আমলাতন্ত্রের বিশটি প্রকাশ

ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০

অনুবাদ – অনুপ সাদি

. প্রশাসন বা সংগঠনের উচ্চস্তরে থেকে আমলাতান্ত্রিক নেতারা খুব অল্প জ্ঞান রাখে; তারা জনগণের মতামত বোঝে না; তারা অনুসন্ধান করে না এবং পড়ে না; তারা নির্দিষ্ট নীতিসমূহ গ্রহণ করে না; তারা রাজনৈতিক এবং মতাদর্শগত কাজ পরিচালনা করে না; তারা বাস্তবতা থেকে, জনগণ থেকে, পার্টি নেতৃত্ব থেকেও দূরে সরে থাকে; তারা সর্বদা নির্দেশনামা জারি করে এবং সেসব নির্দেশনামাগুলো সচরাচর ভুল; তারা দেশ ও জনগণকে নিশ্চিতভাবেই ভুলপথে নিয়ে যায়; এবং অবশেষে তারা পার্টির ধারাবাহিক অবিচল লাইন ও কর্মনীতিতে [policy] প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে; তারা জনগণের নাগাল পায় না।

. তারা অহংকারী, অসহনীয়, এবং তারা রাজনীতি নিয়ে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে আলোচনা করে থাকে। তারা তাদের দায়িত্ব সম্পাদন করে না, তারা আত্মগত এবং একদেশদর্শী; তারা অমনোযোগী; তারা জনগণের কথা শোনে না; তারা হিংস্র ও নির্বিচারী; তারা জোর করে নির্দেশ দেয়; তারা বাস্তবতা সম্বন্ধে মনোযোগী নয়; তারা অন্ধ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এটাই হলো কর্তৃত্বমূলক আমলাতন্ত্র।

. তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ততার ভান করে থাকে, তারা সারা বছর কাজের মধ্যে থাকার ভাব ধরে; তারা জনগণকে নিরীক্ষা করে না এবং তারা বস্তুর তদন্ত করে না; তারা কর্মনীতিসমূহ পাঠ করে না, তারা জনগণের উপর নির্ভর করে না; তারা নিজেদের বিবৃতিসমূহ প্রস্তুত করে না; তারা নিজেদের কাজ নিয়েও পরিকল্পনা করে না। এটা মগজহীন, ভুলদিকে পরিচালিত আমলাতন্ত্র। অন্যভাবে বললে, এটি রুটিনবাদ [routinism]।  

. তাদের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব অপরিমেয়; তারা পথ ঠিক করতে পারে না; তারা স্বার্থপরায়ণ; তারা হম্বিতম্বি করে সবকিছু তুরি মেরে উড়িয়ে দেয়; তারা চোখ রাঙিয়ে জনগণকে সন্ত্রস্ত করে; ক্রমাগতভাবে তারা জনগনের প্রতি বিষোদগার করে; তাদের কাজের ধরণ রূঢ়; তারা জনগণকে সম মর্যাদা দেয় না। এটি জমিদারী আমলাতন্ত্র।

. তারা অজ্ঞ; তারা কোনো বিষয়ে জানার জন্য প্রশ্ন করতে লজ্জ্বাবোধ করে; তারা অতিরঞ্জিত করে এবং মিথ্যা বলে; তারা নিজেরা ভুলে ভরা কিন্তু তারা সে ভুলের দায় চাপায় জনগণের উপর; তারা সফলতার ভাগ নিজেদের উপর বসাতে আগ বাড়িয়ে থাকে; তারা কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে প্রতারণা করে; তারা তাদের উচ্চস্তরের নেতৃত্বকে ভুল তথ্য দিয়ে প্রতারণা করে এবং এবং তাদের অধস্তনদের বোকা বানায়; তারা তাদের ভুলভ্রান্তিকে গোপন করে এবং ভুলসমূহকে চাকচিক্যময় করে। এটাই অসাধু আমলাতন্ত্র।

. তারা রাজনীতি বোঝে না; তারা তাদের কাজও করে না; তারা কাজের ভার অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়; তারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করে না; তারা কুতার্কিক, তারা ওজর দেখিয়ে কাজকে সরিয়ে রাখে; তারা সংবেদনশূন্য; তারা নিজেদের উপর সতর্কতাহীন। এটাই দায়িত্বজ্ঞানহীন আমলাতন্ত্র।

আরো পড়ুন:  আমাদের তলোয়ার দু’টি, লেনিন ও স্তালিন

. তারা বিভিন্ন ব্যাপারে অবহেলাকারী; তারা যতটুকু পারে ততটুকু ভোগসর্বস্ব; তাদের জনগণের সাথে কিছুই করার নেই; তারা সবসময় ভুলই করে থাকে; তারা উর্দ্ধতনের কাছে নিজেকে সম্মানীয় হিসেবে উপস্থাপিত করে এবং নিম্নস্তরের কাছে নিষ্কর্মায় পরিগণিত হয়; তারা নিজেদের সম্মানের বিষয়ে যত্নশীল; তারা আটকোনায় চলতে পারে এবং বাইম মাছের মতো পিচ্ছিল। এটা সেই ধরণের আমলাতান্ত্রিকতা যা কর্মকর্তার মতো কাজ করে কিন্তু কেবল জীবিকা নির্বাহ করে।

