সয়াবিন উপকারী বর্ষজীবী লতানো উদ্ভিদ

সয়াবিন বর্ষজীবী অর্ধলতানে উদ্ভিদ। কখনো কখনো কাণ্ড খাড়া। সমগ্র উদ্ভিদটি রোমশ। তিনটি উপপত্র নিয়ে একটি পাতা। সাদা অথবা হালকা লালচে রঙের ছোট ছোট ফুল হয়। এদের ফল দেড় থেকে ২ ইঞ্চি লম্বা, ফলে ৩-৪টি বীজ থাকে। বীজ লম্বাটে, সামান্য চ্যাপ্টা, হলদে, খয়েরী অথবা কালো রঙের। এর বোটানিক্যাল নাম Glycine max (L.) Merrill, ফ্যামিলী Leguminosae, ইংরেজী নাম Soyabean .

চাষাবাদ:

আদি বাসস্থান চীন হলেও ভারত সহ পৃথিবীর নানা দেশে বর্তমানে এটির ব্যাপক চাষ হচ্ছে। সাধারণত জুন-জুলাই মাসে সয়াবীনের বীজ বোনা হয় এবং ৩-৪ মাসের মধ্যে ফসল উঠতে থাকে। সবুজ বীজ তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। শুকনো বীজ খাদ্য ও ভেষজ রূপে, শিল্পকার্যে ব্যবহৃত হয়। বীজ থেকে যে তেল বেরোয়, তা খাওয়ার পক্ষে উপযুক্ত।

সয়াবিন-এর খাদ্যদ্রব্য

সয়াবীনের বীজ থেকে নানা প্রকার খাদ্য দ্রব্য প্রস্তুত করা হয়। সয়াবীনের দুধ এবং তা থেকে দই, ছানা প্রস্তুত এখন সর্বজনবিদিত। এছাড়া এটির সাহায্যে রুটি, কেক, বিস্কুট, ওমলেট, পোলাও, পায়েস, নানা প্রকার মিষ্টান্ন দ্রব্য প্রভৃতি সুস্বাদু খাদ্য প্রস্তুত হয়। সয়াবীন থেকে প্রস্তুত নিরামিশ মাংসের ‘গুলি’ খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি আহার গুণে ভরপুর।

উপকারিতা

সয়াবিন মস্তিষ্ক ও স্নায়ুকোষের সবলতা আনে, দীর্ঘায়ুলাভে সহায়ক, চুল ও চামড়ার স্বাস্থ্য রক্ষা করে। হৃদয়, ফুসফুস, যকৃৎ, পাকস্থলী, মূত্রাশয় প্রভৃতিকে সতেজ রাখে এবং সেগুলির স্বাভাবিক ক্রিয়া ব্যাহত হয় না। দেহের রক্তসঞ্চালন প্রণালী ঠিক থাকে। এটি দেহ-সৌষ্ঠবকে সুদৃঢ় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, তখন চামড়ায় ফিরে আসে কমনীয়তা, শরীরে বলের সঞ্চার হয়। রক্তহীনতা, কোষ্ঠবদ্ধতা, চোখের ছানি, স্নায়বিক দুর্বলতা, বহুমূত্র, উচ্চ রক্তচাপ, গেঁটেবাত প্রভৃতি রোগে এটি নানা ভাবে ব্যবহার্য। যৌবনকে মনের মত ক’রে উপভোগ এবং তাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চাইলে সয়াবীনের ব্যবহার অপরিহার্য।

উপাদান

অত্যাধুনিক জ্ঞানের দ্বারা বিচার-বিশ্লেষণ ক’রে দেখা গেছে— সয়াবীনে প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বহাইড্রেটস্, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাংগানিজ, ক্লোরিন, কপার, জিঙ্ক, কোবাল্ট এবং লেসিথিন প্রভৃতি বিদ্যমান। এতে ভিটামিন-এ, বি, সি, ডি, ই প্রভৃতি আছে। ভিটামিন-সি নামমাত্র থাকলেও অঙ্কুরিত সয়াবীনে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। এখানে তিনটি দুধের তুলনামূলক সারণী দেওয়া হলো।

আরো পড়ুন:  বেগুনি শালপানি বা শালপর্ণী এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ গুল্ম

সয়াবিন দুধ প্রস্তুত প্রণালী

সয়াবিনের দানা ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখার পর সেগুলিকে রগড়ে উপরের খোসা ফেলে দিতে হবে। তারপর খোসা ছাড়ানো দানাগুলোকে ভালভাবে মিহি ক’রে বেটে, ঐ খাটার ৭/৮ গুণ জল তার সঙ্গে মিশিয়ে ছাকনিতে ভালভাবে ছেঁকে নিতে হবে। এক কিলো সয়াবীন থেকে ৮/১০ লিটার দুধ পাওয়া যেতে পারে। এটিকে ফুটিয়ে দুধের মত খাওয়া চলে এবং এ থেকেই দই ও ছানা প্রস্তুত করা যায়। গরুর দুধ থেকে যেভাবে দই ছানা তৈরি করা হয়, সেভাবেই সয়াবীনের দুধ থেকে দই ও ছানা তৈরি করতে হবে। পরাধীনকে গমের সঙ্গে মিশিয়ে অথবা এককভাবে মেসিনে পিষে আটা প্রস্তুত করা হয় ।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্র:

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, সপ্তম মুদ্রণ ১৪২৬, পৃষ্ঠা, ৪১-৪৩।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: rawpixel

Leave a Comment

error: Content is protected !!