আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > এঙ্গেলস > কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার — মার্কস ও এঙ্গেলস

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার — মার্কস ও এঙ্গেলস

কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত

প্রথম অংশ

দ্বিতীয় অংশ, তৃতীয় অংশ, চতুর্থ অংশ,

ইউরোপ ভূত দেখছে—কমিউনিজমের ভূত। এ ভূত ঝেড়ে ফেলার জন্য এক পবিত্র জোটের মধ্যে এসে ঢুকেছে৷ সাবেকী ইউরোপের সকল শক্তি—পোপ এবং জার, মেত্তেরনিখ ও গিজে, ফরাসি র‍্যাডিকালেরা আর জার্মান পুলিশ গোয়েন্দারা।

এমন কোন বিরোধী পার্টি আছে, ক্ষমতায় আসীন প্রতিপক্ষ যাকে কমিউনিস্ট-ভাবাপন্ন বলে নিন্দা করে নি? এমন বিরোধী পার্টিই বা কোথায় যে নিজেও আরও অগ্রসর বিরোধী দলগুলির, তথা প্রতিক্রিয়াশীল বিপক্ষদের বিরুদ্ধে পাল্টা ছুড়ে মারে নি কমিউনিজমের গালি?

এই তথ্য থেকে দুটি ব্যাপার বেরিয়ে আসে। আরো পড়ুন

এক। ইউরোপের সকল শক্তি ইতোমধ্যেই কমিউনিজমকে একটা শক্তি হিসাবে স্বীকার করেছে।

দুই। সময় এসে গেছে, যখন প্রকাশ্যে, সারা জগতের সম্মুখে কমিউনিস্টদের ঘোষণা করা উচিত তাদের মতামত কী, লক্ষ্য কী, তাদের ঝোঁক কোন দিকে, এবং কমিউনিজমের ভূতের এই আষাঢ়ে গল্পের জবাব দেওয়া উচিত পার্টির একটা ইশতেহার দিয়েই।

এই উদেশ্য নিয়ে নানা জাতির কমিউনিস্টরা লন্ডনে সমবেত হয়ে নিম্নলিখিত ‘ইশতেহারটি’ প্ৰস্তুত করেছে; ইংরেজী, ফরাসী, জার্মান, ইতালীয়, ফ্লেমিশ এবং ডেনিশ ভাষায় এটি প্রকাশিত হবে ।

বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত[১]

আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে তাদের সকলের ইতিহাস শ্ৰেণিসংগ্রামের ইতিহাস।[২]

মুক্ত মানুষ ও দাস, প্যাট্রিসিয়ান ও প্লিবিয়ান, জমিদার ও ভূমিদাস, গিল্ডকর্তা[৩] ও কারিগর, এককথায় নিপিড়ক ও নিপীড়িত শ্রেণিরা পরস্পরের প্রতি নিরন্তর প্রতিপক্ষ থেকেছে, এক অবিরাম লড়াই চালিয়েছে, কখনো গোপনে বা কখনো প্রকাশ্যে; আর সে লড়াই প্রত্যেকবারই শেষ হয়েছে হয় গোটা সমাজেরই এক বিপ্লবী পুনর্গঠনে অথবা দ্বন্দ্বরত শ্রেণিগুলোর সার্বিক ধ্বংসে।

ভূতপূৰ্ব ঐতিহাসিক যুগগুলিতে প্রায় সর্বত্র আমরা দেখি সমাজে বিভিন্ন বর্গের একটা জটিল বিন্যাস, সামাজিক পদমর্যাদার নানাবিধ ধাপ। প্রাচীন রোমে ছিল প্যাট্রিসিয়ান, যোদ্ধা (knights), প্লিবিয়ান এবং ক্রীতদাসেরা; মধ্যযুগে ছিল সামন্ত প্ৰভু, অনু-সামন্ত (vassals), গিল্ড-কর্তা, কারিগর, শিক্ষানবিশ কারিগর এবং ভূমিদাস। এইসব শ্রেণীর প্রায় প্রত্যেকটির মধ্যে আবার আভ্যন্তরীণ স্তরভেদ।

