রসুনের উপকারিতা ও সেবন পদ্ধতি: সুস্থ হার্ট ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর সেরা উপায়

রসুন

বৈজ্ঞানিক নাম: Allium sativum L., Sp. Pl. 1: 297 (1753). সমনাম: জানা নেই। ইংরেজি নাম: গার্লিক। স্থানীয় নাম: রসুন। 
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস 
জগৎ/রাজ্য: Plantae; বিভাগ: Angiosperms; অবিন্যাসিত: Monocots; বর্গ: Liliales; গোত্র: Liliaceae; গণ: Allium; প্রজাতি: Allium cepa L., Sp. PI. 1: 300 (1753).

ভূমিকা: প্রকৃতির এক অনন্য দান হলো রসুন। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় এটি লিলিয়াসি (Liliaceae) পরিবারের এলিয়াম (Allium) গণের একটি ঋজু বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। রসুন কেবল রান্নাঘরের একটি প্রয়োজনীয় মশলা বা উপাদানই নয়, বরং এটি প্রাচীনকাল থেকেই এর অসামান্য ভেষজ গুণাগুণের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বাংলাদেশে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি সবজি জাতীয় খাবার, যা প্রায় প্রতিটি বাঙালির রান্নাঘরেই খুঁজে পাওয়া যায়।

রসুন-এর বর্ণনা:

উদ্ভিদতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে রসুন একটি অনন্য উদ্ভিদ, যার কান্ড অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও চাকতি সদৃশ এবং এটি উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় ‘বাল্ব’ হিসেবে পরিচিত। এর নিচের অংশে অসংখ্য অস্থানিক মূল বিদ্যমান এবং মূলীয় পত্রাবরণের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ধরনের ছদ্ম বায়বীয় কান্ড গঠিত হয়। রসুনের পাতাগুলো সরল, মূলজ এবং রোমশ বিহীন; একটি পরিণত উদ্ভিদে সাধারণত ৪ থেকে ১০টি দ্বিসারী পত্র দেখা যায় যার ফলক রৈখিক এবং প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর পুষ্পবিন্যাস আম্বেল প্রকৃতির এবং শক্ত ভৌমদন্ডের ওপর সবুজাভ সাদা রঙের ৬টি পুষ্পপুটাংশ দুই আবর্তে বিযুক্ত অবস্থায় সজ্জিত থাকে। রসুনের ফুলে ৬টি পুংকেশর এবং ৩টি যুক্ত গর্ভপত্র থাকে, যার গর্ভাশয় ৩-কোষী ও অমরাবিন্যাস অক্ষীয় এবং এর গর্ভদন্ড খাটো ও গর্ভমুণ্ড সুচ্যগ্র হয়ে থাকে। সাধারণত রসুনের ফল বীজবিহীন হয় এবং এর জেনেটিক বৈশিষ্ট্যে ক্রোমোসোম সংখ্যা হলো 2n = ১৬

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

রসুনের সফল চাষাবাদের জন্য এর আবাসস্থল এবং সঠিক বংশ বিস্তার প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত মাঝারি উঁচু জায়গার সুনিষ্কাশিত উর্বর দো-আঁশ মাটি রসুন চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী, যেখানে মাটির পিএইচ (pH) মান ৬ থেকে ৭ বা তার সামান্য বেশি থাকা আদর্শ বলে বিবেচিত হয়। রসুনের বংশ বিস্তার সাধারণত বীজের মাধ্যমে হয় না, বরং এর প্রতিটি ‘কোয়া’ থেকে অঙ্গজ উপায়ে নতুন চারা উৎপাদন করা হয়। যদিও রসুনের গাছে ফুল ও ফল ধারণের প্রক্রিয়াটি মূলত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়, তবে বাণিজ্যিক চাষের ক্ষেত্রে এর কন্দ বা কোয়াই প্রধান রোপণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বিস্তৃতি:

ঐতিহাসিকভাবে রসুনের শেকড় প্রোথিত রয়েছে মধ্য এশিয়ায়, বিশেষ করে তিয়েন শান পার্বত্য অঞ্চলে একে আদি উদ্ভিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এই অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো A. longicuspis Regd. প্রজাতিটিই রসুনের পূর্বপুরুষ বলে পরিচিত। সময়ের বিবর্তনে এই ভেষজটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেও জলবায়ুর ভিন্নতার কারণে বাংলাদেশে মূলত শীতকালকেই এর চাষাবাদের প্রধান মৌসুম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। বর্তমানে বৈশ্বিক চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করছে চীন, যারা রসুনের উৎপাদনে বিশ্বে একক আধিপত্য বজায় রেখেছে। চীনের পাশাপাশি ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, মিশর, তুরস্ক এবং থাইল্যান্ড রসুনের বাণিজ্যিক উৎপাদনে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে, যা দেশগুলোর কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুণাগুণ:

