এশীয় হাতি এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও বিশাল আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী

এশীয় হাতি

বৈজ্ঞানিক নাম: Elephas maximus; সমনাম: নেই; বাংলা নাম: হাতি, হস্তি; হিন্দি নাম: হস্তি; ইংরেজি নাম: Asian Elephant, Indian Elephant.
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Animalia; বর্গ: Proboscidea; পরিবার: Elephantidae; গণ: Elephas; প্রজাতি: Elephas maximus Linnaeus, 1758

এশীয় হাতির বিবরণ

বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকায় হাতি সবচেয়ে বড় ও বিশাল আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী। এশীয় হাতি প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি, যার বিশাল দেহ এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গঠন একে অনন্য করে তুলেছে। এদের বিশালাকার মাথাটি দুটি গম্বুজের মতো আকৃতিবিশিষ্ট এবং ঘাড় বেশ খাটো। গাঢ় ধূসর রঙের এই প্রাণীর সারা দেহ ঢিলেঢালা চামড়া ও বিক্ষিপ্ত লোমে আবৃত। এদের পাগুলো থামের মতো মোটা ও সোজা, যার প্রতিটির তালুতে ৪ থেকে ৫টি করে নখর থাকে। একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ হাতি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৬.৫ মিটার এবং ওজনে ৩ টন পর্যন্ত হতে পারে, যা সাধারণত স্ত্রী হাতির তুলনায় আকারে বড়।

এই হাতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অঙ্গ হলো এর দীর্ঘ শুঁড় এবং নৌকার পালের মতো প্রশস্ত কান। নাসিকা ও উপরের ঠোঁট প্রসারিত হয়ে তৈরি হওয়া এই সংবেদী শুঁড়টি অত্যন্ত শক্তিশালী, যা খাবার ধরা বা আত্মরক্ষায় ব্যবহৃত হয়। এদের চোখ ছোট হলেও দৃষ্টিশক্তি বেশ তীক্ষ্ণ। পুরুষ হাতির ক্ষেত্রে ওপরের কর্তন দাঁতগুলো শুঁড়ের দুই পাশ দিয়ে গজদন্ত হিসেবে বেরিয়ে আসে, যা লম্বায় ১.৮ মিটার পর্যন্ত হতে পারে এবং এক জোড়া দাঁতের ওজন হতে পারে ৭২-৭৩ কেজি। তবে গজদন্তহীন পুরুষ হাতিও দেখা যায়, যাদের স্থানীয়ভাবে ‘মাখনা’ বলা হয়।

এশীয় হাতির লেজটি তুলনামূলক খাটো এবং এর শেষ প্রান্তে একগুচ্ছ ঘন লোম থাকে। স্ত্রী হাতি ও মাখনা হাতির মধ্যে পার্থক্য করার জন্য লেজের নিচের বিশেষ গঠন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এদের বিশাল কানগুলো কেবল শ্রবণশক্তির জন্যই নয়, বরং দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে। পাহাড় ও বনের গহীনে বিচরণকারী এই শান্ত অথচ শক্তিশালী প্রাণীটি তার বুদ্ধিমত্তা এবং দৈহিক বৈশিষ্ট্যের কারণে চিরকালই মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।

হাতির স্বভাব

এশীয় হাতি মূলত একটি অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী, যারা সাধারণত ৫ থেকে ৬০ বা তারও বেশি সদস্যের শক্তিশালী পালে বিচরণ করে। এই পালে মূলত পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী হাতি, তাদের সন্তান এবং তরুণ হাতিরা থাকে; অন্যদিকে পূর্ণবয়স্ক পুরুষ হাতিরা প্রায়ই একা থাকতে পছন্দ করে। গোসলপ্রিয় এই প্রাণীগুলো প্রখর রোদ থেকে বাঁচতে কাদার মধ্যে গড়াগড়ি খায় অথবা শুঁড়ের সাহায্যে গায়ে ধুলো ও পানি ছিটায়। খাবারের খোঁজে বা নিরাপত্তার প্রয়োজনে এরা শত শত বছর ধরে বনের নির্দিষ্ট ‘করিডোর’ বা পথ ব্যবহার করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। যদি কোনো কারণে এসব করিডোর বন্ধ হয়ে যায়, তখনই তারা খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে বা ফসলের ক্ষেতে প্রবেশ করে।

