তেলাকুচা প্রকৃতির লতানো বীরুৎ ও এর বহুমুখী ভেষজ ওষধি গুরুত্ব

তেলাকুচা

বৈজ্ঞানিক নাম: Coccinia grandis (L.) Voigt, Hort. Suburb. Calc.: 59 (1845). সমনাম: Bryonia grandis L., Coccinia cordifolia auct. non (L.) Cogn., Coccinia indica Wight & Arn., Cephalandra indica Naud. সাধারণ নাম: lvy Gourd, Scarlet Fruited Gourd. আদিবাসি নাম: তেলাকুচা শাগ, কুচিলা (চাকমা), বিম্বি (ত্রিপুরা)। বাংলা নাম: তেলাকুচা, কুচিলা, তেলা, তেলাকচু, তেলাহচি, তেলাচোরা, কেলাকচু, তেলাকুচা, বিম্বী, কাকিঝিঙ্গা, কাওয়ালুলি, কান্দুরি, কুচিলা।
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae – Plants উপরাজ্য: Tracheobionta – Vascular plants অধিবিভাগ: Spermatophyta – Seed plants বিভাগ: Magnoliophyta – Flowering plants শ্রেণী: Magnoliopsida – Dicotyledons উপশ্রেণি: Dilleniidae বর্গ: Violales পরিবার: Cucurbitaceae – Cucumber family গণ: Coccinia Wight & Arn. – coccinia প্রজাতি: Coccinia grandis (L.) Voigt- ivy gourd.

তেলাকুচা কেবল আগাছা নয়, বরং এক অমূল্য ভেষজ সম্পদ। এর ১৩টি প্রধান ওষধি গুণ, তিক্ত প্রজাতির বিশেষ ব্যবহার এবং প্রাচীন সাহিত্যে এর জয়গান—সব মিলিয়ে এটি আমাদের প্রকৃতির এক অনন্য দান। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে শ্বাসকষ্ট নিরাময় পর্যন্ত তেলাকুচার বহুমুখী ব্যবহার একে অন্য সব লতানো উদ্ভিদের থেকে আলাদা করেছে।

তেলাকুচা (Scientific Name: Coccinia grandis) হলো কিউকারবিটাসি বা শসা-লাউ পরিবারের সিট্রালাস গণের একটি বহুবর্ষজীবী আরোহী বীরুৎ জাতীয় লতা। এর কাণ্ড বেশ নরম ও দুর্বল হলেও আকর্ষীর সাহায্যে এটি কোনো অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে ওপরের দিকে বেড়ে ওঠে। তেলাকুচার পাতাগুলো সরল, একান্তর এবং দেখতে অনেকটা করতলাকার বা পাঁচকোণা। পাতাগুলো বহুশিরাযুক্ত এবং এর ব্যাস প্রায় ৫ ইঞ্চির মতো হয়; পাতার কিনারাগুলো করাতের ছোট দাঁতের মতো খাঁজকাটা থাকে। মজার বিষয় হলো, প্রতিটি পাতার ঠিক বিপরীত পাশেই একটি করে আকর্ষী অবস্থান করে।

তেলাকুচার ফুলের গঠনও বেশ চমৎকার। এর ফুলের বোঁটা সাধারণত এক ইঞ্চি লম্বা হয়, তবে যেসব ফুলে ফল ধরে সেগুলোর বোঁটা কিছুটা ছোট অর্থাৎ আধ ইঞ্চির মতো হয়ে থাকে। এর ফলগুলো দেখতে অনেকটা ছোট পটল বা আমড়া ঝাঁটি পটলের মতো, লম্বায় সাধারণত দেড় থেকে দুই ইঞ্চি হয়। কাঁচা অবস্থায় ফলগুলো সবুজ রঙের এবং গায়ে সাদা ডোরাকাটা দাগ থাকে, তবে পাকলে তা টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করে। ফলের উপরিভাগ বেশ মসৃণ বা তেলতেলে হওয়ার কারণেই হয়তো এর নাম হয়েছে ‘তেলাকুচা’।

