ভূমিকা: প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় ভাণ্ডারে এমন অনেক উদ্ভিদ রয়েছে যা আমাদের অনেকের কাছেই অপরিচিত। এমনই একটি অনন্য আরোহী লতা হলো আকন্দফল লতা। এর শারীরিক গঠন এবং বৈশিষ্ট্য একে অন্যান্য লতা জাতীয় উদ্ভিদ থেকে আলাদা করেছে। আজ আমরা এই উদ্ভিদের বিস্তারিত পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানবো।
আকন্দফল-এর বর্ণনা:
আকন্দফল লতা একটি বৃহদাকার এবং মসৃণ আরোহী উদ্ভিদ। এর গোড়ার দিক বা পাদদেশ বেশ কাষ্ঠল প্রকৃতির হয়, যা একে শক্তভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। এর লতাগুলো বেশ দীর্ঘ হয়ে থাকে। এই উদ্ভিদের পাতাগুলো দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। পাতাগুলো করতলাকারে ৩ থেকে ৫টি খন্ডে বিভক্ত থাকে। পাতার পাদদেশ বা গোড়ার দিকটি অনেকটা হৃৎপিণ্ডাকার। পরিমাপের দিকে থেকে পাতাগুলো সাধারণত ৬-১৫ সেমি লম্বা এবং ৬-১৪ সেমি চওড়া হয়। পাতায় ৫ থেকে ৭টি স্পষ্ট শিরা লক্ষ্য করা যায়। একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, পাতার উপরের পৃষ্ঠের পাদদেশে দুটি গ্রন্থি থাকে এবং এর পত্রবৃন্ত ৫ থেকে ৮ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়। আকন্দফল লতার ফুলগুলো একলিঙ্গী (পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা)। এগুলো কাক্ষিক স্তবকে সজ্জিত থাকে এবং ফুলের রঙ সাধারণত সাদা হয়। পুষ্পবৃন্ত বেশ লম্বা হয়, যা প্রায় ১০-১৫ সেমি পর্যন্ত হতে পারে। এর বৃতি ঘণ্টার মতো দেখতে এবং পাপড়িগুলো বৃত্যংশ অপেক্ষা কিছুটা খাটো হয়। স্ত্রী পুষ্প: এর গর্ভাশয় অধিগর্ভ এবং এতে ৫টি বন্ধ্যা পুংকেশর থাকে। এগুলো পাদদেশে যুক্ত হয়ে একটি পাতলা ঝিল্লীময় পেয়ালার মতো গঠন তৈরি করে। পুং পুষ্প: এতে ৫টি পুংকেশর থাকে যা পাদদেশে যুক্ত। এর ফল দেখতে দীর্ঘায়ত ক্যাপসিউলের মতো, যার উভয় প্রান্ত কিছুটা সরু। ফলের ভেতরে অনেকগুলো বীজ থাকে। বীজগুলো দেখতে বৃক্কাকার (কিডনি আকৃতির) এবং কিছুটা চেপটা প্রকৃতির হয়।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
আকন্দফল লতা মূলত গৌণ অরণ্যের উন্মুক্ত স্থানে বেশি জন্মাতে দেখা যায়। যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাওয়া যায়, এমন বনাঞ্চলেই এটি দ্রুত বেড়ে ওঠে। বনের কিনারায় বা ঝোপঝাড়ে এটি অন্য গাছকে আশ্রয় করে আরোহণ করে। প্রকৃতির ঋতুচক্রের সাথে মিল রেখে এই উদ্ভিদে প্রাণ সঞ্চার হয়। সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই লতায় ফুল ফোটে এবং ফল ধরতে দেখা যায়। বর্ষার আর্দ্রতা এই উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য বেশ সহায়ক। আকন্দফল লতার বংশ বিস্তার মূলত বীজের সাহায্যে হয়ে থাকে। ফল পরিপক্ক হওয়ার পর তা থেকে বীজ সংগ্রহ করে নতুন চারা তৈরি করা হয়। অনুকূল পরিবেশ ও সঠিক আর্দ্রতা পেলে এর বীজ থেকে খুব সহজেই চারা গজায়।
বিস্তৃতি:
আকন্দফল লতা দক্ষিণ এশিয়ার একটি বিশেষ উদ্ভিদ। এটি মূলত ভারত এবং মায়ানমারে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। তবে সুসংবাদ হলো, বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই এই প্রজাতিটি কম-বেশি পাওয়া যায়। সাধারণত গ্রামীণ ঝোপঝাড় বা বনাঞ্চলের উন্মুক্ত স্থানে এদের দেখা মেলে।
ব্যবহার:
আকন্দফল লতা কেবল একটি বুনো লতা নয়, বরং এর রয়েছে বিশেষ ঔষধি ব্যবহার। প্রাচীনকাল থেকেই লোকজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার হয়ে আসছে।
- সর্পদংশনে ব্যবহার: এই উদ্ভিদের পাতা অত্যন্ত কার্যকর ভেষজ হিসেবে কাজ করে। পাতা থেকে প্রস্তুত করা পেস্ট বা প্রলেপ সর্পদংশনের (সাপের কামড়) চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তবে এটি ব্যবহারের পাশাপাশি দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) আকন্দফল প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে আকন্দফল সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
তথ্যসূত্র:
১. এম আহসান হাবীব (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৯, পৃষ্ঠা ৩৮১। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।