প্রশ্ন-২১: কমিউনিজমের ধারার সমাজব্যবস্থার কোনো প্রভাব পড়বে পরিবারের উপর?

উত্তর: এই ধারার ব্যবস্থা নারী-পুরুষের সম্পর্ককে করে দেবে নিছক একান্ত বিষয়, কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপার, তাতে সমাজের কোনো হস্তক্ষেপের আবশ্যকতা থাকবে না। কমিউনিস্ট সমাজ সেটা করতে পারে, তার কারণ এই সমাজ ব্যক্তিগত মালিকানা লোপ করে এবং ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদীক্ষা দেয় সাধারণী উপায়ে, এবং এইভাবে এযাবত বিদ্যমান বিবাহের ভিত্তি-প্রস্তর দুটোকে ভেঙে দেয়। — এই দুটো হলো ব্যক্তিগত মালিকানা দিয়ে যা ঘটিত সেই স্বামীর উপর স্ত্রীর এবং বাপ-মায়ের উপর ছেলেমেয়েদের নির্ভর। কমিউনিজমের ধারায় স্ত্রীদের নিয়ে সাধারণী সম্ভোগের কথা তুলে নৈতিকতাবাগীশ কূপমণ্ডুকেরা যে সোরগোল করে, এটা হলো তার একটা জবাব। স্ত্রীদের দিয়ে সাধারণী সম্ভোগ সংক্রান্ত সম্পর্কটা সম্পূর্ণত বুর্জোয়া সমাজেরই বস্তু, এখন সেটা রয়েছে নিখুঁত আকারে — বৈশ্যবৃত্তি। কিন্তু বেশ্যাবৃত্তির মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত মালিকানা, এই মালিকানার বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বেশ্যাবৃত্তি লোপ পাবে। এইভাবে, কমিউনিজমের ধারার সংগঠন নারীদের নিয়ে সাধারণী সম্ভোগ চালু না করে বরং সেটার অবসান ঘটবে।
প্রশ্ন-২২. বর্তমান জাতিসমূহের প্রতি কমিউনিস্ট সমাজ কি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে?
_ অপরিবর্তিত
প্রশ্ন-২৩. বর্তমান ধর্মসমূহের প্রতি এর দৃষ্টিভঙ্গি কি হবে?
_ অপরিবর্তিত
প্রশ্ন-২৪. সমাজতন্ত্রীদের সাথে কমিউনিস্টদের পার্থক্য কোথায়?
উত্তর: তথাকথিত সমাজতন্ত্রীরা তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম প্রকারের দলে রয়েছে সেইসব ব্যক্তি যারা জড়িত সামন্ত এবং গোত্রমূলক সমাজের সাথে, যে-সমাজ বৃহদায়তন শিল্প, বিশ্ব বাণিজ্য এবং তাদের সৃষ্ট বুর্জোয়া ব্যবস্থা দ্বারা ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে এবং প্রতিদিন ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।বর্তমান সমাজের অনাচার এবং অন্যায় দেখে এই দল সিদ্বান্ত টানে যে, সামন্ত এবং গোত্রমূলক সমাজ অবশ্য ফিরিয়ে আনা উচিত, কারণ সেই সমাজে এ-রকম অনাচার ও পাপ নেই। যেভাবেই হোক, তাদের সকল প্রস্তাবকেই তারা এই সিদ্বান্তের দিকেই নিয়ে যায়। এই ধরনের ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ সমাজতন্ত্রীদের সমস্ত আপাতসৌভ্রাত্ব এবং প্রলেতারিয়েতের দুর্দশার জন্য তাদের কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ সত্ত্বেও নিম্নলিখিত কারণসমূহের জন্য কমিউনিস্টরা তাদেরকে যথাসাধ্য বাধা দেয়:
১. এ-দল এমন কিছু চায় যা সম্পুর্ণ অসম্ভব।
২. তারা অভিজাত সম্প্রদায়, গিল্ডকর্তা, কারখানা মালিক ও তাদের আনুষঙ্গিক নিরঙ্কুশ বা সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্র, আমলা, সৈনিক ও ধর্মযাজকদের শাসনাধীন এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায় যা নিশ্চিতভাবে আজকের সমাজের অনাচার ও অন্যায় থেকে মুক্ত ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত ছিল অন্তত সমপরিমাণ অনাচার ও অন্যায় এবং তা নিপিড়িত শ্রমিকদের কমিউনিস্ট সমাজের মাধ্যমে মুক্তিলাভের সুযোগও প্রদান করতো না।
৩. যখনই প্রলেতারিয়েত বিপ্লবী ও কমিউনিস্ট হয়ে উঠে, তখনই প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্রীরা প্রলেতারিয়ানদের বিরুদ্ধে বুর্জোয়াদের সাথে এক লক্ষে মিলিত হয়ে তাদের আসল রঙ প্রকাশ করে।
