বাংলাদেশের প্রাকৃতিক জলাভূমি ও বনাঞ্চলের এক অনন্য পাখি হলো তিতির। আমাদের দেশে মূলত Francolinus গণের তিন প্রজাতির তিতির দেখা যায়— কালা তিতির (Black Francolin), মেটে তিতির (Grey Francolin) এবং আমাদের আজকের আলোচনার প্রধান বিষয় বাদা তিতির বা জলার তিতির (Swamp Francolin)। এই পাখিটি মূলত জলাভূমি সংলগ্ন ঘাসবন ও নিচু এলাকায় বিচরণ করে। আজকের ব্লগে আমরা বিপন্নপ্রায় এই বাদা তিতিরের বৈশিষ্ট্য, জীবনযাত্রা এবং বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করব।
বাদা তিতিরের শারীরিক বর্ণনা ও বৈশিষ্ট্য
বাদা তিতির বা Swamp Francolin মূলত একটি হৃষ্টপুষ্ট ও বলিষ্ঠ বাদামি রঙের জলচর পাখি। অন্যান্য তিতির প্রজাতির তুলনায় এটি আকারে কিছুটা বড় হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক বাদা তিতিরের শারীরিক পরিমাপ নিচে দেওয়া হলো:
- দৈর্ঘ্য: প্রায় ৩৭ সেন্টিমিটার।
- ওজন: গড়ে ৫০০ গ্রাম।
- লেজ ও পা: লেজ ১১.৫ সেমি এবং পা ৬.৫ সেমি।
- ঠোঁট: ২.২ সেন্টিমিটার।
পালকের রঙ ও রূপরেখা
এই পাখির শারীরিক সৌন্দর্য বেশ নজরকাড়া। এদের মাথার চাঁদি ও ঘাড় বাদামি রঙের হয়। পিঠের দিকটা হালকা পীত বর্ণের, যার ওপর বাদামি ডোরা ও লালচে-বাদামি পট্টি দেখা যায়। এদের মুখে হালকা পীত রঙের ভ্রু-রেখা এবং গালের ডোরার মাঝখানে একটি মলিন বাদামি চক্ষু-রেখা থাকে।
বাদা তিতিরের গলা ও ঘাড়ের উপরের অংশ উজ্জ্বল কমলা রঙের, যা এদেরকে সহজেই চিনতে সাহায্য করে। এদের লেজ তামাটে এবং লেজের শেষ প্রান্তটি কিছুটা ফিকে হয়ে থাকে। এদের দেহতলে প্রশস্ত সাদা ডোরাসহ বাদামি রঙের মিশ্রণ দেখা যায়।
চোখ, ঠোঁট ও পায়ের গঠন
এদের চোখ গাঢ় লাল অথবা বাদামি রঙের হয়ে থাকে এবং চোখের পাতা হালকা খয়েরি-সবুজ। এদের ঠোঁট পাটকিলে রঙের, যার আগার দিকটা সাদা। বাদা তিতিরের পা ও পায়ের পাতা সাধারণত কমলা-হলুদ কিংবা অনুজ্জ্বল লাল হয়ে থাকে।
ছেলে ও মেয়ে পাখির পার্থক্য
সাধারণভাবে ছেলে ও মেয়ে পাখির চেহারা অভিন্ন হলেও এদের চেনার একটি বিশেষ উপায় আছে। ছেলে বাদা তিতিরের পায়ে গজালের মতো খাড়া নখর থাকে, যা মেয়ে পাখির ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
বাদা তিতিরের স্বভাব ও বিচরণস্থল
নামের সার্থকতা বজায় রেখে বাদা তিতির সাধারণত জলাভূমির আশেপাশে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। এদের মূলত লম্বা ঘাসবন, নলখাগড়ার বন, নদী বা জলাশয়ের ধারের ঝোপঝাড় এবং পার্শ্ববর্তী শস্যখেতে বিচরণ করতে দেখা যায়। এরা খুব একটা একা থাকে না; সচরাচর জোড়ায় কিংবা ৫-১৫টি পাখির একটি অগোছালো বড় দলে এদের দেখা মেলে।
খাদ্যতালিকা ও সক্রিয়তা
এরা প্রধানত ঊষা ও গোধূলিতে (ভোরবেলা ও সন্ধ্যায়) খাবারের সন্ধানে বের হয়। জলাশয়ের প্লাবনভূমি বা জলজ তৃণভূমিতে ধীরস্থিরভাবে ঘুরে এরা খাবার সংগ্রহ করে। এদের প্রধান খাবারের তালিকায় রয়েছে:
- বিভিন্ন প্রকার বীজ ও শস্যদানা।
- জলাভূমির আশেপাশে পাওয়া পোকামাকড়।
- শস্যক্ষেতের অন্যান্য খাদ্যকণা।
বিচিত্র ডাক ও গান
বাদা তিতিরের কণ্ঠস্বর বেশ কর্কশ। এদের কয়েক ধরণের ডাক রয়েছে:
- স্বাভাবিক অবস্থায় এরা কর্কশ গলায় ‘চুক্রিরু, চুকিরু, চুকিরু’ বলে ডাকে।
- ভয় পেলে এদের ডাক বদলে যায় এবং ‘কিউ-কেয়ার’ শব্দে চিৎকার করে।
- সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এরা তীক্ষ্ম কণ্ঠে এক ধরণের ‘গান’ গায়, যা শুনতে ‘চুলি-চুলি-চুলি’ এর মতো মনে হয়।
প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি
বাদা তিতিরের প্রজনন মৌসুম সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত। এই সময়ে এরা জলাশয়ের ধারের নলবন বা ঘন ঝোপঝাড়ের নিচে লতাপাতা দিয়ে আরামদায়ক বাসা তৈরি করে।
- ডিমের বৈশিষ্ট্য: এদের ডিম উজ্জ্বল ফিকে ও হালকা পীত বর্ণের হয়, যার ওপর অনেক সময় লালচে ফুসকুড়ির মতো দাগ থাকে।
- ডিমের সংখ্যা: এরা সাধারণত ৪ থেকে ৬টি ডিম পাড়ে।
- তা দেওয়া: প্রজননের পুরো প্রক্রিয়া ও ডিমে তা দেওয়ার দায়িত্ব মেয়ে পাখি একাই পালন করে।