স্বাদে এই ফল অত্যন্ত তিক্ত বা তিতা। কাঁচা বা পাকা কোনো অবস্থাতেই এই ফল খাওয়া যায় না, কারণ এর শাঁস খেলে বমি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে প্রচুর বীজ থাকে যা অনেক পাখির অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। তবে ফল অখাদ্য হলেও বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক অঞ্চলে তেলাকুচার কচি ডাঁটা ও পাতার ঝোল বা চচ্চড়ি বেশ জনপ্রিয় এবং উপাদেয় খাবার হিসেবে সমাদৃত।

শারীরিক গঠন ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

তেলাকুচার শারীরিক গঠন বেশ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এর কাণ্ড সরু হলেও কিছুটা কাষ্ঠল এবং এটি প্রচুর শাখা-প্রশাখায় সমৃদ্ধ। কাণ্ডগুলো সাধারণত কোণাকার এবং রোমহীন বা মসৃণ প্রকৃতির হয়। এর লতার আকর্ষগুলো সরল ও রৈখিক, যা কোনো অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরতে সাহায্য করে। তেলাকুচার পাতাগুলো কখনো অখণ্ড, আবার কখনো করতলাকারে খণ্ডিত হয়; এগুলো লম্বায় প্রায় ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাতার নিচের অংশ বেশ চকচকে ও গ্রন্থিময় এবং এর সরু বোঁটাগুলো সাধারণত ২ থেকে ৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ হয়। উদ্ভিদতাত্ত্বিক দিক থেকে তেলাকুচা একটি ‘ভিন্নবাসী’ (Dioecious) উদ্ভিদ, যার অর্থ এর পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা আলাদা গাছে ফুটে থাকে।

পুষ্পমঞ্জরী ও ফুলের গঠন

তেলাকুচার পুংপুষ্প বা পুরুষ ফুলের গঠন বেশ বৈচিত্র্যময়। এর মঞ্জরী দণ্ডটি অর্ধ-সূত্রাকার এবং সামান্য খাঁজযুক্ত হয়, যা লম্বায় প্রায় ২ থেকে ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফুলের বৃতিনলটি প্রশস্ত ও অনেকটা ঘণ্টাকার, যার দৈর্ঘ্য ৪ থেকে ৫ মিলিমিটার। এর প্রতিটি খণ্ড রৈখিক-ভল্লাকার এবং প্রায় ৩ মিলিমিটার দীর্ঘ। তেলাকুচার দলমণ্ডল সাধারণত সাদা বা হালকা হলদেটে রঙের হয়, যা ২.৫ থেকে ৩.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। দলমণ্ডলের প্রতিটি খণ্ড দেখতে ডিম্বাকার; এর বাইরের দিকটি মসৃণ বা রোমহীন হলেও ভেতরের অংশটি সূক্ষ্ম রোমে ঢাকা থাকে। একটি পুরুষ ফুলে মোট ৩টি পুংকেশর থাকে, যার পুংদণ্ড ২ থেকে ৩ মিলিমিটার লম্বা হয়। এর পরাগধানীগুলো অর্ধ-গোলাকার এবং ৬ থেকে ৭ মিলিমিটার দীর্ঘ। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, তেলাকুচার পুংদণ্ড ও পরাগধানী একে অপরের সাথে যুক্ত থাকে।

তেলাকুচার স্ত্রী-পুষ্পের গঠন বেশ সূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট। এর পুষ্পমঞ্জরী দণ্ডটি বেশ সরু হয়, যা লম্বায় ১ থেকে ৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই ফুলে তিনটি বন্ধ্যা পুংকেশর থাকে যা দেখতে অনেকটা তুরপুণ বা সুঁচালো আকৃতির (তুরপুণাকার); এর গোড়ার অংশটি থাকে বেশ অতিরোমশ। তেলাকুচার গর্ভাশয়টি মূলাকার এবং এটি ১২-১৫ মিলিমিটার লম্বা ও ৩-৪ মিলিমিটার পুরু হয়। এর গর্ভদণ্ডটি সরু ও সম্পূর্ণ মসৃণ (রোমহীন), যার দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ৭ মিলিমিটার। ফুলে মোট তিনটি গর্ভমুণ্ড থাকে যেগুলো ঘন পিড়কাযুক্ত এবং প্রায় ৫ মিলিমিটার দীর্ঘ হয়ে থাকে।

