ভূমিকা: আমাদের চারপাশের পরিচিত গাছগাছালির ভিড়ে এমন কিছু লতা-গুল্ম রয়েছে, যাদের নাম হয়তো আমরা খুব একটা জানি না। বুইশাকফুল তেমনই একটি উদ্ভিদ, যা এদেশের সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা একে বর্ণনা করেন Aeginetia indica হিসেবে। এটি মূলত ওরোব্যাঙ্কাসি (Orobanchaceae) পরিবারের একটি বিশেষ সদস্য।
বুইশাকফুলের বর্ণনা:
এই উদ্ভিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর ভৌম পুষ্পদণ্ড। এটি সাধারণত বেগুনি-লাল আভাযুক্ত এবং বেশ সরু প্রকৃতির হয়। মাটি থেকে এগুলো এককভাবে অথবা গুচ্ছাকারে (২-৩টি একসাথে) উঁকি দেয়। লম্বায় এই দণ্ডটি প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। দণ্ডের গোড়ার দিকে বাদামী রঙের কিছু শল্কপত্র (Scales) দেখা যায়, যা একে একটি আদিম ও বুনো রূপ দান করে। বুইশাকফুলের ফুলগুলো এককভাবে ফোটে এবং এর সাথে সহপত্র বিদ্যমান থাকে। এর বৃতিটি দেখতে অনেকটা চমসার (Spathe-like) মতো, যা গোড়ার দিকে যুক্ত থাকলেও অগ্রভাগটি খণ্ডিত থাকে। প্রায় ৩.৫ সেন্টিমিটার লম্বা এই বৃত্যংশটি তীক্ষ্ণ ও প্রশস্ত এবং এটি ফুলের প্রধান অংশ বা দলনলকে পরম মমতায় জড়িয়ে রাখে। এর উপরিভাগ মসৃণ এবং লম্বালম্বি শিরার বিন্যাসযুক্ত, যার বর্ণ হালকা হলুদাভ থেকে কালচে গোলাপী হতে পারে। ফুলটির দলমন্ডল পাঁচটি সমান খণ্ডে বিভক্ত, যার প্রতিটি অংশ প্রায় ১ সেন্টিমিটার লম্বা। এর ৩ সেন্টিমিটার দীর্ঘ দলনলটি নিচের দিকে সামান্য বাঁকানো থাকে, যা একে একটি আভিজাত্য দান করে। গাঢ় বেগুনি রঙের এই ফুলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কালচে শিরার রেখা দেখা যায়, যা এর সৌন্দর্যকে আরও রহস্যময় করে তোলে। এর প্রজনন অঙ্গের গঠন বেশ জটিল। ফুলে মোট চারটি পুংকেশর থাকে, যার মধ্যে দুটি লম্বা এবং দুটি খাটো (দীর্ঘদ্বয়ী)। লম্বা পুংদণ্ডগুলো ১ সেন্টিমিটার এবং খাটো দণ্ডগুলো ০.৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর পরাগধানী দ্বিখণ্ডিত এবং খণ্ডগুলো আকারে অসমান। গর্ভাশয়টি এক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট এবং এতে অসংখ্য ডিম্বক থাকে। এর গর্ভদণ্ডটি ছত্রাকার বা ছাতার মতো গর্ভমুণ্ড দিয়ে শেষ হয়, যা প্রায় ১.২ থেকে ১.৮ সেন্টিমিটার লম্বা। প্রজনন শেষে এই ফুলে ক্যাপসিউল জাতীয় ফল জন্মায়, যা লম্বায় ১.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফলটি আংশিকভাবে দুটি কপাটে বা ভালভে বিভক্ত থাকে। ফলের ভেতরে থাকে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র বীজ। এই বীজগুলো দেখতে অনেকটা হলুদাভ সাদা এবং জালিকাময় ক্ষুদ্র গর্তযুক্ত, যা অতি সহজে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
বুইশাকফুল মূলত বনাঞ্চলের ছায়াযুক্ত স্থানে জন্মাতে পছন্দ করে। আমাদের দেশের শালবনগুলোতে গাছের নিচে জন্মানো অন্যান্য লতাগুল্ম বা ‘আন্ডারগ্রোথ’ হিসেবে এদের দেখা মেলে। এছাড়া গভীর অরণ্যের যেখানে লম্বা ঘাসের ঝোপ রয়েছে, সেখানে ঘাসের মূলকে আশ্রয় করে এই পরজীবী উদ্ভিদটি বেড়ে ওঠে। এটি সরাসরি মাটি থেকে খাদ্য গ্রহণ না করে ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের শিকড় থেকে পুষ্টি শোষণ করে টিকে থাকে। এই উদ্ভিদের জীবনচক্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময় হলো বর্ষা ও শরৎকাল। সাধারণত জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বুইশাকফুলে ফুল ফুটতে দেখা যায় এবং এই সময়েই ফল পরিপক্ক হয়। এর বংশবিস্তার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বীজের ওপর নির্ভরশীল। ফলের ভেতর থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র বীজ মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনুকূল পরিবেশে পরবর্তী বছরে নতুন চারা জন্ম দেয়।
