রাজ বটেরা: বাংলাদেশের বিরল ও সংরক্ষিত এক নীল রূপের পাখি

রাজ বটেরা

বৈজ্ঞানিক নাম: Coturnix chinensis; সমনাম: Exalfactoria chinensis Linnaeus, 1766; বাংলা নাম: রাজ বটেরা
; ইংরেজি নাম: King Quail, Blue-breasted Quail.
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য Kingdom: Animalia; বিভাগ/Phylum: Chordata; শ্রেণী/Class: Aves; পরিবার/Family: Phasianidae; গণ/Genus: Coturnix, Bonnaterre, 1791; প্রজাতি/Species: Coturnix chinensis (Linnaeus, 1766)

বৈচিত্র্যময় পাখির দেশ বাংলাদেশে ‘কোটার্নিক্স’ (Coturnix) গণের মোট তিন প্রজাতির বটেরা বা কোয়েল পাখির দেখা মেলে। এই প্রজাতিগুলো হলো—রাজ বটেরা, বৃষ্টি বটেরা এবং পাতি বটেরা। এই ছোট আকৃতির ও চঞ্চল পাখিদের মধ্যে রাজ বটেরা সবচেয়ে নজরকাড়া। আজকের নিবন্ধে আমরা এই ‘রাজ বটেরা’ পাখির জীবনচক্র এবং এর বিচিত্র বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

শারীরিক গঠন ও চমৎকার রূপের বর্ণনা

রাজ বটেরা মূলত স্লেট-নীল রঙের একটি ছোট আকৃতির ভূচর পাখি। এদের দেহের গড় দৈর্ঘ্য মাত্র ১৪ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৫০ গ্রামের মতো। পুরুষ ও স্ত্রী পাখির চেহারায় বেশ স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়:

  • ছেলে রাজ বটেরা: এদের কপাল স্লেট-নীল এবং মাথায় আকর্ষণীয় সাদা-কালো নকশা থাকে। গলার মোটা সাদা-কালো দাগ এবং বুক ও বগলের স্লেট-নীল রঙ এদের অনন্য করে তোলে। পেটের দিকটা লালচে-তামাটে বর্ণের হয়।
  • মেয়ে রাজ বটেরা: এদের কপাল লালচে এবং পিঠ ও ঘাড়ের দিকে সূক্ষ্ম কালো ছিটা-দাগ থাকে। মেয়ে পাখির বুক ও বগলে কালো ডোরাকাটা দাগ দেখা যায়।

অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে পাখিদের রঙ কিছুটা অনুজ্জ্বল হয় এবং তাদের তলপেটে তামাটে ভাব থাকে না। উল্লেখ্য যে, রাজ বটেরার মোট ১০টি উপ-প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে সাধারণত C. c. chinensis প্রজাতিটি দেখা যায়।

স্বভাব ও খাদ্যাভ্যাস

রাজ বটেরা মূলত লাজুক প্রকৃতির পাখি। এরা সাধারণত আর্দ্র তৃণভূমি, শস্যখেত, রাস্তার ধারের ঝোপঝাড় কিংবা চা বাগানে জোড়ায় অথবা ছোট ছোট পারিবারিক দলে বিচরণ করে। আবাদি জমি বা জলমগ্ন ঘাসবনে এদের ধীরে ধীরে খাবার খুঁজতে দেখা যায়। এদের প্রধান খাবার হলো বিভিন্ন ঘাসের বীজ ও শস্যদানা, তবে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে এরা ছোট পোকামাকড়ও খেয়ে থাকে। এই পাখিটি বেশ মিষ্টভাষী; মাঝে মাঝে বাঁশির সুরে ‘টি-ইউ’ বা ‘কুঈ-কী-কিউ’ শব্দে ডেকে ওঠে, তবে ভয় পেলে এদের কণ্ঠে কোমল ‘টির-টির-টির’ ডাক শোনা যায়।