অর্থনৈতিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রসুনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল রান্নাঘরের অপরিহার্য মসলাই নয়, বরং প্রাচীনকাল থেকেই ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এক মহৌষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রসুনের প্রধান কার্যকর উপাদান হলো সালফারযুক্ত যৌগ ‘অ্যালিন’, যা মানবদেহের রক্তে জমে থাকা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে। আধুনিক গবেষণায় ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি প্রতিরোধেও এর ইতিবাচক ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া এটি প্রাকৃতিক বায়ুনাশক, মূত্রবর্ধক ও কামোদ্দীপক হিসেবে কাজ করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে ডায়াবেটিস রোগীদের সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী গনি (২০০৩)-এর মতে, কুষ্ঠ, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, অর্শ, বাত এবং বহুমূত্র রোগের উপশমে রসুনের ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। এশীয় দেশগুলোতে রসুনের স্বাদ ও সুগন্ধের কারণে এটি বিভিন্ন ধরণের আচার, চাটনি ও মুখরোচক খাবার তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

জাতিগত ও লোকজ ব্যবহার: বাংলার গ্রামীণ জনপদে রসুনের রয়েছে বৈচিত্র্যময় লোকজ ব্যবহার। যুগ যুগ ধরে বদহজম কিংবা পেটের ব্যথা উপশমে গ্রামের মানুষ প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে রসুন ব্যবহার করে আসছে। এছাড়া বাতের ব্যথায় আরাম পেতে রসুনের কোয়া মিশ্রিত সরিষার তেল গরম করে মালিশ করার প্রথা অত্যন্ত জনপ্রিয়। শিশুদের সাধারণ সর্দি-কাশিতেও রসুনের তেল কপালে বা বুকে মালিশ করা একটি প্রাচীন ও কার্যকর পদ্ধতি। চিকিৎসাগত গুণের পাশাপাশি রসুনের চমৎকার প্রিজারভেটিভ বা পচনরোধী গুণ রয়েছে, যা রান্নাকরা খাদ্যদ্রব্যকে দীর্ঘক্ষণ ভালো রাখতে সহায়তা করে।

১. ঢলা যৌবন: শরীরের অভ্যন্তরীণ সজীবতা বজায় রাখতে এবং অকাল বার্ধক্য রোধে রসুনের বিশেষ সেবনবিধি আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া প্রাণশক্তি পুনরুদ্ধার করতে দুই কোয়া রসুন খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে ভেজে সামান্য মাখনসহ খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে, তবে খাওয়ার শেষে অবশ্যই সামান্য উষ্ণ গরম জল পান করা জরুরি। এছাড়া দৈনন্দিন আহারের মাধ্যমে রসুনের গুণাগুণ পেতে আটার সঙ্গে রসুন বাটা মিশিয়ে রুটি বা লুচি তৈরি করে খাওয়া অত্যন্ত ফলদায়ক। বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে ছাতুর সঙ্গে সামান্য ঘি, চিনি এবং রসুন বাটার সংমিশ্রণ একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক টনিক হিসেবে কাজ করে যা শরীরের পেশী ও স্নায়ুকে পুনরুজ্জীবিত রাখে। এই ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো নিয়মিত অনুসরণের মাধ্যমে দীর্ঘকাল শারীরিক সক্ষমতা ও সতেজতা ধরে রাখা সম্ভব।

২. যৌবন রক্ষায়: দীর্ঘকাল শারীরিক সক্ষমতা ও সজীবতা ধরে রাখতে কাঁচা আমলকীর রসের সাথে রসুনের সংমিশ্রণ একটি ভেষজ পদ্ধতি হিসেবে কাজ করতে পারে, যা ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমলকী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এবং রসুন বিভিন্ন স্বাস্থ্যগুণসম্পন্ন উপাদান ধারণ করে। টাটকা আমলকীর রসের সাথে সামান্য রসুন বাটা (ব্যক্তিগত শারীরিক সহনশীলতা অনুযায়ী) সেবন করা নারী ও পুরুষ উভয়েরই জৈবিক শক্তি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য অটুট রাখতে সহায়তাকারী হিসেবে গণ্য হতে পারে। যৌবনের শুরু থেকে এই প্রাকৃতিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে তা শরীরের অভ্যন্তরীণ কোষগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং দীর্ঘ সময় সজীবতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।

৩. পেটের অসুখে: পেটের সমস্যায় রসুনের এই ঘরোয়া টোটকাটি বেশ কার্যকরী; বিশেষ করে শ্লেষ্মাযুক্ত পেট খারাপে ঠান্ডা জলে ২৫ ফোঁটা রসুনের রস মিশিয়ে খেলে দ্রুত স্বস্তি পাওয়া যায়। এছাড়া রসুনের রস ও লবণের সাথে নির্দিষ্ট অনুপাতে আদার রস ও ঘিয়ে সেঁকা হিং মিশিয়ে সেবন করলে শুধু উদররোগই সারে না, বরং এটি শরীরের জমে থাকা বাড়তি চর্বি কমাতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে পেট পরিষ্কার রাখতেও সাহায্য করে। চিনি, সৈন্ধব নুন ও ঘিয়ের সাথে রসুনের এই মিশ্রণটি মন্দাগ্নি বা হজমশক্তি বাড়ানোসহ কাশি ও বাতের ব্যথায় অত্যন্ত কার্যকর হিসেবে পরিচিত; এমনকি রসুনের অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণের কারণে এটি যক্ষ্মা রোগীদের জন্য সহায়ক হতে পারে। এছাড়া ভাতের আগে ঘিয়ে ভাজা রসুনের কোয়া খাওয়ার অভ্যাসটি পেটের বায়ু বা গ্যাসের সমস্যা দূর করার একটি সহজ ও দারুণ ঘরোয়া উপায়।[২]