সামন্ত সমাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে আধুনিক যে বুর্জোয়া সমাজ জন্ম নিয়েছে তার মধ্যে শ্রেণিবিরোধ শেষ হয়ে যায়নি। এ সমাজ শুধু প্রতিষ্ঠা করেছে নতুন শ্রেণি, অত্যাচারের নতুন অবস্থা পুরাতনের বদলে সংগ্রামের নতুন ধরন।

আমাদের যুগ অর্থাৎ বুর্জোয়া যুগের কিন্তু একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে, শ্রেণিবিরোধ এতে সরল হয়ে এসেছে। গোটা সমাজ ক্রমেই দুটি বিশাল শত্রুশিবিরে ভাগ হয়ে পড়েছে, ভাগ হচ্ছে পরস্পরের সম্মুখীন দুই বিরাট শ্রেণিতে — বুর্জোয়া এবং প্রলেতারিয়েতে।

মধ্যযুগের ভূমিদাসদের ভিতর থেকে প্রথম শহরগুলির স্বাধীন নাগরিকদের (chartered burghers) উদ্ভব হয়। এই নাগরিকদের মধ্য থেকে আবার বুর্জোয়া শ্রেণির প্রথম উপাদানগুলি বিকশিত হলো।

আমেরিকা আবিষ্কার ও আফ্রিকা প্ৰদক্ষিণে উঠতি বুর্জোয়াদের সামনে নূতন দিগন্ত খুলে গেল। পূর্ব ভারত ও চীনের বাজার, আমেরিকায় উপনিবেশস্থাপন, উপনিবেশের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিময়-ব্যবস্থার তথা সাধারণভাবে পণ্যের প্রসার বাণিজ্যে নৌযাত্রায় শিল্পে দান করে অভূতপূর্ব একটা উদ্যোগ এবং তদ্বারা টলায়মান সামন্ত সমাজের অভ্যন্তরস্থ বিপ্লবী অংশগুলির জন্য এনে দেয় দ্রুত একটা বিকাশ।

সামন্ত শিল্প-ব্যবস্থায় শিল্পোৎপাদনের একচেটিয়া ছিলো গণ্ডিবদ্ধ গিল্ডগুলির হাতে, নূতন বাজারের চাহিদার পক্ষে তা আর পর্যাপ্ত নয়। তার জায়গায় এল হস্তশিল্প কারখানা। কারখানাজীবী মধ্য শ্রেণি ঠেলে সরিয়ে দিল গিল্ড-কর্তাদের। বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট গিল্ডের মধ্যেকার শ্রমবিভাগ মিলিয়ে গেল একই কারখানার ভেতরকার শ্রমবিভাগের সামনে।

এদিকে বাজার বাড়তেই থাকে, চাহিদা বাড়তে থাকে। হস্তশিল্প কারখানাতেও আর কুলাল না। অতঃপর বাষ্প ও কলের যন্ত্রে বিপ্লবী পরিবর্তন ঘটল শিল্পোৎপাদনে। হস্তশিল্প কারখানার জায়গা নিল অতিকায় আধুনিক শিল্প, শিল্পজীবী মধ্য শ্রেণির জায়গা নিলো শিল্পজীবী লাখাপতি, এক একটা গোটা শিল্প বাহিনীর হর্তাকর্তা, আধুনিক বুর্জোয়া।

