কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, রক্ষণশীল অথবা বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র

— কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্য
২. রক্ষণশীল অথবা বুর্জেয়া সমাজতন্ত্র

বুর্জোয়া সমাজের অস্তিত্বটা ক্রমাগত বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই বুর্জোয়া শ্রেণির একাংশ সামাজিক অভাব-অভিযোগের প্রতিকার চায়।

এই অংশের মধ্যে পড়ে অর্থনীতিবিদেরা, লোকহিত ব্রতীরা, মানবতাবাদীরা, শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থার উন্নয়নকারীরা, দুঃস্থ-ত্ৰাণ সংগঠকেরা, পশুক্লেশ নিবারণী সভার সদস্যরা, মাদকতা নিবারণের গোঁড়া প্রচারকেরা, সম্ভবপর সবরকম ধরনের খুচরো সংস্কারকরা। সমাজতন্ত্রের এই রূপটি পরিপূর্ণ মতধারা হিসাবেও সংরচিত হয়ে উঠেছে।

এই রূপটার নিদর্শন হিসাবে আমরা প্রুঁধোর ‘দারিদ্র্যের দর্শন’-এর উল্লেখ করতে পারি।

সমাজতান্ত্রিক বুর্জোয়ারা আধুনিক সামাজিক অবস্থার সুবিধাটা পুরোপুরি চায়, চায় না তৎপ্রসূত অবশ্যম্ভাবী সংগ্রাম ও বিপদটুকু। তারা সমাজের বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে চায় কিন্তু তার বিপ্লবী ও ধ্বংসকারী উপাদানসমূহ বাদ দিয়ে। তারা চায় প্রলেতারিয়োতবিহীন বুর্জেীয়া শ্রেণি। যে-দুনিয়ায় তারা সর্বেসর্বা, স্বভাবতই সেই দুনিয়াই তাদের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ। এই প্রীতিকর প্রত্যয়টিকেই বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র ন্যুনাধিক পরিপূর্ণ নানাবিধ মতবাদে দাঁড় করায়। এরূপ মতবাদ কাজে পরিণত করে প্রলেতারিয়েত সামাজিক নব জেরুজালেমে যাক, এই বলে এরা আসলে এটাই চায় যে শ্রমিক শ্রেণি বর্তমান সমাজের চৌহদ্দির ভিতরেই থাকুক, কিন্তু বুর্জোয়া সম্বন্ধে তার সমস্ত বিদ্বেষভাব বিসর্জন দিক।

এই ধরনের সমাজতন্ত্রের আর একটা অধিকতর ব্যবহারিক অথচ কম সুসংবদ্ধ রূপ আছে; তাতে প্রতিটি বিপ্লবী আন্দোলনকে শ্রমিক শ্রেণির চোখে হেয় প্রতিপন্ন করা হয় এই বলে যে নিছক রাজনৈতিক কোনো সংস্কারে নয়, অস্তিত্বের বৈষয়িক অবস্থার, অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তনেই তাদের সুবিধা হতে পারে। অস্তিত্বের বৈষয়িক অবস্থার পরিবর্তন বলতে অবশ্য এই ধরনের সমাজতন্ত্র কোনোক্রমেই বুর্জোয়া উৎপাদন-সম্পর্কের উচ্ছেদ বোঝে না, যে উচ্ছেদ কেবল বিপ্লব দিয়েই সম্পন্ন হওয়া সম্ভব; বোঝে বুর্জোয়া উৎপাদন-সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার ভিত্তিতে শুধু শাসনতান্ত্রিক সংস্কার। অর্থাৎ এহেন সংস্কার যা পুঁজি ও মজুরি-শ্রমের সম্পর্কটাকে কোনো দিক থেকেই আঘাত করে না, শুধু বড়ো জোর বুর্জোয়া সরকারের প্রশাসনের খরচ কমায় ও তাকে সরল করে আনে।

আরো পড়ুন:  কমিউনিস্ট ইশতেহারের ১৮৯৩ সালের ইতালীয় সংস্করণের ভূমিকা

বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রের সর্বোত্তম প্রকাশ শুধু তখন, যখন তা একটা বাক্যালঙ্কার মাত্র।

অবাধ বাণিজ্য: শ্রমিক শ্রেণির উপকারের জন্য। সংরক্ষণ শুল্ক: শ্ৰমিক শ্রেণিরই উপকারের জন্য। কারাগারের সংস্কার: শ্রমিক শ্রেণির উপকারের জন্য। বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রের এই হলো শেষ ও একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কথা।

সংক্ষেপে তা এই: বুর্জোয়ারা শ্রমিক শ্রেণির উপকারের জন্যই বুর্জোয়া।

কমিউনিস্ট ইশতেহারের সূচিপত্র
১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা
১৮৮২ সালের রুশ সংস্করণের ভূমিকা
১৮৮৩ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা
১৮৮৮ সালের ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকা
১৮৯০ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা
১৮৯২ সালের পোলীয় সংস্করণের ভূমিকা
১৮৯৩ সালের ইতালীয় সংস্করণের ভূমিকা
কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার
১. বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত
২. প্রলেতারিয়েত ও কমিউনিস্টগণ
৩. সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্য
(১) প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্র
ক. সামন্ত সমাজতন্ত্র
খ. পেটি বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র
গ. জার্মান অথবা “খাঁটি” সমাজতন্ত্র
(২) রক্ষণশীল অথবা বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র
(৩) সমালোচনী — কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম
৪. বর্তমান নানা সরকার-বিরোধী পার্টির সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্বন্ধ
টীকা

Leave a Comment

error: Content is protected !!