মেটে তিতির: এক হারিয়ে যাওয়া পাখির বৈশিষ্ট্য ও জীবনকথা | Grey Francolin

মেটে তিতির

বৈজ্ঞানিক নাম: Francolinus pondicerianus (Gmelin, 1789) সমনাম: Grey pondicerianus Gmelin, 1789 বাংলা নাম: মেটে তিতির ইংরেজি নাম: Grey Francolin
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য Kingdom: Animalia বিভাগ/Phylum: Chordata শ্রেণী/Class: Aves পরিবার/Family: Phasianidae গণ/Genus: Francolinus, Stephens, 1819; প্রজাতি/Species: Francolinus pondicerianus (Gmelin, 1789)

বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যে তিতির পাখি এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আমাদের দেশে মূলত Francolinus গণের তিন প্রজাতির তিতির দেখা যায়— কালা তিতির (Black Francolin), বাদা তিতির (Swamp Francolin) এবং আমাদের আজকের আলোচনার মূল বিষয় মেটে তিতির (Grey Francolin)। এক সময় দেশের ঝোপঝাড় ও খোলা প্রান্তরে এদের বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মতো। আজকের ব্লগে আমরা এই চঞ্চল ও সুন্দর মেটে তিতিরের জীবনযাত্রা, স্বভাব এবং বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

মেটে তিতিরের শারীরিক বর্ণনা ও বৈশিষ্ট্য

মেটে তিতির (Grey Francolin) মূলত একটি ছোট লেজের ধূসর রঙের ভূচর পাখি। এদের শারীরিক গঠন বেশ আঁটসাঁট। একটি পূর্ণবয়স্ক মেটে তিতিরের শরীরের গড় পরিমাপ নিচে দেওয়া হলো: 

  • দৈর্ঘ্য: ৩৩ সেন্টিমিটার।
  • ওজন: প্রায় ২৭৫ গ্রাম।
  • পাখা: ১৪.৬ সেন্টিমিটার।
  • ঠোঁট ও পা: ঠোঁট ২.৫ সেমি এবং পা ৪ সেমি।
  • লেজ: ৮.৫ সেন্টিমিটার। 

পালকের রঙ ও সৌন্দর্য

এই পাখির গায়ের রঙ একে প্রকৃতির সাথে মিশে থাকতে সাহায্য করে। প্রাপ্তবয়স্ক মেটে তিতিরের পিঠের দিকে হালকা পীত, তামাটে, এবং ধূসর-বাদামি রঙের সুন্দর ডোরাকাটা দাগ থাকে। এদের মুখের রঙ অনুজ্জ্বল কমলা এবং চোখের ওপর দিয়ে একটি স্পষ্ট কালো রেখা চলে গেছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এদের হালকা পীতাভ গলা, যার চারপাশে একটি সরু কালো মালার মতো দাগ থাকে। 

ওড়ার সময় এদের লেজের প্রান্তের তামাটে কিনারা এবং হালকা পীত রঙের অবসারণী (Ventral area) স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। এদের ঠোঁট রূপালি রঙের হলেও নিচের অংশটি কিছুটা কালচে এবং পাগুলো অনুজ্জ্বল লাল হয়ে থাকে।

মেয়ে ও ছেলে পাখির পার্থক্য এবং উপ-প্রজাতি

অন্যান্য অনেক পাখির মতো মেটে তিতিরের মেয়ে ও ছেলে পাখির চেহারায় কোনো দৃশ্যমান পার্থক্য নেই; অর্থাৎ এরা দেখতে অভিন্ন। বিশ্বে মেটে তিতিরের মোট তিনটি উপ-প্রজাতি দেখা যায়, যার মধ্যে বাংলাদেশে একসময় F. p. interpositus উপ-প্রজাতিটি পাওয়া যেত।

মেটে তিতিরের স্বভাব ও বিচরণ

মেটে তিতির সাধারণত শুকনো তৃণভূমি, ছোট ঝোপঝাড়, কৃষিখামার এবং বালিয়াড়িতে বিচরণ করতে পছন্দ করে। এরা খুব একটা একা থাকে না; সচরাচর জোড়ায় কিংবা ৪-৮টি পাখির একটি পারিবারিক দল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। 

এরা মূলত ভূচর পাখি। এদের চলাফেরা ও ওড়ার ধরন বেশ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ—ডানার দ্রুত ঝাপটে কিছুক্ষণ জোরে ওড়ার পর এরা বাতাসের ওপর ভর করে কিছুটা সময় ভেসে থাকে এবং পুনরায় ডানা চালায়। রাতের বেলায় সুরক্ষার জন্য এরা কাঁটাগাছ বা ঘন ঝোপের নিচে আশ্রয় নেয়। কোনো কারণে ভয় পেলে এরা ঝোপের ওপর দিয়ে দ্রুত উড়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যায়। 

খাদ্যতালিকা ও খাদ্যান্বেষণ

মাটি আঁচড়ে খাবার খোঁজা এদের সহজাত স্বভাব। এরা পা এবং ঠোঁট ব্যবহার করে মাটি থেকে খাবার বের করে আনে। মেটে তিতিরের প্রধান খাবারগুলো হলো: 

  • বিভিন্ন ধরনের ছোট পোকামাকড়।
  • আগাছার বীজ ও শস্যদানা।
  • ঘাসের কচি ডগা।
  • বিভিন্ন প্রকার রসালো ফল। 

