ভূমিকা: আমাদের চিরচেনা গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে, রাস্তার পাশে কিংবা পতিত জমিতে অযত্নে বেড়ে ওঠা অনেক গাছই আসলে ঔষধি গুণে ভরপুর। তেমনই একটি অতি পরিচিত অথচ অবহেলিত উদ্ভিদ হলো উচুন্টি। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ageratum conyzoides। যদিও আমরা একে অনেক সময় আগাছা হিসেবেই গণ্য করি, কিন্তু আধুনিক ভেষজ শাস্ত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
উচুন্টি-এর বর্ণনা:
উচুন্টি একটি একবর্ষজীবী এবং সুগন্ধী বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। এটি সাধারণত ৮০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর কাণ্ডটি ঋজু বা খাড়া এবং প্রস্থচ্ছেদ করলে দেখা যায় এটি গোলাকার। কাণ্ডের পুরো শরীর জুড়েই থাকে ছোট ছোট কণ্টক রোম (hairs), যা একে স্পর্শ করলে অনুভূত হয়।
পাতার বৈচিত্র্য: এই উদ্ভিদের পাতাগুলো ডিম্বাকার এবং দীর্ঘ বৃন্তযুক্ত। পত্রবৃন্তগুলোও রোমাবৃত থাকে। পাতার মাপ সাধারণত ২.০ থেকে ৬.৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ এবং ১ থেকে ৪ সেন্টিমিটার চওড়া হয়ে থাকে। পাতার শিরা বিন্যাস অনেকটা করতলাকার (palmate), যেখানে প্রধানত ৩টি শিরা দেখা যায়। পাতার কিনারাগুলো খাঁজকাটা বা দন্তুর এবং উভয় পৃষ্ঠই সূক্ষ্ম রোম দিয়ে ঢাকা থাকে।
পুষ্পমঞ্জরী ও ফুলের গঠন: উচুন্টির সৌন্দর্য ফুটে ওঠে এর শিরমঞ্জরী বা ‘Head’ ইনফ্লোরেন্সে।
- আকার ও বিন্যাস: ফুলগুলো ঘন সমভূমঞ্জরীতে সজ্জিত থাকে, যার ব্যাস ৩-৬ মিলিমিটার।
- রঙ: এর দলমণ্ডল সাধারণত সাদা, হালকা গোলাপি বা সাদাটে-নীল রঙের হয়, যা লম্বায় ২.০ থেকে ২.৫ মিমি।
- গর্ভদণ্ড: এর গর্ভদণ্ডীয় বাহুগুলো বেশ লম্বা (৩.৩-৫.০ মিমি) এবং এগুলো অনেক সময় দলমণ্ডলের মুখ ছাপিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
ফল ও বীজ (সিপসেলা): এর ফল বা সিপসেলা অনেকটা সংকীর্ণ আয়তাকার। এটি লম্বায় ১.০ থেকে ১.৫ মিমি এবং কৃষ্ণবর্ণের হয়। বীজের উপরিভাগ হালকা কৌণিক রোমাবৃত থাকে এবং এতে ৫টি মুক্ত শল্ক বা স্কেল দেখা যায়।
জেনেটিক তথ্য: বিজ্ঞানীদের মতে, উচুন্টির জেনেটিক গঠন বেশ বৈচিত্র্যময়। এর ক্রোমোসোম সংখ্যা সাধারণত ২n = ২০ অথবা ৪০ হয়ে থাকে।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
উচুন্টি গাছটি তার অভিযোজন ক্ষমতার জন্য পরিচিত। এটি খুব সাধারণ পরিবেশে যেমন টিকে থাকতে পারে, তেমনি বিশেষ কিছু ভৌগোলিক অঞ্চলেও এর আধিক্য দেখা যায়। নিচে এর আবাসস্থল এবং বংশ বিস্তারের প্রক্রিয়া বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
প্রাকৃতিক আবাসস্থল (Habitat): উচুন্টি মূলত মুক্ত ও উন্মুক্ত স্থানে জন্মাতে পছন্দ করে। সাধারণত যেসব জায়গায় এই গাছটি বেশি দেখা যায়:
- উন্মুক্ত ভূমি ও রাস্তার পার্শ্ব: পরিত্যক্ত জমি বা রাস্তার ধারের ঝোপঝাড়ে এটি প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে ওঠে।
- বনাঞ্চল: গৌণ বনাঞ্চল (Secondary forests) এবং অস্থায়ী বনাঞ্চলেও এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
- বিশেষ অঞ্চল: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উঁচু টিলা এবং চা-বাগানগুলোতে উচুন্টি প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। মাটির আর্দ্রতা এবং পর্যাপ্ত আলো একে দ্রুত বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।
ফুল ও ফল ধারণের সময়কাল (Flowering & Fruiting)
উচুন্টি গাছের জীবনচক্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর দীর্ঘ পুষ্পায়ন কাল। সাধারণত নভেম্বর মাস থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরের জুন মাস পর্যন্ত এই গাছে ফুল ও ফল দেখা যায়। এই সময়ে ছোট ছোট সাদা বা হালকা নীলচে ফুলের সমারোহে গাছটি পূর্ণ থাকে।
বংশ বিস্তার প্রক্রিয়া (Propagation)
এই উদ্ভিদটি মূলত বীজের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করে। এর সিপসেলা বা বীজগুলো খুবই হালকা হওয়ায় বাতাসের মাধ্যমে সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। উপযুক্ত আর্দ্রতা ও মাটির সংস্পর্শ পেলে বীজ থেকে দ্রুত নতুন চারা গজায়, যার ফলে খুব অল্প সময়েই একটি নির্দিষ্ট এলাকা উচুন্টি গাছে ছেয়ে যেতে পারে।
বিস্তৃতি:
উচুন্টি বা Ageratum conyzoides মূলত দক্ষিণ আমেরিকার আদি নিবাসী হলেও বর্তমানে এটি বিশ্বের সমস্ত উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে একটি পরিচিত নাম। বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়ায় এটি পরিত্যক্ত জমি, রাস্তার ধার এবং চা-বাগানের মতো স্যাঁতসেঁতে স্থানে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। সুগন্ধী এই একবর্ষজীবী বীরুৎটি সাধারণত ৮০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়, যার কাণ্ড ও ডিম্বাকার পাতাগুলো সূক্ষ্ম রোমাবৃত এবং কিনারা খাঁজকাটা। নভেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত এতে সাদা বা হালকা নীলচে রঙের ছোট ছোট ফুলের সমারোহ দেখা যায় এবং বীজের মাধ্যমে এটি দ্রুত বংশ বিস্তার করে। অনন্য উদ্ভিদতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এর ভেষজ গুণাগুণ একে সাধারণ আগাছা থেকে আলাদা করে এক বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে।
অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:
সাধারণ ও বাহ্যিক ব্যবহার: উচুন্টি গাছটি লোকজ চিকিৎসায় একটি অপরিহার্য নাম। এই উদ্ভিদের সম্পূর্ণ অংশই জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের শরীরের বাইরের অংশে ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যায়। এর পাতা মূলত রক্তস্রাবরোধী হিসেবে কাজ করে। শরীরের যেকোনো কাটা-ছেঁড়া বা ক্ষত এবং শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির ক্ষতে পাতার রস সরাসরি প্রয়োগ করা হয় যা দ্রুত নিরাময়ে সাহায্য করে।
জটিল রোগ ও চোখের সমস্যায়: দীর্ঘস্থায়ী আলসার এবং চোখের বিভিন্ন সমস্যায় উচুন্টির ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া এটি জরায়ুর বিভিন্ন জটিলতায় এবং স্ত্রী যোনীর অভ্যন্তরে পরিষ্কারক বা লোশন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চোখের যোজকত্বকের দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ (Conjunctivitis) কমাতে এর পাতার ঠাণ্ডা ক্বাথ দারুণ কাজ করে।
পাকস্থলী ও মূত্রাশয়ের চিকিৎসায়: পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যায় এই উদ্ভিদের রস জাদুকরী ভূমিকা রাখে। পেটের শুল বেদনা, ডায়রিয়া এবং গ্যাসের ব্যথায় এর রস বলবর্ধক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া আমাশয় নিরাময়ে মূলের রস একটি কার্যকর পথ্য। বিশেষ করে পাতার রসের সাথে মূলের রস মিশিয়ে সেবন করলে তা ডায়রিয়া নিরাময়ের পাশাপাশি মূত্রথলিতে পাথর (Urinary calculi) হওয়া প্রতিরোধ করে।
অন্যান্য বিশেষ ব্যবহার: উচুন্টি শিশুদের নিউমোনিয়া প্রতিকারেও বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া চর্মরোগ, বিশেষ করে কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসায় এর পাতার রস বেশ কার্যকর। এমনকি ধনুষ্টংকার প্রতিরোধে কান বা শরীরের ক্ষতস্থানে এই উদ্ভিদের নির্যাস ব্যবহারের বর্ণনা পাওয়া যায়।
ত্রিপুরা ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীর ব্যবহার: বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসী বা উপজাতীয় সংস্কৃতিতে উচুন্টি গাছের ব্যবহার অত্যন্ত গভীর। যেমন, ত্রিপুরা আদিবাসীরা প্রাচীনকাল থেকেই শরীরের যেকোনো কাটা স্থান বা ঘায়ের ক্ষত সারাতে উচুন্টি পাতার রসকে প্রধান ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। অন্যদিকে, খাসিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে লিভার বা যকৃতের ব্যথা উপশমে সম্পূর্ণ উচুন্টি গাছের ক্বাথ তৈরি করে পান করার ঐতিহ্যবাহী প্রচলন রয়েছে।
মনধা ও গারো জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও চিকিৎসা: মৌলভীবাজার জেলার মনধা জনগোষ্ঠী এই গাছটিকে ঘিরে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক বিশ্বাস লালন করে। তারা শিশুদের ক্ষতিকারক শয়তানী শক্তি বা কু-নজর থেকে রক্ষা করতে এই উদ্ভিদের শিকড় কবজ হিসেবে ব্যবহার করে। এছাড়াও তারা বিভিন্ন চর্মরোগ নিরাময়ে পুরো গাছের ক্বাথ ব্যবহার করে থাকে। আবার নেত্রকোনা, শেরপুর ও টাঙ্গাইল জেলার গারো উপজাতীয়রা ডায়রিয়া, পাকস্থলীর তীব্র ব্যথা এবং চর্মরোগের মতো শারীরিক সমস্যায় উচুন্টিকে একটি নির্ভরযোগ্য প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে গণ্য করে।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৬ষ্ঠ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) উচুন্টি প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে উচুন্টি সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
তথ্যসূত্র:
১. এ বি এম এনায়েত হোসেন (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৬ষ্ঠ, পৃষ্ঠা ২৮৬-২৮৭। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: J.M.Garg
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।