কারিপাতা বা বারসুঙ্গার গাছে আছে ভেষজ গুণ

কারিপাতা (Murraya koenigii অথবা Bergera koenigii) বা বারসুঙ্গা বা মিষ্টি নিম চিবিয়ে খেলে আমাশয় ভালো হয়। এই পাতা ভারত ও পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে নানা ধরনের রান্নায় ব্যবহার করা হয়। অনেকে ঝোল জাতীয় রান্নায় ব্যবহার করে থাকে। কারিপাতা রোপণ করার জন্য বীজকে অবশ্যই পাকা ও সতেজ হতে হবে। শুকনো অথবা কোঁকড়ানো ফল চাষ করার যোগ্য নয়। পুরো ফলটি রোপণ করা যায়, তবে ফলের শাঁস ছাড়িয়ে নিয়ে কোনো স্যাঁতসেঁতে পাত্রে কিন্তু তা যেনো ভেজা না হয় এমন পাত্রে রোপণ করতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়।

কারিপাতার ব্যবহার আগে বাঙালি রান্নাঘরে ছিলই না। কেরালা ও তামিলনাড়ুতে এটির বেশি প্রচলন। এখন গুজরাট ও মহারাষ্ট্রেও কড়হি ইত্যাদি ব্যঞ্জনে দেওয়া হয়। তরকারি সুগন্ধিত করবার জন্যে কারিপাতা বা যাকে মিঠা নিমও বলে ফোড়ন হিসেবে দেওয়া হয়। কারিপাতা বা মিঠা নিম শীতল, কটু, তিক্ত, কিছুটা কষায় আর লঘু। শরীরের জ্বালা বা দাহ, অর্শ, কৃমি, শূল, শরীর ফুলে ওঠা, কুষ্ঠ এবং বিষ নাশ এই পাতা রুচিকর। এতে পালং বা মেথি শাকের চেয়ে ভিটামিন এ বেশি আছে।

বিষাক্ত কীটের কামড়ে এই পাতার প্রলেপ লাগানো হয়। এই পাতা পচে যাওয়া বন্ধ করে ও ত্বকের বিকার দূর করে। কারি পাতার গাছের ছাল ও মূল খেলে শরীরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং মৃদু জোলাপের কাজও করে।[১]

অসুখে কারিপাতার ব্যবহার:

পাতা-ছাল-মূল (সমগ্র গাছ) অগ্নিদ্দীপক, বলকর, উত্তেজক, পাকস্থলীর পক্ষে হিতকর। পাতার রস আমাশা ও রক্ত আমাশা নাশক এবং বলকারক। পাতায় সামান্য মেনথল জাতীয় সুগন্ধ দ্রব্য পাওয়া যায়। জলে চটকে সেই জল বমিনাশক, সামান্য উত্তেজক ও বায়ুনাশক। এটির রস অতিসার, উদরাময়, সাধারণ জ্বরে উপকার করে। ঝলসানো পাতার রস বমন নিবারক। ক্বাথ জ্বরঘু ও সর্পবিষে উপকারী। বেটে লাগালে চুলকানি নষ্ট হয়। মূল উত্তেজক, বলকর, ভেদক, চুলকানি নাশক। কীটদংশন ও বৃক্ক প্রদাহে ব্যবহার করলে উপশম হয়। ফল সংকোচক, অতিসার নাশক।

আরো পড়ুন:  কাউন-এর নানাবিধি ভেষজ প্রয়োগের বিবরণ

যদিও পাতা, গাছের ছাল, মূলের ছাল সর্পদংশনে ব্যবহারের উল্লেখ দেখা যায়, কিন্তু সর্পদংশন চিকিৎসার ক্ষেত্রে এগুলির কোন ভূমিকা নাই। তাহলেও বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়ে এই গাছের মূল, ছাল বা পাতা বেটে প্রলেপ দিলে যন্ত্রণার উপশম হয়ে থাকে। ইউনানি মতে– পাতা পাচক, ক্ষুধাকারক, শক্তিবর্ধক, ধাতু পুষ্টিকর। সংগ্রহণী, কৃমি ও মুখদৌর্গন্ধনাশক এবং কফনিঃসারক। মূল বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়ে এর মূল বেটে লাগালে যন্ত্রণা নষ্ট হয়। এটি বিশেষভাবে কাজ করে রসবহ স্রোতে।[২]

১. অগ্নিমান্দ্য: যেক্ষেত্রে সাময়িক ভাবে অর্থাৎ সাধারণতঃ কোন রোগভোগের বা মানসিক বিপর্যয়ের পর অগ্নিমান্দ্য দেখা দেয়, সঙ্গে থাকে পেটফাঁপা, অরুচি, বমি বমি ভাব, সেক্ষেত্রে কারিপাতা বা বারসুঙ্গার বা মিঠানিমের ৮/১০টি পাতা (পত্রিকা) আধ কাপ জলে চটকে ঘেঁকে সকালের দিকে একবার এবং এভাবেই বৈকালের দিকে একবার করে কয়েকদিন খেলে এ অসুবিধেগুলি চলে যায়।

