সজনে চাষ পদ্ধতি ও উপকারিতা: পুষ্টিগুণে ভরপুর এক জাদুকরী বৃক্ষ

সজনা বা সজনে

বৈজ্ঞানিক নাম: Moringa oleifera সমনাম: Moringa pterygosperma Gaertn. (1791), Moringa polygona DC. (1825), Moringa zeylanica Pers. (1830). সাধারণ নাম: drumstick tree বা horseradish tree বা ben oil tree বা benzoil tree বাংলা নাম: সজনে বা সজনা বা সাজিনা
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae বিভাগ: Angiosperms অবিন্যাসিত: Eudicots অবিন্যাসিত: Rosids বর্গ: Brassicales গোত্র: Moringaceae গণ: Moringa প্রজাতি: Moringa oleifera

ভূমিকা: সজনে (বৈজ্ঞানিক নাম: Moringa oleifera) বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পুষ্টিকর একটি উদ্ভিদ, যা আমাদের দেশে ‘সজনা’ বা ‘সাজিনা’ নামেও পরিচিত। এটি মূলত মোরাসি পরিবারের অন্তর্গত একটি বৃক্ষ। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিটি প্রান্তেই এই গাছটি দেখা যায়। এর কচি পাতা শাক হিসেবে এবং লম্বাটে ফল সবজি হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সজনে গাছের গঠন বেশ নরম এবং এর বাকল কিছুটা আঠালো প্রকৃতির হয়। সাধারণত রঙের ভিন্নতা অনুযায়ী সজনে তিন ধরণের হয়ে থাকে— নীল, শ্বেত ও রক্ত সজিনা। জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা থাকায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলসহ প্রায় সব এলাকায় এটি অনায়াসেই জন্মে। এমনকি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এই গাছটি টিকে থাকতে পারে। শুষ্ক আবহাওয়ায় টিকে থাকতে সক্ষম এই গাছটি মূলত উর্বর ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে এমন মাটিতে ভালো হয়। আমাদের উপমহাদেশে সাধারণত সজনে গাছের ডাল বা শাখা রোপণের মাধ্যমেই দ্রুত বংশবিস্তার করা হয়। তবে আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বীজের মাধ্যমেও এর চারা উৎপাদন করার প্রচলন রয়েছে।

বিবরণ:

সজনে মূলত একটি মাঝারি উচ্চতার বৃক্ষ, যা সাধারণত ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর কান্ডে কর্কের মতো খসখসে বাকল দেখা যায়। কচি অবস্থায় সজনে গাছ দেখতে কিছুটা সবুজাভ সাদা এবং গায়ে সূক্ষ্ম রোম থাকে। এর পাতাগুলো যৌগিক ও আকর্ষণীয় বিন্যাসের, যা মূলত ৪ থেকে ৭ জোড়া উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার ক্ষুদ্র পাতার সমন্বয়ে গঠিত। সজনে গাছের পুষ্পমঞ্জরী বেশ বড় ও ছড়ানো হয়, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর সাদা রঙের ফুলগুলো উভলিঙ্গ এবং পাঁচটি পাপড়ির সমন্বয়ে গঠিত। ফুলের মাঝখানে থাকা পুংকেশরগুলো হলুদ বা কমলা রঙের হয়ে থাকে, যা দেখতে বেশ চমৎকার। সজনে ফল দেখতে অনেকটা লম্বা ক্যাপসুলের মতো, যা ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। প্রতিটি ফলের গায়ে ৯টি স্পষ্ট শিরার রেখা থাকে এবং এটি গাছ থেকে ঝুলে থাকে। ফলের ভেতরে থাকা বীজগুলো পাখনাবিশিষ্ট হয়, যা প্রাকৃতিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে। সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সজনে গাছে ফুল ও ফল দেখা যায়। তবে বাংলাদেশে এমন কিছু উন্নত জাতের সজনে গাছ রয়েছে, যেগুলোতে সারা বছরই ফুল ও ফল পাওয়া যায়। ক্রোমোসোম সংখ্যা: 2n = ১৪, ২৮।

বিস্তৃতি:

Moringa oleifera প্রজাতিটি ভারত উপমহাদেশীয় এবং অনেক আফ্রিকান দেশে দেশ্যভূত। বাংলাদেশে ইহা দেশের সর্বত্র প্রধানত ইহার সবুজ ফলের জন্য রোপন করা হয়।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