বিস্তৃতি:
বুইশাকফুল দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য উদ্ভিদ। আন্তর্জাতিকভাবে এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং মায়ানমারে। এছাড়াও দূরপ্রাচ্যের দেশ চীন, জাপান এবং ফিলিপাইনেও এই উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এই বিরল উদ্ভিদটি দেখা যায় না। মূলত দেশের বনাঞ্চল সমৃদ্ধ জেলাগুলোতে এর দেখা মেলে। বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং চট্টগ্রাম জেলার বনাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় বুইশাকফুলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বনের ভেতরের স্যাঁতসেঁতে এবং ঘাসযুক্ত স্থানগুলো এই উদ্ভিদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র।
অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:
বুইশাকফুল কেবল একটি অদ্ভুত পরজীবী উদ্ভিদই নয়, বরং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় এর রয়েছে শক্তিশালী ভূমিকা। বিশেষ করে ফিলিপাইন এবং তাইওয়ানের লোকজ চিকিৎসায় এই উদ্ভিদের প্রয়োগ বিস্ময়কর। নিচে এর উল্লেখযোগ্য কিছু ব্যবহার তুলে ধরা হলো:
১. ডায়াবেটিস ও বৃক্কের চিকিৎসায় (ফিলিপাইন)
ফিলিপাইনের প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে Aeginetia indica বা বুইশাকফুলের ক্বাথ (Decoction) অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করা হয়। সেখানকার মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে এই নির্যাস গ্রহণ করে ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এছাড়া, মূত্রগ্রন্থি বা কিডনির তীব্র প্রদাহের ফলে শরীরে যখন অতিরিক্ত তরল জমে ফুলে যায় (Dropsy/Edema), তখন এই উদ্ভিদের নির্যাস সেই তরল নিঃসরণে এবং প্রদাহ কমাতে জাদুর মতো কাজ করে।
২. যকৃত বা লিভারের সুরক্ষায় (তাইওয়ান)
তাইওয়ানের ভেষজ চিকিৎসায় বুইশাকফুলকে যকৃতের বন্ধু হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে হেপাটাইটিস এবং লিভারের নানাবিধ জটিলতা নিরাময়ে এই উদ্ভিদের ব্যবহার সুপ্রাচীন। যকৃতের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং লিভারের কোষগুলোকে বিষমুক্ত করতে এই উদ্ভিদের ঔষধি গুণাগুণ অনন্য।
৩. আধুনিক চিকিৎসায় সম্ভাবনা
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই পরজীবী উদ্ভিদের অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণাবলী নিয়ে গবেষণা করছেন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষের এই দীর্ঘদিনের আস্থা প্রমাণ করে যে, যথাযথ গবেষণার মাধ্যমে বুইশাকফুল থেকে ভবিষ্যতে অনেক জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করা সম্ভব।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) বুইশাকফুল গুলো প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের আবাসস্থল ধ্বংসের কারণ বাংলাদেশে এটি হুমকিরসম্মুখীন বলে বিবেচিত। বাংলাদেশে বুইশাকফুল গুলো সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির জন্য স্ব -স্থানে সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র:
১. মমতাজ বেগম (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৯ম, পৃষ্ঠা ৩৬৫-৩৬৬। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dinesh Valke
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।