২. আমাশায়: সাদা বা রক্তামাশা ক্ষেত্রে এটি কাজ করে। পাতা চটকানো জল উপরিউক্ত পদ্ধতিতে কয়েকদিন খেতে হবে। পাতা ঝলসানো রস বা পাতা বেটে তা থেকে রস বের করে আধ চা-চামচ মাত্রায় দিনে ২ বার সকালে ও বিকাল সিকি কাপ ঠাণ্ডা জলের সঙ্গে মিশিয়ে খেলেও চলবে। এর দ্বারা আমাশা নষ্ট হয়ে গিয়ে ক্ষুধাবৃদ্ধি হবে, শরীরে বল আসবে।

৩. উদরশূলে: অজীর্ণ, আমাশা, অতিসার প্রভৃতিতে পেটে ব্যথা হতে পারে, পেটে বায়ু জমলে, ক্রিমি হলেও হয়ে থাকে। এসব কারণে উদরশূল হলে কারিপাতা বা বারসুঙ্গার বা মিঠানিমের শুকনা শিকড়ের ছাল ৫/৬ গ্রাম নিয়ে একটু থেঁতো করে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে ১ কাপ থাকতে নামিয়ে, ঘেঁকে, তাতে শুঁঠের মিহিচুর্ণ ২ গ্রাম মত মিশিয়ে, সেটিকে এক ঘণ্টা অন্তর অন্তর ৩/৪ বারে খেতে হবে। এর দ্বারা উদরবায়ু নিঃসরিত হয়ে গিয়ে ব্যথা কমবে। তবে আসল কারণের জন্য যথাবিহিত চিকিৎসা চলবে।

আরো পড়ুন:  বনঢুলি বা দুপুরমনি ফুল ও মূলের ছয়টি ভেষজ গুণাগুণ

৪. ফুস্কুড়ি ও চুলকানি: বিশেষ করে গরমের দিনে খুবই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, অন্য সময়েও হয়, তবে গরমের দিনের মত প্রচণ্ড অসুবিধায় না ফেললেও এ রোগটি যেখানে-সেখানে সময়ে-অসময়ে মানুষকে অপ্রস্তুত করে দেয়। এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে মিঠানিমের কাঁচা পাতা বেটে হলুদের মতো আক্রান্ত স্থানে লাগাতে হবে এবং শুকিয়ে গেলে তা ফেলে দিয়ে ভালভাবে গরম জল দিয়ে ধোওয়া প্রয়োজন। তারপর জল শুকিয়ে গেলে মিঠানিমের পাতা (ছায়াতে শুকিয়ে) মিহিচূর্ণ আক্রান্ত স্থানে ছড়িয়ে দিতে হবে। এভাবে কয়েকদিন করলেই অসুবিধাটা চলে যাবে।

৫. বিষাক্ত পোকামাকড়ের দংশন: মূলের ছাল, অভাবে পাতা বেটে প্রলেপ দিলে। ধীরে ধীরে যন্ত্রণার উপশম হয়।

৬. প্রস্রাবের সমস্যা দূর করতে:  কারিপাতার গাছের শিকড়ের রস বা কারিপাতার পাতার রসে অল্প এলাচগুঁড়া মিশিয়ে পান করলে কোনো কারণে আটকে থাকা প্রস্রাব বেরিয়ে যায় ও প্রস্রাব পরিষ্কার হয়।[১][২]

CHEMICAL COMPOSITION

Murraya koenigii (Linn.) Spreng. Leaves contain: moisture 66.3, protein 6.1, fat (ether extr.) 1.0, carbohydrate 16.0, volatile oil 2.6%, fibre 6.4 and mineral matter 4.2%, সুরভিনিম্ব। calcium 810 mg., phosphorus 600 mg. and iron 3.1 mg., carotene (as vitamin A) 12,600 i.u., nicotinic acid 2.3 mg. and vitamin C 4 mg./100 g.; amino acids (asparagine, glycine, serine, aspartic acid, glutamic acid, theonine, alanine, proline, tyrosine, tryptophan, x-aminobutyric acid, phenylalanine, leucine, isoleucine, ornithine, lysine, arginine and histidine), a glucoside (koenigin) and a resin. Twigs and leaves contain: potash 0.8% (dry matter basis). Curry leaf oil contains: dl-a-phellandrene 4.6, d-sabinene 9.2, d-apinene 5.55, dipentene 6.8, d-a-terpineol 3.2, caryophyllene 26.3, isosafrol 4.4, cadinene 18.2, cadinol 12.8, lauric acid 2.7 and palmitic acid 3.4%. Fruit contains: a volatile oil 0.76% and koenigin[২]

আরো পড়ুন:  সোজা জাতা কানশিরা শোভাবর্ধক ও ভেষজ বিরুৎ

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, ২৩৯-২৪০। ২. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৯, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৫, পৃষ্ঠা, ১৫৭-১৫৯।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Mokkie

Leave a Comment

error: Content is protected !!