তেলাকুচার ফলের গঠন অনেকটা অর্ধ-গোলাকার এবং এর উভয় প্রান্তই গোলাকার হয়। একটি আদর্শ ফল সাধারণত লম্বায় ৫ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ২.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকলেও পাকার পর ফলের ভেতরের রসালো অংশটি টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করে। এর বীজগুলো দীর্ঘায়ত ও হলুদাভ রঙের, যার মাপ প্রায় ৬-৭ মিলিমিটার লম্বা এবং ২.৫-৪ মিলিমিটার চওড়া। বীজের শীর্ষভাগ গোলাকার হলেও এর গোড়ার অংশে দুটি গভীর দাগ স্পষ্ট দেখা যায়। সাধারণত মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তেলাকুচার ফুল ও ফল ধারণের প্রক্রিয়া চলে।

আবাসস্থল ও চাষাবাদ

তেলাকুচা সাধারণত প্রকৃতিগতভাবেই জন্মে থাকে। এটি কোনো নির্দিষ্ট যত্নের অপেক্ষায় না থেকে বাগানের বেড়া, তৃণভূমি, রাস্তার ধার, ঝোপঝাড় কিংবা বনভূমিতে কোনো বড় গাছকে আশ্রয় করে লতানো বীরুৎ হিসেবে বেড়ে ওঠে।

এর বংশবিস্তার প্রধানত দুইভাবে হয়—পরিণত বীজ থেকে এবং লতার শাখা কলমের মাধ্যমে। বছরের প্রায় বারো মাসই এই লতাগাছে ফুল ও ফল দেখা যায়। তবে শীতকালে এর বৃদ্ধি এবং ফলন কিছুটা কমে যায়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, তেলাকুচা ভিন্নবাসী উদ্ভিদ হওয়ায় এর সব ফুলে ফল ধরে না; কেবল স্ত্রী-পুষ্প থেকেই ফল উৎপন্ন হয়।

ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও আদিনিবাস

তেলাকুচার আদি উৎসস্থল হলো মধ্য আফ্রিকা। তবে কালক্রমে এর বিস্তার ঘটেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশ ছাড়াও এশিয়া মহাদেশের চীন, ভারত, জাপান, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানে এই লতানো উদ্ভিদটি প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। আমাদের বাংলাদেশেও এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি উদ্ভিদ এবং দেশের প্রায় সর্বত্রই একে লতানো অবস্থায় জন্মাতে দেখা যায়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও বহুমুখী ব্যবহার

তেলাকুচার অর্থনৈতিক ব্যবহার ও এর উপযোগিতা অত্যন্ত ব্যাপক। খাদ্য হিসেবে এর কচি ডাঁটা বা কাণ্ড সবজি হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। এর ফল সংরক্ষণের জন্য বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়; সাধারণত ফার্মেন্টেশন (গাঁজন) ও ডিহাইড্রেশনের (জলবিয়োজন) মাধ্যমে ফালি করে কেটে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব।

ভেষজ চিকিৎসা ও জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে তেলাকুচার ভূমিকা অপরিসীম। এর মূল, কাণ্ড ও পাতা প্রক্রিয়াজাত করে চর্মরোগ, শ্বাসনালীর প্রদাহ এবং বহুমূত্র (ডায়াবেটিস) রোগ নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকর ওষুধ তৈরি করা হয়। ভারতের ছোট নাগপুর অঞ্চলের মুন্ডা আদিবাসীদের মধ্যে কানের ব্যথা উপশমে তেলাকুচা গাছের রসের সাথে সরিষার তেল মিশিয়ে ব্যবহারের এক প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ডে তেলাকুচার কচি ফল দিয়ে সুস্বাদু স্যুপ তৈরির প্রচলন আছে। মূলত এই লতানো উদ্ভিদটির ফল, পাতা, লতা এমনকি মূলের রসও ওষধি গুণাগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি জনস্বাস্থ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ

‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’-এর ৭ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) তেলাকুচা (বা বিম্বফল) প্রজাতিটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই উদ্ভিদটি বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো ধরনের অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন নয় এবং এটি ‘আশঙ্কামুক্ত’ (Least Concern) হিসেবে বিবেচিত।

