আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সাহিত্য > প্রবন্ধ > প্রকৃতিবাদ উনবিংশ শতাব্দীর শেষের বাস্তববাদের অনুরূপ সাহিত্য আন্দোলন

প্রকৃতিবাদ উনবিংশ শতাব্দীর শেষের বাস্তববাদের অনুরূপ সাহিত্য আন্দোলন

প্রকৃতিবাদ

প্রকৃতিবাদ বা যথাস্থিতবাদ বা সাহিত্যে প্রকৃতিবাদ (ইংরেজি: Naturalism) হচ্ছে উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের সাহিত্যিক বাস্তবতাবাদের অনুরূপ একটি সাহিত্য আন্দোলন যেটি রোমান্টিকতাবাদের প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। তবে এই আন্দোলন নির্ধারণবাদ, বিচ্ছিন্নতা, বৈজ্ঞানিক নৈর্ব্যক্তিকবাদ এবং সামাজিক ভাষ্যকে সাগ্রহে গ্রহণ করে এটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই আন্দোলনটি মূলত ফরাসি লেখক এমিল জোলার তত্ত্বগুলির পথানুসরণ করে।[১]

বাস্তববাদ ও প্রকৃতিবাদ সমার্থক কোনো মতবাদ নয়। বরং প্রকৃতিবাদ বা “Naturalism is the logical result of realism. One is a process and | other is the aim.” এই দুটি মতবাদের অভিন্নতার বিভ্রান্তিকর অনুসন্ধান এখনও অব্যাহত বলেই দামিয়েন গ্রান্টের সতর্ক বিশ্লেষণ— “realism’ derives from philosophy and describes an objective, the attainment of the real; ‘Naturalism’ derives from natural philosophy or science and describes a method which shall conduce to the attainment of real. Admittedly usage does not always make this clear; realism is spoken of as a technique and naturalism as a tendency.” বাস্তববাদ থেকে প্রকৃতিবাদের ভিন্নতা বৈজ্ঞানিক নিমিত্তবাদ বা মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় নিয়তিবাদের পরিগ্রহণে, যা কিনা প্রকৃতিবাদী লেখককে মানুষের নৈতিক বা মানসিক গুণাবলী অপেক্ষা মনস্তাত্ত্বিক প্রকৃতি নির্ধারণে প্রণোদিত করে।

এই প্রকৃতিবাদকে কেউ কেউ যথাযথবাদ বা পরিবেশবাদ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। এই অভিধার নিহিতার্থ অস্পষ্ট নয়। পরিস্থিতি বা পরিবেশের ফটোগ্রাফি প্রকৃতিবাদের বৈশিষ্ট্য। জীবন ও শিল্পের সম্বন্ধ বা দুরত্ব নিয়ে প্রকৃতিবাদী ভাবিত নন। হয়তো সচেতন নন। জীবন ও সমাজের প্রতিমূর্তি রচনায় প্রকৃতিবাদীর স্বস্তি ও তৃপ্তি।