৪. বাতজনিত ব্যথায়: বাতজনিত ব্যথার উপশমে রসুনের এই ব্যবহারগুলো অত্যন্ত প্রাচীন ও কার্যকরী ঘরোয়া পদ্ধতি; বিশেষ করে গাওয়া ঘিয়ের সাথে রসুনের রস বা বাটা রসুন সেবন করলে শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমে। পাশাপাশি, সরষের তেলে রসুন ফুটিয়ে তৈরি করা তেল মালিশ করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং হাড়ের জয়েন্টের দীর্ঘদিনের পুরনো ব্যথা ও আড়ষ্টতা দ্রুত উপশম হয়।

প্রকৃতির এক মহৌষধি রসুন বাতের দীর্ঘদিনের ব্যথা উপশম এবং পেটের যাবতীয় জটিলতা দূর করতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে, যা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ হিসেবে স্বীকৃত। বাতের ব্যথা বা আর্থ্রাইটিসে যারা ভুগছেন তাদের জন্য তিন সপ্তাহের একটি বিশেষ কোর্স অত্যন্ত কার্যকর, যেখানে প্রথম সপ্তাহে রাতে পাঁচটি রসুনের কোয়া ভিজিয়ে রেখে সকালে সেগুলো পিষে জল ছেঁকে খেতে হয় এবং পরবর্তী দুই সপ্তাহে কোয়ার সংখ্যা বাড়িয়ে যথাক্রমে সাতটি ও দশটি করতে হয়; তবে মনে রাখতে হবে তিন সপ্তাহ খাওয়ার পর অবশ্যই এক সপ্তাহ বিরতি দিয়ে পুনরায় এই চক্র শুরু করা উচিত এবং সাথে মাখন বা গাওয়া ঘি খেলে শরীরের মাংসপেশি ও হাড়ের সংযোগস্থলগুলো আরও বলবান হয়। শুধু বাত নয়, পেটের মেদ কমাতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে রসুনের রস, আদার রস, সৈন্ধব লবণ ও ঘিয়ে সেঁকা হিংয়ের মিশ্রণ চমৎকার কাজ করে, এমনকি শ্লেষ্মাযুক্ত পেটের সমস্যায় ঠান্ডা জলে ২৫ ফোঁটা রসুনের রস মিশিয়ে খেলে দ্রুত উদ্বেগ ও অস্বস্তি দূর হয়। এছাড়া নিয়মিত ডালে বা তরকারিতে রসুনের ফোঁড়ন এবং দুপুরের খাবারের আগে ঘিয়ে ভাজা রসুনের কোয়া খাওয়ার অভ্যাস শরীরের বায়ুর প্রকোপ কমায় এবং হজমশক্তি বাড়িয়ে শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। [২]

৫. শরীর ক্ষয়ে: অনেক সময় দেখা যায় পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরেও শরীর শুকিয়ে যায় বা ওজন বাড়ে না, যাকে আমরা সাধারণ ভাষায় শরীর ক্ষয় হওয়া বলে থাকি; এই সমস্যা সমাধানে রসুনের ব্যবহার অত্যন্ত প্রাচীন এবং কার্যকরী। প্রতিদিন এক বা দুই কোয়া রসুন খুব ভালো করে বেটে নিয়ে এক বা আধ পোয়া দুধে জ্বাল দিয়ে (পাক করে) নিয়মিত খেলে শরীরের ক্ষয় হওয়া বন্ধ হয় এবং প্রাকৃতিক উপায়ে ধীরে ধীরে শরীরের ওজন বাড়তে শুরু করে। রসুনের এই পুষ্টিকর মিশ্রণটি শরীরের অভ্যন্তরীণ শক্তি ফিরিয়ে আনতে এবং শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে, যা দীর্ঘ মেয়াদে একটি স্বাস্থ্যোজ্জ্বল গঠন প্রদান করে।

৬. মদ্যপায়ীর পেটে: অত্যধিক মদ্যপানের ফলে অনেকের পেটে প্রায়ই তীব্র শূল ব্যথা বা কামড়ানি অনুভূত হয়, যা যন্ত্রণাদায়ক হলেও আসক্তির কারণে অনেকেই মদ্যপান ছাড়তে পারেন না—এমনকি অনেকের মনোভাব এমন হয় যে এটি ছাড়ার চেয়ে মৃত্যুও ভালো; অথচ এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি অতি সহজ ও প্রাকৃতিক সমাধান লুকিয়ে আছে রান্নাঘরের রসুনেই। যদি মদ্যপানের কারণে সৃষ্ট এই ধরণের পেটের ব্যথায় কেউ আক্রান্ত হন, তবে মাত্র এক থেকে দুই কোয়া কাঁচা রসুন চিবিয়ে খেলে বা সামান্য তপ্ত করে সেবন করলে সেই শূল ব্যথা দ্রুত প্রশমিত হয়। রসুনের প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান পাকস্থলী ও লিভারের ওপর মদ্যপানের ক্ষতিকর প্রভাব কিছুটা কমিয়ে দেয় এবং পেটের গ্যাস বা বায়ুর চাপ সরিয়ে দিয়ে যন্ত্রণায় তাৎক্ষণিক আরাম প্রদান করে; তাই যারা এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় ভুগছেন, তারা নিয়মিত নিয়ম করে খাবারের সঙ্গে বা ব্যথার সময় রসুন সেবন করলে এই চরম অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

