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ব্যবহার

  • খাদ্য হিসেবে ব্যবহার: এই ফলের নিচের অংশটি অত্যন্ত সুস্বাদু ও ভোজ্য, যা স্থানীয় মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। পাকা ভেলা ফল বেশ মিষ্টি ও রসালো হওয়ায় অনেকেই এটি খান। কচি ফল লবণ দিয়ে কাঁচা খাওয়া যায় এবং এর আচারও বেশ জনপ্রিয়।
  • মিষ্টান্ন তৈরিতে: ফলের ভেতরে একটিমাত্র বীজ থাকে। এই বীজের ভেতরের নরম মজ্জা বা শাঁস কাজুবাদামের মতো সুস্বাদু, যা বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
  • কাপড় চিহ্নিতকরণে প্রাকৃতিক কালি: এই ফলের উপরের অংশ থেকে এক ধরনের বিশেষ আঠালো রস বা নির্যাস নিঃসৃত হয়। লন্ড্রি বা ধোপাখানায় কাপড়ে স্থায়ী দাগ বা চিহ্ন দেওয়ার জন্য ধোপাগণ এই প্রাকৃতিক রসকে কালি হিসেবে ব্যবহার করেন। এ কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে এই গাছকে ‘The Marking Nut Tree’ বা ‘চিহ্নিতকরণ বাদাম গাছ’ বলা হয়।

আবাসস্থল ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি

এই উদ্ভিদটি মূলত শুষ্ক পর্ণমোচী বা পাতাঝরা বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ভারত এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়ায় এই প্রজাতির বিস্তৃতি রয়েছে।

  • বাংলাদেশে এর উপস্থিতি: বাংলাদেশে মূলত ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) শুষ্ক বনাঞ্চলে ভেলা গাছ দেখা যায়। বিশেষ করে টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের মধুপুর জাতীয় উদ্যান এবং মধুপুর বনাঞ্চলে এই প্রজাতিটির উপস্থিতির সুনির্দিষ্ট নথিপত্র (Record) রয়েছে।
  • ভারতে এর উপস্থিতি: ভারতের বিভিন্ন উষ্ণ অঞ্চলে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, মধ্যভারত ও গুজরাটে এই গাছ প্রচুর জন্মে। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া এবং বীরভূম জেলায় ভেলার গাছ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
  • আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভোলাটুকি বা ভেলা উদ্ভিদটি প্রধানত ভারত এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়ার শুষ্ক ও উষ্ণ জলবায়ুযুক্ত অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে বিস্তৃত।

ভোলাটুকি বা ভেলা উদ্ভিদের সংরক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা

‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’-এর ৬ষ্ঠ খণ্ডের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের প্রকৃতি থেকে এই মূল্যবান ওষধি উদ্ভিদটি হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া। নির্বিচারে বন উজাড় এবং বনাঞ্চলের জমি পরিবর্তনের ফলে প্রজাতিটি বর্তমানে মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।

  • বর্তমান অবস্থা: এই উদ্ভিদটির বর্তমান সর্বশেষ পরিস্থিতি বা সংখ্যার নিখুঁত ডেটা বা তথ্য এখনো সংগৃহীত হয়নি।
  • গৃহীত পদক্ষেপ: দুঃখজনক হলেও সত্য, বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এই গাছটি টিকিয়ে রাখার জন্য এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
  • প্রস্তাবিত পদক্ষেপ: উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এই ওষধি প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল (Natural Habitat) কঠোরভাবে সংরক্ষণ করার জোর প্রস্তাব করা হয়েছে।[২][৩]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র, রেফারেন্স ও সম্পাদকীয় নোট

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য; চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৯, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড; কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৫, পৃষ্ঠা, ২৮-৩২।
২. আফরোজ, সুমনা (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস: ডাইকটিলিডনস”। আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার, মনিরুজ্জামান (সম্পাদক)। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। খণ্ড ৬ (১ম সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা: ১২৫। আইএসবিএন: 984-30000-0286-0।
৩. এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ৮ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টাল ‘রোদ্দুরে.কম’-এ পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্টের গুণগত মান ও তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখতে আজ ১৩ জুন ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ নিবন্ধটি নতুন তথ্যসহ পরিমার্জন, আধুনিকীকরণ এবং আপডেট করা হয়েছে।

পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

প্রশ্ন ১: ভোলাটুকি বা ভেলা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম কী?

উত্তর: ভোলাটুকি বা ভেলা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Semecarpus anacardium Linn. f.। এটি এনাকারডিয়াসি (Anacardiaceae) পরিবারের একটি উদ্ভিদ।

প্রশ্ন ২: ভেলা ফলকে ইংরেজি ও আঞ্চলিক ভাষায় কী বলা হয়?

উত্তর: আন্তর্জাতিকভাবে ভেলা ফলকে ‘The Marking Nut Tree’ বলা হয়। বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে স্থানীয় মানুষ এই ফলটিকে ‘বাওলা’ নামে ডেকে থাকে।

প্রশ্ন ৩: কাপড় চিহ্নিতকরণে ভেলা ফলের ব্যবহার কী?

উত্তর: ভেলা ফলের উপরের অংশ থেকে এক ধরনের বিশেষ আঠালো রস নিঃসৃত হয়। লন্ড্রি বা ধোপাখানায় কাপড়ে স্থায়ী বা পাকা দাগ দেওয়ার জন্য ধোপাগণ এই প্রাকৃতিক রসকে কালি হিসেবে ব্যবহার করেন।

প্রশ্ন ৪: ওষধি চিকিৎসায় ভেলা বীজের উপকারিতা কী?

উত্তর: লোকজ ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় বলা হয় ভেলা বীজের মজ্জা বা শাঁস খেলে মেধা ও স্মরণশক্তি বাড়ে। এছাড়াও অ্যাজমা (হাঁপানি), ত্বকের সংক্রমণ এবং শরীরের জ্বালাপোড়া কমাতে এর ব্যবহার রয়েছে।

প্রশ্ন ৫: ভোলাটুকি বা ভেলা গাছ প্রাকৃতিকভাবে বর্তমানে কী সংকটের মুখোমুখি?

উত্তর: ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’-এর তথ্য অনুযায়ী, নির্বিচারে বন উজাড় এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার কারণে এই ওষধি প্রজাতিটি বর্তমানে মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি এবং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!