আমেরিকা আবিষ্কার যার পথ পরিষ্কার করে, সেই বিশ্ববাজার প্রতিষ্ঠা করেছে আধুনিক শিল্প। এ বাজারের ফলে বাণিজ্য, নৌযাত্রা, স্থলপথ যোগাযোগের প্রভূত বিকাশ ঘটেছে। সে বিকাশ আবার প্রভাবিত করেছে শিল্প প্রসারকে, এবং যে অনুপাতে শিল্প, বাণিজ্য, নৌযাত্রা ও রেলপথের প্রসার, সেই অনুপাতেই বিকশিত হয়েছে বুর্জোয়া, বাড়িয়ে তুলেছে তার পুঁজি, মধ্যযুগ থেকে আগত সমস্ত শ্রেণিকেই পেছনে ঠেলে দিয়েছে।

এইভাবে দেখা যায় যে আধুনিক বুর্জোয়া শ্রেণিটা একটা দীর্ঘ বিকাশ ধারার ফল, উৎপাদন ও বিনিময় পদ্ধতির ক্রমান্বয় বিপ্লবের পরিণতি।

বিকাশের পথে বুর্জেয়া শ্রেণির প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সমানে চলেছিলো সে শ্রেণির রাজনৈতিক অগ্ৰগতি। এই যে বুর্জোয়ারা ছিলো সামন্ত প্ৰভুদের আমলে একটা নিষ্পেষিত শ্রেণি, মধ্যযুগের কমিউনে[৪] যারা দেখা দেয় একটা সশস্ত্র ও স্বশাসিত সংঘ রূপে, কোথাও বা স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক নগর রাষ্ট্র (যেমন ইতালি ও জার্মানিতে), আবার কোথাও বা রাজতন্ত্রের করদাতা ‘তৃতীয় মণ্ডলী’ রূপে (যেমন ফ্রান্সে), অতঃপর হস্তশিল্প পদ্ধতির প্রকৃত পর্বে যারা আধা সামন্তবাদী বা নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের কাজে লাগে অভিজাতবর্গকে দাবিয়ে রাখার ব্যাপারে, এবং বস্তুত সাধারণভাবে যারা ছিল বৃহৎ রাজতন্ত্রের স্তম্ভস্বরূপ, সেই বুর্জোয়া শ্রেণি অবশেষে আধুনিক যন্ত্রশিল্প ও বিশ্ববাজার প্রতিষ্ঠার পর, আজকালকার প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রের মধ্যে নিজেদের জন্য পরিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন করতে পেরেছে। আধুনিক রাষ্ট্রের শাসকমণ্ডলী হলো সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির সাধারণ কাজকর্ম ব্যবস্থাপনার একটা কমিটি মাত্র।

ইতিহাসের দিক থেকে বুর্জোয়া শ্রেণি খুবই বিপ্লবী ভূমিকা নিয়েছে।

বুর্জোয়া শ্রেণি যেখানেই প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানেই সমস্ত সামন্তবাদী, পিতৃতান্ত্রিক ও প্রকৃতি-শোভন সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। যে সব বিচিত্ৰ সামন্ত বাঁধনে মানুষ বাঁধা ছিলো তার ‘স্বভাবসিদ্ধ ঊর্ধ্বতন’দের কাছে, তা এরা ছিঁড়ে ফেলেছে নির্মমভাবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের অনাবৃত স্বার্থের বন্ধন, নির্বিকার ‘নগদ টাকার’ বাঁধন ছাড়া আর কিছুই এরা বাকি রাখে নি। আত্মসর্বস্ব হিসাবনিকাশের বরফজলে এরা ডুবিয়ে দিয়েছে ধর্ম-উন্মাদনার স্বর্গীয় ভাবোচ্ছাস, শৌর্যবৃত্তির উৎসাহ ও কূপমণ্ডুক ভাবালুতা। লোকের ব্যক্তি-মূল্যকে এরা পরিণত করেছে বিনিময় মূল্যে, অগণিত অনস্বীকার্য সনদবদ্ধ স্বাধীনতার স্থানে এরা এনে খাড়া করল ওই একটিমাত্র নির্বিচার স্বাধীনতা — অবাধ বাণিজ্য। এক কথায়, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভ্ৰমে যে শোষণ এতদিন ঢাকা ছিলো, তার বদলে এরা এনেছে নগ্ন, নির্লজ্জ, সাক্ষাৎ পাশবিক শোষণ।