তৃণভোজী এই বিশালাকার প্রাণীর দৈনিক খাদ্যের চাহিদা বিশাল। একজন পূর্ণবয়স্ক হাতি প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কেজি ঘাস, বাঁশ, কলাগাছ, ফলমূল ও লতাগুল্ম গ্রহণ করে এবং এর সাথে ৮০ থেকে ২০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। প্রজনন মৌসুম মূলত মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত। স্ত্রী হাতি ৯ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে মা হতে পারে এবং দীর্ঘ ২২ মাস গর্ভধারণের পর সাধারণত একটি বাচ্চা প্রসব করে। জন্মের সময় একটি হাতি শাবক প্রায় ০.৯ মিটার উঁচু এবং ৯০ কেজি ওজনের হয়। শৈশবে বাচ্চাগুলো বেশ চঞ্চল থাকে এবং প্রায়ই মায়ের পেটের নিচ দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে।

বন্য পরিবেশে এশীয় হাতির জীবনচক্র ও টিকে থাকার লড়াই বেশ সুশৃঙ্খল। বাঘ বা সিংহের মতো শিকারি প্রাণী যখন হাতি শাবকের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন দলের বয়স্ক হাতিরা চারপাশ থেকে ঘিরে একটি দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করে। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো শিকারি প্রাণীর হাতে পূর্ণবয়স্ক হাতির বিপদে পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। পুরুষ হাতির বিচরণ এলাকা বা ‘হোম রেঞ্জ’ প্রায় ১৫ বর্গকিলোমিটার হলেও স্ত্রী হাতিদের ক্ষেত্রে তা ৩০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। প্রকৃতির এই বুদ্ধিমান ও সংবেদনশীল প্রাণীটি অনুকূল পরিবেশে প্রায় ৭০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

হাতির আবাসস্থল: হাতি মিশ্র পাতাঝরা বন ও আশপাশের গ্রাম, চিরসবুজ বন, অর্ধ-চিরসবুজ বন, ক্ষুদ্র ঝোপ, চা বাগান, তৃণভূমি, জলা, সাভানা ও নিচুভূমিতে বাস করে।

এশীয় হাতির বিস্তৃতি

বাংলাদেশে একসময় এই প্রজাতিটি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল, কিন্তু বর্তমানে এটি মূলত এমন অঞ্চলে সীমাবদ্ধ যেখানে মানুষের প্রবেশাধিকার তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের মিশ্র পাতাঝরা বনে পাওয়া যায়। তাছাড়া বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী পাতাঝরা বন ও আশপাশের গ্রামে বিস্তৃত। এককালে সিলেট ও মধুপুর বনে পাওয়া গেলেও এখন কেবল চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে পাওয়া যায়। মাঝে মধ্যে বন্য হাতি ভারত থেকে ময়মনসিংহের বালিজপুর ও দূর্গাপুর এবং সিলেটের পাথরিকায় প্রবেশ করে। এবং দেশের উত্তর-পূর্বে সিলেট বন বিভাগের অধীনে মৌলভীবাজার জেলার নতুন সমানবাগ এলাকায় আসে, যারা প্রতিবেশী ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয় এবং আসাম রাজ্য থেকে আসে।

এশীয় হাতির বিস্তৃতি ভারত, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, নেপাল, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, ক্যাম্পুচিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চীন (বন্য আবাসে বিলুপ্ত), ব্রনাই, ভূটান হয়ে দক্ষিণ-ও এশিয়ায়। এশিয় হাতি অতীতে হিমালয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীনের ইয়ানজি নদী পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল।