. তারা রাজনীতিকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শিখে না; তারা নিজেদের কাজকে এগিয়ে নেয় না; তাদের কথাবলার ধরণ কটু; তাদের নেতৃত্বের কোন দিকনির্দেশনা নেই; তারা বেতন গ্রহণের সময় তাদের অফিসের কর্তব্য উপেক্ষা করে; তারা লোকদেখানো কাজেই সিদ্ধহস্ত; তারা অলস জমিদারের মতো ঠাটবাট বজায় রাখে; তারা যে সকল কর্মী কঠোর পরিশ্রম করে ও ধার্মিক, এবং কর্মকর্তার মতো কাজ করে না, তাদের সাথে বাজে আচরণ করে। এই ধরণের আমলাতান্ত্রিকতা হলো ফাঁকিবাজির ও মেধাশুন্য আমলাতান্ত্রিকতা।

. তারা নির্বোধ; তারা দ্বিধাগ্রস্ত; তাদের নিজস্ব চিন্তা বলে কিছু নেই; তারা পচা মনের; দিনশেষে তাদের বাগাড়ম্বরই সার; তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের জন্য গর্বিত এবং তারা একইসাথে অস্থিরচিত্তসম্পন্ন ও অজ্ঞ। এটা হলো নির্বোধ, অকর্মা আমলাতন্ত্র।

১০. তারা অন্যদের দিয়ে দলিল দস্তাবেজ পড়ায়; অন্যেরা পড়ে এবং তারা ঘুমায়; তারা জিনিসের দিকে না তাকিয়েই সমালোচনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে; তারা ভুলের সমালোচনা করে এবং জনগণকে দোষারোপ করে; ভুল থেকে উত্তরণের পথটি তারা খোঁজে না; তারা সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করে না, বরং সমস্যাকে উপেক্ষা করা; তারা তাদের উচ্চস্তরের নেতৃবৃন্দের মন যোগাতে ব্যস্ত থাকে; তারা তাদের অধস্তনদের কাছে নিজেকে বুঝদার হিসেবে জাহির করে; যখন তারা পেরে উঠে না তখন তাদের হিক্কা উঠতে থাকে; তারা তাদের সমপর্যায়ের সকলের সাথে তর্ক চালাতে থাকে। এটা অলস আমলাতন্ত্র।

১১. সরকারি অফিসে লটবহর বড় থেকে বড় হতে থাকে; কিন্তু ব্যাপারগুলাতে বিভ্রান্তি আরো বাড়ে; কাজের চেয়ে জনগণ বেশি হয়ে যায়; তারা চক্রের সাথে চলে; তারা ঝগড়া করে এবং অনর্থক আলোচনায় মেতে থাকে; জনগণ অধিক কিছু করতে অনিচ্ছুক থাকে কিন্তু তারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করে না। এটা সরকারী দপ্তরের আমলাতন্ত্র।

১২. দলিলাদির সংখ্যা অসংখ্য; লাল ফিতার দৌরাত্ব্য বাড়ে; নির্দেশাবলী প্রসারিত হয়; অনেক প্রতিবেদন অপঠিত থেকে যায় যেগুলো মূল্যায়ন করা হয় না; অনেক ছক কষা হতে থাকে, কাজের তালিকা বাড়তে থাকে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না; অনেক বৈঠকের পরে কোনো সিদ্ধান্তই গৃহীত হয় না; অনেক ঘনিষ্ঠ সংগঠন আছে কিন্তু কিছুই শেখা হয় না। এটাই লাল ফিতার ও আনুষ্ঠানিকতার আমলাতন্ত্র।

আরো পড়ুন:  কর্মীদের উপর সব নির্ভর করে

১৩. তারা আমোদ খোঁজে, কিন্তু কষ্ট করতে ভয় পায়; তারা সবসময় পেছন দরজা দিয়ে কাজ সারে; নিজে কর্মকর্তা হবার পরে পরিবারের সবাই সুবিধা পেতে থাকে; একজন নির্বান লাভ করলো তো তার সমস্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা স্বর্গ পর্যন্ত উঠে যায়; তাদের উদ্দেশ্যে ভোজসভা আর উপহার দেয়া হতেই থাকে… এটা ব্যতিক্রমীদের আমলাতন্ত্র।

১৪. যিনি যত উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, তিনি তত অসহিষ্ণুতা; তাকে সমর্থন দেবার জন্য তার চাহিদা উচ্চ থেকে উচ্চে যেতে থাকে; তার ঘরদোর ও আসবাবপত্রের বাহার ক্রমান্বয়ে বিলাসবহুল হতে থাকে; বিভিন্ন বিষয়ে তার এখতিয়ার বাড়তে থাকে; তারা উচ্চস্তরের আমলারা অধিক ভাগ পেতে থাকে কিন্তু নিচের স্তরকে তার মূল্য দিতে হয়; বিলাসিতা বাড়তে থাকে, আবর্জনাও বাড়তে থাকে। উপরে-নিচে-ডানে-বামে সবাই হাত তুলতে থাকে। এটা হলো বায়বীয় কর্মকর্তাদের আমলাতন্ত্র।

