আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > মার্কসবাদকোষ > বাহ্যিক চেহারা ও সারমর্ম প্রসঙ্গে

বাহ্যিক চেহারা ও সারমর্ম প্রসঙ্গে

বাহ্যিক চেহারা ও সারমর্ম বা আকার ও বস্তু বা আধার ও আধেয় (ইংরেজি: Form and Content) হচ্ছে কোনো বস্তু বা অস্তিত্বের সামগ্রিক চরিত্র উপলব্ধির সূত্র। সারমর্ম বলতে কোনো অস্তিত্বের অন্তর্গত বস্তুপুঞ্জকে বুঝায়। বাহ্যিক চেহারা বলতে সারমর্মের অন্তর্গত বস্তুপুঞ্জের পারস্পরিক সম্পর্কের সামগ্রিক রূপকে বুঝায়। একটি টেবিলের সারমর্ম বা বস্তু বা আধেয় বলতে টেবিলটা যা দিয়ে তৈরি আমরা তাকে বুঝি। টেবিলের বাহ্যিক চেহারা বা আধার বা আকার বলতে বস্তুর সাংগঠনিক রূপ বুঝি।

বাহ্যিক চেহারা ও সারমর্মের পারস্পরিক সম্পর্ক একটি দার্শনিক প্রশ্ন। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মতে বাহ্যিক চেহারা ও সারমর্মের পারস্পরিক সম্পর্ক হচ্ছে দ্বন্দ্বমূলক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক। এই দর্শন অনুযায়ী বাহ্যিক চেহারা ও সারমর্মের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মূল হচ্ছে অস্তিত্বের বিকাশে বাহ্যিক চেহারা ও সারমর্মের ভূমিকার পার্থক্য। সারমর্মই হচ্ছে বিকাশের মূল। বাহ্যিক চেহারা হচ্ছে বস্তুর অস্তিত্বের সাংগঠনিক রূপ।

ভাববাদী দর্শনে বাহ্যিক চেহারাকে বস্তুনিরপেক্ষ শক্তি বলে মনে করা হয়। প্লেটো, কান্ট প্রমুখ বিশিষ্ট ভাববাদী দার্শনিকের মতে সারমর্ম হচ্ছে বাহ্যিক চেহারার প্রকাশ। সারমর্মের পরিবর্তন বা বিকাশও তাই বাহ্যিক চেহারা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই দর্শনে বাহ্যিক চেহারাই মূল, সারমর্ম নয়। চরম বাহ্যিক চেহারা অদৃশ্য এবং অজ্ঞেয়। কিন্তু দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ মনে করে যে, সারমর্মের নিজস্ব গতি আছে। বাহ্যিক চেহারা বস্তুর বিকাশে প্রায় ক্ষেত্রে সহায়ক না হয়ে প্রতিবন্ধক শক্তি হিসাবে কাজ করে। সারমর্মের আভ্যন্তরিক পরিবর্তনের ফলেই তার বাহ্যিক চেহারার পরিবর্তন ঘটে।

সমাজের বিকাশের ক্ষেত্রে বাহ্যিক চেহারা ও সারমর্মের এই বিরোধাত্মক সম্পর্কের উত্তম দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সমাজের মানুষ, হাতিয়ার, যন্ত্রপাতি, সম্পদ হচ্ছে সমাজের সারমর্ম। সমাজের বাহ্যিক চেহারা হচ্ছে উৎপাদনের উপায়ের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ক। সমাজের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, সামাজিক সারমর্মের পরিবর্তনে বাহ্যিক চেহারা এক সময়ে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। আবার সারমর্মের পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাহ্যিক চেহারায় পরিবর্তন ঘটে না। পুরাতন বাহ্যিক চেহারার রেশ কিছুকাল চলতে থাকে। কিন্তু পুরাতন বাহ্যিক চেহারা স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারে না। সারমর্মের পরিবর্তনের ফলে বাহ্যিক চেহারাও পরিশেষে পরিবর্তিত হয়ে যায়।

আরো পড়ুন:  ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হচ্ছে সমাজ জীবনে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মূলনীতিগুলোর প্রয়োগ

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১৭৫ ।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page