হাতির অর্থনৈতিক গুরুত্ব

বহু কাল থেকে হাতির দাঁতের ব্যবহার আইভরি শিল্পে প্রচলিত। কথিত আছে আইভরি শিল্পের প্রচলন শুরু হয়েছে খ্রিস্টাব্দের অনেক আগে এবং ভারতে ইন্ডাজ সভ্যতার সময়কালে (২৩০০-১৭৫০ খ্রিঃ পৃঃ)। বাংলাদেশে একবিংশ শতাব্দীতে সিলেট জেলায় আইভরি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। শাসকদের সিংহাসনের পায়া, আসবাব পত্র ও গীর্জা সজ্জায় এ শিল্পকলার অভিজ্ঞ কারিগরদের নিযুক্ত করা হতো। হাতি আবাদী ক্ষেতের শস্য যেমন কলা ও আখ পছন্দ করে বলে কোন কোন এলাকায় শস্যের জন্য এটি ক্ষতিকারক হতে পারে। বন্য হাতি মানুষের জন্য হুমকিস্বরুপ। শতাব্দীকাল যাবৎ হাতি গৃহপালিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন ধরনের নির্ভরযোগ্য কাজের জন্য হাতিকে পোষ মানানো যেতে পারে যেমন ড্রাফট এ্যানিমেল, শিকার ও ভারবাহী প্রাণী হিসেবে। হাতির দাঁত জুয়েলারি শিল্পসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিস প্রস্তুত করতে ব্যবহার করা হয়।

পরিবেশগত গুরুত্ব

এশিয় হাতি লবনের চাহিদা মেটাতে মাটি উল্টায়। এছাড়া এশীয় হাতি যেই অঞ্চলে বিচরণ করে সেই অঞ্চলে নতুন বনভূমি জন্মায়।

এশীয় হাতির বর্তমান অবস্থা

এশিয় হাতি পৃথিবীতে বিপন্ন (EN) প্রজাতি হিসেবে গণ্য। এশিয় হাতির আইইউসিএন স্পেসিস সারভাইভাল কমিশনের এশিয় হাতি বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাচ ৪১,৪১০–৫২,৩৪৫ বন্যহাতি জীবিত আছে। বাংলাদেশে এ হাতিকে মহাবিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে (IUCN Bangladesh. 2003)। এটি CTTES-এর পরিশিষ্ট ১ ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) (সংশোধিত) আইন ১৯৭৪ এর তৃতীয় তফসিলের অর্ন্তভূক্ত।

২০০৩ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী এশীয় হাতির বৈশ্বিক বিতরণে ভারতের আধিপত্য ছিল সবচেয়ে বেশি, যেখানে এদের সংখ্যা ছিল ২৬,৩৯০ থেকে ৩০,৭৭০টির মতো। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় ২,৫০০-৪,০০০টি, মিয়ানমারে ৪,০০০-৫,০০০টি এবং থাইল্যান্ডে ২,৫০০-৩,২০০টি হাতির উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় ২,৪০০-৩,৪০০টি এবং মালয়েশিয়ায় ২,১০০-৩,১০০টি হাতির আবাস ছিল। তবে বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে হাতির সংখ্যা ছিল আশঙ্কাজনকভাবে কম; সে সময় বাংলাদেশে এদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫০-২৫০টি, নেপালে ১০০-১২৫টি এবং ভিয়েতনামে ৭০-১৫০টির মতো।

অন্যদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাও পিডিআর-এ ৫০০-১,০০০টি, কম্বোডিয়ায় ২৫০-৬০০টি এবং ভুটানে ২৫০-৫০০টি হাতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। চীনেও এই সংখ্যা ছিল তুলনামূলক সীমিত, মাত্র ২০০-২৫০টির মতো। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হয় যে, এশীয় হাতির একটি বিশাল অংশ ভারত ও এর আশেপাশের অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকলেও অনেক দেশে এরা চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে ছিল। গত দুই দশকে এই সংখ্যার অনেক পরিবর্তন ঘটলেও ২০০৩ সালের এই হিসাবটি হাতির আঞ্চলিক বিন্যাস বুঝতে গবেষকদের আজও সহায়তা করে।

বর্তমান ২০২৪-২৬ সালের বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিবেদন ও বন্যপ্রাণী জরিপ অনুযায়ী, এশীয় হাতির সংখ্যার ক্ষেত্রে দেশভেদে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমানে বিশ্বে এশীয় হাতির সবচেয়ে বড় আবাসস্থল হলো ভারত, যেখানে এদের সংখ্যা প্রায় ২৭,০০০ থেকে ৩০,০০০-এর মধ্যে। এছাড়া শ্রীলঙ্কায় বর্তমানে ৫,৮০০ থেকে ৭,৫০০টি হাতি রয়েছে, যা ২০০৩ সালের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারে ২,০০০ থেকে ৫,০০০টি এবং থাইল্যান্ডে ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০টি বন্য হাতি টিকে আছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র মালয়েশিয়ায় ২,০০০ থেকে ৩,৫০০টি এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১,৫০০ থেকে ২,৮০০টি হাতি রয়েছে, যার মধ্যে সুমাত্রান হাতিরা বর্তমানে চরম অস্তিত্ব সংকটে। 