সাধারণভাবে বাস্তববাদ, স্বভাবত মনস্তাত্ত্বিক বা psychological realism (স্তাঁদাল) ও সামাজিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বা ‘Socio-economic realism (বালজাক) রোমান্টিকতা বা ভাববাদের আতিশয্য-জনিত প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট। অন্যদিকে এই রোমান্টিকতা-বিরোধী মানসতা থেকে এবং ডারউইন জীবতত্ত্ব ও বস্তুতান্ত্রিক জীবনদর্শনের সমীকরণে প্রকৃতিবাদের প্রতিষ্ঠা। তাহলে বোঝা গেল ‘পরিবেশবাদ, বংশগতিতত্ত্ব এবং বৈজ্ঞানিক অভিব্যক্তিবাদ’ যেমন প্রকৃতিবাদের ধারণা, মানুষ নিয়তির কাছে অসহায়, ব্যক্তিচরিত্রসমূহ ‘helpless products of heredity and environment’, জড় বিশ্বের ফাঁদে সে বন্দি, নিয়তি নির্ধারিত তার দেহের দাবি, “পঞ্চভূতের ফাঁদে মানবমন চিরশৃঙ্খলিত। রক্তমাংসের দেহের কামনা, আকাঙ্ক্ষা ও তার জড়বিধান মানুষের জীবনে একমাত্র নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি।” বাস্তববাদের যে পরিণতি প্রকৃতিবাদে অথবা যে প্রকৃতিবাদ ‘পরিণত বাস্তবতাবাদ’— শিল্পসাহিত্যে সেই প্রকৃতিবাদের প্রথম প্রবক্তা দার্শনিক মনোবিজ্ঞানী হিপোলাইট টেইন-এর বিশ্লেষণ প্রভাবসঞ্চারী ভূমিকা নিয়েছে, তার মতে মনকে আধ্যাত্মিক রহস্যময়তার মোড়কে বাঁধা বলে ধরা যায় না। বরং মানতে হয় ইন্দ্রিয়ানুভূতির প্রভাব মনের ওপর ক্রিয়াশীল। টেইনের ধারণা এই মহাবিশ্ব বস্তুত একটি ‘Great mechanism’. মানুষ, মানুষের নৈতিক জীবন এবং কর্মকাণ্ডসমূহ—এই সব কিছুই বোঝা যেতে পারে কার্য ও কারণের সম্বন্ধসূত্রে। এখানে অলৌকিকতার স্থান নেই। এভাবেই গড়ে উঠছে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। মনোবিজ্ঞানী টেইনের বিশ্লেষণ চিকিৎসাবিজ্ঞানী লুকাসের বংশগতিতত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। সাহিত্য ক্ষেত্রে জোলার The Experimental Novel (১৮৮০) শীর্ষক রচনাটি প্রকৃতিবাদের ইশতেহার হিসেবে গৃহীত হয়েছে, যেখানে তিনি বোঝাতে চান প্রকৃতিবাদী ঔপন্যাসিক কেবল জগৎ ও জীবনকে পর্যবেক্ষণ করবে না, সমস্ত অনুপুঙ্খের রেকর্ড সংকলন করবে, চরিত্রসমূহের রুচি, আবেগ, সংবেদনশীলতা নিয়ে রাসায়নিকের মতো বস্তুর কারবারি হবে।

আরো পড়ুন:  Shaw advertised his doctrines on the problems of modern society.

ফরাসি উপন্যাস ক্ষেত্রেই, ১৮৫০ সালে প্রকৃতিবাদের প্রথম প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা। বাস্তববাদী আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতিতেই এই প্রকৃতিবাদের উদগাতা হয়তো ফ্লবেয়ার, কিন্তু তিনি যে রিয়ালিজম বা বাস্তববাদের ‘গুরু’ এবিষয়ে সন্দেহ নেই। তার মাদাম বোভারি যেমন বিশ্বসাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে, অভিযোগ থেকে মুক্তও হয়েছে, তেমনি চিন্তাজগতে প্রবল নাড়া দিয়েছে। রোমান্টিকতার প্লাবন যখন অসহ্য ও একঘেয়েমিতে বৈচিত্র্যহীন ও ক্লান্তিকর মনে হয়েছে, তখনই প্রতিবাদী ফসল মাদাম বোভারির মতন বাস্তববাদী উপন্যাস; যদিও সেখানে সমাজ ও জীবনের প্রেক্ষাপটে তীব্র আশাবাদের বিচ্ছুরণ হয়তো লক্ষ করা যায় না, সমকালীন নেপোলিয়নের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জেহাদও শোনা যায় না, কিন্তু পাওয়া যায় একধরনের বাস্তবধর্মী নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি। মানব ইতিহাসের স্তর বিভাজন সূত্রে ‘শূকরধর্মী’ স্তরে ফ্লোবেয়ার এর বেশি অগ্রসর হতে পারেন নি। তাই তার কাছ থেকে শোনা গেল ‘Human life is a sad show, undoubtedly ugly, heavy and complex: মাদাম বোভারি ‘ফরাসি উপন্যাসের গতিপথে নিঃসন্দেহে এক দুঃসাহসিক যাত্রাবদল— সে যাত্রা অকুণ্ঠ বাস্তবধর্মিতায়’, যার চুলচেরা বিশ্লেষণে লাভ করা যায় অবশ্যই প্রকৃতিবাদের স্বাদ।