প্রকৃতিতে এই লতাটি প্রচুর পরিমাণে জন্মানোর কারণে বর্তমানে এটি সংরক্ষণের জন্য বিশেষ কোনো সরকারি বা বেসরকারি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন নেই বলে উক্ত গ্রন্থে প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশে এর সহজলভ্যতা এবং টিকে থাকার সক্ষমতা একে একটি সুরক্ষিত প্রজাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তেলাকুচার ভেষজ গুণাগুণ ও প্রতিকার

১. সর্দি প্রতিরোধে: ঋতু পরিবর্তনের সময় হওয়া সর্দি বা শ্লেষ্মার আক্রমণ প্রতিহত করতে তেলাকুচা অত্যন্ত কার্যকর। ৪-৫ চা-চামচ তেলাকুচা পাতা ও মূলের রস হালকা গরম করে সকালে ও বিকেলে সেবন করলে সর্দির ভয় থাকে না। রস তৈরির সময় খেয়াল রাখবেন, পাতার ওজনের চারভাগের একভাগ (সিকি পরিমাণ) মূল ব্যবহার করা শ্রেয়।

২. অধোগত রক্তপিত্ত উপশমে: শরীরে কোনো জ্বালা-যন্ত্রণা নেই, অথচ টাটকা রক্ত পড়ছে এবং অর্শের কোনো লক্ষণও স্পষ্ট নয়—এমন ক্ষেত্রে তেলাকুচা দারুণ কাজ করে। ৩ চা-চামচ তেলাকুচা মূল ও পাতার রস হালকা গরম করে সেবন করলে মাত্র ২-৩ দিনের মধ্যেই রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়।

৩. আমাশয়জনিত শোথ (পা ফোলা) দূর করতে: যাঁদের নিয়মিত আমাশয় লেগে থাকে এবং দীর্ঘক্ষণ পা ঝুলিয়ে রাখলে ফুলে যায়, তাঁদের জন্য তেলাকুচা বেশ কার্যকর। ৩-৪ চা-চামচ তেলাকুচা মূল ও পাতার রস প্রতিদিন একবার করে সেবন করলে পায়ের ফোলা ভাব দ্রুত কমে যায়। তবে মনে রাখা জরুরি, মূল রোগ অর্থাৎ আমাশয়ের স্থায়ী চিকিৎসা না করলে এই ফোলা ভাব পুনরায় ফিরে আসতে পারে।

৪. পাণ্ডু রোগে (অতিরিক্ত শ্লেষ্মাজনিত): শ্লেষ্মার আধিক্যের কারণে পাণ্ডু বা জন্ডিস সদৃশ উপসর্গ দেখা দিলে তেলাকুচা মূলের রস ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

৫. শ্লেষ্মাজনিত জ্বরে: শ্লেষ্মার কারণে হওয়া জ্বরে তেলাকুচা পাতা ও মূল অত্যন্ত কার্যকর। এক্ষেত্রে পাতা ও মূল একসঙ্গে থেঁতো করে ২-৩ চা-চামচ রস বের করে নিতে হবে। এই রস সামান্য গরম করে সকালে ও বিকেলে দুইবার করে টানা দুই দিন সেবন করলে জ্বর সেরে যায়। সাধারণত এই ধরনের জ্বরে মুখে প্রবল অরুচি দেখা দেয়, এমনকি অনেকের মুখে ঘা বা ‘জ্বরঠুঁটো’ও বের হয়; তেলাকুচার রস এসব উপসর্গ কমাতেও সাহায্য করে।

৬. শ্বাসকষ্ট বা সর্দিজনিত হাঁপানিতে: যদি বুকে সর্দি বসে যাওয়ার কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয় (যেখানে বংশগত হাঁপানি বা একজিমার ইতিহাস নেই), তবে তেলাকুচা দারুণ কাজ করে। এক্ষেত্রে তেলাকুচা পাতা এবং তার চারভাগের একভাগ (সিকি পরিমাণ) মূল একসঙ্গে থেঁতো করে ৩-৪ চা-চামচ রস বের করে নিতে হবে। এই রস সামান্য গরম করে সেবন করলে বুকে জমাটবদ্ধ সর্দি তরল হয়ে বেরিয়ে আসে এবং শ্বাসকষ্টের উপশম হয়।