১৫. তারা অহংকারী; তারা সর্বজনীন উপকরণ দিয়ে ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি মেটায়; তারা কারচুপি, সন্দেহকে ঘনীভূত করে; তারা যত গিলতে পায়, তত বেশি চায়; এবং তারা পিছু হটে না বা দেয় না। এটা হলো অহংকারী আমলাতন্ত্র।

১৬. তারা নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা ও অর্থের ভাগ নিয়ে বিবাদ লাগায়, তারা পার্টির ভেতরে হাত বাড়ায়; তারা খ্যাতি ও সৌভাগ্য চায়, তারা পদ চায়, এবং তারা যদি তা না পায় তবে তারা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে; তাদের মেদ বাড়তে থাকে, কিন্তু তারা পাতলু হতে চায়; তারা বেতন ভাতাদির ব্যাপারে বেশ মনোযোগী থাকে; তারা তাদের সহযোদ্ধাদের সাথে উঞ্চ সম্পর্ক ধরে রাখে, কিন্তু জনগণকে তোয়াক্কা করে না। এটা হলো ক্ষমতা ও অর্থের ভাগ নিয়ে বিবাদে মত্ত থাকা আমলাতন্ত্র।

১৭. সংখ্যাভারাক্রান্ত নেতৃত্বমন্ডলী সুসসমন্বিতভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে জানে না; তারা সবাই যে যার মতো করে পথ দেখাতে থাকে এবং তাদের কাজ হযবরল হতে থাকে; নিজের কথাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে থাকে; উচ্চস্তর বিচ্ছিন্ন থাকে নিম্নস্তর থেকে এবং কেন্দ্রীকরণ থাকে না, গণতন্ত্রও থাকে না। এটা অনৈক্যের আমলাতন্ত্র।

১৮. কোনো সংগঠন নেই; তারা ব্যক্তিগত বন্ধুদের মনোনীত করে; এতে উপদলীয়বাদ সৃষ্টি হয়; তারা সামন্তীয় ধারার সম্পর্ক বজায় রেখে চলে; তারা ক্ষুদ্র কুচক্র সৃষ্টি করে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য, এবং তারা একে অপরকে রক্ষা করে, এতে সব কিছুর উপরে ব্যক্তিবাদিতা জাহির হয়; এই ক্ষুদে কর্মকর্তারা জনগণের ক্ষতি করে।। এটাই হলো চক্রপন্থী আমলাতন্ত্র।

আরো পড়ুন:  প্রতিক্রিয়াশীল ট্রেড ইউনিয়নে বিপ্লবীদের কি কাজ করা উচিত?

১৯. তাদের বিপ্লবী আকাংখা দুর্বল; তাদের রাজনীতির পতন হয় এবং রাজনীতির চরিত্র বদলে যায়; তারা দেখায় যে তারা অনেক অনেক অভিজ্ঞ; তারা দায়িত্বপালনকে লাটে ওঠায়; তারা যা ভাবে তা প্রকাশ করে না এবং যা করে তা ভাবে না। তারা প্রতিদিন তাদের খাবার খায়; তারা অসুস্থ না হলেও ডাক্তার ডাকে; তারা পাহাড়ে, সাগর সৈকতে সময় কাটাতে যায়; তারা ভাসাভাসা ভাবে সবকিছু করে থাকে; তারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে সবসময় উদ্বিগ্ন থাকে; কিন্তু তারা জাতীয় স্বার্থ নিয়ে চিন্তাই করে না। এটা হলো অধপতিত আমলাতন্ত্র।

২০. তারা খারাপ প্রবণতা পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকে এবং প্রতিক্রিয়াশীলতাকে উস্কে দেয়; তারা মন্দ লোকদের সাথে সংযোগ রাখে এবং খারাপ অবস্থাকে লাই দিতে থাকে; তারা খলনায়কীতে জড়িত থাকে এবং আইন ভাঙতে থাকে; তারা সন্দেহজনক হতে থাকে; তারা পার্টি ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকি; তারা গণতন্ত্রকে পিষতে থাকে; তারা কোন্দল করে এবং প্রতিশোধ নেয়, আইন ও বিধি ভাঙতে থাকে; তারা মন্দকে রক্ষা করে; তারা শত্রু ও মিত্রের মধ্যে পার্থক্য করে না। এটাই ভ্রান্ত প্রবণতা ও প্রতিক্রিয়াশীল আমলাতন্ত্র।

উৎস: Joint Publications Research Service, (ওয়াশিংটন, ডিসি)

অনুবাদ করা হয়েছে মার্কসবাদী ডট অর্গের ইংরেজি লেখা থেকে। লিংক এখানে

Leave a Comment

error: Content is protected !!