প্রকৃতির এক অপূর্ব এবং অনিন্দ্যসুন্দর সৃষ্টি এশীয় শাবুলবুলি (Asian Paradise Flycatcher)। বাংলাদেশের পাখিপ্রেমীদের কাছে এটি দুধরাজ, শাহ-বুলবুল কিংবা সুলতান বুলবুল নামেই বেশি পরিচিত। এর স্বর্গীয় রূপ ও রাজকীয় চলনের কারণে একে অনেকেই ‘নন্দনপাখি’ বা ‘স্বর্গীয় পাখি’ বলে ডাকেন। আধুনিক শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী মোনার্কিডি (Monarchidae) পরিবারের টার্পসিফোনি (Terpsiphone) গণের এই পাখিটি তার দীর্ঘ ফিতার মতো লেজ এবং চোখ জুড়ানো রঙের পরিবর্তনের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে পুরুষ পাখির দীর্ঘ সাদা বা লালচে লেজ বনের মাঝে এক রাজকীয় আবহ তৈরি করে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের সবসময়ই মুগ্ধ করে।
এশীয় শাবুলবুলির বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
| ট্যাক্সনমিক ধাপ (Rank) | বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name) | বাংলা নাম/অর্থ |
|---|---|---|
| জগৎ (Kingdom) | Animalia | প্রাণীজগৎ |
| পর্ব (Phylum) | Chordata | কর্ডাটা (মেরুদণ্ডী) |
| শ্রেণী (Class) | Aves | পাখি (পক্ষীশ্রেণী) |
| বর্গ (Order) | Passeriformes | পাসেরিফর্মেস (বৃক্ষচর পাখি) |
| পরিবার (Family) | Monarchidae (Corvidae নয়) | মোনার্কিডি (প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচার গোত্র) |
| গণ (Genus) | Terpsiphone (Gloger, 1827) | টার্পসিফোনি |
| প্রজাতি (Species) | Terpsiphone paradisi | এশীয় শাবুলবুলি |
| দ্বিপদ নাম (Binomial Name) | Terpsiphone paradisi (Linnaeus, 1758) | এশীয় শাবুলবুলি |
| সমনাম (Synonym) | Corvus paradisi Linnaeus, 1758 | পূর্বের বৈজ্ঞানিক নাম |
শারীরিক বৈশিষ্ট্য
এশীয় শাবুলবুলি মূলত একটি দীর্ঘ লেজ ও ঝুঁটিবিশিষ্ট পতঙ্গভুক পাখি। এদের দেহের গড় দৈর্ঘ্য ২০ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ২০ গ্রামের মতো। এদের ডানার মাপ ৯ সেমি, ঠোঁট ২.৫ সেমি এবং পা ১.৭ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। তবে পুরুষ পাখির ক্ষেত্রে লেজের দৈর্ঘ্য ১০ সেন্টিমিটার হলেও অতিরিক্ত লেজ বা ‘ফিতা’ প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
পুরুষ শাবুলবুলির দেহে দুটি বর্ণ-বৈচিত্র্য বা ‘ফেজ’ দেখা যায়—সাদা ও লালচে। সাদা অবস্থায় এদের দেহ উজ্জ্বল সাদা হলেও মাথা, গলা, ঝুঁটি এবং ডানার পালক কুচকুচে কালো থাকে। অন্যদিকে, লালচে অবস্থায় এদের পিঠের রঙ হয় লালচে-বাদামি এবং নিচের দিকটা থাকে ধূসরাভ। তবে স্ত্রী পাখির ক্ষেত্রে লেজে কোনো দীর্ঘ ফিতা থাকে না এবং এদের ঝুঁটিও তুলনামূলক খাটো। এদের গলা ও কান-ঢাকনি ধূসর রঙের হয়ে থাকে।
ছেলে ও মেয়ে উভয় পাখির চোখ কালচে বাদামি এবং ঠোঁট ও পা নীলচে-ধূসর বর্ণের হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখিরা দেখতে অনেকটা স্ত্রী পাখির মতোই। বিশ্বে এই পাখির ১৬টি উপপ্রজাতি থাকলেও বাংলাদেশে মূলত T. p. leucogaster, T. p. paradisi এবং T. p. saturatior—এই তিনটি উপপ্রজাতি দেখা যায়।
স্বভাব ও জীবনকাল
এশীয় শাবুলবুলি সাধারণত নদীর ধারের ছায়াময় গাছপালা, ঘন বন এবং বাগানে বিচরণ করতে পছন্দ করে। এদেরকে অধিকাংশ সময় একা কিংবা জোড়ায় দেখা যায়। শিকার ধরার ক্ষেত্রে এরা বেশ দক্ষ; গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে উড়ে এরা প্রজাপতি, গুবরে পোকা, ফড়িং ও বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গ শিকার করে জীবনধারণ করে।