প্রকৃতিবাদী ঔপন্যাসিক হিসেবে জোলা-কে ‘অথরিটি’ গণ্য করা হলেও গঁকুর ভ্রাতৃদ্বয়ের সৃষ্টিকর্মে প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত। প্রকৃতিবাদী লেখক সাধারণভাবে জনসাধারণের মৌলিক আশা-আকাঙ্ক্ষা, দাবি, চাহিদা তুলে ধরেন না, বরং অবক্ষয়িত সমাজের ফটোগ্রাফিতে যেন আশ্বস্ত বোধ করেন। এই ধরনের ঔপন্যাসিকু তাদের সৃষ্টিতে গুরুত্ব দেন ১. Sociological enquiry; ২. Extra Psychological Investigation; ৩. Methods of Scientific Workmanship. এই কারণে এডমণ্ড গকুঁরের হাতে জন্ম নেয় Woman of Paris-প্যারিসের গণিকাজীবন, গণিকাপল্লীর অবিকল প্রতিলিপি। এখানে প্রকৃতিবাদীদের প্রত্যাশিত ‘frankness’ ও ‘documentation’ দুর্লভ নয়। কিন্তু তদতিরিক্ত কিছু পাওয়া কঠিন, কেননা এডমণ্ড গঁকুর ও তার ভাইয়ের বক্তব্যই ছিল— “The novel today is made with documents narrated or selected from nature as history is based on written documents.”