৭. রোগে প্রতিরোধক: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাকৃতিক উপায়ে বৃদ্ধি করতে এক কোয়া রসুন ও এক গ্লাস কুসুম গরম দুধের মিশ্রণ একটি চমৎকার ঘরোয়া সমাধান হতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিনের ঘাটতিজনিত কারণে যাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং যারা ঘনঘন ঋতু পরিবর্তনজনিত সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য এই পানীয়টি প্রাকৃতিক অ্যান্টি-বায়োটিক হিসেবে কাজ করে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রসুনের এই ওষধি গুণ সম্পন্ন মিশ্রণটি যুক্ত করলে এটি শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ক্লান্তি দূর করতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে, যা আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।

৮. পুরাতন জ্বর: দীর্ঘদিনের জেদি বা পুরাতন ঘুসঘুসে জ্বর, যা শরীরে সবসময় সামান্য তাপমাত্রা বজায় রাখে, তা দূর করতে রসুনের এই ওষধি ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। ৫ থেকে ৭ ফোঁটা টাটকা রসুনের রসের সঙ্গে আধা বা এক চামচ খাঁটি গাওয়া ঘি মিশিয়ে দুই-চার দিন খেলে শরীরের অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ দূর হয় এবং জ্বর দ্রুত সেরে যায়। এছাড়া, বাত বা কফজনিত কারণে সৃষ্ট প্রবল জ্বর ও শারীরিক ব্যথা উপশমে সামান্য রসুন বাটার সাথে তিলের তেল বা টাটকা ঘি এবং সামান্য সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে খেলে ম্যাজিকের মতো উপকার পাওয়া যায়। এই মিশ্রণটি কেবল শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং সব ধরণের বাত-ব্যাধি দূর করে শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী ও রোগমুক্ত রাখতে সহায়তা করে।

৯. অটারিওস্কেলেরোসিস: বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের শরীরের রক্তবাহী ধমনী বা শিরার স্থিতিস্থাপকতা বা ইলাসটিসিটি (Elasticity) প্রাকৃতিক নিয়মেই কমতে শুরু করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় আটারিওস্ক্লেরোসিস (Arteriosclerosis) বলা হয়। এই সমস্যায় রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলেও নিয়মিত রসুন খাওয়ার অভ্যাস একটি কার্যকর প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে। রসুনের বিশেষ গুণাগুণ শিরার নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং রক্ত চলাচলের পথকে স্বাভাবিক রাখে, ফলে বার্ধক্যজনিত এই জটিল হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়। সুস্থ হৃদপিণ্ড এবং সচল রক্তনালীর জন্য তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পরিমিত রসুন রাখা একটি অত্যন্ত সচেতন ও স্বাস্থ্যসম্মত সিদ্ধান্ত।

১০. এমফাইসিমা (Emphisema) রোগ: এমফাইসিমা (Emphysema) হলো ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা, যা ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) এর অন্তর্ভুক্ত। এতে রোগীর সাধারণত নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় তীব্র সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় ঐতিহ্যগতভাবে কিছু ঘরোয়া পদ্ধতিতে ফুসফুসের স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করা হয়, যার মধ্যে রসুনের ব্যবহার অন্যতম। এমফাইসিমাজনিত শ্বাসকষ্টের উপশমে রসুনের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে, কারণ রসুনে অ্যালিসিন নামক উপাদান থাকে যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়।

  • নিয়মিত চিকিৎসা: এমফাইসিমা একটি গুরুতর রোগ, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার বা ঔষধ ব্যবহার অপরিহার্য। ঘরোয়া উপশম মূল চিকিৎসার বিকল্প নয়।
  • রসুন ব্যবহার: কেউ কেউ ঠাণ্ডা দুধের সাথে রসুনের রস মিশিয়ে সেবন করে থাকেন। তবে যেকোনো প্রাকৃতিক উপাদানের নির্দিষ্ট পরিমাণ, যেমন ৫-৭ ফোঁটা রসুনের রস, প্রত্যেকের শরীরের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ: রসুন বা যেকোনো ভেষজ উপাদান সেবনের আগে অবশ্যই ফুসফুস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কারণ ভুল প্রয়োগে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে [5]।

২. মাথা ধরা বা ব্যাথায়: সর্দি বা ঠাণ্ডার কোনো উপসর্গ নেই, অথচ দীর্ঘক্ষণ মাথা ধরা বা তীব্র মাথাব্যথা হয়ে থাকে—এমন সমস্যা সাধারণত বায়ুর প্রকোপের কারণে হতে পারে। এই অস্বস্তিকর মাথাব্যথা থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে দুই-এক ফোঁটা রসুনের রসের নস্যি নেওয়া একটি কার্যকর ঘরোয়া পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। রসুনের রস অত্যন্ত নিরাপদ এবং এটি সরাসরি ত্বকে লাগলে বা সংস্পর্শে এলে চামড়ার কোনো ক্ষতি বা অনিষ্ট করে না। যারা কেমিক্যালযুক্ত ওষুধের বদলে প্রাকৃতিক উপায়ে মাথার যন্ত্রণা কমাতে চান, তারা নির্দ্বিধায় রসুনের এই ওষধি গুণটি ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