সজনে কেবল একটি সুস্বাদু সবজিই নয়, বরং এটি পুষ্টির এক বিশাল আধার। এশিয়ায় সাধারণত সজনের কচি ফল সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়ার প্রচলন থাকলেও আফ্রিকান দেশগুলোতে এর পাতা সালাদ, স্যুপ এবং সসে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। মজার বিষয় হলো, সজনের কচি ফলের চেয়ে এর পাতার পুষ্টিমান অনেক বেশি; একারণেই পশ্চিম আফ্রিকায় শিশু এবং গর্ভবতী বা প্রসূতি মায়েদের অপুষ্টি দূর করতে নিয়মিত পত্রচূর্ণ খাওয়ানো হয়। আমাদের দেশেও সজনের কচি পাতা এবং ফুল শাক হিসেবে কিংবা বিভিন্ন তরকারিতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সজনের বাকলের নির্যাস বা ক্বাথ বাতের ব্যথা উপশমে অত্যন্ত কার্যকর। লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, সজনে ফল জলবসন্ত রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে, তাই আক্রান্ত রোগীদের খাদ্যতালিকায় এটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

সজনা বা সজনে চাষ পদ্ধতি:

বাংলাদেশে সজনে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় সবজি গাছ, যা বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে সক্ষম এই উদ্ভিদটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত অনায়াসেই জন্মাতে পারে এবং প্রচণ্ড খরা বা শুষ্কতা সহ্য করতে পারে। উর্বর ও পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা আছে এমন মাটিতে সজনে সবচেয়ে ভালো হয়। আমাদের দেশে সাধারণত সজনে গাছের ডাল বা শাখা রোপণ (কাটিং) পদ্ধতিতেই সবচেয়ে সহজে বংশবিস্তার করা হয়, তবে বীজের মাধ্যমেও এর চারা তৈরি করা সম্ভব। সাধারণত অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ মাসের দিকে এর পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে এবং মাঘ-ফাল্গুনে গাছজুড়ে সাদা ফুলের সমারোহ দেখা যায়। চৈত্র থেকে আষাঢ় মাসের মধ্যে ফল পরিপক্ক হয়, যার ভেতরে অনেক ত্রিকোণাকার বীজ থাকে। বংশবিস্তারের জন্য ডাল কাটিং করে মাটি ও গোবরের মিশ্রণে (৩:১ অনুপাতে) সামান্য কাত করে পলিথিন ব্যাগ বা নার্সারিতে রোপণ করতে হয় এবং শুষ্ক সময়ে নিয়মিত পানি দিতে হয়; পরবর্তীতে শিকড় গজালে তা মূল জমিতে স্থানান্তরের উপযোগী হয়।

সজনে গাছ অত্যন্ত সহনশীল প্রকৃতির হওয়ায় প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে, তবে ২০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং বার্ষিক ২৫০ থেকে ১৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এমন অঞ্চলে এটি সবচেয়ে ভালো জন্মে। ৫.০ থেকে ৯.০ পিএইচ (pH) সম্পন্ন বেলে দোঁআশ বা দোঁআশ মাটি সজনে চাষের জন্য আদর্শ। এই গাছের শিকড় অনেক গভীর ও বিস্তৃত হওয়ায় সাধারণত সারের প্রয়োজন হয় না, তবে ভালো ফলন পেতে কিছু পরিমাণ ইউরিয়া ও জৈব সার ব্যবহার করা যেতে পারে। যদিও বীজ এবং ডাল—উভয় পদ্ধতিতেই বংশবিস্তার সম্ভব, তবে বাংলাদেশে বীজ থেকে চারা তৈরির প্রক্রিয়া তুলনামূলক ব্যয়বহুল হওয়ায় ডাল রোপণ পদ্ধতিই বেশি জনপ্রিয়। বীজের মাধ্যমে চাষ করতে চাইলে এপ্রিল-মে মাসে গাছ থেকে পরিপক্ক ফল সংগ্রহ করে শুকিয়ে নিতে হয় এবং প্রাপ্ত বীজগুলো শুকনো, বায়ুরোধী পাত্রে ১ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।

জুলাই-আগস্ট মাসে সজনে বীজতলা বা পলিথিন ব্যাগে বপন করা যায়, তবে দ্রুত অঙ্কুরোদগমের জন্য বীজগুলো অন্তত ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা প্রয়োজন। সাধারণত ১০ থেকে ২০ দিনের মধ্যে চারা গজালে নিয়মিত সেচ ও সার প্রয়োগের মাধ্যমে সঠিক পরিচর্যা করতে হয়। বীজ থেকে উৎপাদিত গাছে ফলন আসতে ডাল রোপণ পদ্ধতির চেয়ে কিছুটা বেশি সময় লাগে বলে আমাদের দেশে ডাল পুঁতে বংশবিস্তারই বেশি জনপ্রিয়। এই পদ্ধতিতে খরচ যেমন কম, তেমনি বিশেষ কোনো কারিগরি দক্ষতারও প্রয়োজন হয় না। ডাল থেকে চারা তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণত ৪-৫ ইঞ্চি ব্যাসের এবং ৫-৬ হাত লম্বা রোগমুক্ত ও সতেজ ডাল নির্বাচন করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। নতুন লাগানো গাছে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শীঘ্রই শিকড় গজাতে পারে। শুষ্ক ও গ্রীষ্ম মৌসুমে প্রায় দুই মাস সেচ দিতে হবে। তবে সাজনার গাছ একবার লেগে গেলে তেমন পানির প্রয়োজন হয় না। সজিনার গাছে তুলনামূলক কীট-পতঙ্গ ও রোগ সহনশীলভাবে মাঝে মাঝে প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। যেমন জলাবদ্ধ মাটিতে শিকড় পচা রোগ দেখা দিতে পারে এর কারণ ডিপ্লোডিয়া। কীট-পতঙ্গ শুষ্ক ও ঠাণ্ডায় বেশি আক্রমণ করে। কীট-পতঙ্গ দ্বারা গাছে হলুদ রোগ দেখা যায়। কীট-পতঙ্গের মধ্যে টারমাইটস, এফিড, সাদা মাছি প্রধান।