৭. শ্লেষ্মাজনিত কাশিতে: যদি কাশিতে কফ বা শ্লেষ্মা উঠতে খুব কষ্ট হয় এবং বুক ভার হয়ে থাকে, তবে তেলাকুচা দারুণ উপকারে আসে। এক্ষেত্রে ৩-৪ চা-চামচ তেলাকুচা মূল ও পাতার রস হালকা গরম করে নিন। রস ঠান্ডা হলে তার সাথে আধা চা-চামচ মধু মিশিয়ে (সম্ভব হলে) সেবন করলে জমে থাকা শ্লেষ্মা তরল হয়ে বেরিয়ে আসে এবং কাশির কষ্ট দ্রুত প্রশমিত হয়।

৮. আসন্ন জ্বর ভাব ও কফজনিত সমস্যায়: যদি শরীরে জ্বর আসার পূর্বলক্ষণ যেমন—মাথা ভার হওয়া বা সারা শরীরে ব্যথা অনুভূত হয়, তবে কাঁচা তেলাকুচা ফলের রস অত্যন্ত কার্যকর। ১ চা-চামচ কাঁচা ফলের রসের সাথে সামান্য মধু মিশিয়ে সকালে ও বিকেলে দুইবার সেবন করলে জ্বরভাব কেটে যায়। এর ফলে অনেক সময় সামান্য বমি হয়ে তরল শ্লেষ্মা বেরিয়ে আসতে পারে, যা শরীরকে হালকা বোধ করতে সাহায্য করে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী, এই প্রতিকারটি মূলত তাঁদের জন্য কার্যকর যাঁদের শরীরে কফের প্রবণতা এবং সেই সাথে ডায়াবেটিস রয়েছে। এই ধরনের রোগীদের শারীরিক গঠন সাধারণত থপথপে বা ফ্যাকাসে হয় এবং ত্বকের কোমল অংশে ফোঁড়া হওয়ার প্রবণতা থাকে। এঁদের মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি প্রবল আকর্ষণ থাকে। আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যায় আক্রান্তদের জন্য আলু, মিষ্টি এবং অতিরিক্ত ভাত খাওয়া এড়িয়ে চলা জরুরি।

৯. জরুরি প্রয়োজনে বমন (বমি) করাতে: অনেক সময় শরীরে এমন কিছু প্রবেশ করে বা খাওয়া হয় যা পেট থেকে বের করে দেওয়ার জন্য বমি করানোর প্রয়োজন পড়ে। এই ধরনের জরুরি অবস্থায় তেলাকুচা পাতার ৫-৬ চা-চামচ কাঁচা রস (গরম না করে) সেবন করলে দ্রুত বমন বা বমি হয়ে থাকে, যা পেট পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। 

১০. সর্দিজনিত অরুচি দূর করতে: সর্দি বা শ্লেষ্মাবিকারের কারণে মুখে অরুচি দেখা দিলে তেলাকুচা পাতা অত্যন্ত কার্যকর। এক্ষেত্রে তেলাকুচা পাতা সামান্য সেদ্ধ করে জল ফেলে দিতে হয়। এরপর সেই সেদ্ধ পাতা ঘি দিয়ে সাঁতলে শাকের মতো রান্না করে খেলে মুখের অরুচি দ্রুত কেটে যায় এবং খাবারের প্রতি রুচি ফিরে আসে।

১১. বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে: অনেকের ধারণা তেলাকুচা পাতার রসে ডায়াবেটিসের সুফল পাওয়া যায় না, তবে আয়ুর্বেদ মতে সঠিক নিয়ম মেনে সেবন করা জরুরি। ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগের ক্ষেত্রে তেলাকুচার পাতা ও মূলের রস ৩ চা-চামচ করে মিশিয়ে সামান্য গরম করে সকালে ও বিকেলে দুইবার সেবন করতে হবে। এই নিয়ম মেনে ৩-৪ দিন নিয়মিত খেলে শারীরিক সুস্থতা ও চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন অনুভব করা যায়।