১৩. ক্ষতে: শরীরের কোনো পুরানো ক্ষত বা ঘা যদি দীর্ঘ সময় ধরে নিরাময় হতে না চায়, তবে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-সেপটিক হিসেবে রসুন ও ঘিয়ের মিশ্রণ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। সামান্য পরিমাণের খাঁটি ঘিয়ের সঙ্গে রসুন বাটা মিশিয়ে ক্ষতের ওপর নিয়মিত প্রলেপ দিলে তা দ্রুত শুকিয়ে যেতে সাহায্য করে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়। রসুনের শক্তিশালী জীবাণুনাশক ক্ষমতা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে ক্ষতস্থান পরিষ্কার রাখে, ফলে দীর্ঘদিনের নাছোড়বান্দা ক্ষতও খুব অল্প সময়ের মধ্যে সেরে ওঠে। এটি একটি নিরাপদ এবং সহজলভ্য ঘরোয়া পদ্ধতি যা ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে সহায়তা করে।

১৪. অরুচি দূর করতে: খাবারের প্রতি অনীহা বা অরুচি দূর করতে এবং হজম শক্তি বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি চাটনি দারুণ কার্যকর হতে পারে। টাটকা রসুন, ধনেপাতা, আদা, সাদা আঙুর, চিনি ও সৈন্ধব লবণ—এই উপাদানগুলো একসাথে পিষে একটি সুস্বাদু চাটনি তৈরি করে নিন। খাবারের সাথে এই চাটনি নিয়মিত খেলে মুখে রুচি ফিরে আসে এবং পরিপাক প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ায় খাবার খুব সহজেই হজম হয়। যারা হজমের সমস্যায় ভুগছেন বা খাবারে স্বাদ পাচ্ছেন না, তাদের জন্য এটি একটি স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু ঘরোয়া সমাধান।

১৫. ক্ষতের ক্রিমিতে: গবাদি পশু যেমন গরু বা মহিষের পচা ঘায়ে অনেক সময় পোকা বা ক্রিমি জন্মাতে দেখা যায়, যা ক্ষতকে আরও জটিল করে তোলে। এই সমস্যা সমাধানে রসুন একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। আক্রান্ত স্থানে রসুন বাটা প্রলেপ হিসেবে লাগালে নতুন করে পোকা জন্মানোর ভয় থাকে না এবং আগে থেকে পোকা হয়ে থাকলে তাও দ্রুত মরে যায়। পশুর ক্ষতস্থান দ্রুত নিরাময় করতে এবং ক্ষতিকর জীবাণু থেকে মুক্ত রাখতে রসুনের এই ওষধি ব্যবহার অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও কার্যকর একটি ঘরোয়া পদ্ধতি।

১৬. ঠাণ্ডাজনিত কারনে: শীত ও বর্ষাকালের নানাবিধ রোগবালাই থেকে শরীরকে সুরক্ষিত রাখতে কাঁচা রসুন ও গুড় এর মিশ্রণ একটি অসাধারণ প্রাকৃতিক মহৌষধ। রসুনের শক্তিশালী অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণ এবং গুড়ের শক্তিবর্ধক উপাদান একত্রে মিশে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত রসুন সেবনে শরীরের তেজস্বিতা ও বল বৃদ্ধি পায়, যা দীর্ঘায়ু লাভে এবং বার্ধক্যকালেও সক্ষমভাবে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, রসুন একটি উত্তম ‘রসায়ন’, যা কেবল বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি বাড়ায় না, বরং বীর্য ও পুরুষত্ব বৃদ্ধিতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই সুস্থ ও নিরোগ জীবন নিশ্চিত করতে বিশেষ করে প্রতিকূল আবহাওয়ার সময় প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রসুন রাখা অত্যন্ত জরুরি।

১৭. কৃমি রোগে: কৃমি রোগ ও পেটের সমস্যা দূর করতে রসুনের ওষধি গুণ অতুলনীয়। বিশেষ করে যারা উদরকৃমি বা পেটের কৃমিতে ভুগছেন এবং যার ফলে শরীর দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য নিয়মিত রসুন খাওয়া অত্যন্ত উপকারী। রসুন কেবল কৃমি নাশ করে না, বরং এটি বমি ভাব, বদহজম এবং আমযুক্ত মল ত্যাগের মতো অস্বস্তিকর সমস্যাগুলোর দ্রুত প্রশমন ঘটায়। প্রাকৃতিকভাবে পরিপাকতন্ত্র পরিষ্কার রাখতে এবং শরীরের রোগা ভাব কাটিয়ে সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে প্রতিদিনের খাবারে রসুন যুক্ত করা একটি কার্যকর ঘরোয়া সমাধান হতে পারে।

১৮. রক্তচাপ কমাতে: উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখতে রসুন একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। রসুনের মধ্যে থাকা এলাটল সালফাইড (Allyl Sulfide) নামক বিশেষ উড্ডয়নশীল উপাদান রক্তনালীকে প্রসারিত করতে এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত রসুন খাওয়ার অভ্যাস ধমনীর ওপর বাড়তি চাপ কমিয়ে রক্তচাপ বৃদ্ধি রোধ করে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। যারা প্রাকৃতিকভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ থাকতে চান, তাদের জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পরিমিত রসুন রাখা একটি অত্যন্ত কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত।

