গুইয়া বাবলা গ্রীষ্মমন্ডলীয় পত্রঝরা বনের ঔষধি বৃক্ষ

বৈজ্ঞানিক নাম: Acacia farnesiana (L.) Willd., Sp. PL -4; 1033 (1306). সমনাম: Mimosa famesiana L. (1753). Vouchellia farnesiana (L.) Wight & Am. (1992). ইংরেজি নাম: Cassie Flower, Farnesiana, Sponge Tree, Sweet Acacia, Stinking Acacia. স্থানীয় নাম: গুইয়া বাবলা, বিলাতি বাবলা।

ভূমিকা: 

গুইয়া বাবলা (বৈজ্ঞানিক নাম: Acacia farnesiana ইংরেজি: Cassie Flower, Farnesiana, Sponge Tree, Sweet Acacia, Stinking Acacia) ফেবিয়াসি পরিবারের Acacia  গণের ঝোপালো গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ। এটি বাড়িতে বা বাগানে লাগানো হয় এবং পত্রঝরা বনেও জন্মে।

অন্যান্য নাম:

গুইয়া বাবলা বিভিন্ন ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন গুজরাটে- গন্ধেলো বাবুল; হিন্দি এবং পাঞ্জাবে- বিলাতি কীকর; আসাম- তারা কদম; বিহার- গ্রাবুর; ইংরেজিতে- Cassie flower. এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Acacia faruestaura Willd, এর অন্য দুটি নাম বিভিন্ন সময়ে দেয়া হয়েছিল, যেমন Vachelia farnesiana (L.) W & A এবং Acacia leucophloea Willd. এর গোত্রের নাম- লেগুমাইনোসী এবং উপগোত্র মাইমোসী।

গুইয়া বাবলা গাছের বর্ণনা:

গুইয়া বাবলা বহু-শাখান্বিত, কন্টকিত গুল্ম বা পত্রঝরা ছোট বৃক্ষ। এই গাছ ৪ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। এদের বাকল গাঢ় বাদামী, মসৃণ অথবা বয়স্ক বৃক্ষে ফাটলময়। শাখা-প্রশাখা আঁকাবাঁকা, বায়ুরন্ধ্রবিশিষ্ট এবং উপপত্রীয় সোজা কন্টক বর্তমান, কন্টক ৩ সেমি পর্যন্ত লম্বা।

পাতা দ্বি-পক্ষল যৌগিক, পত্রাক্ষ ২.৫-৭.৫ সেমি লম্বা, রোমশ, পত্রবৃন্ত একটি ক্ষুদ্রাকর উপবৃদ্ধিবিশিষ্ট। পক্ষ ২-৮ জোড়া, প্রায়ক্ষেত্রেই ৩ সেমি পর্যন্ত লম্বা এবং প্রায়ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন এবং সর্ব উপরের পক্ষদ্বয়ের পাদদেশে একটি পেয়ালাকৃতির উপবৃদ্ধি থাকে, প্রায়শই পক্ষগুলোর শেষপ্রান্ত একটি ক্ষুদ্রাকার কুর্চে পরিণত হয়, পত্রক ১০-২০ জোড়া, ২-৭ x ০.৮-১.৮ মিমি, অবৃন্তক, দীর্ঘায়ত, প্রতিমুখ, মসৃণ, নিষপ্রান্ত খতিগ্র, শীর্ষ অসমভাবে তীক্ষ্ণ এবং সূক্ষ্ম খর্বাগ্রবিশিষ্ট, মধ্যশিরা বহিকেন্দ্রীক।

পুষ্পমণ্ডর কাক্ষিক, মঞ্জরীদন্ডক, উপগোলকাকার শিরমরী, মঞ্জরীতে ৩.৫-৪.০ সেমি লম্বা, ৩-৫টি একত্রে একটি গুচ্ছে। পুষ্প  ৫-গুণিতক, উজ্জ্বল হলুদ, সুমিষ্ট গন্ধবিশিষ্ট, অবৃন্তক, প্রতিটি পুষ্প ১ মিমি লম্বা ও চমলাকার একটি মঞ্জরীপত্র দ্বারা আচ্ছাদিত। বৃতি ০.৫ মিমি (প্রায়) লম্বা, ঘণ্টাকার, ক্ষুদ্রাকার, দন্তক ০.২ মিমি (প্রায়) লম্বা, ত্রিকোণাকার, তীক্ষ্ণ। দলমন্ডল ২.৫ মিমি (প্রায়) লম্বা, গলাকার, খন্ডক ০.৮-০.৬ x ০.২-০.৩ মিমি, উপবৃত্তাকারি-দীর্ঘায়ত, মসৃণ।

আরো পড়ুন:  ঘন্টাপারুল বা ঘন্টাপাটালি এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ

