পুঁজিবাদ ও নারী শ্রমিক

বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজের মধ্যে দারিদ্র্য ও নিপীড়নের অসংখ্য ঘটনা চাপা থাকে যা হামেশা চোখে পড়ে না। সবচেয়ে ভাল সময়েও শহরের বিক্ষিপ্ত গরিব পরিবারগুলি, কারিগর, শ্রমিক, চাকুরিজীবী এবং ছোট ছোট সরকারি কর্মচারীরা অবিশ্বাস্য রকমের শোচনীয় অবস্থার মধ্যে দিন কাটায়। কোনো মতে দু’বেলার আহার সংগ্রহ করে। এই সব পরিবারের লক্ষ লক্ষ নারী পারিবারিক দাসী হিসাবে বেঁচে থাকে (অথবা কোনোমতে জীবন ধারণ করে)। তারা অতি সামান্য পয়সায় পরিবারের অন্নবস্ত্র যোগাড় করার জন্য প্রতিদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে, আর সবকিছু বাঁচাতে নিজেদের শরীরপাত করে।

এইসব নারীদেরই পুঁজিপতিরা স্বেচ্ছায় তাদের বাড়িতেই কাজ দিয়ে থাকে। আর তারা তাদের জন্য ও পরিবারের জন্য সামান্য আহার সংস্থানের আশায়, একটুখানি অতিরিক্ত আয়ের জন্য অস্বাভাবিক রকম কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি হয়। এইসব নারীদের মধ্য থেকেই আবার সব দেশের পুঁজিপতিরা অতিশয় ন্যায্য মূল্যে নিজেদের জন্য যত খুশি রক্ষিতা সংগ্রহ করে থাকে (প্রাচীন যুগে দাসদের মালিকদের মতো) নারীদের নিয়ে এই ব্যবসার বেলায় কিন্তু পতিতাবৃত্তির বিষয়ে কোন নৈতিক ঘৃণাই (যা কিনা শতকরা ৯৯টি ক্ষেত্রেই শঠতা ছাড়া আর কিছুই না) আর কোনো কাজে আসে না। যতদিন মজুরি দাসত্ব থাকবে, ততদিন পতিতাবৃত্তিও অনিবার্যভাবে থাকবেই। মানব সমাজের ইতিহাসের সর্বস্তরেই সমস্ত নিপীড়িত, শোষিত শ্রেণীর মানুষ সব সময়েই বাধ্য হয়েছে (এবং এইভাবে তারা শোষিত হয়েছে) তাদের শোষকদের জন্য প্রথমত তাদের বেগার শ্রম দিতে এবং দ্বিতীয়ত তাদের নারীদের প্রভুদের জন্য রক্ষিতা হিসাবে দিতে।

এ বিষয়ে দাসপ্রথা, সামন্তবাদপুঁজিবাদের মধ্যে কোনো তফাত নেই। শুধু শোষণের রূপ পালটেছে। কিন্তু শোষণ থেকেই গেছে।

নারীরা বাড়ি বসে কাজ করে কিভাবে শোষিত হচ্ছে সে বিষয়ে সভ্যজগতের কেন্দ্রস্থল, রাজধানী প্যারিসে একটি প্রদর্শনী খুলছে।

প্রতিটি প্রদর্শনীতেই দেখানো হয়েছে নারীরা বাড়ি বসে কাজ করে কোন জিনিসের জন্য কত পায়, এবং সেই অনুযায়ী প্রতিদিন ও প্রতি ঘণ্টায় তার কত আয় হয়।

আরো পড়ুন:  ইনেসা আরমান্দ সমীপে লেনিন

আর তার থেকে আমরা কি দেখলাম? কোনো একটি জিনিসের জন্যই ঘরে বসে কাজ করে কোন নারীই ১.২৫ ফ্রাঙ্ক বা ৫০ কোপেকের বেশি পায় না। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সকলেই আয় করে এর চেয়ে অনেক কম। ল্যাম্পশেডের কথা ধরা যাক। প্রতি ডজনের জন্য মজুরি চার কোপেক, প্রতি ঘণ্টায় আয় ৬ কোপেক। তারপর ফিতে বাধা পুতুল ইত্যাদি। ঘণ্টায় ২.২৫ কোপেক। নকল ফুল: ঘণ্টায় দুই বা তিন কোপেক। মহিলা পুরুষদের অন্তরবাস: ঘণ্টায় ২ থেকে ৬ কোপেক। এই ভাবেই চলছে। তালিকার শেষ নেই।

আমাদের শ্রমিক সংগঠনগুলির এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলির এই ধরনের প্রদর্শনী সংগঠিত করা দরকার। তাতে বুর্জোয়াদের মুনাফার পাহাড়ের কিছু দেখা যাবে না। সর্বহারা নারীদের অভাব ও দৈন্যদশার প্রকাশের মধ্যে দিয়ে অন্য সুফল হবে। এর থেকে নারী পুরুষ নির্বিশেষে মজুরি দাসদের তাদের নিজেদের অবস্থা বুঝতে সাহায্য করবে। তারা তাদের জীবনের দিকে ফিরে তাকাবে। আবহমান কাল ধরে অভাব, দারিদ্র্য, বেশ্যাবৃত্তি এবং বঞ্চিত জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার কথা ভাববে।

[লিখেছেন ২৭ এপ্রিল, ১৯১৩, প্রাভদায় প্রকাশিত হয়েছে: প্রাভদা নং ১০২, মে ৫, ২০১৩]

Leave a Comment

error: Content is protected !!