ভূমিকা: কাসারি বা কেসুর (বৈজ্ঞানিক নাম: Actinoscirpus grossus) মূলত এক ধরণের বুনো প্রকৃতির উদ্ভিদ বা আগাছা হিসেবে পরিচিত। প্রাকৃতিকভাবেই এটি পাহাড়ের ঢালে কিংবা সমতলের আবাদি জমিতে প্রচুর পরিমাণে জন্মে থাকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাগুলোতে এই উদ্ভিদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যদিও অনেকে একে সাধারণ আগাছা মনে করেন, তবে এর রয়েছে অনন্য গুণাগুণ। এটি একদিকে যেমন ভেষজ ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অন্যদিকে বুনন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে বিভিন্ন কুটির শিল্পজাত পণ্য তৈরিতেও এর গুরুত্ব অপরিসীম।
কাসারি বা কেসুর-এর বর্ণনা:
কাসারি বা কেসুর মূলত একটি দীর্ঘজীবী বা বহুবর্ষজীবী বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। এর মাটির নিচের অংশ বা বক্রধাবকগুলো সরু এবং ক্ষুদ্র স্ফীতকন্দে গিয়ে শেষ হয়, যা প্রায় ৫ মিমি পর্যন্ত পুরু হতে পারে। এই উদ্ভিদের কাণ্ড বা তৃণকাণ্ড লম্বায় ১০০ থেকে ২০০ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ১.০ থেকে ১.২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। সাধারণত এক বা একাধিক গুচ্ছ আকারে বেড়ে ওঠা এই কাণ্ডগুলো বেশ ঋজু, দৃঢ় এবং সুস্পষ্টভাবে ত্রিকোণাকার হয়। কাণ্ডের ভেতরের অংশ স্পঞ্জী এবং উপরিভাগ মসৃণ হলেও উপরের দিকে কিছুটা অমসৃণতা লক্ষ্য করা যায়।
এর পত্র বা পাতাগুলো প্রধানত মূলীয় অংশ থেকে বের হয় এবং দৈর্ঘ্যে ৫০ থেকে ১৭০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতার নিচের অর্ধাংশ দেখতে অনেকটা নৌকার তলার মতো ত্রিকোণাকার, তবে উপরের অংশ কিছুটা কুঞ্চিত ও দীর্ঘ। পাতার কিনারা বা প্রান্তভাগ অমসৃণ এবং এর নিচের আবরণটি প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা, যা ফিকে হলুদ বর্ণের ও স্পঞ্জী হয়ে থাকে। এছাড়া গাছের মাথায় ৩ থেকে ৪টি চ্যাপটা ও ছড়ানো মঞ্জরীপত্র থাকে, যার মধ্যে নিচের দুটি পুষ্পবিন্যাসের চেয়েও বেশি দীর্ঘ (প্রায় ৫০ সেমি) হয়।
কাসারি বা কেসুর উদ্ভিদের পুষ্পবিন্যাস মূলত প্রান্তীয় এবং এটি সরল বা যৌগিক ‘করি’ প্রকৃতির হয়ে থাকে। এর পুষ্পমঞ্জরী সাধারণত ৬ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, যার একাধিক প্রাথমিক শাখাগুলো অসম এবং অমসৃণ হয়ে থাকে। এই গাছে অসংখ্য ছোট ছোট স্পাইকলেট দেখা যায়, যা দেখতে উপবৃত্তাকার এবং কালচে বাদামী বর্ণের। প্রতিটি স্পাইকলেট ঘন পুষ্পে সমৃদ্ধ থাকে। এর গ্লুম বা আবরণীগুলো নৌকাকৃতি এবং তন্তুময়, যার কিনারায় মরিচা-বাদামী আভা লক্ষ্য করা যায়। ফুলের অভ্যন্তরীণ গঠনে তিনটি পুংকেশর থাকে, যার পরাগধানী রৈখিক এবং লালাভ-বাদামী রঙের। এর গর্ভদণ্ডটি বেশ মসৃণ এবং তিনটি গর্ভমুণ্ড বিশিষ্ট হয়। জীবনচক্রের শেষে এই উদ্ভিদে যে ফল বা ‘নাটলেট’ উৎপন্ন হয়, তা আকারে ক্ষুদ্র এবং বি-ডিম্বাকার। ত্রিকোণাকার ও মসৃণ এই নাটলেটগুলো দেখতে লালাভ-বাদামী রঙের হয় এবং এর অগ্রভাগ বেশ তীক্ষ্ণ থাকে। ক্রোমোসোম সংখ্যা: 2n = ৮৮।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
কাসারি বা কেসুর সাধারণত জলাশয়, ডোবা এবং নিচু ধানক্ষেতের মতো আর্দ্র পরিবেশে জন্মাতে পছন্দ করে। প্রাকৃতিকভাবে এটি একটি আগাছা হিসেবে বিবেচিত হলেও এর টিকে থাকার ক্ষমতা অসাধারণ। এই উদ্ভিদের জীবনচক্রের বিশেষ সময়কাল হলো আগস্ট থেকে ডিসেম্বর মাস, যখন এতে ফুল ও ফল দেখা যায়। এর বংশবিস্তার পদ্ধতি বেশ বৈচিত্র্যময়; এটি মূলত বীজের মাধ্যমে নতুন চারা উৎপাদন করে। তবে বীজের পাশাপাশি এর পুরাতন স্ফীতকন্দ এবং ঊর্ধ্বধাবকের সাহায্যেও এটি দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটাতে এবং ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম।
কাসারি বা কেসুর-এর বিস্তৃতি:
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কাসারি বা কেসুরের বিস্তৃতি বেশ বিশাল। এটি ভারত থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড হয়ে সুদূর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া চীনের দক্ষিণাঞ্চল, তাইওয়ান, মাইক্রোনেশিয়া এবং জাপানের বনিন দ্বীপপুঞ্জেও এই উদ্ভিদটির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় এর বিস্তৃতি অত্যন্ত উল্লেখ্যযোগ্য। দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ বৃহত্তর বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে এটি প্রচুর পরিমাণে জন্মে। তবে উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলো যেমন—দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং নেত্রকোণায় এই প্রজাতিটি তুলনামূলক কম পরিমাণে বা সামান্য দেখা যায়।
অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:
আর্থ-সামাজিক ও ব্যবহারিক দিক থেকে কাসারি বা কেসুর উদ্ভিদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ কুটির শিল্পে এর কাণ্ড রৌদ্রে শুকিয়ে এবং এর প্রধান শিরা (Rib) অপসারিত করে চ্যাপটা আঁশ তৈরি করা হয়। এই টেকসই আঁশ দিয়ে অত্যন্ত মজবুত ও দৃষ্টিনন্দন মাদুর, থলে এবং ঝুড়ি তৈরির প্রাচীন প্রচলন রয়েছে। শুধু বুনন শিল্পেই নয়, কোনো কোনো অঞ্চলে এর মাটির নিচের স্ফীতকন্দ পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এছাড়া দেশের বেশ কিছু জনপদে এটি পশুখাদ্য হিসেবেও বেশ জনপ্রিয়। তবে কৃষিজমির ক্ষেত্রে এটি একটি শক্তিশালী আগাছা হিসেবে পরিচিত; কারণ অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই এটি পুরো ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা রাখে।
অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১১ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) কাসুর বা কাসারি প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে কাসুর বা কাসারি সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
তথ্যসূত্র:
১. এস নাসির উদ্দিন (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১১, পৃষ্ঠা ১৭২। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Gordon Leppig & Andrea J. Pickart
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।