টেইনের দর্শনচিন্তা বা লুকাসের বংশগতিতত্তই নয়, ডারউইনের জীবতত্ত্ব (Origin of Species, ১৮৫৯) বিষয়ক যুগান্তকারী ব্যাখ্যা ও অগাস্ট কোঁতের ঐহিকতাবাদ (Postivism) -এর প্রসারও ফরাসি কথাসাহিত্যে প্রভাবসঞ্চারী হয়েছে, যার ফলশ্রুতি জোলার সৃষ্টিকর্ম, বিশেষত ২০ খণ্ডে সম্পূর্ণ Rongon Macquart (১৮৭১-১৮৯৩) উপন্যাসমালা। এখানে মানবিক অধিকারে বিশ্বাসী জোলা আধ্যাত্মিক সত্তাকে অস্বীকার করেছেন। অস্বীকার করেননি রক্তমাংসের দেহকে কেন্দ্র করে মানবমনের আশা-আকাঙ্ক্ষা-আসক্তি, বেশ্যাসক্তি, ‘অন্তর্লীন পাশবিকতা’, কামনা ও যৌনবুভুক্ষা, মদ্যাসক্তি, সর্বোপরি বেদনা ও আর্তনাদ। ‘পজিটিভিস্ট, এভসনিস্ট ও মেটিরিয়ালিস্ট’,-রূপে যেমন জোলার আত্মঘোষণা ছিল, তেমনি আকাঙ্ক্ষা ছিল ‘to be naturalist’। তাই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ছিল তার অন্বিষ্ট। তথাপি সামগ্রিক অর্থে জর্জ লুকাসের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণে ধরা পড়ে, প্রকৃতিবাদী ‘পরীক্ষামূলক’ উপন্যাসে জোলা ‘Writer’ থেকে ‘mere Spectator’-এ অবনমিত হয়েছিলেন। মার্কস-এঙ্গেলসের চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ লাফার্গ ও বালজাকের প্রতিতুলনায়, আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন, বাস্তবতা সম্বন্ধে জোলার দৃষ্টিভঙ্গি ‘newspaper reporter’ সদৃশ হয়ে গেছে। লুকাস ও লাফার্গের সমালোচনার অন্তঃসার অস্বীকার করা না গেলেও এবং জেলা সমালোচিত হলেও তার লেখা Germinal (১৮৮৫) উপন্যাসে তার শিল্পীসত্তার সততাকে প্রশংসা না করে পারা যায় না। এই উপন্যাস কয়লাখনির অভ্যন্তরে খনিশ্রমিকদের কীরূপ কর্মধারা, কীভাবে কয়লা কাটা হয়, কীভাবে খনির রন্ধ্রপথে জলের অনুপ্রবেশ ঘটে, ধ্বস নামে, যেমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণিত হয়েছে, তেমনি রক্তাক্ত খনিশ্রমিকের ধর্মঘটের পূর্ণাঙ্গ চিত্রায়ণ ঘটেছে। শ্রেণিসমাজে যা স্বাভাবিক, তাই প্রতিফলিত হয়েছে সেকালের পটভূমিকায়, পরিস্ফুট হয়েছে একটি রাজনৈতিক প্রগতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার শোষণে পিষ্ট খনিশ্রমিকদের বঞ্চনা ও আর্তনাদের অবিকল প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন, অগ্নিগর্ভ প্রতিবাদী খনি শ্রমিকদের প্রতিবাদী মিছিলের রুদ্ধশ্বাস বিবরণ দিয়েছেন, পাশাপাশি মালিক শ্রেণির অভ্যন্তরে একটা মানুষকে খুঁজেছেন। এক্ষেত্রে পরিবেশবাদ বা যথাযথবাদ অর্থাৎ আলােচ্য প্রকৃতিবাদের বৈশিষ্ট্যে অন্বিত উপন্যাসে বাস্তববাদের ডাইমেনশন বেড়েছে, তাও অগ্রাহ্য করা যায় না।

আরো পড়ুন:  Conventional Family and Marriage as a Hindrance for Reformation

লাফার্গ বা লুকাসের সমালোচনা সত্ত্বেও জোলার উপন্যাসে অন্তর্নিহিত রোমান্টিকতা, যা মূলত প্রকৃতিবাদী জোলারই স্ববিরোধিতা, তা তার স্বীকারোক্তিতে সুস্পষ্ট। রোমান্টিকতার বাড়াবাড়ির প্রতিক্রিয়ায় বাস্তববাদ এবং সেই সূত্রে প্রকৃতিবাদের আত্মপ্রকাশ, একথা সত্য, কিন্তু প্রকৃতিবাদী সাহিত্যেও ক্লান্তিকর একঘেয়েমি দুর্লক্ষ্য নয়। জর্জ লুকাস দেখিয়েছেন, একদিকে পতনোন্মুখ পুঁজিবাদী সমাজের প্রতিমূর্তি অঙ্কন অপরদিকে তা থেকে শিল্পসম্মত উত্তরণের স্বপ্নে আবিষ্ট হওয়া একটি অদ্ভুত রোমান্টিক দ্বৈততায় আক্রান্ত হতে হয়েছে ফরাসি প্রকৃতিবাদী সাহিত্যকে।