প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি

জুন থেকে আগস্ট মাস হলো রাজ বটেরার প্রধান প্রজনন মৌসুম। এ সময় এরা ঘন লতাপাতা ও ঘাসঝোপের আড়ালে মাটিতে গর্ত করে বাসা তৈরি করে। বাসা বানাতে এরা সাধারণত ঘাস ও শুকনো পাতা ব্যবহার করে। স্ত্রী বটেরা ৫ থেকে ৭টি পর্যন্ত ফিকে-ধূসর বা জলপাই-হলদে রঙের ডিম পাড়ে। ডিমগুলো আকারে ছোট এবং এক প্রান্ত কিছুটা সুচালো হয়। প্রজনন প্রক্রিয়ায় স্ত্রী পাখিটি একাই ডিমে তা দিয়ে থাকে।

রাজ বটেরার বিস্তৃতি ও বৈশ্বিক আবাসস্থল

রাজ বটেরা পৃথিবীর একটি বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। এশিয়া মহাদেশের ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন থেকে শুরু করে সুদূর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত এদের বিচরণ রয়েছে। প্রজাতিটি মূলত আর্দ্র ও উন্মুক্ত তৃণভূমি পছন্দ করে। তবে বাংলাদেশে এটি অত্যন্ত বিরল একটি আবাসিক পাখি। এখন পর্যন্ত দেশের ঢাকা ও সিলেট বিভাগের ঘাসবনে এদের দেখা পাওয়ার মাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে।

বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ

“বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইইউসিএন (IUCN) রাজ বটেরাকে ‘বিপদমুক্ত’ (Least Concern) হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেও বাংলাদেশে এদের অবস্থা বেশ সংকটাপন্ন। অত্যন্ত কম দেখা মেলায় বাংলাদেশের রেড লিস্টে এদের ‘অপ্রতুল-তথ্য’ (Data Deficient) বা বিরল প্রজাতির তালিকায় রাখা হয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংস এবং বুনো পাখি শিকারের কারণে এদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। তাই এই বিরল পাখিটিকে রক্ষায় প্রাকৃতিক আবাসস্থল বা ঘাসবন সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

সংরক্ষণ অবস্থা ও আইনি সুরক্ষা

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) এর বৈশ্বিক তালিকায় রাজ বটেরা বর্তমানে ‘বিপদমুক্ত’ (Least Concern) অবস্থায় থাকলেও বাংলাদেশে এদের অবস্থান বেশ অনিশ্চিত। তথ্যের সল্পতার কারণে বাংলাদেশের রেড লিস্টে এদের ‘অপ্রতুল-তথ্য’ (Data Deficient) শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এই বিরল পাখিটিকে রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশের ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের সংশোধিত আইন অনুযায়ী এই প্রজাতিটি সংরক্ষিত। তাই রাজ বটেরা শিকার, ধরা বা এদের আবাসস্থল ধ্বংস করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

নামকরণের ইতিহাস ও বৈজ্ঞানিক অর্থ

রাজ বটেরার বৈজ্ঞানিক নামের পেছনে একটি চমৎকার অর্থ লুকিয়ে আছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Synoicus chinensis (পূর্বে যা Coturnix chinensis নামে পরিচিত ছিল)। ল্যাটিন শব্দ ‘Coturnix’ অর্থ হলো বটেরা বা কোয়েল এবং ‘chinensis’ শব্দের অর্থ হলো চীনের। অর্থাৎ, আক্ষরিক অর্থে এর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ দাঁড়ায় ‘চীনের বটেরা’। যদিও এটি এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার অনেক দেশেই পাওয়া যায়, তবে এই নামকরণটি এর ঐতিহাসিক ভৌগোলিক পরিচয়ের একটি অংশ।

🌿 বোনাস: বাংলাদেশের সব পাখির নাম জানতে আমাদের এই ৭০০+ পাখির তালিকাটি ঘুরে দেখুন! 🦜

তথ্যসূত্র

১. সাজেদা বেগম, বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, ২৬তম খণ্ড “পাখি”, ১ম প্রকাশ, আগস্ট ২০০৯; ইনাম আল হক, সৈয়দ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, মোনাওয়ার আহমাদ ও আবু তৈয়ব আবু আহমদ সম্পাদিত; বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা; পৃষ্ঠা – ৩-৪। আইএসবিএন 984-30000-0286-0।
২. বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, জুলাই ১০, ২০১২, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, পৃষ্ঠা-১১৮৪৪৮।

Leave a Comment

error: Content is protected !!