পুংকেশর অসংখ্য, ৩-৪ মিমি লম্বা, দলমণ্ডল থেকে অনেকখানি বের হয়ে থাকে। গর্ভাশয় ১.৫ মিমি (প্রায়) লম্বা, প্রায় অবৃন্তক, ঘনরোমশ। ফল পড ৩.১-৭.৮ x ১২ সেমি, বেলনাকার-দীর্ঘারত, সোজা অথবা কিঞ্চিৎ বাঁকা, প্রস্থচ্ছেদে প্রায় গোলাকার এবং রসস্ফীত, শুষ্ক অবস্থায় গাঢ় বাদামী বা কালচে, মসৃণ, শিরিত, বাইরে থেকে বীজের অস্তিত্ব দৃশ্যমান, অস্পষ্ট, অনিদানী। বীজ প্রতি পড ১২-২০টি, পাল্পের মধ্যে ২ সারিতে সজ্জিত, ৭-৮ x ৫.৫ মিমি, উপবৃত্তাকার, মসৃণ, কালো। ফুল ও ফল সারা বছর ধরে। ক্রোমোসোম সংখ্যা: 2n = ৫২ (Atchison, 19,48)

চাষাবাদ:

পত্রঝরা অরণ্যে সহজদৃষ্ট, অথবা গুল্ম অরণ্য বা উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্যের কালো বা নুড়ি পাথর বা বেলে মাটিতে, নিম্ন উচ্চতায় ১৫০০ মিটার পর্যন্ত জন্মে।

গুইয়া বাবলা গাছের বিস্তৃতি:

গুইয়া বাবলা গাছের আদি নিবাস গ্রীষ্ম প্রধান দক্ষিণ আমেরিকা, বর্তমানে বিশ্বজনীন বিস্তৃত, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, মায়ানমার এবং আন্দামান দ্বীপে বিস্তৃত। বাংলাদেশে ইহা প্রবর্তিত ও দেশ্যভূত, রাজশাহী জেলায় রেল পথের পাশে খুব বেশী দেখা যায়, প্রায়শই গ্রামের ঝোপ-ঝাড়ে এবং বাইরের অঞ্চল সমূহে বা পতিত জমিতে জন্মাতে দেখা যায়।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

গৃহস্থালীর কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কাঠ খাদ্য ও পানীয়, ভেষজ ও রাসায়নিক পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় (Kumar and Sane, 20(02), এর পুষ্প বিখ্যাত প্রসাধনী ক্যাসির (cassie) উৎস এবং এইজন্য ইহা ফ্রান্সের দক্ষিণাংশে চাষাবাদ করা হয়। ইহা উল্লেখযোগ্য পরিমান সাদা গঁদ নির্গত করে। ইহার ফল চামড়া পাকা করতে ব্যবহৃত হয়। ভেষজ গুণাবলীর মধ্যে ইহা কোষ্ঠবদ্ধতাকারী, কৃমিনাশক, আমাশয় প্রতিষেধক এবং মুখ ফোলা নিরাময়ক, দাঁতের ক্ষয়রোগ, চুলকানি, ব্রংকাইটিস, শ্বেতপ্রদর, আলসার, ফোলা প্রভৃতিতে উপকারী (Chakrabarty and Gangopadhyay, 1996). ফিলিপাইনে ইহার কান্ডের বাকলের ক্বাথ পায়ুদ্বারের প্রলেপসিস হিসেবে এবং শ্বেতপ্রদরে ব্যবহৃত হয়ে থাকে (Caius, 1989).

জাতিতাত্বিক ব্যবহার:

অ্যামেরিকাতে ইহার কাঠ জ্বালানী হিসেবে এবং পাতা ও ফল অনেক দেশে গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইহার ফল থেকে কালি তৈরির জন্য এক প্রকার কালো রং নিংসৃত করা যেতে পারে (Verdcourt, 1979)। বাংলাদেশে এই প্রজাতিটি কিছু কিছু উপকুলীয় এলাকায় বাঁধ হিসেবে লাগানো হয় এবং কোথাও কোথাও বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বেড়ার উদ্ভিদ হিসেবে লাগানো হয় (Das and Alam, 2001)। ভারতেও ইহা প্রাচীর উদ্ভিদ ও রাস্তার পাশে লাগানো হয়। কখনও কখনও ভারতের হিন্দু সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ইহার পুষ্প ব্যবহার করে থাকে (Benthall, 1933)। বংশ বিস্তার হয় বীজের মাধ্যমে।

আরো পড়ুন:  ফলসা গাছের দশটি ভেষজ গুণাগুণ ও উপকারিতা

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) গুইয়া বাবলা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে গুইয়া বাবলা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে উপকুলীয় অঞ্চলের বাধ সমূহে এবং আশ্রয় দানকারী উদ্ভিদ হিসেবে ব্যাপক পরিসরে বনায়নের আওতায় আনা জরুরী।

তথ্যসূত্রঃ

১.  বি এম রিজিয়া খাতুন (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ ৯ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৪৮-১৪৯। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dick Culbert

Leave a Comment

error: Content is protected !!