বাদা তিতিরের বিস্তৃতি ও বর্তমান অবস্থা
বাদা তিতির একসময় বাংলাদেশের জলাভূমি ও ঘাসবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তবে বর্তমানে এটি বাংলাদেশের একটি প্রাক্তন আবাসিক পাখি হিসেবে পরিচিত। অতীতে দেশের ঢাকা, খুলনা এবং সিলেট বিভাগের বিস্তৃত তৃণভূমি ও নলবনগুলোতে এই পাখির নিয়মিত দেখা মিলত। কিন্তু আবাসস্থল ধ্বংস এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এখন আমাদের দেশে এদের আর দেখা পাওয়া যায় না।
বৈশ্বিক বিচরণস্থল
বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেলেও বিশ্বজুড়ে বাদা তিতিরের বিচরণক্ষেত্র কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ। বর্তমানে যেসব দেশে এদের দেখা পাওয়া যায়:
- ভারত: বিশেষ করে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকার ঘাসবনে।
- নেপাল: তরাই অঞ্চলের সংরক্ষিত জলাভূমি এলাকায়।
বিশ্বের খুব সামান্য এলাকাতেই এই পাখিটি টিকে আছে, তাই আন্তর্জাতিকভাবে এর সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান অবস্থা ও আইনি সুরক্ষা
বাদা তিতির বা জলার তিতির বর্তমানে পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত নাজুক অবস্থানে রয়েছে। আইইউসিএন (IUCN) এর লাল তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী এই পাখিটি ‘সংকটাপন্ন’ (Vulnerable) হিসেবে চিহ্নিত। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর অবস্থা আরও ভয়াবহ; আমাদের দেশে একে ‘মহাবিপন্ন’ (Critically Endangered) পাখি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্রমাগত জলাভূমি ভরাট এবং ঘাসবন উজাড় হওয়ার ফলে আমাদের দেশ থেকে এই প্রজাতিটি প্রায় হারিয়েই গেছে।
বাংলাদেশ সরকার এই পাখির গুরুত্ব বিবেচনা করে একে আইনি সুরক্ষা প্রদান করেছে। বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন অনুযায়ী বাদা তিতির একটি সংরক্ষিত প্রজাতি। অর্থাৎ, এই পাখি শিকার, ধরা বা এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
🌿 বোনাস: বাংলাদেশের সব পাখির নাম জানতে আমাদের এই ৭০০+ পাখির তালিকাটি ঘুরে দেখুন! 🦜
নামের উৎপত্তি ও বিচিত্র তথ্য
বাদা তিতিরের বৈজ্ঞানিক নামের মধ্যেও এর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় লুকিয়ে আছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ortygornis gularis (আগে যা ছিল Francolinus gularis)।
- নামের অর্থ: ‘ফ্রাঙ্কোলিন’ (Francolin) শব্দটি এসেছে ইতালীয় শব্দ ‘Francolino’ থেকে, যার অর্থ হলো ‘খুদে মুরগি’।
- শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মিল: ল্যাটিন শব্দ ‘gularis’ এর অর্থ হলো ‘গলার’ বা ‘গলা সংক্রান্ত’। যেহেতু এই পাখির গলার রঙ উজ্জ্বল কমলা এবং বেশ স্পষ্ট, তাই এর পূর্ণ বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ দাঁড়ায়—‘গলা-অলা খুদে মুরগি’।
আলোকচিত্রের ইতিহাস: বাদা তিতিরের ছবিটি নীলোৎপল মহন্ত (ইংরেজি: Nilutpal Mahanta) তুলেছিলেন এপ্রিল, ২০১৮ সালে যোরহাট, আসাম থেকে।
তথ্যসূত্র
১. ইনাম আল হক ও এম শাহরিয়ার মাহমুদ, বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, ২৬তম খণ্ড “পাখি”, ১ম প্রকাশ, আগস্ট ২০০৯; ইনাম আল হক, সৈয়দ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, মোনাওয়ার আহমাদ ও আবু তৈয়ব আবু আহমদ সম্পাদিত; বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা; পৃষ্ঠা – ২-৩। আইএসবিএন 984-30000-0286-0।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
I have come across your article “বাদা তিতির“. The photo of the bird used here is an original work by me. I would be more than happy if you give me due credits for this photo in your article.
It was already mentioned in the Caption, but the caption was not showing due to design problem. I’ve mentioned it inside the article. Thanks a lot for your concern.
Thank you Sir for mentioning the credit.