উদ্ভিদ জগতের বৈচিত্র্যের শেষ নেই। আমাদের চারপাশের লতাগুল্মের মধ্যে কিউকারবিটাসি (Cucurbitaceae) বা শসা-লাউ পরিবারের একটি বিশেষ গণের নাম হলো মুকিয়া (Mukia)। আজ আমরা এই উদ্ভিদটির গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং বাংলাদেশে এর উপস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
শারীরিক গঠন ও লতা
মুকিয়া মূলত একটি বহুবর্ষজীবী আরোহী লতা। এর লতাগুলোর নিচের অংশ বা মূলীয় দিকটি বেশ কাষ্ঠল প্রকৃতির হয়। এর পাতাগুলো ৩ থেকে ৭টি কোণবিশিষ্ট এবং করতলাকার খণ্ডিত বা তাম্বুলাকার। লতাটি অন্য গাছকে আঁকড়ে ধরার জন্য এতে খুব সাধারণ ও সরু আকর্ষ থাকে।
পুষ্প বা ফুলের বৈশিষ্ট্য
মুকিয়া উদ্ভিদে খুব ছোট ছোট সহবাসী ফুল ফোটে। অর্থাৎ একই উদ্ভিদে পুং ও স্ত্রী পুষ্প আলাদাভাবে কিন্তু একসাথে অক্ষীয় গুচ্ছে অবস্থান করে।
- পুংপুষ্প: এই ফুলগুলো খাটো মঞ্জরীদণ্ডে জন্মে। এদের বৃতি ঘণ্টার মতো এবং ৫টি খণ্ডে বিভক্ত। এর দলমণ্ডল চক্রাকার এবং ৩টি পুংকেশর বৃতিনলের ভেতরে সন্নিবিষ্ট থাকে। এর পরাগধানীগুলো দীর্ঘায়ত হয়—যার মধ্যে দুটি ২-প্রকোষ্ঠী এবং একটি ১-প্রকোষ্ঠী বিশিষ্ট।
- স্ত্রী পুষ্প: স্ত্রী পুষ্পগুলো অর্ধবৃন্তক হয়। এদের গর্ভাশয় ডিম্বাকার বা উপবৃত্তাকার এবং গায়ে ছোট ছোট কন্টকরোম (কাঁটার মতো রোম) থাকে। এতে ২-৩টি আমরা থাকে এবং গর্ভমুণ্ড ২-৩ খণ্ডে বিভক্ত।
ফল ও বীজ
মুকিয়া গণের ফলগুলো সাধারণত গোলাকার বা উপবৃত্তাকার হয়। এগুলো অবিদারী, অর্থাৎ পাকার পর ফলগুলো নিজে থেকে ফেটে যায় না। ফলের ভেতরে থাকা বীজগুলো ডিম্বাকৃতির এবং কিছুটা চাপা। বীজের উপরিভাগ মসৃণ বা অমসৃণ—উভয়ই হতে পারে।
বাংলাদেশে মুকিয়া: আগমুখি বা বিলারি
বাংলাদেশে মুকিয়া গণের একটি বিশেষ প্রজাতি পাওয়া যায়, যার নাম আগমুখি বা বিলারি। এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো Mukia maderaspatana। গ্রামবাংলার ঝোপঝাড় বা বন-বাদাড়ে এই লতাটি প্রায়ই চোখে পড়ে, যা আমাদের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।
উপসংহার
প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র সদস্যটি তার জটিল গঠন আর অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এমন আরও অনেক উদ্ভিদ রয়েছে যা আমাদের প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে।
আরো পড়ুন
- ঝিঙ্গা বা ঝিংগা-র লতা, মূল, ফলের নানা ভেষজ গুণ
- তরমুজ ও বীজের সাতটি ভেষজ গুণাগুণ ও উপকারিতা
- কাঁকুড় বা কাঁকড়ি খাওয়ার উপকারিতা ও ছয়টি ভেষজ গুণাগুণ
- করলা বা উচ্ছের বহুবিধ ভেষজ গুনাগুণ, পুষ্টিমান ও উপকারিতা
- তরমুজ বা খরমুজা উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ দেশসমূহের বাণিজ্যিক ফল
- ইন্দ্রায়ন বা মাকাল ফল হচ্ছে আফ্রিকা ও এশিয়ার লতানো উদ্ভিদ
- সিট্রালাস হচ্ছে কিউকারবিটাসি বা শসা লাউ পরিবারের একটি গণের নাম
- মালা আফ্রিকা অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার কিউকারবিটাসি পরিবারের লতানো উদ্ভিদ
- প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি মুকিয়া গণ ও আমাদের আগমুখি লতা
- ঘি করলা বা ভাত করলা দক্ষিণ এশিয়া ও মায়ানমার অঞ্চলের সবজি
- কাঁকরোল বা কাকরোল বা গোলকাক এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলের জনপ্রিয় সবজি
- উচ্ছে পৃথিবীর উষ্ণ মণ্ডলীয় অঞ্চলের ভেষজ সবজি
- করলা পৃথিবীর গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলের জন্মানো ভেষজ সবজি
- মমরডিকা হচ্ছে কিউকারবিটাসি (শসা লাউ) পরিবারের একটি গণ
- গুটি বান্দল এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিউকারবিটাসি পরিবারের লতা
- দেতরা বা বান্দল দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার ঔষধি লতা
- ঝিঙ্গা বা ঝিঙা-এর হচ্ছে সারা বিশ্বে আবাদকৃত একটি সবজি
- লাফা হচ্ছে কিউকারবিটাসি (শসা লাউ) পরিবারের একটি গণ
- চালকুমড়া এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একটি জনপ্রিয় শাক ও সবজি
- পটল লতার পনেরোটি ভেষজ গুণ ও প্রযোগ পদ্ধতি
- বেনিনকাসা হচ্ছে কিউকারবিটাসি (শসা লাউ) পরিবারের একটি গণ
- লাউ বা কদু হচ্ছে এশিয়া ও আফ্রিকার জনপ্রিয় পাতা ও ফল সবজি
- লাগেনারিয়া হচ্ছে কিউকারবিটাসি (শসা লাউ) পরিবারের একটি গণ
- চালকুমড়া বা জালিকুমড়ার ১৫টি ঔষধি গুণ ও ব্যবহার
- লাউ বা কদুর ষোলটি ঔষধি গুনাগুণ ও নানামুখী উপকারিতা
- ফুটি বা বাঙ্গি বা বাঙ্গী বা বাঙির কয়েকটি বহুমুখী ঔষধি গুনাগুণ
- তেলাকুচা প্রকৃতির লতানো বীরুৎ ও এর বহুমুখী ভেষজ ওষধি গুরুত্ব
তথ্যসূত্র
১. এম অলিউর রহমান, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৭ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩২৪। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১২টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।