১৯. ব্রণ রোগে: ত্বকের সতেজতা ধরে রাখতে এবং ব্রণ বা একনের সমস্যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে রসুন দারুণ কাজ করে। মুখে ব্রণের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই যদি আক্রান্ত স্থানে সাবধানে রসুনের প্রলেপ লাগানো হয়, তবে এটি ব্রণের বৃদ্ধিকে তাৎক্ষণিকভাবে রুখে দিতে পারে। রসুনে থাকা অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান লোমকূপের গভীরে গিয়ে জীবাণু ধ্বংস করে, ফলে ব্রণের আকার আর বাড়ে না এবং লালচে ভাব দ্রুত কমে যায়। এটি একটি সহজ ও ঘরোয়া পদ্ধতি যা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই আপনার ত্বককে দাগমুক্ত ও সুন্দর রাখতে সাহায্য করতে পারে।

২০. সর্দি কাশি সারাতে: ঋতু পরিবর্তনের সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে শিশুদের কষ্টদায়ক হুপিং কাশি সারাতে রসুনের ব্যবহার সত্যিই জাদুকরী। সর্দি-কাশির মহৌষধ হিসেবে রসুন ও তুলসী পাতার রসের মিশ্রণ অনন্য। সমপরিমাণ রসুন ও তুলসী পাতার রসের সাথে সামান্য আদা বা শুঁঠের গুঁড়ো এবং গোলমরিচ মিশিয়ে এক কাপ দুধে গুলে সকাল-সন্ধ্যা পান করলে দ্রুত উপশম পাওয়া যায়। এছাড়া শিশুদের হুপিং কাশি নিরাময়ে দুধে রসুনের কোয়া ফুটিয়ে সেই দুধ ছেঁকে খাওয়ালে দারুণ উপকার পাওয়া যায়। এমনকি তীব্র কাশিতে ২০ ফোঁটা রসুনের রস শরবতের সাথে মিশিয়ে প্রতি চার ঘণ্টা অন্তর সেবন করলে শ্বাসকষ্ট ও কাশির প্রকোপ কমে শরীর সতেজ হয়।

২১. কানের ব্যথা সারাতে: কানের অসহ্য যন্ত্রণা বা কানের ব্যথা থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে সরিষার তেল ও রসুনের মিশ্রণ একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও কার্যকর ঘরোয়া পদ্ধতি। কয়েকটি রসুনের কোয়া খাঁটি সরিষার তেলে ভালো করে ভেজে নিয়ে সেই তেল হালকা কুসুম গরম অবস্থায় কানে দুই-এক ফোঁটা দিলে ব্যথার উপশম হয়। এমনকি কান পেকে যাওয়া বা সংক্রমণজনিত পুঁজ হওয়ার সমস্যায় এই তেল অ্যান্টি-সেপটিক হিসেবে কাজ করে এবং কানের ভেতরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। নিরাপদ ও প্রাকৃতিক উপায়ে কানের অস্বস্তি দূর করতে এই ঘরোয়া টোটকাটি ওষুধের বিকল্প হিসেবে দারুণ ভূমিকা রাখে।

২২. বিছের কামড়ে: অসহ্য যন্ত্রণা ও জ্বালাপোড়া দ্রুত কমাতে রসুন একটি শক্তিশালী প্রাথমিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। আক্রান্ত স্থানে তাৎক্ষণিকভাবে রসুন বাটা বা পিষে প্রলেপ দিলে বিষের তীব্রতা ও জ্বালা দ্রুত কমে যায়। এছাড়া, আরও দ্রুত উপশম পেতে রসুনের রসের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা মধু মিশিয়ে চেটে খেলে তা শরীরের ভেতর থেকে বিষক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ঘরোয়া উপায়ে বিষাক্ত পোকামাকড়ের দংশন থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে রসুনের এই ওষধি ব্যবহার অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।

২৩. চুলকুনি: ত্বকের বিরক্তিকর চুলকুনি বা অ্যালার্জি জনিত সমস্যা দূর করতে রসুনের ব্যবহার বেশ কার্যকর। আক্রান্ত স্থানে রসুনের প্রলেপ লাগালে এটি চুলকানির ফলে সৃষ্ট শক্ত চামড়া বা পাপড়িকে নরম করে দ্রুত ঝরিয়ে দেয় এবং ভেতরের সংবেদনশীল অংশটি বের করে আনে। এরপর সেই পরিষ্কার স্থানে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কোনো ভালো মলম ব্যবহার করলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায় এবং ত্বকের অস্বস্তি কমে যায়। রসুনের প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ফাঙ্গাল উপাদান ত্বকের গভীর থেকে জীবাণু পরিষ্কার করে সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