জোলা যেমন প্রকৃতিবাদী সাহিত্যের অগ্রনায়ক তেমনি এই পথের ভ্যানগার্ড বলা যায় মােপাসাঁকে। তার Une Vie (১৮৮৩), Bel-Ami (১৮৮৫), Pierre Jeam (১৮৮৮), For Comme la mort (১৮৮৯) ইত্যাদি উপন্যাস ও দু’শ পাচশটিরও বেশি গল্পে প্রকৃতিবাদের অজস্র উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে। ‘স্বোপার্জিত, ব্যাধি ও Melancholia’য় অভিশপ্ত ব্যক্তিজীবন; ফলে নারী সম্পর্কে, সমাজের নানা স্তরের মানুষ সম্পর্কে, জীবনের সর্ববিষয়ে রূঢ় সত্য উন্মোচনই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাঁর Bel-Ami-তে যেমন ফ্রান্সের ‘অভিজাত সম্প্রদায়ের নৈতিক অধঃপাত’ পূর্ণাঙ্গ রূপ পরিগ্রহ করেছে, তেমনি তার যন্ত্রণাদগ্ধ হৃদয়ের রক্তাক্ত প্রতিবিম্বন ঘটেছে ‘চর্বির গোলা’ (Boul de Suit) গল্পে। তার অসংখ্য গল্পের মধ্যে একটি আনুবীক্ষণিক প্রক্রিয়ায় চরিত্রের উন্মোচনে বা রূপায়ণে মোপাসাঁর প্রকৃতিবাদী ভূমিকা নির্ধারিত হয়ে গেছে। তাঁর গল্পে অবলীলায় গণিকাপল্লী, গণিকাজীবন, নীচুতলার সমাজ স্থান পেয়েছে। কিন্তু ফ্লবেয়ার বা জোলার মধ্যে রোমান্টিক মানসতা প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্নরূপে যদি বা পাওয়া যায়, মোপাসাঁর মধ্যে তা একান্তই দুর্লভ। ‘অবক্ষয়িত নাগরিকতা’ ও ‘মনোব্যাধির আচ্ছন্নতা হয়তো মোপাসাঁর গল্পকে প্রকৃতিবাদের অন্তঃসারে নিষিক্ত করে নেয়, তথাপি ছোটগল্পে তাঁর শিল্পচরিতার্থতা তলস্তয়ের দৃষ্টিতে মুগ্ধতা সঞ্চারিত করেছে।

ফ্রোবেয়ার, গকুর ভ্রাতৃদ্বয়, জেলা, মোপাসাঁই নয়, মার্কিন সাহিত্যেও প্রকৃতিবাদ বিলম্বে হলেও বিকাশ ঘটেছে হ্যামলিন গ্যারল্যণ্ড, স্টিফেন ক্রেন, ফ্রাঙ্কনরিস এবং জ্যাক লণ্ডন-এর এবং সাহিত্যকর্মে জার্মান সাহিত্যে ইমারমান, গুস্তাফ ফ্রিন্টাকের উপন্যাসে কিংবা রুশি বুনিনের The Vigil শীর্ষক ব্যতিক্রমী উপন্যাসে।

আরো পড়ুন:  হৃতসর্বস্ব প্রজন্ম ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের সামাজিক প্রজন্মের সমাহার

