শ্বেত চন্দন (বৈজ্ঞানিক নাম Santalum album) সান্টালাসি পরিবারের সান্টালুম গণের একটি ছোট, চিরহরিৎ, রোমহীন বৃক্ষ। ১৫ থেকে ১৮ মিটার উঁচু হয়। শ্বেত চন্দনের পুষ্প সুগন্ধি, ক্রীমসদৃশ সাদা, পরবতীতে লাল এবং রক্ত-বেগুনি। শ্বেত চন্দন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন
শ্বেত চন্দন এশিয়ার বাণিজ্যিক বৃক্ষ
শ্বেত চন্দনের ঔষধি ব্যবহার
১. জ্বরে: পিপাসা, শরীরে জ্বালা অথবা শুধু পিপাসা থাকলে চন্দন ঘষা আধ চা-চামচ থেকে এক চা-চামচ (বয়স এবং অবস্থা বিবেচনায়) কচি ডাবের জলের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ালে দুই-ই প্রশমিত হয়; কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বরও কমে যায়; তবে সর্দির প্রকোপ বেশি থাকলে না দেওয়াই সমীচীন।
২. যখন পেনিসিলিনের আবিষ্কার হয়নি, তখন গণোরিয়ার (ঔপসর্গিক পুর্ব-মেহের) জ্বালা-যন্ত্রণা, পুজ পড়া ইত্যাদির প্রশমনে পাশ্চাত্য চিকিৎসক গোষ্ঠীর বিশেষ ঔষধই ছিল চন্দনের তেল এবং তার সঙ্গে আরও দুই-একটা জিনিষ মিশিয়ে ‘ইমালসান’ করে খেতে দেওয়া। এটাও হয়তো অনেক চিকিৎসকের মনে আছে যে, ফ্রান্স থেকে চন্দন তেল ভরা জিলোটিনের বটিকা আসতো, তার নাম ছিল Santal midi এটি সে সময়কার শ্রেষ্ঠ ঔষধ; আর ইউনানি সম্প্রদায় চিনির সঙ্গে ৫ থেকে ১০ ফোঁটা করে খাঁটি চন্দনের তেল খেতে দিতেন, আর বৈদ্যকগোষ্ঠী এটিকে ব্যবহার করতেন অন্যান্য ভেষজের সঙ্গে আসব বা অরিষ্ট করে; তবে চন্দনের কাঠেরই বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে।
এখানে আর একটু, বলে রাখি ঢেঁকিতে ছাটা চাল ধুয়ে সেই জলে চন্দন ঘষে ওর সঙ্গে একটু মধু মিশিয়ে খাওয়ালে যে কোনো কারণে প্রস্রাবে জ্বালা অথবা আটকে যাওয়া, এমনকি প্রস্রাবেও উপকার পাওয়া যায়।
৩. নারীর ক্ষেত্রে: যাঁদের ঋতুস্রাবে দুর্গন্ধ, পুজ বা মজ্জাবৎ স্রাব হতে থাকে। সে ক্ষেত্রে চন্দন ঘষা অথবা ঐ কাঠের গুঁড়ো গরম জলে ভিজিয়ে রেখে সেটা ছেঁকে নিয়ে দুধে মিশিয়ে খেতে হয়।
৪. অপষ্মার রোগে (Epilepsy): প্রাচীন বৈদ্যগণ ঔষধের অনুপান হিসেবে চন্দন ঘষা ব্যবহার করেন; তবে যদি রোগের প্রাবল্য না থাকে, দেখা যায় যে শুধু, চন্দন ঘষা দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলেই অনেকটা ভাল থাকেন।
৫. বমিতে: আমলকির রস অথবা শুকনো আমলকি ভিজানো জলে চন্দন ঘষা মিশিয়ে খেতে দিলে বমি বন্ধ হয়ে যায়।
৬. শীতল পানীয়: গ্রীষ্মকালে শরীরে স্নিগ্ধতা আনার জন্য ঘষা চন্দন ঠাণ্ডা জলে মিশিয়ে খেলে উপকার হয়; এটাতে পেটও ঠাণ্ডা থাকে।
৭. হিক্কায়: চালধোয়া জলের সঙ্গে চন্দন ঘষা মিশিয়ে ঐ জল দু’ ঘণ্টা অন্তর একটু একটু করে খাওয়ালে হিক্কা বন্ধ হয়। এমন কি দুধে ঘষে (ছাগদগ্ধ হলে ভালো হয়) নস্য নিলেও হিক্কা বন্ধ হয়।
৮. বসন্তরোগে: পিপাসা থাকলে মৌরীভিজান জলে চন্দন ঘষা মিশিয়ে খেতে দিয়ে থাকেন এ রোগের স্পেশালিষ্টরা।
৯. বিষফোড়ায়: ঘষা চন্দনে গোল মরিচ ঘষে সেটা ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা অন্তর ৩।৪ বার লাগালে ব্যথা কেটে যায়।
১০. অস্বাভাবিক ঘমে: ঘাম বেশি হলে এই ঘষা চন্দনের সঙ্গে বেনামূল বেটে একট, কর্পূর মিশিয়ে গায়ে মাখলে উপকার হবে।
১১. ঘামাচি: সাদা চন্দন ঘষার সঙ্গে হলুদবাটা ও অল্প একটু কর্পূর মিশিয়ে অথবা চন্দন ও দুরহরিদ্রা একত্রে ঘষে মাখলে মরে যায়।
১২. মাথা ধরা: যখন মাথা ধরার ঔষধ বেরোয়নি, তখন চন্দন ঘষার সঙ্গে একটু কর্পূর মিশিয়ে কপালে লাগাতে হতো।