১২. স্তন্যদুগ্ধ বৃদ্ধিতে: সন্তান জন্মদানের পর যদি কোনো মায়ের স্তনে পর্যাপ্ত দুধ না থাকে এবং শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যায়, তবে তেলাকুচা ফল বিশেষ উপকারে আসে। এক্ষেত্রে কাঁচা সবুজ তেলাকুচা ফলের রস সামান্য গরম করে ছেঁকে নিতে হবে। সেই রস থেকে ১ চা-চামচ নিয়ে তাতে ২-৫ ফোঁটা মধু মিশিয়ে সকালে ও বিকেলে দুইবার সেবন করলে সাধারণত ৪-৫ দিনের মধ্যেই স্তনে দুধের সঞ্চার হয়।

১৩. শ্লেষ্মাজনিত অপস্মার (Epilepsy) রোগে: যদি অপস্মার বা মৃগী রোগের কারণ শ্লেষ্মা হয়ে থাকে, তবে তেলাকুচা লতার রস ব্যবহারে সুফল পাওয়া যেতে পারে। এই ধরনের রোগীদের বিশেষ লক্ষণ হলো—রোগাক্রমণের সময় রোগী অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রস্রাব করে ফেলে এবং সাধারণত দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটার সময় আক্রমণ হয় না। মূলত খাওয়ার পর ঘুমানোর সময় বা খুব ভোরে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং মুখ দিয়ে কোনো লালা বা গাঁজলা বের হয় না। রোগটি দীর্ঘদিনের বা পুরাতন হলে নিরাময় হওয়া কঠিন, তবে তেলাকুচা পাতা ও মূলের রস ২ চা-চামচ করে প্রতিদিন হালকা গরম করে ছেঁকে সেবন করলে ঘনঘন আক্রমণের প্রবণতা হ্রাস পায়।

তিক্ত তেলাকুচা ও এর বিশেষ ওষধি গুণ

তেলাকুচার একটি বিশেষ প্রজাতি রয়েছে যা স্বাদে অত্যন্ত তিক্ত বা তেতো। এই তিক্ত লতার মূলের ছাল জোলাপ হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়াও তেলাকুচার পাতা বেটে ফোঁড়া বা ব্রণের ওপর প্রলেপ (পুলটিস) দিলে দ্রুত উপশম হয়। ভেষজ গুণাগুণের দিক থেকে তেতো তেলাকুচা মল নিঃসরণ সহজ করে এবং মুখের অরুচি দূর করে। এটি শ্বাসকষ্ট, কাশি, জ্বর এবং বমিভাব নিরাময়ে কাজ করে। এর তিক্ততা খিদে বাড়িয়ে দেয় এবং ‘রক্তের দোষ’ বা রক্তবিকার শোধন করতে সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলাকুচার প্রভাব জননেন্দ্রিয় ও মূত্রাশয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি। এর মূলের চূর্ণ সেবনে প্রস্রাবের সাথে শ্বেত পদার্থ নির্গত হওয়া বন্ধ হয় এবং বিভিন্ন স্ত্রী-রোগে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া বিছা বা বিষাক্ত পতঙ্গ কামড়ালে এর পাতার রসের প্রলেপ দিলে জ্বালা-যন্ত্রণা দ্রুত প্রশমিত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই লতা শরীর স্নিগ্ধ রাখে এবং রক্ত ও মূত্রের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। অন্যান্য সমজাতীয় সবজির তুলনায় তেলাকুচার পুষ্টিগুণ অনেক বেশি।

সাহিত্যে তেলাকুচা বা ‘বিম্বফল’

সংস্কৃত ভাষায় তেলাকুচাকে বলা হয় ‘বিম্বফল’। তেলাকুচা পাকলে যখন টুকটুকে লাল বর্ণ ধারণ করে, তখন তার সৌন্দর্য কবিদেরও মুগ্ধ করে। মহাকবি কালিদাস তাঁর কাব্যে সুন্দরীদের রাঙা ঠোঁটের উপমা দিতে গিয়ে এই পাকা ফলের সাথে তুলনা করে লিখেছিলেন—‘পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী’। অর্থাৎ, পাকা বিম্ব ফলের মতো রক্তিম যাঁর ওষ্ঠ বা ঠোঁট।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. এম অলিউর রহমান, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৭ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩০৬। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৪, পৃষ্ঠা ২৬-৩১।
৩. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা,১১৩-১১৪।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Forest and Kim Starr

Leave a Comment

error: Content is protected !!