এভাবেই সমাজবিকাশের ধারায় পুরোনো ও নতুন সমাজব্যবস্থার দ্বন্দ্বে, ব্যবস্থার অন্তর্গত শ্রেণিদ্বন্দ্বে, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে, মূল্যবোধের রূপান্তরে, অতীন্দ্রিয়তায় ঋদ্ধ রোমান্টিক রবীন্দ্রসাহিত্যের বিরোধিতায় বাংলা গল্প-উপন্যাসে দখল নিল বাস্তবতা, অনিবার্য সূত্রে প্রকৃতিবাদ, যান্ত্রিক-প্রকৃতিবাদ ও বিষন্ন বাস্তবতা। রিয়ালিটির কারিপাউডার’ ছড়িয়ে দেওয়া হলো সাহিত্যের আঙিনায়। গোগোল-পুশকিন-তুলস্তয় থেকে গোর্কি যেমন স্বীকৃত হলো, তেমনি বালজাক ফ্লবেয়ার-জোলা-মোপাসাঁ সাদরে গৃহীত হলো। নুট হামসুনও বাদ গেলেন না। যুদ্ধোত্তর কালের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও সমস্যা, আশাহীনতা, জীবন সম্পর্কে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি বিদ্রোহ দ্রুত গ্রাস করতে থাকে প্রকৃতিবাদী সাহিত্য-রচয়িতাদের সৃষ্টিসমূহ। এমিল জোলার ঘোষণাই যেন ঘুরে ফিরে বেজে উঠতে থাকে, “The metaphysical man is dead; our whole demand is transformed with the coming of the Physiological man.” রচিত হতে থাকে বেদে, বিবাহের চেয়ে বড়ো, প্রাচীর ও প্রান্তর (অচিন্ত্যকুমার); রতি ও বিরতি, অসাধু সিদ্ধার্থ (জগদীশ গুপ্ত); এরা ওরা আরও অনেকে, রাত ভোরে বৃষ্টি (বুদ্ধদেব বসু) ; কিংবা কারও ভাবনায় তারাশঙ্করের হাঁসুলী বাঁকের উপকথা; মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা কোনো সন্ধানী দৃষ্টিতে বিভূতিভূষণের অশনি সংকেত; প্রেমেন্দ্র মিত্রের বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে, সংসার সীমান্তে, অপগত; নারায়ণ গঙ্গে পাধ্যায়ের ‘টোপ’, ‘হাড়’, গল্প বা উপনিবেশ-এর আখ্যান; সমরেশ বসুর প্রজাপতি, বিবর; সর্বোপরি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কয়লাকুঠির গল্পগুলি। শৈলজানন্দর কয়লাকুঠি পাঠে জোলা ও তার জার্মিনাল মনে পড়া স্বাভাবিক।

যৌনমনস্কতা, নৈরাশ্য, তিক্ততা, ঘৃণা, নারী-সম্পর্কিত ভাবনার রূপান্তর, জৈব তাড়না, পাপের দিকটার চিত্রণ’—সবমিলিয়ে বাংলা সাহিত্যে প্রতিবাদী সাহিত্যের প্রভাব অস্পষ্ট রইল। জোলা প্রমুখের এ ধরনের প্রভাব রবীন্দ্রনাথ অথবা শরৎচন্দ্রের আকাঙ্ক্ষিত ছিল না। প্রকৃতি বা স্বভাবের হুবহু নকল করা photography হতে পারে, কিন্তু সে কি ছবি? শরৎচন্দ্রের এ প্রশ্ন সংগত কারণেই তাঁর মননধর্ম অনুযায়ী উচ্চারিত হয়েছে কেননা তিনি মানতেন ‘Art জিনিসটা মানুষের সৃষ্টি, সে Nature নয়। রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের বিরোধিতার জন্যই নয়, সাহিত্য ও সমাজসম্পর্ক, দেশকাল-পরিবেশের কার্যকারণেই এ অবস্থা বেশিদিন বাংলা সাহিত্যে বিরাজ করেনি। শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, সামগ্রিক অর্থেই প্রকৃতিবাদী সাহিত্য-আন্দোলন আন্তর্জাতিক স্তরেও দীর্ঘজীবী হতে পারেনি। তবে এই ঐতিহাসিক সাহিত্য আন্দোলন আমাদের চিন্তাজগতে প্রভূত আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, সমৃদ্ধ করেছে শিল্পের দিক থেকেই বাস্তববাদকে।[২]

তথ্যসূত্র

১. Campbell, Donna M. (8 March 2017). “Naturalism in American Literature”. Washington State University. https://public.wsu.edu/~campbelld/amlit/natural.htm, সংগৃহীত ৪ সেপ্টেম্বর ২০২০.
২. শুভঙ্কর ঘোষ, “প্রকৃতিবাদ”, নবেন্দু সেন সম্পাদিত পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্যভাবনা, রত্নাবলী কলকাতা, ১৯৬২, পৃষ্ঠা ১৮২-৮৫

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page