১৩. শরীরে বসন্ত দেখা দিলে: হেলেঞ্চা (Enhydra luctuans) শাকের রসে শ্বেতচন্দন ঘষা মিশিয়ে খেতে দিলে গুটি শীঘ্র বেরিয়ে পড়ে ও তার ভয়াবহতা চলে যায়।
১৪. নাভিপাকা: শিশুদের নাভি পাকলে শ্বেত চন্দন ঘষে পুরু করে লাগিয়ে দিলে জ্বালা যন্ত্রণা কমে যায় এবং সারেও।
১৫. শিশুদের মাথায় ঘা: ২ বা ৩ মাসের শিশুর মাথায় এক ধরণের চাপড়া ঘা হয় সে ক্ষেত্রে শুধ, শ্বেতচন্দন ঘষা লাগিয়ে দিলে অচিরেই সেরে যায়।
১৬.শূল রোগে: চন্দন ঘষা এবং বেনামুলের ক্বাথ (প্রত্যেকবার ১০ থেকে ১২ গ্রাম হিসাবে) ব্যবহার করলে বুকের আকস্মিক শূল রোগ (বায়ুজন্য) উপশমিত হয়।
রাসায়নিক গঠন:
(a) Santalol 89-96%. (b) Allo-hydroxyproline. (c) Anthocyanins. (d) Phenols. (e) Tannins. (f) Essential oil.
সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।
তথ্যসূত্রঃ
১. আয়ূর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ৮২-৮৪।
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Vinayaraj
- পানি কেশুরী বাংলাদেশের বনাঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- বড়কুচ পার্বত্যঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- ময়নাকাঁটা বাংলাদেশে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- নাগেশ্বর পার্বত্য অঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- কুমারি বুড়া দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো উপকারি বৃক্ষ
- সিন্দুরি গাছ বাংলাদেশের সর্বত্রে জন্মে
- শাল গাছ দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- ছোট জাগরা বাংলাদেশের পাহাড়ীঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- দেশি জাগরা দক্ষিণ এশিয়ার ভেষজ বৃক্ষ
- ভল্লা পাতা জাগরা এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- বড় কুকুরচিতা চিরহরিৎ ভেষজ বৃক্ষ
- বড়হরিনা ভেষজ গুণসম্পন্ন ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ
- পুবদেশি বনচালতা বাংলাদেশের ভেষজ উদ্ভিদ
- পলক জুঁই সুগন্ধি আলংকারিক বৃক্ষ
- গন্ধাল রঙ্গন দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ছোট বৃক্ষ
- গোমরিয়া গামার পার্বত্যঞ্চলের ভেষজ বৃক্ষ
- চালমুগড়া বা ডালমুগরি পাহাড়িঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- ঝাউয়া বাংলাদেশের পার্বত্যঞ্চলে জন্মানো উপকারী বৃক্ষ
- স্থল পদ্ম গ্রীষ্মমন্ডলে জন্মানো ভেষজ উদ্ভিদ
- হরপুল্লি বাংলাদেশে পার্বত্যঞ্চলে জন্মানো বৃক্ষ
- দাকুম দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো পত্রঝরা বৃক্ষ
- পানিসরা বা পিচান্দি উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের উপকারী বৃক্ষ
- ফলসা দক্ষিণ এশিয়ার জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- দেশি কার্পাস এশিয়ায় জন্মানো বর্ষজীবী বৃক্ষ
- দেশি কচুয়া পূর্ব এশিয়ায় জন্মানো চিরহরিৎ বৃক্ষ
- অরনি বা বাতঘ্নী এশিয়ায় জনানো ভেষজ উদ্ভিদ
- চিল্লা এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ গাছ
- স্বর্ণমূলা এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ উদ্ভিদ
- সপ্তরঙ্গী-এর ভেষজ গুণ সম্পন্ন বৃক্ষ
- মায়াফল গাছ-এর তেরটি ভেষজ গুণাগুণ
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।