আঞ্চলিক অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে লাওসে ৫০০ থেকে ১,১০০টি, ভুটানে ৫০০ থেকে ৭০০টি এবং কম্বোডিয়ায় ৪০০ থেকে ৭০০টি হাতি রেকর্ড করা হয়েছে। নেপালে হাতির সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ১০০ থেকে ২৫০টিতে দাঁড়িয়েছে এবং চীনে এদের সংখ্যা ২৫০ থেকে ৩০০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশে বর্তমানে স্থায়ী বন্য হাতির সংখ্যা প্রায় ২৬৮টি, তবে পরিযায়ী হাতিসহ এই সংখ্যা ৩৬৩ পর্যন্ত হতে পারে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থা ভিয়েতনামে, যেখানে বর্তমানে মাত্র ৭০ থেকে ১৫০টি হাতি কোনোমতে টিকে আছে। সার্বিকভাবে, চোরাশিকার এবং বন উজাড়ের কারণে অনেক দেশেই এদের সংখ্যা পূর্বের তুলনায় হ্রাস পাচ্ছে।

বর্তমান সময়ে এশীয় হাতির অস্তিত্বের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলের বিনাশ, অবক্ষয় এবং বনভূমির খণ্ডায়ন। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে বনভূমি সংকুচিত হওয়ায় হাতিরা প্রায়ই খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে হানা দেয়, যার ফলে ফসলহানি ও ঘরবাড়ি ভাঙচুরের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এই ক্রমবর্ধমান ‘মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব’ প্রতি বছর শত শত মানুষ ও হাতির প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, যা উভয় পক্ষের জন্যই এক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।

সংরক্ষিত বনাঞ্চল কিংবা এর বাইরের এলাকা—সর্বত্রই হাতির দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ এখন এই প্রাণঘাতী সংঘাত নিরসনের ওপর নির্ভর করছে। আধুনিক সংরক্ষণ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মানুষ ও হাতির মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করা এবং এই দ্বন্দ্ব প্রশমন করাই এখন এশিয়ার বন্যপ্রাণী রক্ষার বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান ছাড়া প্রকৃতির এই বিশালাকার সংবেদনশীল প্রাণীটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব।

এশীয় হাতিরা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলে বসবাস করছে, যেখানে মানুষের সংখ্যা প্রতি বছর ১-৩% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশাল আকৃতি এবং ব্যাপক খাদ্যের চাহিদার কারণে হাতির জন্য বিশাল প্রাকৃতিক আবাসস্থলের প্রয়োজন হয়, যা এশিয়ার অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি। ফলে আবাসস্থল ধ্বংস বা খণ্ডিত হওয়ার প্রভাব এই প্রজাতির ওপর সবচেয়ে আগে এবং মারাত্মকভাবে পড়ে। বিশেষ করে যে অঞ্চলে কৃষিকাজই প্রধান পেশা, সেখানে হাতি ও মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আবাসস্থলের এই তীব্র সংকটের কারণে অনেক সময় হাতিরা মানুষের বসতি বেষ্টিত ছোট ছোট বনাঞ্চলে আটকা পড়ে যায়, যাকে ‘পকেটেড হর্ডস’ (Pocketed herds) বলা হয়। এই পরিস্থিতি মানুষ ও হাতির মধ্যকার সংঘাতের এক চরম ও ভয়াবহ রূপ। অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের সংকটাপন্ন হাতিদের উদ্ধার করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়, যার ফলে তারা তাদের স্বাভাবিক বন্য গোষ্ঠী থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছেদ কেবল একটি হাতির জীবনই বদলে দেয় না, বরং বন্য হাতির বংশবিস্তার ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও বড় ক্ষতি বয়ে আনে।

