তিলের মতাে তেলও (বৈজ্ঞানিক নাম: Sesamum indicum) উপকারী। তিলের তেল ভারী, বলপ্রদ, মল নিষ্কাষণ করে, মৈথুন শক্তি বৃদ্ধি করে, স্বচ্ছ, রস তথা পাকে মধুর, সূক্ষ্ম, কটু, বায়ু ও কফ দূর করে, উষ্ণবীর্য, স্পর্শে শীতল, পুষ্টিদায়ক, শরীরের দোষ দূর করে, মল ও মূত্র নিয়ন্ত্রণ করে, গর্ভাশয় পরিস্কার করে, খিদে বাড়ায়, বুদ্ধি বৃদ্ধি করে, পবিত্রভাব পুরাে শরীরে তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে, ব্রণ ও ডায়াবেটিস সারিয়ে দেয়, তিলের তেল শরীরে মাখলে শরীর হালকা হয়, ত্বক, চুল এবং চোখের পক্ষে হিতকর। এই তেল নাকেও দেওয়া যায়; সবেতেই তিলের তেল উপকারী। চরকের মতে তিলের তেল বল বৃদ্ধি করে, ত্বকের পক্ষে ভাল, গরম, স্থিরতা প্রদান করে এবং যােনি শােধন করে।
তেল তৈরি:
তিল ঝেড়ে ধুলা ও গুড়া পরিষ্কার করতে হয়। পরিষ্কৃত তিলকে ঘানিতে ভাঙ্গলে তৈল হয়। তৈল ভারতবর্ষ হইতে বহু পরিমাণে বিদেশে রপ্তানী হয়। এরপরে তিলের খইল গরুতে খাইলে উহার দুধ বৃদ্ধি হয়। অন্য খইল অপেক্ষা তিলের খইল গরুতে ভাল খায়।
তেলের ব্যবহার:
তিলের তেল ছবি আঁকবার জন্য ব্যবহৃত হয়। ইহা সাবান প্রস্তুত, শরীরে মালিশ, ও জ্বালানের জন্য ব্যবহৃত হয়। বাদামের তৈল ও ঘৃতের সাথে তিল তেল ভেজাল দেয়। বিদেশ হতে যে অলিভ অয়েল আমদানী হয় তাহাতে তিল তৈল মিশ্রিত থাকে। তিল তৈল হইতে অনেক সুগন্ধি তৈল প্রস্তুত হয়, এই তৈলের সহিত গোলাপ, বেল, বকুল, প্রভৃতি পুষ্প মিশ্রিত করিয়া সুগন্ধি তৈল প্রস্তুত করে।
তিলের তেল-এর প্রয়োগ:
১. খাবার হিসেবে তেল: অলিভ অয়েলের চেয়ে তিল তেলের উপকারিতা তা পুষ্টিগুণ কিছু কম নয় । স্বাদের দিক থেকে বরঞ্চ অলিভ অয়েলের চেয়ে তিলের তেলই বেশি ভাল।
২. বিভিন্ন পোড়া ঘায়ে: নানা রকমের ক্ষত, আঘাত, পুড়ে যাওয়া, মাড়িয়ে যাওয়া, ভেঙে যাওয়া ইত্যাদিতে তিলের তেল অত্যন্ত উপকারী। শরীরের পুড়ে যাওয়া জায়গায় তিলের তেলকে গরম করে লাগালেও আশ্চর্য সুফল পাওয়া যায়।
৩. ব্যথা নিরাময়ে: তিলের তেলের মধে রসুনের কোয়া দিয়ে গরম করে কানে দিলে কানের ব্যথা সেরে যায়। এছাড়াও তিলের তেল মস্তিষ্ক বেদনা, যােনির ব্যথা দূর করে।
৪. জোড়ার ব্যথা নিরাময়ে: হিং আর শুঠের গুড়ো মিশিয়ে গরম করা তিলের তেল মালিশ করলে কোমরের ব্যথা, জোড়ের ব্যথা, কোনো অঙ্গ আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি রোগের প্রশমন হয়। রাই, যোয়ান, শুঠ, রসুন বা হিং দিয়ে গরম করা তেল মালিশ করলে এবং তার সঙ্গে গরম সেঁক দিলে জোড়ের (গাঁটের) ব্যথা কমে যায়। তিল তেলের আর একটা বিশেষ গুণ এই তেল বাতঘ্ন অথাৎ বাত সারিয়ে দেয়। রিউমেটিমি ছাড়া অন্য সন্ধি বাতে সুফল পাওয়া যায়।