মানুষের যেসব বৃত্তিকে লোকে এতদিন সম্মান করে এসেছে, সশ্রদ্ধ বিস্ময়ের চোখে দেখেছে, বুর্জেয়া শ্রেণি তাদের মাহাত্ম্য ঘুঁচিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসাবিদ, আইনবিশারদ, পুরোহিত, কবি, বিজ্ঞানী—সকলকেই এরা পরিণত করেছে তাদের মজুরি-ভোগী শ্রমজীবী রূপে।

বুর্জোয়া শ্রেণি পরিবারপ্রথা থেকে তার ভাবালু ঘোমটাটাকে ছিঁড়ে ফেলেছে, পারিবারিক সম্বন্ধকে পরিণত করেছে একটা নিছক আর্থিক সম্পর্কে।

মধ্যযুগে শক্তির যে পাশবিক প্রকাশকে প্রতিক্রিয়াপন্থীরা এতটা মাথায় তোলে, তারই যোগ্য পরিপূরক হিসাবে চূড়ান্ত অলসতার নিস্ক্রিয়তা কী করে সম্ভব হয়েছিলো তা বুর্জেয়া শ্রেণিই ফাঁস করে দেয়। এরাই প্রথম দেখিয়ে দিলো মানুষের উদ্যমে কী হতে পারে। এদের আশ্চর্য কীর্তি মিশরের পিরামিড, রোমের পয়ঃপ্ৰণালী এবং গথিক গির্জাকে বহুদূর ছাড়িয়ে গেছে। এদের পরিচালিত অভিযান অতীতের সকল জাতির দেশান্তর যাত্রা (Exoduses)  ও ধর্মযুদ্ধকে (crusades) ম্লান করে দিয়েছে।

উৎপাদনের উপকরণে অবিরাম বিপ্লবী বদল না এনে, এবং তাতে করে উৎপাদন-সম্পর্ক ও সেইসঙ্গে সমগ্র সমাজ-সম্পর্কে বিপ্লবী বদল না ঘটিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণি বাঁচতে পারে না। অপরদিকে অতীতের শিল্পজীবী সকল শ্রেণীর বেঁচে থাকার প্রথম শর্তই ছিলো সাবেকি উৎপাদনপদ্ধতির অপরিবর্তিত রূপটা বজায় রাখা। আগেকার সকল যুগ থেকে বুর্জোয়া যুগের বৈশিষ্ট্যই হলো উৎপাদনে অবিরাম বিপ্লবী পরিবর্তন, সমস্ত সামাজিক অবস্থার অনবরত নড়চড়, চিরস্থায়ী অনিশ্চয়তা এবং উত্তেজনা। অনড় জমাট সব সম্পর্ক ও তার আনুষঙ্গিক সমস্ত সনাতন শ্রদ্ধাভাজন কুসংস্কার ও মতামতকে ঝোঁটিয়ে বিদায় করা হয়, নবগঠিতগুলো দৃঢ়সম্বন্ধ হয়ে উঠবার আগেই আচল হয়ে আসে। যা কিছু ভারিক্কী তা-ই যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়, যা পবিত্র তা হয় কলুষিত, শেষ পর্যন্ত মানুষ বাধ্য হয় তার জীবনের আসল অবস্থা এবং অপরের সঙ্গে তার সম্পর্কটাকে খোলা চোখে দেখতে।

দ্বিতীয় অংশ পড়ুন এই লিংক থেকে

কমিউনিস্ট ইশতেহারের সূচিপত্র পড়ুন এই লিংক থেকে

আরো পড়ুন:  কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে অন্তর্ভুক্তির শর্ত
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page