এশীয় হাতির অস্তিত্ব রক্ষার পথে চোরাশিকার আজও একটি অন্ধকার ও ভয়াবহ হুমকি হিসেবে টিকে আছে। যদিও চোরাকারবারিদের হাতে ঠিক কতগুলো হাতি প্রাণ হারিয়েছে এবং ঠিক কী পরিমাণ হাতির দাঁত বা অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার হয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তথ্যের এই ঘাটতি মূলত অবৈধ বাণিজ্যের গোপনীয়তা এবং দুর্গম বনাঞ্চলে নজরদারির অভাবের কারণেই ঘটে থাকে।

দামী গজদন্তের পাশাপাশি হাতির চামড়া এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ সংগ্রহ ও বিক্রির এই অশুভ তৎপরতা এশিয়ার অনেক দেশেই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। নির্ভরযোগ্য তথ্যের এই স্বল্পতা সত্ত্বেও এটি স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক বাজারে হাতির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চাহিদা এই রাজকীয় প্রাণীটিকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী হুমকিটি মোকাবিলা করা বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

কাঁটাতারের বেড়া

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে স্থাপিত কাঁটাতারের বেড়া বর্তমানে এশীয় হাতিদের জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল পর্যন্ত যে দীর্ঘ পথ ধরে হাতিরা যুগ যুগ ধরে অবাধে চলাচল করত, এই বেড়া সেই চিরচেনা পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে ভারতের মেঘালয় থেকে আসা পরিযায়ী হাতিরা এখন বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় আটকা পড়ে যাচ্ছে এবং নিজ আবাসে ফিরে যেতে পারছে না। অবাধ বিচরণের এই প্রতিবন্ধকতা হাতিদের জন্য চরম খাদ্য সংকট তৈরি করেছে। 

পাশাপাশি, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর অর্থায়নে পরিচালিত একক প্রজাতির বনায়ন (Monoculture afforestation) হাতিদের স্বাভাবিক চারণভূমি ও খাদ্য উৎস ধ্বংস করেছে। এছাড়া গারো পাহাড় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মানুষের বসতি স্থাপন এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব হাতির আদি আবাসস্থল ও করিডোরগুলোকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই ত্রিমুখী সংকটের ফলে—আবাসস্থল হারানো, খাদ্যের অভাব এবং আটকে পড়া—হাতিরা প্রায়ই লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। ২০১২ সালের এক ভয়াবহ ঘটনায় দেখা যায়, কেবল এক সপ্তাহেই গারো পাহাড় এলাকায় হাতিরা প্রায় ৬০০ বাড়িঘর ধ্বংস করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য হাতির চলাচলের করিডোরগুলো থেকে জনবসতি সরিয়ে নেওয়া এবং বন্য প্রজাতির উপযোগী প্রাকৃতিক বন পুনরায় গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

অন্যান্য মন্তব্য

হিন্দু সম্প্রদায় হাতির প্রতিমাকে দেবতা গণেশের মূর্তির মত ভক্তি করে, তানের মতে হাতির মাথা হচ্ছে সৌভাগ্যের দেবতা। হাতি পরস্পরের সাথে স্পর্শ, শব্দ ও গন্ধের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হাতি বিপদে পড়লে ও ভয় পেলে প্রাপ্তবয়স্ক হাতির কাছে চলে এসে শুঁড়ের ডগা প্রাপ্তবয়স্ক হাতির মুখে ঢুকিয়ে দেয়। তাছাড়া যোগাযোগের জন্য বিকট শব্দ করে। সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন হাতি ইনফ্রাসনিক লেভেলে একে অপরের সাথে কথা বলে।[২]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র:

১. এম কামরুজ্জামান, জুন ২০১১; বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, ২৭তম খণ্ড, স্তন্যপায়ী প্রাণী, প্রধান সম্পাদক, জিয়া উদ্দিন আহমেদ; সম্পাদকমণ্ডলী আবু তৈয়ব আবু আহমদ, সৈয়দ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর এবং মোনাওয়ার আহমাদ; বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৮-১০ আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. আমি [অনুপ সাদি] ১০ মার্চ ২০১২ তারিখে ‘Asian elephant is a critically endangered mammals in Bangladesh’ শিরোনামে একটি লেখা প্রাণকাকলি ব্লগে এবং পরে ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করি। বর্তমান লেখাটি শেষ লেখার অনুসরণে নতুন করে তথ্য সংযোজন ও সংস্করণ করে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment

error: Content is protected !!