৫. শূল ব্যথায়: শূল ব্যথায় শুঁঠ ও হিং মেশানো তেল মালিশ করলে তাড়াতাড়ি আরাম পাওয়া যায়।
৬. ত্বকের উজ্জ্বলতায়: তেল একটু গরম করে রোজ মালিশ করলে এক মাসের মধ্যেই নিষ্প্রভ বা জৌলুষহীন ত্বকে উজ্জ্বলতা এসে যায়, সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, চুলকানি সেরে যায়। তিলের তেল সারা শরীরে তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে এবং তাড়াতাড়ি হজম হয় এবং শরীরকে নিরোগ রাখে।
৭. গোড়ালি বা হাত পা ফাটায়: মোম আর নুন মিশিয়ে গরম করা তেল লাগালে ফাটা গোড়ালিতে উপকার পাওয়া যায়। শীতকালে ফাটা হাত-পা এমনকী গাল বা ঠোঁটে তিলের তেল লাগালে উপকার হয়।
৮. দাঁত মজবুত করতে: তিল তেল মুখে দশ পনেরো মিনিট রেখে কুলকুচো করে ফেলে দিলে নড়ে যাওয়া দাঁতও মজবুত হয়ে যায় এবং পাইয়োরিয়া (দাঁতের অসুখ) সেরে যায়।
৯. বন্ধ নাক খুলতে: পেষা গোলমরিচ বা পেষা যোয়ান মিশিয়ে গরম করা তেল নাকে দিলে, শুকলে বা মালিশ করলে বন্ধ নাক খুলে যায়।
১০. পায়খানা ঠিক করতে: তিলের তেল মলকে বদ্ধ করে এবং পুরোনো জমে থাকা মল বাইরে বের করে দেয়। এইভাবে এই তেলের মল রোধ পরস্পর-বিরোধী গুণ রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা,৪৬-৪৯।
- তিলের তেল-এর দশটি উপকারিতা
- কুতি কালাই বর্ষজীবী বিরুত ডাল জাতীয় শস্য
- যব নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের ভেষজ গুণসম্পন্ন খাদ্যশস্য
- মুগ ডাল সহজ, সস্তা ও পুষ্টিকর খাদ্যশস্য
- ভুট্টার আটটি ব্যবহার ও খাদ্যগুণের বিস্তারিত বিবরণ
- সাল্টু বা এমোনিয়াম সালফেট এবং ইউরিয়া সার ব্যবহৃত হচ্ছে খাদ্য নরম করতে
- অড়হর ডাল খাওয়ার কয়েকটি ঔষধি গুণ ও উপকারিতা
- কাউন বা কাওন পৃথিবীর সর্বত্র চাষাবাদকৃত খাদ্যশস্য
- জোয়ার বা জওয়ার বিশ্বব্যাপী চাষাবাদকৃত খাদ্যশস্য
- গম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ খাদ্যশস্য
- গম খাওয়ার উপকারিতা ও আটারবহুবিধ ব্যবহার
- যব খাওয়ার ১২টি উপকারিতা, রেসিপি ও নিয়ম
- ভুট্টা বিশ্বের উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের শস্য
- ছোলা জনপ্রিয় ডাল জাতীয় খাদ্যশস্য
- মসুর ডাল খাদ্যশস্যটির কুড়িটি উপকারিতা ও ঔষধি গুণাগুণ
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।