দ্বিতীয় প্রকারের দলে বর্তমান সমাজব্যাবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট সেইসব ব্যক্তি রয়েছেন যারা নিজেদের কৃত অনাচার ও অন্যায়ের ভয়ে ভীত। স্বাভাবিকভাবে তারা চান, বর্তমান সমাজব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে এবং সেই সঙ্গে এই ব্যবস্থার অস্তিত্বের সাথে জড়িত অনাচার ও অন্যায় থেকে মুক্ত থাকতে। এই উদ্দেশ্যে কেউ কেউ নিতান্তই জনকল্যাণমূলক পরিকল্পনার প্রস্তাব করেন আবার অন্যরা এগিয়ে আসেন জাঁকাল-সব সংস্কার-পরিকল্পনা নিয়ে যেসব পরিকল্পনা সমাজকে নতুনভাবে সংগঠিত করবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই সংস্কার-প্রস্তাবকেরা বর্তমান সমাজ ব্যাবস্থার ভিত্তি সমূহ অর্থাৎ বর্তমান সমাজব্যবস্থার প্রাণকে রক্ষা করতে চান, তাদের সংস্কার-প্রস্তাব ভাঁওতা মাত্র। কমিউনিস্টেরা অবশ্যই এই বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রী’দের বিরুদ্ধে নিরাপোস সংগ্রাম করে; কারণ তারা কমিউনিস্টদের শত্রুদের পক্ষে কাজ করে এবং কমিউউনিস্টরা যে সমাজব্যাবস্থাকে উৎখাত করতে চায় তারা তাকেই রক্ষা করতে চায়।
আর তৃতীয় প্রকারের দল গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত যারা কমিউনিস্টদের দ্বারা প্রস্তাবিত (পাণ্ডুলিপিতে এখানে শূন্যস্থান রয়েছে। ১৯ নং প্রশ্নের উত্তর দেখুন।_ সম্পাদক) প্রশ্নোত্তরে বর্ণিত কিছুকিছু কর্মসূচির প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শন করেন এই বিশ্বাস থেকে যে, ঐ পরিকল্পনাগুলি বর্তমান সমাজের দূর্দশা এবং অনাচারকে বিলুপ্ত করার জন্য যথেষ্ট; কমিউনিজমের উত্তরণের অংশ হিসেবে এগুলোকে তারা সমর্থন করেন না। এইসব ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী’রা হচ্ছেন সেই সব প্রলেতারিয়ান যারা নিজেদের শ্রেণির মুক্তির শর্তাবলী এখনো পরিস্কারভাবে বুঝতে পারেননি, অথবা তাঁরা হচ্ছেন পাতিবুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী শ্রেণি যে শ্রেণি গণতন্ত্রের ও সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনার দাবি তোলে এবং এগুলো বাস্তবায়নের পূর্বে প্রলেতারিয়েতের সাথে নিজেদের অনেক স্বার্থ সাধারণ দেখতে পায়। এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, কাজের সময় গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের সাথে কমিউনিস্টদের বোঝাপড়ায় আসতে হবে, এবং সাধারণত সাময়িকভাবে যতক্ষণ পারা যায় তাদের সাথে একই কর্মনীতি গ্রহণ করতে হবে-অবশ্য যদি এই সমাজতন্ত্রীরা শাসক বুর্জোয়া শ্রেণির সেবায় নিয়োজিত না হন এবং কমিউনিস্টদের আক্রমণ না করেন। সুতারাং স্পষ্ট যে কার্যক্ষেত্রে তাদের সাথে এই ধরনের সহযোগীতা মতপার্থক্যের প্রশ্নকে দূরে রাখে না।
প্রশ্ন-২৫: আমাদের একালের অন্যান্য রাজনীতিক পার্টি সম্বন্ধে কমিউনিস্টদের মনোভাব কী?
উ: এই মনোভাব বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন। — ইংলন্ড, ফ্রান্স আর বেলজিয়ামে বুর্জোয়ারা শাসক পার্টি, এইসব দেশে আপাতত বিভিন্ন গণতান্ত্রিক পার্টির সঙ্গে এখনও কমিউনিস্টদের বিভিন্ন সাধারণী স্বার্থ রয়েছে, এই স্বার্থের অভিন্নতা হবে ততই বেশি যে-পরিমাণে গণতন্ত্রীদের এখন সর্বত্র উপস্থাপিত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাবলি কমিউনিস্টদের লক্ষ্যগুলির কাছাকাছি আসবে, অৰ্থাৎ যতই বেশি স্পষ্ট করে এবং নির্দিষ্টভাবে প্রলেতারিয়েতের স্বার্থ সমর্থন করবে, আর যতই বেশি করে তারা নির্ভর করবে প্রলেতারিয়েতের উপর। দৃষ্টান্তস্বরূপ ইংলন্ডে — সেখানে চার্টিস্টরা (১) সবাই শ্রমিক, তারা গণতন্ত্রী পেটি বুর্জোয়া কিংবা তথাকথিত র্যাডিকালদের চেয়ে কমিউনিস্টদের এত বেশি কাছাকাছি যা অপরিমেয়।
আমেরিকায় প্রবর্তিত হয়েছে একটা গণতান্ত্রিক সংবিধান। — সেখানে যে-পার্টি এই সংবিধানটাকে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করবে এবং প্রলেতারিয়েতের স্বার্থে কাজে লাগাবে সেটার সঙ্গে, অর্থাৎ জাতীয় ভূমিসংস্কারকদের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম-কর্মব্রতী হতে হবে।