২৪. দাদের জ্বালা সারাতে: ত্বকের জেদি সমস্যা দাদ বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন দূর করতে রসুনের প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ফাঙ্গাল গুণ অত্যন্ত কার্যকরী। আক্রান্ত স্থানে নিয়মিত রসুনের রস টানা তিন দিন লাগালে দাদ ধীরে ধীরে শুকিয়ে সেরে যায়। রসুনের রস সরাসরি ব্যবহারের ফলে যদি ত্বকে তীব্র জ্বালাপোড়া অনুভব হয়, তবে উপশম পেতে এর ওপর সামান্য খাঁটি ঘি লাগিয়ে নিতে পারেন। ঘি ব্যবহারের ফলে ত্বকের জ্বালা কমে আসে এবং ক্ষতস্থান দ্রুত নিরাময় হতে শুরু করে। ঘরোয়া উপায়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীনভাবে চর্মরোগ থেকে মুক্তি পেতে রসুনের এই ওষধি ব্যবহারটি বেশ সাশ্রয়ী ও বিশ্বস্ত

গন্ধ দূর করতে:

অনেকেই রসুনের চমৎকার স্বাস্থ্যগুণ সম্পর্কে জানলেও এর কড়া গন্ধের কারণে এটি খেতে দ্বিধাবোধ করেন। তবে খুব সহজেই এই রসুনের দুর্গন্ধ দূর করার উপায় রয়েছে। রসুনের কোয়ার খোসা ছাড়িয়ে মাঝখান থেকে কেটে আগের দিন রাতে টক দইয়ে ভিজিয়ে রাখুন; পরদিন খাওয়ার আগে ধুয়ে নিলে এর উটকো গন্ধ একদম চলে যাবে। এছাড়া ঘি-য়ে ভেজে শাক-তরকারির সঙ্গে অথবা মাংস বা দইয়ের সঙ্গে সিদ্ধ করেও এটি অনায়াসেই খাওয়া যায়।

ইউনানি বা হাকিমি শাস্ত্র মতে, রসুন একটি বহুমুখী প্রাকৃতিক মহৌষধ। এটি শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে এবং হজম শক্তি ও কামোদ্দীপনা বৃদ্ধিতে দারুণ কার্যকর। এছাড়া পক্ষাঘাত (প্যারালাইসিস), গেঁটে বাত, লিভার বা প্লীহা বৃদ্ধি এবং হার্ট ও ফুসফুসের জটিলতা দূর করতে রসুনের ভূমিকা অতুলনীয়। নিয়মিত রসুন সেবনে গলার স্বর পরিষ্কার হয়, দাঁতের রোগ সারে এবং এমনকি শ্বেতী বা রক্ত ঘন হওয়ার মতো সমস্যাও নিয়ন্ত্রণে থাকে। সুস্থ ও রোগমুক্ত জীবনের জন্য তাই রান্নায় বা সরাসরি রসুন যুক্ত করা একটি বুদ্ধিমানের কাজ।

বৈজ্ঞানিকদের মতে:

১. রসুন উষ্ণ, লঘু, মনের উৎসাহ বৃদ্ধি করে উদ্দীপিত করে, উদরবাত সারায়, কৃমি সারায়।

২. এছাড়াও শরীর সবল করে, উত্তেজনা সৃষ্টি করে, কফ সারায়, পচে যাওয়া প্রতিরোধ করে, মূত্রের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, বাত সারায় এবং বলকারক।

৩. রসুনে ক্যালসিয়াম, পাটাসিয়াম, ফসফরাস, প্রভৃতি খনিজ আছে। এছাড়াও আছে একালি ও আয়োডিন। রসুনে ভিটামিন ‘বি’, ‘সি’ এবং অল্প পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ আছে।

৪. রসুনের এলায়ল সালফাইড ফুসফুসের ক্ষয়, গ্রস্থিক্ষয়, গলগণ্ড, পেটের ক্ষয়, ত্বকের ক্ষয় প্রতিরোধ করে।

৫. পচন নিবারণের পক্ষে রসুনের গুণ অমৃতের মতো।

৬. রসুনে জীবাণুনাশক অ্যান্টিসেপ্টিক গুণ প্রচুর পরিমাণে আছে।

৭. রসুন ক্ষয় রোগ নিবারণ করে। নিয়মিত রসুন খেলে ক্ষয়রোগ হয় না।

৮. শোথ ও জলোদর (ড্রপসি) রোগের পক্ষেও রসুন উপকারী।

৯. প্রসূতির পক্ষে রসুন খাওয়া তো খুবই ভাল।

১০. বৃদ্ধাবস্থায় যদি বহুদিন ধরে অসুস্থ থাকবার পর শারীরিক শক্তি কমে যায় তাহলে শীতকালে নিয়ম করে রসুন খাওয়া উচিত। রসুন ব্যাকটেরিয়া রোধ করে কাজেই শাসনালী ও ফুসফুসের অসুখে রসুন খেলে উপকার পাওয়া যায়।

১২. শ্বাসনালীর জমা হয়ে থাকা কফ সরল করে, কিডনির পাথর মূত্রের সাহায্যে বাইরে বের করে দেয়।

১৩. পচা গলা ঘায়ে রসুনের প্রলেপ খুবই উপকারী-রসুন ঘামের সমস্ত জীবাণু বিনষ্ট করে।

১৫. নিয়মিত রসুন খেলে শরীর বলবান, নিরোগ ও তেজোপূর্ণ হয় ।

বৈদ্য শাস্ত্রমতে রসুন ও রসুনের নানা নাম:

বৈদ্য শাস্ত্র মতে রসুনের অনেক গুণ আছে। অন্যান্য নানান ব্যাধি সারানোর সঙ্গে সঙ্গে রসুনের আরও কয়েকটি বিশিষ্ট গুণ হল রসুন খাদ্যরুচি বৃদ্ধি করে। বলকারক, পুষ্টি বৃদ্ধি করে, মেধা বাড়ায় এবং চোখের পক্ষে নানা গুণের সমাবেশের জন্যে রসুনের আরও কয়েকটি নাম আছে যেমন উগ্রগন্ধ (গন্ধ বেশি উগ্র বলে এই নাম), শীতবর্ধক, বাতারি (বাত সারিয়ে তোলে অথাৎ বাতের অরি বা শত্রু), অরিষ্ঠ, ভূত ও মহৌষধ।

নানা রোগে রসুনের প্রয়োগ

ম্যালেরিয়া— একজন চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেখেছেন ২ চা চামচ গাওয়া ঘি গরম করে তাতে কয়েক ফোঁটা রসুনের রস ঢেলে সাত দিন ধরে সকালবেলা খেলে ম্যালেরিয়া সারে।

মাথাধরা— রসুনের কোয়া ছেচে কপালে প্রলেপ লাগাতে হবে বা খেতে

তড়কা— রসুনের রসের মালিশ ।

যক্ষ্মা—  রসুনের রস খেলে উপশম হয়।

কানের ব্যথা— কানে গরম রসুনের রসের ফোঁটা দিলে উপকার পাওয়া যায়।

জ্বর ও হাঁপানি— রসুনের রস খেলে উপকার পাওয়া যায় ।

বাতজ্বর— তিল তেলে রসুনের কোয়া বেটে নিয়ে খুব অল্প পরিমাণে নিয়মিত খেলে উপকার পাওয়া যায়।

আয়ুদৌর্বল্যে বা স্নায়ুবিকার— রসুনের রস খেলে বা শুকলে আরাম পাওয়া যায়।

মানসিক ভারসাম্য হারানো— দুধে রসুনের কোয়া সেদ্ধ করে খেলে উপকার হয় ! প্রাচীনকালে রোমে পাগলামি সারাতে রোগীদের রসুন খাওয়ানো হতো।

মৃগী রোগে— রসুন খেলে উপকার হয়।

চোয়াল আটকে যাওয়ায়— মেরুদণ্ডে রসুনের রস মালিশ করলে আরাম পাওয়া যায়।

ঘুম কম হলে অর্থাৎ অনিদ্রা রোগে— রসুন খেলে ঘুম ভাল হয়।

যা, খোস,পাঁচড়া— নারকোল বা সর্ষের তেলে রসুনের কোয়া নরম করে ভেজে নিয়ে ঘায়ে বা পাঁচড়ায় সেই তেলের প্রলেপ লাগালে উপকার পাওয়া যায়।

বদহজমে— অল্প পরিমাণে রসুন প্রতিদিন নিয়ম করে খেলে ভাল ফল পাওয়া যায়।

কামলা বা জণ্ডিস রোগে— অ্যালকোহলের সঙ্গে রসুনের রস মিশিয়ে খেলে উপকার হয়।

বাত রোগে— রসুন ও পেঁয়াজ বাত রোগের প্রসিদ্ধ ওষুধ। নিয়ম করে রসুন খেলে বাতের উপকার হয়। কোনো জায়গা মচকে গেলে রসুনের রস লাগালে বা রসুনের কোয়া নুন দিয়ে বেটে প্রলেপ লাগালে উপকার পাওয়া যায় এবং বাতের ব্যথা সেরে যায়। গেঁটে বাতে রসুনের বাটে মধুর সঙ্গে মিশিয়ে প্রলেপ দিলে তাড়াতাড়ি উপকার হয়। [২] 

নিষেধ: মাছের সঙ্গে, কাঁচা দুধের সঙ্গে রসুন খেতে নেই, এর দ্বারা রক্ত দূষিত হয়।

রাসায়নিক গঠন:

রসুনের বিস্ময়কর ওষধি গুণের মূলে রয়েছে এর শক্তিশালী রাসায়নিক গঠন। বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রসুনে প্রচুর পরিমাণে অর্গানিক সালফাইড (Organic Sulphides) রয়েছে, যার মধ্যে অ্যালিসিন (Allicin), অ্যালিল প্রোপাইল ডিসালফাইড এবং অ্যালিসেটিন-১ ও ২ প্রধান। এই উপাদানগুলোই মূলত রসুনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণের প্রধান উৎস। এছাড়াও এতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সালফার যুক্ত অ্যামিনো অ্যাসিড, যেমন এস-কার্বক্সি প্রোপাইল গ্লুটাথাইন। রসুনের নিজস্ব তীব্র গন্ধ ও গুণের জন্য দায়ী এর ভেতরে থাকা এসেনশিয়াল অয়েল বা উদ্বায়ী তেল। মূলত এই রাসায়নিক উপাদানগুলোর সমন্বিত কার্যকারিতার কারণেই রসুন হৃদরোগ, সংক্রমণ এবং বাতের মতো জটিল সমস্যায় মহৌষধ হিসেবে কাজ করে।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্র:

১. আশরাফুল হক ও এম এ হাসান, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ১১ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩৫৫। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ৫১-৫৩।

৩. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা,১৯৩-২০০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!