সজনা বা সজনে চাষ-এর জমি প্রস্তুতি:

সজনে গাছ প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারলেও ২০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং বার্ষিক ২৫০-১৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এমন অঞ্চলে সবথেকে ভালো ফলন দেয়। চাষের জন্য ৫.০ থেকে ৯.০ পিএইচ (pH) মাত্রার বেলে-দোঁআশ বা দোঁআশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। সজনে গাছের শিকড় মাটির অনেক গভীরে বিস্তৃত থাকে বলে সাধারণত বাড়তি সারের প্রয়োজন হয় না, তবে ভালো বৃদ্ধির জন্য সীমিত পরিমাণে জৈব সার ও ইউরিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে। যদিও বীজ এবং ডাল—উভয় পদ্ধতিতেই বংশবিস্তার সম্ভব, তবে খরচ কমাতে বাংলাদেশে ডাল রোপণ পদ্ধতিই বেশি জনপ্রিয়। বীজের মাধ্যমে চাষ করতে চাইলে এপ্রিল-মে মাসে পরিপক্ক ফল সংগ্রহ করে তা শুকিয়ে বীজ বের করে নিতে হয়; এই বীজগুলো বায়ুরোধী পাত্রে প্রায় ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।

বীজ বোপনের সময়কাল:

জুলাই-আগস্টে বীজতলায় অথবা পলি ব্যাগে বপন করতে পারি। বীজ বপনের আগে বীজগুলোকে ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। এতে বীজ থেকে চারা গজাতে সুবিধা হয়। বীজ থেকে চারা বের হতে সময় লাগে ১০ থেকে ২০ দিন। চারা বের হওয়ার পর নিয়মিত সেচ, সার প্রয়োগ ও অন্যান্য যত্ন পরিচর্যা করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যে, বীজ থেকে সজিনা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ডাল পুঁতে অঙ্গজ বংশবিস্তারের চেয়ে দেরিতে ফল আসে। আমাদের দেশে ডাল পুঁতে অঙ্গজ উপায়ে বংশ বিস্তার পদ্ধতিটি বেশি ব্যবহৃত হয়। তার কারণ হলো, এটি করতে তেমন দক্ষতার প্রয়োজন হয় না। আর খরচও কম, অঙ্গজ বংশবিস্তারের জন্য ৪-৫ ব্যাসের বা বেডের ৫-৬ হাত লম্বা নিরোগ ডাল এবং আঘাতমুক্ত ডাল ব্যবহার করা ভালো।

গাছের রোগ বালাই:

নতুন লাগানো গাছে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শীঘ্রই শিকড় গজাতে পারে। শুষ্ক ও গ্রীষ্ম মৌসুমে প্রায় দুই মাস সেচ দিতে হবে। তবে সাজনার গাছ একবার লেগে গেলে তেমন পানির প্রয়োজন হয় না। সজিনার গাছে তুলনামূলক কীট-পতঙ্গ ও রোগ সহনশীলভাবে মাঝে মাঝে প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। যেমন জলাবদ্ধ মাটিতে শিকড় পচা রোগ দেখা দিতে পারে এর কারণ ডিপ্লোডিয়া। কীট-পতঙ্গ শুষ্ক ও ঠাণ্ডায় বেশি আক্রমণ করে। কীট-পতঙ্গ দ্বারা গাছে হলুদ রোগ দেখা যায়। কীট-পতঙ্গের মধ্যে টারমাইটস, এফিড, সাদা মাছি প্রধান।

আরো পড়ুন

সংরক্ষণ তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) সজনে প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে সজনে সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে বসতবাটির বৃক্ষ হিসেবে ইহার বংশবিস্তার উৎসাহিত করা যেতে পারে।

তথ্যসূত্র:

১ আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ৩১-৩২ ।

২. এম এ হাসান, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৭ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ২৫১-২৫৩। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

Leave a Comment

error: Content is protected !!