ডাক ও ভাববিনিময়

মেটে তিতিরের ডাক বেশ বৈচিত্র্যময়। এরা মাঝে মাঝে উচ্চস্বরে ‘খাতিজা-খাতিজা-খাতিজা…’ শব্দে ডেকে ওঠে। তবে যখন এরা ভয় পায় বা কোনো বিপদের আশঙ্কা করে, তখন এক ধরনের ঘর্ষণের মতো শব্দ করে ডাকে, যা শুনতে অনেকটা ‘র্ক্ষির-র্ক্ষির’ এর মতো মনে হয়।

প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি

বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মেটে তিতিরের প্রজননকাল। এই সময়ে এরা নিরাপদ স্থান হিসেবে কাঁটাযুক্ত ঝোপের আড়াল অথবা পাথরের ফাঁক বেছে নেয়। সেখানে ঘাস ও শুকনা পাতা দিয়ে বাসা তৈরি করে এরা ডিম পাড়ে। 

  • ডিমের বৈশিষ্ট্য: ডিমগুলো ফিকে বা হালকা পীত বর্ণের হয়।
  • ডিমের সংখ্যা: এরা সাধারণত ৪ থেকে ৯টি ডিম পাড়ে।
  • ডিমের আকার: প্রতিটি ডিমের গড় পরিমাপ প্রায় ৩.২ × ২.৬ সেন্টিমিটার।
  • তা দেওয়া: বাসা তৈরি ও ডিম পাড়ার পর স্ত্রী পাখি একাই ডিমে তা দেয় এবং ছানা ফোটায়।

মেটে তিতিরের বিস্তৃতি ও বর্তমান অবস্থা

মেটে তিতির বর্তমানে বাংলাদেশের একটি প্রাক্তন আবাসিক পাখি হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ, একসময় এ দেশে এদের নিয়মিত দেখা মিললেও এখন তা কেবল ইতিহাস। এককালে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন বিস্তৃত তৃণভূমিতে এই পাখির অবাধ বিচরণ ছিল, কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে এদের আর দেখা পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মেটে তিতিরের একমাত্র ‘নমুনা’ বা রেকর্ড পাওয়া গিয়েছিল ১৯ শতকের দিকে। সেটি দেশের পশ্চিমাঞ্চলের শুষ্ক এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে এ দেশে এদের কোনো অস্তিত্ব বা বিচরণের প্রমাণ মেলেনি।

বৈশ্বিক বিস্তৃতি

বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশে মেটে তিতিরের উপস্থিতি এখনো লক্ষ্য করা যায়। দক্ষিণ এবং নিকট পূর্ব এশিয়ায় এদের ব্যাপক বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে। উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হলো:

  • ভারত ও পাকিস্তান
  • নেপাল ও শ্রীলংকা
  • ইরান

সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়া এবং আধা-মরু অঞ্চল এদের বসবাসের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।

🌿 বোনাস: বাংলাদেশের সব পাখির নাম জানতে আমাদের এই ৭০০+ পাখির তালিকাটি ঘুরে দেখুন! 🦜

বর্তমান অবস্থা ও আইনি সুরক্ষা

মেটে তিতিরের বৈশ্বিক এবং স্থানীয় অবস্থা কিছুটা ভিন্ন। আইইউসিএন (IUCN) এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মেটে তিতির এখনো ‘বিপদমুক্ত’ (Least Concern) হিসেবে বিবেচিত। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর চিত্রটি ভিন্ন। উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বর্তমানে বাংলাদেশে একে ‘অপ্রতুল-তথ্য’ (Data Deficient) শ্রেণিতে রাখা হয়েছে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে এ দেশে এর দেখা পাওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট রেকর্ড নেই।

পাখিটি এ দেশ থেকে হারিয়ে গেলেও আইনিভাবে এটি সুরক্ষিত। বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) (সংশোধন) আইন অনুযায়ী এই প্রজাতিটি সংরক্ষিত। অর্থাৎ, এই পাখি শিকার বা এর আবাসস্থল ধ্বংস করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

নামের উৎপত্তি ও বিচিত্র তথ্য

মেটে তিতিরের বৈজ্ঞানিক নামের পেছনে একটি সুন্দর অর্থ লুকিয়ে আছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ortygornis pondicerianus

  • নামের অর্থ: ‘ফ্রাঙ্কোলিন’ (Francolin) শব্দটি এসেছে ইতালীয় শব্দ ‘Francolino’ থেকে, যার অর্থ হলো ‘খুদে মুরগি’
  • ভৌগোলিক সংযোগ: নামের দ্বিতীয় অংশ ‘pondicerianus’ এসেছে ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম চেন্নাইয়ের বিখ্যাত শহর পন্ডিচেরি থেকে। অর্থাৎ, পূর্ণ বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ দাঁড়ায়—’পন্ডিচেরির খুদে মুরগি’।

মেটে তিতির আমাদের জীববৈচিত্র্যের এমন এক অংশ যা আজ কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ। এককালের ঢাকা বিভাগের তৃণভূমি কাঁপানো এই পাখিটি কেন দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেল, তা পরিবেশ রক্ষার একটি বড় শিক্ষা। সঠিক তদারকি এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমেই আমরা হয়তো ভবিষ্যতে এমন অনেক প্রজাতিকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারব।

তথ্যসূত্র

১. ইনাম আল হক ও এম শাহরিয়ার মাহমুদ, বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, ২৬তম খণ্ড “পাখি”, ১ম প্রকাশ, আগস্ট ২০০৯; ইনাম আল হক, সৈয়দ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, মোনাওয়ার আহমাদ ও আবু তৈয়ব আবু আহমদ সম্পাদিত; বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা; পৃষ্ঠা – ২-৩। আইএসবিএন 984-30000-0286-0।

Leave a Comment

error: Content is protected !!