এদের ডাক বেশ বৈচিত্র্যময় ও কিছুটা কর্কশ। সচরাচর এদের কণ্ঠে ‘ট্রিট’, ‘চিউচিউ’, ‘কুয়িঙ্ক’ কিংবা ‘পীটি-টু-হুয়িট’ এর মতো শব্দ শোনা যায়।
বাসা তৈরি ও বংশবৃদ্ধি
প্রজনন মৌসুমে এরা সরু ও দ্বি-বিভক্ত ডালে অত্যন্ত শৈল্পিক উপায়ে বাসা তৈরি করে। ঘাস, গাছের মূল, আঁশ ও পাতা একত্রিত করে মাকড়সার জালের সাহায্যে এরা মজবুত বাসা বানায়। বাসার বাইরের দিকটি মাকড়সার ডিম-থলি দিয়ে ঢেকে দেয়, যা একাধারে সৌন্দর্য বাড়ায় এবং সুরক্ষাও দেয়। এদের ডিমগুলো দেখতে হালকা বেগুনি আভার হয় (মাপ ২.০ × ১.৫ সেমি)। সাধারণত ১৫ থেকে ১৬ দিন ডিমে তা দেওয়ার পর শাবক জন্ম নেয়।
ভৌগোলিক বিস্তৃতি
এশীয় শাবুলবুলি বাংলাদেশের একটি দুর্লভ আবাসিক পাখি। আমাদের দেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন বনাঞ্চল এবং বিশেষ করে পুরনো আমবাগানে এদের দেখা মেলে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই পাখির বিচরণ ক্ষেত্র বেশ বিশাল। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপসহ দক্ষিণ এশিয়া ছাড়াও চীন, জাপান, আফগানিস্তান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াজুড়ে এদের দেখা পাওয়া যায়।
বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ
২০০৯ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে এশীয় শাবুলবুলিকে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে ‘বিপদমুক্ত’ (Least Concern) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করা জরুরি। বাংলাদেশের ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী এই প্রজাতিটি সংরক্ষিত, তাই একে শিকার করা বা এর ক্ষতি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
এশীয় শাবুলবুলির ইংরেজি নামের আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘মাছিধরা স্বর্গের পাখি’। নামটির সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় এর রূপের মাঝে। মাথায় রাজকীয় কালো ঝুঁটি আর শরীরে রঙের খেলা—এমনিতেই পাখিটি অপূর্ব সুন্দর। তবে এর সৌন্দর্যের আসল চাবিকাঠি হলো এর অবিশ্বাস্য দীর্ঘ লেজ, যা দেখে যেকোনো মানুষ মুগ্ধ হতে বাধ্য।
মজার ব্যাপার হলো, পুরুষ পাখির এই রূপসী লেজের দৈর্ঘ্য অনেক সময় তার শরীরের মূল দৈর্ঘ্যের চেয়েও দুই-তিন গুণ বেশি লম্বা হয়ে থাকে। ওড়ার সময় যখন লেজের বিভক্ত প্রান্ত দুটি বাতাসে দোলে, তখন মনে হয় যেন রূপের কোনো ঝরনাধারা বয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি যেন তার সমস্ত কারুকাজ দিয়ে এই ‘স্বর্গীয়’ পাখিটিকে সাজিয়েছে।
🌿 বোনাস: বাংলাদেশের সব পাখির নাম জানতে আমাদের এই ৭০০+ পাখির তালিকাটি ঘুরে দেখুন! 🦜
বিবিধ: এশীয় শাবুলবুলির বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ স্বর্গের সুরেলা-কণ্ঠ পাখি (গ্রিক: terpsi = পরিতৃপ্ত, phone = গান; ল্যাটিন: paradisi = স্বর্গ)।[১]
তথ্যসূত্র
১. ইনাম আল হক ও সুপ্রিয় চাকমা, আগস্ট ২০০৯; “পাখি”। আহমাদ, মোনাওয়ার; কবির, হুমায়ুন, সৈয়দ মোহাম্মদ; আহমদ, আবু তৈয়ব আবু। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ ২৬ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা – ৩৪৯-৩৫০। আইএসবিএন 984-30000-0286-0।
২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৪ মার্চ ২০১২ তারিখে প্রাণকাকলি ব্লগে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ৩১ মে ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