সুইজারল্যান্ডে র্যাডিকালরা এখনও একটা খুবই মিশ্র পার্টি হলেও একমাত্র তাদের সঙ্গেই কমিউনিস্টদের কোনো সম্পর্ক হতে পারে, আর এদের মধ্যে আবার ভাউড আর জেনেভার র্যাডিকালরা সবচেয়ে প্রগতিশীল। শেষে, জার্মানিতে বুর্জোয়া শ্রেণী আর নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের মধ্যে নিৎপত্তিকর সংগ্রাম এখনও সবে সামান্য দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু বুর্জোয়ারা শাসক না হওয়া অবধি কমিউনিস্টরা তাদের বিরদ্ধে নিৎপত্তিকর সংগ্রাম চালাতে পারে না, তাই যত শীঘ্র সম্ভব বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ করার জন্যে যথাসম্ভব দ্রুত তাদের শাসন-ক্ষমতা লাভ করতে সাহায্য করাই কমিউনিস্টদের স্বার্থের অনুযায়ী। কাজেই, কমিউনিস্টদের সবসময়ে সরকারের বিরুদ্ধে উদারপন্থী বুর্জোয়াদের পক্ষাবলম্বন করতে হবে, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে হুশিয়ার থাকতে হবে, যাতে কমিউনিস্টরা বুর্জোয়াদের আত্মপ্রবঞ্চনায় শরিক হয়ে না পড়ে, কিংবা বুর্জোয়াদের জয়ের ফলে প্রলেতারিয়েতের কল্যাণ হবে বুর্জোয়াদের এমনসব লোভনীয় কথায় কমিউনিস্টরা যাতে বিশ্বাস না করে। বুর্জোয়াদের জয়ের ফলে কমিউনিস্টদের যে একমাত্ৰ সুবিধে হতে পারে তা হল: ১) যাতে কমিউনিস্টদের মূলনীতিগুলি সমর্থন করা, সেগুলি নিয়ে আলোচনা করা এবং সেগুলিকে ছড়িয়ে দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ হয়, আর তার ফলে একটা নিবিড়, লড়িয়ে এবং সুসংগঠিত শ্রেণি হিসেবে প্রলেতারিয়েতের ঐক্য সাধিত হয়, এমনসব সুযোগ-সুবিধে, আর ২) যখন নিরঙ্কুশ সরকার উচ্ছেদ হবে সেইদিন থেকেই বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়ানদের মধ্যে সংগ্রামের পালা আসবে এই নিশ্চয়তা। সেইদিন থেকে কমিউনিস্টদের পার্টি কর্মনীতি হবে বুর্জোয়ারা যেসব দেশে ইতোমধ্যে শাসক সেখানে যেমনটা তেমনই।
বি. দ্র.: অক্টোবর, ১৮৪৭ সালের অক্টোবর মাসে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস রচিত ‘কমিউনিজমের নীতিমালা’ পুস্তিকার পুরোটি এখানে সঙ্কলিত। এটি প্রথম ১৯১৪ সালে প্রকাশিত হয়। এ অনুবাদ নেয়া হয়েছে আফজালুল বাসার অনূদিত নন্দন প্রকাশন, অক্টোবর, ১৯৮৬ ঢাকা এবং প্রগতি প্রকাশন মস্কো, মার্কস এঙ্গেলস রচনা সংকলন বার খণ্ডে, প্রথম খণ্ড থেকে।
টীকাঃ
১. চার্টিস্টরা হচ্ছেন ১৯ শতকের চতুর্থ দশক থেকে ষষ্ঠ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেনে শ্রমিকদের রাজনীতিক আন্দোলনে অংশগ্রহীরা। কঠিন আর্থনীতিক অবস্থা এবং রাজনীতিক অধিকারহীনতার ফলেই এই আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের শ্লোগান ছিল ‘গণ-চার্টার’ কার্যে পরিণত করার জন্যে সংগ্রাম। ‘চাটার’-এ ছিল সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং কয়েকটা শর্তের দাবি, যা শ্রমিকদের জন্যে ঐ অধিকার সুনিশ্চিত করবে। লেনিন বলেছেন, চার্টিজম হলো ‘প্রথম ব্যাপক, সত্যিকার সর্বজনীন, বৈপ্লবিক প্রলেতারীয় আন্দোলন যার ছিল রাজনীতিক আকার।
কার্ল মার্কসের সাথে মার্কসবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (২৮ নভেম্বর, ১৮২০ – ৫ আগস্ট ১৮৯৫) ছিলেন জার্মান বিপ্লবী, দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী, লেখক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে “পবিত্র পরিবার” (১৮৪৪), “ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা” (১৮৪৫) “এ্যান্টি-ডুরিং” (১৮৭৮) “প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা (১৮৮৩), “পরিবার ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি” (১৮৮৪) প্রভৃতি। ১৮৪৮ সালে ছাপা মার্কস ও এঙ্গেলসের সুবিখ্যাত “কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার”।