ভূমিকা: দিয়েন্দ লাকরাও (বৈজ্ঞানিক নাম: Actinodaphne obovata) হলো একটি বিশেষ প্রজাতির চিরহরিৎ বৃক্ষ, যা মূলত আর্দ্র ও ঘন বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠে। ভৌগোলিক অবস্থান বিচারে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্রজাতির গাছ প্রচুর পরিমাণে দেখা গেলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত বিরল ও দুষ্প্রাপ্য হিসেবে বিবেচিত। এই চিরসবুজ বৃক্ষটি তার নির্দিষ্ট গঠন এবং প্রাকৃতিক গুরুত্বের জন্য উদ্ভিদবিদদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত।
দিয়েন্দ লাকরাও-এর বর্ণনা:
দিয়েন্দ লাকরাও মূলত একটি ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি আকৃতির বৃক্ষ। এর কাণ্ডের উপরিভাগ বা বাকল ধূসরাভ-বাদামি বর্ণের হয়ে থাকে। এই গাছের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর কচি ডালপালা এবং উপশাখাগুলো তামাটে রঙের সূক্ষ্ম রোমে আবৃত থাকে। এর পাতার গঠন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়; দৈর্ঘ্যে ১৭.৫ থেকে ৪৫.৫ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থে ৬.২ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। পাতাগুলো বিডিম্বাকার বা উপবৃত্তাকার-আয়তাকার এবং এর অগ্রভাগ কখনও সূক্ষ্ম আবার কখনও স্থূল হয়। পাতলা ও চর্মবৎ এই পাতার উপরের অংশ উজ্জ্বল হলেও নিচের দিকটা অনেকটা নীলাভ-সাদা বা চকচকে দেখায়।
এর পুষ্পবিন্যাসেও চমৎকার ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। পুংপুষ্পগুলো সাধারণত ছোট ঝিল্লিময় খণ্ডবিশিষ্ট এবং খাটো নলযুক্ত হয়। অন্যদিকে, স্ত্রীপুষ্পগুলো প্যানিকেল আকৃতির রেসিম বিন্যাসে থাকে, যা তুলনামূলক লম্বা ও শক্ত পুষ্পবৃন্তিকা ধারণ করে। এই বৃক্ষের ফলগুলো উপবৃত্তাকার, যা দৈর্ঘ্যে ০.৬ থেকে ২.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। পরিপক্ক ফলগুলো একটি অখণ্ড পেয়ালা আকৃতির পুষ্পপুট নলের ওপর অবস্থান করে, যা গাছটিকে একটি স্বতন্ত্র রূপ দান করে।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
দিয়েন্দ লাকরাও মূলত আর্দ্র ও নিবিড় ছায়াযুক্ত পরিবেশে জন্মাতে পছন্দ করে। চিরহরিৎ বনের স্নিগ্ধ ও শীতল স্থানগুলো এই বৃক্ষের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে উপযোগী। প্রাকৃতিকভাবেই এই গাছের জীবনচক্র আবর্তিত হয়; সাধারণত মার্চ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত এই বৃক্ষে ফুল ও ফল ধারণের প্রক্রিয়া চলে। বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি পুরোপুরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, কারণ মূলত পরিপক্ক বীজের মাধ্যমেই এই প্রজাতিটি নতুন চারা উৎপাদন করে এবং বনের বিস্তৃতি ঘটায়।
দিয়েন্দ লাকরাও-এর বিস্তৃতি:
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে দিয়েন্দ লাকরাও মূলত হিমালয় সংলগ্ন এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বেশি দেখা যায়। ভারতের আসাম, মেঘালয়, সিকিম, মণিপুর এবং খাসিয়া পাহাড়ের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে এই বৃক্ষটি প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমায় এর উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। প্রধানত সিলেট জেলার পাহাড়ি ও আর্দ্র বনাঞ্চলেই এই বিরল প্রজাতির গাছটি টিকে আছে, যা একে এ দেশের পরিবেশের জন্য একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদে পরিণত করেছে।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৮ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) দিয়েন্দ-লাকরাও প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে এটি বিরল হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে দিয়েন্দ-লাকরাও সংরক্ষণের জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে উদ্ভিদটিকে এর প্রাপ্ত এলাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় খুঁজে বের করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এক্স-সিটু ও ইন-সিটু উভয় পদ্ধতিতেই এর সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেয়া বাঞ্চনীয়।
তথ্যসূত্র:
১. এম কে মিয়া (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৩৬-৩৩৭। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Rohit Naniwadekar
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।